cms.somewhereinblog.net

কাউসার রুশো

২০১৩ সালটি উপমহাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে দু’টো অসাধারন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। আজি হতে শতবর্ষ পূর্বে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জিতে নিয়েছিলেন বিশ্বের সবেচেয়ে সম্মানজনক নোবেল পুরষ্কার। একই সঙ্গে ১৯১৩ সালে উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পর পেরিয়ে গেছে পুরো একশোটি বছর! দু’টো অর্জনই ভৌগোলিক কারনে আজ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দখলে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবেনা এ অর্জনের পরতে পরতে মিশে আছে বাঙ্গালি তথা বাংলাদেশিদের মেধা-ঘাম-অশ্রু-রক্ত। আর শিল্প-সংস্কৃতিকে কোন নির্দিষ্ট গন্ডি বা সীমানার মাঝে বেঁধে ফেলা সম্ভব নয়। তাই এই অর্জন কার সেই তর্ক-বিতর্ক আপাতত তোলা থাক। জেনে নেয়া যাক এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নেপথ্য নায়কদের কথা।
শুরুর কথা
১৮৯৫ সালে ল্যুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় প্যারিসে বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। এই ঘটনার ১৮ বছরের মধ্যেই, ১৯১৩ সালের ৩ মে দাদা সাহেব ঢুন্ডিরাজ গোবিন্দ ফালকে-র (যিনি দাদা সাহেব ফালকে নামে সুপরিচিত) হাত ধরে উপমহাদেশের চলচ্চিত্র গৌরবোজ্জ্বল যাত্রা শুরু করে। সাদাকালো নির্বাক সেই চলচ্চিত্রটির নাম ছিলো ‘রাজা হরিশচন্দ্র’। রামায়ণ ও মহাভারতে বর্ণিত রাজা হরিশচন্দ্রের জীবন নিয়ে তৈরি এই ছবির নারী চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছিলেন পুরুষরা৷ কারন তত্কালে নারীদের অভিনয় করাটা অশোভন বলে মনে করা হত৷ সেদিন মুম্বাইয়ের (তৎকালীন বোম্বে) নানা শ্রেণীর মানুষ জড়ো হয়েছিলেন শহরটির অলিম্পিয়া থিয়েটারে উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রটি দৃষ্টিগোচর করার এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার জন্য ।
মজায় বিষয় তখন চলচ্চিত্রকে বলা হত বায়স্কোপ। যদিও এর আগেই ১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই ভারতীয় উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের প্রদর্শণী হয়ে গেছে। ল্যুমিয়ের ভাইদের একজন ভারতবর্ষে এসে বোম্বের ওয়াটসন হোটেলে উপমহাদেশের বায়স্কোপের প্রথম প্রদর্শনীটি করেছিলেন। সে বছরই ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় বায়স্কোপের প্রদর্শনী হয়।
তবে উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা, তথ্যচিত্র নির্মাতা, বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শক হিসেবে যার নামটি সবার আগে আসা উচিত তিনি একজন বাঙ্গালি, হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭)। ১৮৯৮ সালে হীরালাল সেন প্রতিষ্ঠিত দ্য রয়েল বায়স্কোপ কোম্পানিকে বাংলা চলচ্চিত্র তথা উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের সূতিকাগার বলে মনে করা হয়। দ্য রয়েল বায়স্কোপ বেশ কিছু নির্বাক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র র্নির্মাণ করে। হীরালালের তৈরি তথ্যছবি “Anti-Partition Demonstration and Swadeshi Movement at the Town Hall, Calcutta on 22nd September 1905” উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বলে গণ্য করা হয়। ১৯১৭ সালে এক অগ্নিকাণ্ডে তাঁর তৈরি সকল চলচ্চিত্র নষ্ট হয়ে যায়।
নির্বাক ছবি নির্মাণের প্রায় ১৮ বছর পর ১৯৩১ সালের ১৪ মার্চ মুক্তি পায় আরদেশির ইরানি পরিচালিত ‘আলম আরা’ ছবিটি যা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। এ ছবির ‘দে দে খোদা কে নাম পার’ গানটি উপহাদেশের সিনেমায় ব্যবহৃত প্রথম গান। গানটি গেয়েছিলেন ওয়াজির মোহাম্মদ খান, যিনি ঐ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন।। গানটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় শুধুমাত্র একটি হারমোনিয়াম এবং তবলা বাজিয়ে সরাসরি ধারণ করা হয়েছিল। চলচ্চিত্রটিতে সংলাপ কম, গান ছিল বেশি যা পরবর্তীতে উপমহাদেশ তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রাঙ্গনে সঙ্গীতর্নিভর চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
রাজা হরিশচন্দ্রের পর উপমহাদেশের চলচ্চিত্র পার করেছে দীর্ঘ একশোটি বছর। এরই মাঝে এসেছে যুদ্ধ-দাঙ্গা, ঘটেছে দেশবিভাগের মত ঘটনা। উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে পৃথক নাম গ্রহণ করেছে। আর সূত্রপাতটা তত্কালীন বোম্বেতে হওয়ায় ভারতীয় চলচ্চিত্রকে বিশ্ব এখন ‘বলিউড’ নামে চেনে। অনেকটা সময় ধরেই বলিউড রূপান্তরিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। বলিউডকে সঙ্গ ও শক্তি দিচ্ছে ভারতের অন্যান্য প্রদেশ যেমন কলকাতা, তামিল, তেলেগু আর মালয়লামের মত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলো। জন্ম দিয়েছে দুনিয়া কাঁপানো অসংখ্য সব ছবি আর তারকার। তাই ভারতীয় চলচ্চিত্র এখন নিজ দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে প্রবেশ করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, পরিণত হয়েছে অবিশ্বাস্য অর্থ মূল্যের শিল্পে!
কালে কালে ভারতীয় ছবি
ভারতের সর্বপ্রথম সবাক চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন আরদেশির ইরানি। ভারতীয় চলচ্চিত্রকে সাদাকালোর বৃত্ত থেকে রঙ্গিন দুনিয়ায় নিয়ে আসার কৃতিত্বটাও তাঁর। ১৯৩৭ সালে আরদেশির ইরানি প্রযোজিত ও মতি বি. গিদভানি পরিচালিত ‘কিষাণ কানইয়া’ ভারতের প্রথম রঙ্গিন চলচ্চিত্র। ছবিটির চিত্রনাট্য লেখেন প্রখ্যাত পাকিস্তানি লেখক সাদাত হাসান মান্টো। তবে ভারতে রঙ্গিন ছবি জনপ্রিয়তা লাভ করে ১৯৫৫ সালের পর।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন অভিনেত্রী দেবিকা রানি ও হিমাংশু রায়। ১৯৩৩ সালে ‘কর্ম’ ছবিতে চার মিনিটের একটি চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করেন বাস্তব জীবনের এই স্বামী-স্ত্রী৷ হিমাংশু রায় পরবর্তীতে জার্মান পরিচালক ফ্রানৎস অস্টেনের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
শুরুর দিকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে দেশপ্রেম বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল। দেড় শ বছরের বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল চলচ্চিত্র। উপমহাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে চলচ্চিত্র সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল। আর তাই উপমহাদেশে প্রথম সেন্সর বোর্ডের সৃষ্টি হয়েছিল চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা রোধে নয় বরং ‘রাজনৈতিক’ বিষয় সেন্সর করার জন্য। ১৯২১ সালের ‘ভক্ত বিধুর’ চলচ্চিত্রটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে প্রথমবারের মত সেন্সর করা হয় বলে আশিস রাজধাক্ষ ও পল উইলমেন এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইন্ডিয়ান সিনেমায় উল্লেখ করেছেন।
নৃত্য ও সঙ্গীত সবসময়ই ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম মুখ্য উপাদান হলেও বিবর্তনের পথ ধরে কাহিনীর গন্ডি ছাপিয়ে বর্তমানে তা হয়ে উঠেছে নাচে-গানে ভরপুর মাসালা ছবিতে । আর ভারতে নাচ-গান র্নিভর ছবির চলটা মূলত শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৯৪০-১৯৬০ কে বলা হয় ভারতীয় ছবির স্বর্ণযুগ। এই সময়টিতে রোমান্টিক চলচ্চিত্র প্রাধান্য পেলেও সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি, শ্রৈণী বৈষম্য ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোও উঠে আসতে শুরু করে। এই সময়ে আগমন ঘটে ভারতীয় সিনেমার দুই বরপুত্রের। রাজ কাপুর আর গুরু দত্ত। পরিচালনা, প্রযোজনা, অভিনয়সহ চলচ্চিত্রে বহুমুখী ভূমিকা পালন করে তাঁরা দর্শকদের উপহার দিতে থাকেন একের পর এক অসাধারন সব ছবি। এর মধ্যে গুরু দত্ত-ওয়াহিদা রহমান জুটির পেয়াসা (১৯৫৭), কাগজ কী ফুল (১৯৫৯) সাহেব বিবি গোলাম (১৯৬২), রাজ কাপুরের আগ (১৯৪৮), আওয়ারা (১৯৫১), শ্রী ৪২০ (১৯৫৫), জিস দেশ মে গঙ্গা ব্যাহতি হ্যায় (১৯৬০) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের হাত ধরেই ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলো মূলত আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
রাজ কাপুর-নার্গিস জুটি অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো বলিউডে জুটি প্রথার প্রচলন করে দেয়। রাজ কাপুর তাঁর চলচ্চিত্রগুলো দিয়ে দেশের বাইরেও জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করেন। তাঁর নিজস্ব প্রোডাকশন হাউস আরকে প্রোডাকশন থেকে আশির দশক পর্যন্ত প্রচুর হিট ছবি উপহার দেন যার মধ্যে রয়েছে মেরা নাম জোকার, সঙ্গম, সত্যম শিভম সুন্দরম এর মত ছবি। এ ছবিগুলো একইসঙ্গে দর্শক ও বোদ্ধামহলের দারুন প্রশংসা কুড়ায়। তিনি পরিণত হন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তীতে।
এদিকে দুই ভাই চেতন আনন্দ আর দেব আনন্দ বলিউডকে নতুন ধারার ছবি দেখাতে শুরু করেন। হলিউড কায়দা-কানুন প্রবেশ করে বলিউডে আর দেব আনন্দ পরিণত হন বলিউডের সর্বকালের অন্যতম এভারগ্রীন স্টাইলিশ আইকনে। দেব আনন্দের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হল কালাপানি (১৯৫৮), কালা বাজার (১৯৬০),রূপ কী রানি চোর কা রাজা (১৯৬১),হাম দোনো (১৯৬২), গাইড (১৯৬৫)।
প্রায় একই সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র সন্ধান পায় আরেক কিংবদন্তীর, দিলীপ কুমার। দেবদাস (১৯৫৫) ও মুঘল-ই-আযম (১৯৬০) ছবিতে অভিনয় করে তখন তিনি তারকখ্যাতি উপেভোগ করছেন। ১৯৬০ সালে কে আসিফ দিলীপ কুমার, মধুবালা আর পৃথ্বিরাজ কাপুরকে নিয়ে তৈরি করেন বলিউডের সর্বকালের অন্যতম সেরা ছবি ‘মুঘল-ই-আযম’। বলিউডের অন্যতম ব্যয়বহুল ছবি হিসেবেও ‘মুঘল-ই-আযম’ স্বীকৃত। তুমুল জনপ্রিয় সাদাকালো এই ছবিটিকে রঙ্গীন করে পুনরায় ২০০৪ সালে মুক্তি দেয়া হয়। দিলীপ কুমার-মীনাকুমারী জুটির ছবিগুলোও দারুন ব্যবসা সফল হয়।
১৯৭১ সালে ঋষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত ‘আনন্দ’ ছবিতে রাজেশ খান্না আর অমিতাভ বচ্চন পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেন। ভারতবাসী তখনই বুঝে নিয়েছিল বলিউড আশীর্বাদপুষ্ট হতে যাচ্ছে দুই মহান শিল্পীর আবির্ভাবে । সত্তর দশকে ভারতীয় ছবির সুপারস্টার হচ্ছেন রাজেশ খান্না। অমিতাভের আগেই তিনি তখন তারকাখ্যাতি লাভ করেছেন। তখন রোমান্টিক হিন্দি সিনেমার অপর নামই ছিলো রাজেশ খান্না। আরাধনা, রোটি, সাচ্চা ঝুটা, অমর প্রেম, দাগ, হাতি মেরি সাথি-র মত একের পর এক হিট ছবি বলিউডকে খুব কম তারকাই দিতে পেরেছে।
সত্তর দশকটা রাজেশ খান্নার হলেও সত্তর দশকের মাঝামাঝি আর ১৯৮০-৯০ টানা প্রায় দুই দশক নিজের করে নিয়েছেন বলিউডের জীবন্ত কিংবদন্তী অমিতাভ বচ্চন। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পায় রমেশ সিপ্পি পরিচালিত ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘শোলে’। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা শেখর কাপুর এই ছবিটির গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বোঝাতে মন্তব্য করেন, ‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। শোলের আগে এবং পরে।’ ছবিটিতে অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, হেমা মালিনী, জয়া বচ্চন, সঞ্জীব কাপুর ও আমজাদ খান অভিনয় করেন। আমজাদ খান অভিনীত এই ছবির ডাকাত সর্দার গব্বর সিং চরিত্রটি ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা খলচরিত্র। ছবিটির কিছু কিছু সংলাপ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
ভারতের কিংবদন্তী চলচ্চিত্র নির্মাতা যশ চোপড়ার সঙ্গে জুটি বেঁধে অসংখ্য হিট ছবি উপহার দেন বলিউড শাহেনশাহ মিস্টার বিগ বি। অমিতাভ বচ্চন অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে দিওয়ার, জাঞ্জির, ডন, লাওয়ারিশ, অগ্নিপথ, কাভি কাভি, সিলসিলা ইত্যাদি। রাজ কাপুর-নার্গিস এর পর অমিতাভ-রেখা জুটি বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত জুটি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। এই জুটির উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে দো আনজানে (১৯৭৬),মুকাদ্দার কা সিকান্দার (১৯৭৮), সুহাগ (১৯৭৯), মি. নাটওয়ারলাল (১৯৭৯), সিলসিলা (১৯৮১),শূণ্য দশকে এই মহাতারকা প্রায় হারিয়ে যেতে বসলেও ফিনিক্স পাখির মত বলিউডে দোর্দন্ড প্রতাপে প্রত্যাবর্তন করেন। সত্তর-আশি দশকে পারভীন ববি, জিনাত আমান, সায়রা বানু বলিউডের গ্ল্যামারাস গার্ল হিসেবে আবির্ভূত হন। এই সময়টিতে বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে সামাজিক অ্যাকশনধর্মী ছবির নির্মাণের ঝোঁক উঠে।
১৯৮৪ সালে প্রথম ভারতীয় থ্রিডি ছবি ‘মাই ডিয়ার কুট্টিচাথান’ মুক্তি পায়। এই মালয়লাম ছবিটি ১৯৯৭ সালে হিন্দিতে ভাষান্তর (ডাব) করে এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবর্ধিত আকারে ‘ছোটা চেতন’ নামে মুক্তি দেয়া হয়। ছবিটির পরিচালক ছিলেন জিজো পুন্নোসে।
নব্বইয়ের দশকে সঞ্জয় দত্ত আর অনিল কাপুর বেশ ভালো অবস্থান গড়ে তুলেন। অনিল কাপুর-শ্রীদেবী অভিনীত শেখর কাপুরের মিস্টার ইন্ডিয়া (১৯৮৭) সায়েন্স ফিকশন নিয়ে সিনেমা তৈরির প্রচলন ঘটায়। এ ছবিতে অমরেশ পুরি ‘মোগোম্বো’ চরিত্রে অভিনয় করে হৈচৈ ফেলে দেন। নেতিবাচক চরিত্রের সংজ্ঞাই পাল্টে দেন এই শক্তিমান অভিনেতা। সঞ্জয় দত্ত-মাধুরী দীক্ষিত অভিনীত সুভাষ ঘাইয়ের খলনায়ক (১৯৯৩)সঞ্জয় দত্তকে পৌঁছে দেয় সাফল্যের শিখরে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত জীবন সঞ্জয়কে খুব বেশিদিন বলিউডের সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকতে দেয়নি।
নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত বলিউডে চলছে খানদের যুগ। শাহরুখ খান, আমির খান আর সালমান খান। এ সময় বলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনার জন্ম দেয় আদিত্য চোপড়া পরিচালিত ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ ছবিটি, যা ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রেক্ষাগৃহে চলতে থাকা চলচ্চিত্র। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবিটি মুম্বাইয়ের মারাঠা মন্দির প্রেক্ষাগৃহে গত জানুয়ারি মাসে টানা ৯০০ সপ্তাহ ধরে চলার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ে।
এ ছবি দিয়ে বলিউডে শাহরুখ খান যুগের সূচণা হয়। শাহরুখের বিপরীতে ছিলেন কাজল। শাহরুখ-কাজল জুটি দীর্ঘদিন দাপটের সঙ্গে বলিউড শাসন করেছে। শাহরুখ খান যশ চোপড়া, করন জোহর, সঞ্জয় লীলা বানসালির মত নির্মাতাদের সঙ্গী করে উপহার দিয়েছেন ব্লকবাস্টার সব ছবি। কখনও মাধুরী দীক্ষিত, কখনও জুহি চাওলা, কখনও কাজল, কখনও ঐম্বরিয়ার সঙ্গে তিনি জুটি বেঁধে বলিউডে হয়ে উঠেন রোমান্টিক ছবির আইকন। এখন তার পরিচিতি কিং খান হিসেবে।
অপরদিকে মিস্টার পারফেকশনিস্ট খ্যাত আমির খান বলিউডের সবচেয়ে ভার্সাটাইল অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃত। লগান, দিল চাহতা হ্যায়, রঙ দে বাসন্তী, থ্রি ইডিয়টস, তারে জামিন পার সহ প্রতিনিয়ত ব্যতিক্রমধর্মী চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন দর্শক আর সমালোচকদের। ভারতীয় চলচ্চিত্রকে নিয়ে গেছেন অস্কারের দৌড়ে। অপর দিকে ব্যাড বয় ইমেজ নিয়েও সালমান খান এগিয়ে চলেছেন তার আপন গতিতে। বহুদিন খানদের সঙ্গে কেউ পেরে উঠতে পারেনি। তবে তাদের একচ্ছত্র আধিপাত্যে প্রথম ভাগ বসিয়েছেন হৃত্বিক রোশন। আর বর্তমানে কাপুর পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য রণবীর কাপুর বলিউড মাতাচ্ছেন।
বলিউডে বর্তমানে নাচ-গানে ভরপুর মাসালা মুভির পরিমাণ বেশি হলেও শুধূ নির্দিষ্ট ঘরানার ছবিতে আবদ্ধ থাকেনি। রোমান্টিক, কমেডি থেকে শুরু করে অ্যাকশন, হরর, সাইকো থ্রিলার এমনকি সায়েন্স ফিকশন ছবিও হচ্ছে বলিউডে। বলিউডের ছবির বিবর্তনের পথ পরিক্রমায় যারা এখনও নেপথ্য নায়কের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে আরো রয়েছেন শ্যাম বেনেগাল, মণি রত্নম, প্রকাশ ঝা, মধুর ভান্ডারকর, মহেশ মাঞ্জেরকর, রাম গোপাল ভার্মা, বিধু বিনোদ চোপড়া, রাজকুমার হিরানী, বিশাল ভরদ্বাজ, অনুরাগ কাশ্যপ, দিবাকর বন্দোপাধ্যায়, অনুরাগ বসু সহ আরো অনেকে।
মাঝে বলিউডে নারী চরিত্রগুলোকে চলচ্চিত্রে শুধুমাত্র সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য রাখার একটি চল সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু একটা সময় নারীপ্রধান চরিত্র নিয়েই সিনেমা বানানো শুরু হয়। নারীকে শুধূ গ্ল্যামারসভাবে উপস্থাপনের এই প্রথা ভেঙ্গে দেন শাবানা আজমি। বহুবার জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেত্রী দারুন ধ্রুপদী সব ছবি দিয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তারই দেখানো পথে পরবর্তীতে হেঁটেছেন নন্দিতা দাশ, টাবু, কঙ্কনা সেন শর্মা, রানী মুখার্জি, বিদ্যা বালান, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া প্রমুখ। বর্তমানে বলিউডের গ্ল্যামার-চাকচিক্য আর মাসালার ভিড়েও তাই এরা ব্যতিক্রম।
এবং কাপুর পরিবার
সমগ্র বলিউড কৃতজ্ঞ থাকবে কাপুর পরিবারের প্রতি । ভারতে সবাক চলচ্চিত্রের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত কাপুর পরিবারের চার চারটি প্রজন্ম বলিউডে রাজত্ব করেছে। শুরুটা পৃথ্বিরাজ কাপুরের হাত ধরে। ভারতের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র আলম আর-তে তিনি অভিনয় করেছিলেন। তাঁর সুপুত্র রাজ কাপুরকে বলা হয় শোম্যান অফ দ্য মিলেনিয়াম। রাজ কাপুরের দুই ভাই শশী কাপুর আর শাম্মী কাপুর বলিউডের বহু হিট ছবির জনক। রাজ কাপুরের তিন ছেলে রনধীর কাপুর, ঋষি কাপুর আর রাজীব কাপুরও বলিউডে বেশ ভালো অবস্থান গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। রনধীর কাপুরের দুই মেয়ে কারিশমা কাপুর আর কারিনা কাপুর বলিউডের দুই লাস্যময়ী অভিনেত্রী। আর ঋষি কাপুরের ছেলে রনবীর কাপুর এ মূহুর্তে বলিউড কাঁপাচ্ছেন।
অস্কার ও আন্তর্জাতিক আসরে ভারতীয় ছবি
১৯৫৭ সালের ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ছবিটি ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পায়৷ মেহবুব খান পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেন নার্গিস, সুনীল দত্ত, রাজেন্দ্র কুমার ও রাজ কুমার৷ ছবিটি মূলত একই পরিচালকের অওরাত (১৯৪০) ছবির রিমেক। ১৯৮৮ সালে মিরা নায়ার পরিচালিত ‘সালাম বোম্বে’ ছবিটি দ্বিতীয় ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেকে অস্কার মনোনয়ন লাভ করে। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানজনক ক্যামেরা ডি’ অর পুরষ্কার জিতে নেয়। ২০০১ সালে আশুতোষ গোয়ারিকার পরিচালিত ও আমির খান অভিনীত ‘লগান’ ছবিটি বিশ্ববাসীকে চমকে দেয়। ‘টাইম’ ম্যাগাজিন লগানকে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা চলচ্চিত্রের একটি বলে আখ্যায়িত করে। তৃতীয় ভারতীয় ছবি হিসেবে অস্কার মনোনয়ন লাভ করে লগান। তিন তিনবার মনোনয়ন পেলেও এখন পর্যন্ত কোন ভারতীয় ছবি অস্কার জিতে নিতে পারেনি।
তবে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্রকর হিসেবে সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২) বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরষ্কার ‘অস্কার’ জিতে নেন। পরিচালনাসহ চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে অস্কার কমিটি তাঁকে আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার প্রদান করে। তাঁর নির্মিত বহু চলচ্চিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসব, ভেনাস চলচ্চিত্র উৎসব, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব সহ বিশ্বের নামীদামী চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রদর্শিত হয় ও পুরষ্কার জিতে নেয়। অপু ট্রিলজি (পথের পাঁচালি, অপরাজিত, অপুর সংসার) তাঁর সৃষ্টি । বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সিনেমার যে কোন তালিকায় অপু ট্রিলজিকে খুঁজে পাওয়া যায়। সত্যজিৎ রায়। অপু ট্রিলজির প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’ ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ‘হিউম্যান ডকুমেন্ট প্রাইজ’ জিতে নেয়।
তবে ভারতীয় ছবিতে নয় হলিউডি ছবিতে কাজ করে অস্কার পেয়েছেন এই তালিকায় আছেন আরো বেশ কয়েকজন। প্রথমজনের নাম ভানু আথাইয়া। ১৯৮২ সালে ‘গান্ধী’ ছবিতে পোশাক পরিকল্পনার (কস্টিউডম ডিজাইন) কাজ করে অস্কার জিতে নেন তিনি। একদিক থেকে তিনিই প্রথম ভারতীয় অস্কারবিজয়ী। এরপর ২০০৯ সালে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে নির্মিত হলিউডি ছবি ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’-এ সঙ্গীত পরিচালনার জন্য এ আর রেহমান দু’টি অস্কার জয় করেন৷ গীতিকার হিসেবে গুলজার-এর ঝুলিতেও যায় একটি অস্কার। এই ছবির ‘জয় হো’ গানটি বিশ্বব্যাপী সঙ্গীত চার্টগুলোতে শীর্ষ স্থান দখল করে। একই ছবির জন্য আরেক ভারতীয় রেসুল পুকুট্টি শ্রেষ্ঠ শব্দ সংযোজন বিভাগে অস্কার জিতে নেন।
১৯৪৬ সালে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে ‘নীচা নগর’ (The Lowly City) কান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরষ্কার জিতে নেয়। কানের দ্বিতীয় আসরেই বাজিমাত করে ভারতীয়রা। ছবিটির পরিচালক চেতন আনন্দ আর সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন বিশ্ববরেণ্য কিংবদন্তী শিল্পী পন্ডিত রবি শঙ্কর।
ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে ভুমিকা রাখছেন প্রবাসী ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতারাও। এই তালিকায় আছেন শেখর কাপুর, মিরা নায়ার ও দীপিকা মেহতার মত অস্কারের দৌড়ে প্রতিদ্বন্দিতা করা নির্মাতারা।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাঙ্গালিদের ভূমিকা
ভারতীয় চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক আসরে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বাঙ্গালি চলচ্চিত্রকররা। সত্যজিত রায় ছাড়াও এ তালিকায় আছেন ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, তপন সিনহা, ঋতূপর্ণ ঘোষদের মত কিংবদন্তীরা। জীবনমুখী এই ফিল্মমেকাররা তাঁদের চলচ্চিত্রকর্ম দিয়ে সবার মন যেমন জয় করেছেন তেমনি দেশের বাইরের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করে ও পুরষ্কার জিতে ভারতের জন্য বয়ে এনেছেন বিপুল সম্মান। তাঁরা ভারতীয় চলচ্চিত্রের শিল্পমানকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন যে বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ভাষাকে বিশ্ব সমীহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে।
শুধু তাই নয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবেচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় উত্তম-সূচিত্রা জুটি এসেছে বাংলা সিনেমা থেকেই। কলকাতার বাংলা সিনেমায় উত্তম কুমার মহানায়ক হিসেবে সর্বজন শ্রদ্ধেয়। একইভাবে অভিনেত্রীদের মধ্যে সূচিত্রা সেনের স্থানও সবার উপরে। এই জুটির অসংখ্য হিট ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারানো সুর, সপ্তপদী, পথে হলো দেরি, চাওয়া পাওয়া, জীবনতৃষ্ণা, সাগরিকা প্রভৃতি।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে দক্ষিণের ভূমিকা
ভারতীয় চলচ্চিত্র ষাটের দশক থেকেই বিভিন্ন আঞ্চলিক পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করে এবং ভোজপুরি, উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। দক্ষিণ ভারত এদিক থেকে একটু বেশি এগিয়ে থাকবে। বলিউডের অনেক রথী-মহারথীরা মূলত দক্ষিণ ভারতের সম্পদ। তামিল, তেলেগু, মালয়লাম থেকে শুরু করে সমগ্র দক্ষিণ ভারত কোন কোন দিকে থেকে বলিউডের চেয়েও শক্তিশালী। জন্ম দিয়েছে কমল হাসান, রজনীকান্ত, রেখা, শ্রীদেবি, হেমা মালিনী, ওয়াহিদা রহমান, বিদ্যা বালানদের মত তারকাদের। রজনীকান্ত হচ্ছেন এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতা। বর্তমানে তামিল-তেলেগু ছবির পুন:নির্মাণের একটি ধারা চালু হয়েছে বলিউডে ।
হলিউডে বলিউড তারকারা
১৯৮২ সালে স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরোর অস্কারজয়ী ‘গান্ধি’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মূলত বলিউড শিল্পীদের হলিউডে যাত্রা শুরু হয় । অমরিশ পুরি, ওম পুরি, রোশান সেথ সহ বলিউডের অনেক শিল্পীই এ ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৮৩ সালে কবির বেদি অভিনয় কেরন জেমস বন্ড সিরিজের ‘অক্টোপুসি’ ছবিতে। ১৯৮৪ সালে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ইন্ডিয়ানা জোনস: দি টেম্পল অফ ডুম’ ছবিতে অমরিশ পুরির অভিনয় দেখেন স্পিলবার্গ তো বলেই ফেলেন ‘ভিলেন চরিত্রে আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং বর্তমান সময়ে সম্ভবত তিনিই বিশ্বসেরা ’।
প্রথম দিকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে নির্মিত হলিউড ছবিতে বলিউড শিল্পীদের পার্শ্বচরিত্রে আনাগোনা দেখা গেলেও হলিউডে বলিউড তারকাদের অভিনয় এখন ডালপালা মেলে নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্সের কথা না বললেই নয়, ভিক্টর ব্যানার্জি (এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া), নাসিরউদ্দিন শাহ (দি লিগ অফ এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টেলম্যান), অনিল কাপুর (স্লামডগ মিলিওনেয়ার, মিশন ইম্পসিবল: ঘোস্ট প্রটোকল), ইরফান খান (লাইফ অফ পাই, দি অ্যামেজিং স্পাইডারম্যান, নিউইয়র্ক, আই লাভ ইউ, দি নেমেসেক), টাবু (লাইফ অফ পাই, দি নেমসেক), অনুপম খের (সিলভার লাইনিংস প্লেবুক), অমিতাভ বচ্চন (দি গ্রেট গ্যাটসবি), মল্লিকা শেরওয়াত (দি মিথ, পলিটিক্স অফ লাভ)। তবে এ মূহুর্তে ভারতের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক তারকা সাবেক মিস ওয়ার্ল্ড ঐশ্বরিয়া রায়। প্রোভোকড: এ ট্রু স্টোরি, ব্রাইড এন্ড প্রেজুডিস, দি মিস্ট্রেস অফ স্পাইসেস, পিঙ্ক প্যানখার ২, দি লাস্ট লিজিয়ন এর মত ছবিগুলোতে তিনি মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। শুধু তাই নয় ১৯৯৪ সালে ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ খেতাবজয়ী ঐশ্বরিয়া রাই ২০০৩ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি মনোনীত হন৷
ভারতীয় চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের ভূমিকা
উপমহাদেশর চলচ্চিত্রের সঙ্গে সঙ্গীতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। গানও অনেক সময় আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছে। অশোক কুমারের ‘কিসমত’ ছবির (১৯৪৩) বিখ্যাত গান ‘হে দুনিয়াওয়ালো হিন্দুস্তান হামারা হ্যায়’ ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিল অন্যতম প্রতিবাদের ভাষা। উপমহাদেশে রেডিওতে চলচ্চিত্রের গান শোনার চলও শুরু সেই ষাটের দশকেই। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রের গানগুলো মানুষের জীবনের অংশ হয়ে যায়। আজও তাই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে সঙ্গীত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। যুগে যুগে জন্ম হয়েছে কিংবদন্তী গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পীর। শৈলেন্দ্র, কভি প্রদীপ, হাশরাত জয়পুরি, মাজরুহ সুলতানপুরি, সাহির লুধিয়ানভি, আনন্দ বক্সী, কাইফি আজমী, গুলজার, জাভেদ আখতার, সামির এর মত বাঘা বাঘা গীতিকাররা ভারতীয় সিনেমার জন্য গান লিখে গেছেন। আর তাঁদের লেখা গানে সুর সৃষ্টি করেছেন শচীন দেব বর্মন, নওশাদ আলি, মদন মোহন, অনিল বিশ্বাস, লক্ষীকান্ত পেয়ারেলাল ও পি নায়ার, রাহুল দেব বর্মন, এ আর রেহমান এর মত সুরের জাদুকররা। আর কিংবদন্তী ভারতীয় সঙ্গীত শিল্পীর তালিকা করতে গেলে সহজে তা শেষ করা যাবেনা। আছেন মুখেশ, মোহাম্মদ রফি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে থেকে শুরু করে হালের কুমার শানু, উদিত নারায়ণ, সনু নিগামরা। তবে সবচেয়ে ভারতীয় সিনেমায় সবচেয়ে ভার্সাটাইল শিল্পী হিসেবে নিজেকে যিনি অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি কিশোর কুমার। ক্লাসিক্যাল, রক থেকে শুরু করে রোমান্টিক, ট্র্যাজেডি যে কোন ধরনের গানে কিশোর কুমার এক ও অদ্বিতীয়। আর ভারতীয় সিনেমার সঙ্গীতে সবচেয়ে বড় কিংবদন্তীর নাম লতা মাঙ্গেশকর। আজও একই সুরেলা কন্ঠ অটুট রেখে সাত দশক ধরে তিনি গেয়ে চলেছেন যা এক অপার বিস্ময়! নারী শিল্পীদের মধ্যে লতা মাঙ্গেশকরের পরেই থাকবেন তাঁর ছোট বোন আশা ভোঁসলে। বর্তমানে আলকা ইয়াগনি, শ্রেয়া ঘোষাল, সুনীধি চৌহনরা দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছেন ভারতীয় মিউজিক ইন্ড্রাস্ট্রি।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদান রাখার জন্য নিয়মিত প্রদান করা হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার । তবে চলচ্চিত্রে তাদের সবচেয়ে বড় পুরষ্কারটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের স্বপ্নদ্রষ্টার নামে, দাদা সাহেব ফালকে পুরষ্কার। ভারতীয় ছবির একশো বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এ বছর বলিউড নির্মাণ করেছে ‘মুম্বাই টকিজ’ নামের চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সমন্বয়ে একটি চলচ্চিত্র। ছবিটি পরিচালনা করেছেন করণ জোহর, অনুরাগ কাশ্যপ, জয়া আখতার ও দিবাকর ব্যানার্জি। ছবিটিতে দেখা যাবে অমিতাভ বচ্চন, আমির খান, ফারহান আখতার, শ্রীদেবী, মাধুরি দীক্ষিত, বিদ্যা বালান, কারিনা কাপুর সহ বলিউডের সব সুপারস্টারকে।
বলিউড বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি। আর এই পর্যায়ে আসতে তাদের কম কাঠ-খড় পোড়াতে হয়নি। একশো বছর পর আজ তাদের অবস্থান গর্ব করার মত। এই একশো বছরে যে মজবুত ভিত্তি গড়ে উঠেছে তাতে নি:সন্দেহে বলা যায় ভারতীয় ফিল্ম আরো একশো বছর স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যাবে।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *