Smiley face

অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি

826233b55d1a6a3dc6c3f301327e3b5b

বিশ্বখ্যাত পোলিশ পরিচালক রোমান পোলানস্কি’র অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি-এর তিন বাসিন্দাকে নিয়ে লিখেছেন জাহিদ হোসেন

অদ্ভুত উত্থানপতনে ভরপুর অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি স্রষ্টার জীবন।
নাম তার রোমান পোলানস্কি, পুরো নাম রাজমুন্ড রোমান থিয়েরি পোলানস্কি। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে ফ্রান্সের প্যারিসে জন্ম তার। বাপ পেশায় আঁকিয়ে ও ভাস্কর। জন্ম এক ইহুদি পরিবারে; বাপ ইহুদি, মা আধা ক্যাথলিক আধা ইহুদি। এখানে ধর্মবিশ্বাস উল্লেখ করাটা দরকার ছিল। কারণ এই ধর্মবিশ্বাসের কারণেই রোমান পোলানস্কি নামক ক্ষণজন্মা এই পরিচালকের জীবনের পুরো নকশাটাই পাল্টে যাবে।
পোলানস্কির জন্মের কিছুদিন পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধে। পোলান্ডের কুখ্যাত অউশউইৎজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। তাদের অপরাধ? তারা ইহুদি। পোলানস্কির ভাগ্য ভালো। বাপের সহায়তায় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে পালাতে সক্ষম হন তিনি। তবে তার মা’র ভাগ্য অত সুপ্রসন্ন ছিল না। তার পক্ষে পালানো সম্ভব হয়নি। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পেই মারা যান তিনি। এরপর পোলানস্কির ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। এরপরের গল্প পোলানস্কির পোলানস্কি হওয়ার। এরপরের গল্প তার আকাশ ছোঁয়ার গল্প।দাঁড়ান, দাঁড়ান! একটু থেমে আর্টিকেলের প্রথম লাইনটা আবার পড়েন। কী লেখা সেখানে? উত্থানপতন, তাই না?
কারণ পোলানস্কি শুধু আকাশই ছোঁননি, তিনি গোত্তা খেয়ে আবার মাটিতেও নেমে এসেছেন। হলোকাস্ট সারভাইভার হিসেবে যেমন মানুষের সহানুভূতি পেয়েছেন, তেমনি রেপিস্ট হিসেবে পেয়েছেন ধিক্কার। তিনি ইংল্যান্ডে ছবি বানিয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন, “চায়নাটাউন” ও “রোজমেরিজ বেবি” বানিয়ে হলিউড জয় করেছেন। আবার তিনিই অসহায় চোখে প্রিয়তমা স্ত্রী শ্যারন টেটের নৃশংস হত্যাকান্ড দেখেছেন, আবার তিনিই অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়ের সাথে অনৈতিক যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে জেলের ভাত খেয়েছেন। বিচারের হাত থেকে বাঁচার জন্য আজো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ১৯৭৮ সালে সেই যে আমেরিকা ছেড়েছিলেন আর ঢুকতে পারেন নি। আমেরিকায় ঢুকলেই তো জেল, আবার সেই চৌদ্দ শিক! এমনকি “দ্য পিয়ানিস্ট” ছবির জন্য জেতা অস্কারটা পর্যন্ত নিতে আসতে পারেন নি তিনি।
শুধু উত্থানপতন না, অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরপুর পোলানস্কির জীবন। এই তিনি হলোকাস্ট সারভাইভার, আবার এই তিনি-ই ধর্ষক! নাৎসিরা তার শৈশব তছনছ করে দিয়েছিল, ছিনিয়ে নিয়েছিল তার মা’কে। যুদ্ধের পর পোলানস্কিদের জীবন নতুনভাবে শুরু হয়। সেই জীবনটাও মারাত্নক কঠিন। বাপ আরেকটা বিয়ে করে বসেন। সৎ মা কেন জানি পোলানস্কিকে দেখতে পারতেন না। পোলানস্কি তাই পালিয়ে পালিয়ে থাকতেন। আর এই পালিয়ে থাকাটা যেন পোলানস্কির অদৃষ্ট। ছোটবেলায় নাৎসির কাছ থেকে পালিয়ে থাকতেন, তারপর সৎ মা’র কাছ থেকে, আর এখন পালিয়ে বেড়ান আমেরিকান পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য।
নিষ্ঠুর এই জীবন থেকে বাঁচার একটা তরিকা জানা ছিল পোলানস্কির। আর সেটা হলো ফিল্ম। প্রচুর ফিল্ম দেখতেন তিনি। আর ফিল্মের প্রতি এই সুতীব্র অনুরাগই তার পোলান্ডের এক ফিল্ম স্কুলে ভর্তির মোটিভেশন। সেখানে তিনি পড়াশোনা করেন, কয়েকটা শর্ট ফিল্ম বানিয়ে হাত পাকান। ১৯৫৯ সালে সেখান থেকেই গ্র্যাজুয়েট করেন তিনি। ১৯৬২ সালে তার প্রথম ফিচার ফিল্ম মুক্তি পায়। পোলিশ ছবি, নাম “নাইফ ইন দ্য ওয়াটার”। প্রথম ছবিই বাজিমাত করে ফেলে। পশ্চিমে দারুণ ব্যবসা করে “নাইফ ইন দ্য ওয়াটার”, পায় বিদেশী ফিল্ম ক্যাটাগরিতে অস্কার নমিনেশন। কিন্তু ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে নি। ফিল্ম দুনিয়ার আরেক কিংবদন্তি ফেদেরিকো ফেলিনি’র –এর কাছে হেরে যায়।
কয়েকটা শর্ট ফিল্ম বানিয়ে পোলানস্কি পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে, সেখানেই ১৯৬৫ সালে তিনি বানান তার সাইকোলজিক্যাল হরর মাস্টারপিস “রিপালশন”। রিপালশন অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজির প্রথম ছবি। আর এই অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজিই আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু।
যে তিনটা ছবি নিয়ে এই অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি সেগুলো হলো রিপালশন, রোজমেরিস বেবি ও দ্য টেনান্ট। প্রথমেই বলে নেই, অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি নামটা পোলানস্কির নিজের দেয়া না। এটা “দ্য গডফাদার” কিংবা ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যানের মত কোন অফিশিয়াল ট্রিলজি না। ভক্ত-অনুরাগীরা ভালোবেসে এই নামটা বেছে নিয়েছেন। কারণটাও খুবই সাধারণ। ফিল্ম তিনটার কাহিনী একটা জায়গায় মিলে যায়। সেটা হলো, তিনটা ফিল্মের কাহিনীই আবর্তিত হয়েছে অ্যাপার্টমেন্ট ঘিরে। আরেকটা কমন ফ্যাক্টর আছে, ফিল্ম তিনটাই হরর। কোন ঘরানার হরর তা আরেকটু সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, তিনটাই সাইকোলজিক্যাল হরর। অবশ্য রোজমেরিস বেবি সাইকোলজিক্যাল হরর নাকি সুপার‌ন্যাচারাল হরর সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে| কিন্তু আপাতত সে তর্কে আমরা যাব না, ওটা নাহয় ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক।
তাহলে চলুন তিনটা ছবি সম্বন্ধে একটু-আধটু জেনে নেই আমরা।

১. Repulsion (1965):

Repulsion-1965-Catherine-Deneueve-Ian-Hendry-Yyonne-Furneux-John-Fraser-General-Stills-6
রিপালশন পোলানস্কির দ্বিতীয় ফিচার ফিল্ম। রিপালশনের বাংলা হলো বিকর্ষণ, অরুচি। প্রশ্ন জাগতে পারে, জাগাটা অস্বাভাবিক কিছু না, এই বিকর্ষণ কার প্রতি? অরুচিই বা কার ওপর? এত কিছু থাকতে পোলানস্কি নিজের প্রথম ব্রিটিশ ছবির নাম কেন এটা দিলেন? আসলে পোলানস্কি নাম দিয়েই কিন্তু ছবিটার একটা হিন্টস দিয়ে দিয়েছেন। যারা ছবিটা দেখেছেন তাদের বোঝার কথা, যারা দেখেননি মিলিয়ে দেখার আমন্ত্রণ রইলো।
যাই হোক কাহিনীতে আসি। কাহিনীর প্রোটাগনিস্ট এক বেলজিয়ান তরুণী, নাম তার ক্যারল (ক্যাথরিন দানিউভ)। ক্যারল লন্ডনের এক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে বড় বোনের সাথে থাকে, পেশায় সে ম্যানিকুরিস্ট। ম্যানিকুরিস্ট হলেও তাকে সারাক্ষণ নিজের নখ খুঁটতে দেখা যায়। ক্যারল সুন্দরী, লাজুক, অর্ন্তমুখী, মিতভাষী। সে এতটাই মিতভাষী যে পুরো ফিল্মে তার ডায়লগ সংখ্যা হাতে গুণে বলে দেয়া যাবে। আপন দুনিয়ায় মশগুল থাকে ক্যারল, তার হাঁটাচলা অনেকটা জিন্দালাশের মত, চেহারাও অভিব্যক্তিহীন। তার মোহনীয় রুপে অনেকেই ধরাশায়ী হয়, পাণিপ্রার্থীরা ভিড়ও জমায়।
ক্যারল বিরক্ত হয়। ক্যারল পাথরমুখ করে রাখে। আমরা দর্শকরা প্রথম প্রথম বুঝতে পারি না। আমরা বুঝতে পারি না, ক্যারল নামক মেয়েটার “সমস্যা” আছে। তবে আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারি। আমরা দেখি ক্যারলকে বেঞ্চে বসে থাকতে। তার সামনের পিচ ঢালা রাস্তায় হঠাৎ ফাটল দেখা দেয়! আমরা তাকে স্যুইচের দিকে হাত বাড়াতে দেখি, সাথে সাথে দেয়ালে ধরে যায় ফাটল! ফিল্মের এক মুহূর্তে আমরা ক্যারলকে বলতে শুনি ফাটলগুলো মেরামত করতে হবে। কিন্তু ফাটলগুলো আর মেরামত হয় না। ফাটল যে ক্যারলের মাথায়. মেরামত হবে কীভাবে? আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারি ক্যারলের বিকারগ্রস্ততা। এক অদ্ভুত মনোবৈকল্যে ভুগছে আমাদের প্রোটাগোনিস্ট। সেই মনোবৈকল্যের নাম সিজোফ্রেনিয়া।
পুরুষদের বাড়ানো সব হাতই তার কাছে লোলুপ, তাদের দৃষ্টি লোলুপ, তাদের ভাবভঙ্গি লোলুপ। সব পুরুষই যেন তার কাছে সম্ভাব্য ধর্ষক, সব পুরুষই ঘৃণার বস্তু। বড় বোন হেলেনের বয়ফ্রেন্ড মাইকেলের জন্যও থোক থোক ঘৃণা বরাদ্দ রাখা। মাইকেল আবার প্রায়ই তার টুথব্রাশ ভুল করে ক্যারলের গ্লাসে রেখে যায়। প্রবল ঘৃণায় ক্যারল টুথব্রাশ সরায়।
ক্যারলের বিকারগ্রস্ততা বুঝানোর জন্য সাধারণ কিছু ঘটনাই বেছে নেন পোলানস্কি। ঘড়ির বিরতিহীন টিকটিক, পানির বিরক্তিকর টুপটুপ, দরজা ঠকঠক করার আওয়াজ, নিচের রাস্তায় কেউ একজন হেঁটে যাচ্ছে, কারো ফিসফাস। পাশের ঘর থেকে বিছানার ছন্দময় ক্যাঁচক্যাঁচ শোনা যায়, বড় বোন হেলেনের শীৎকারের আওয়াজ ভেসে আসে। ক্যারল বালিশ দিয়ে কানচাপা দেয়। তার অসহ্য লাগে, অসহনীয় ঠেকে সবকিছু। প্রতিদিনকার এই নিত্যপরিচিত শব্দগুলো যেন ক্যারলকে কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে।
হেলেন যখন বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে ইটালি বেড়াতে যায়, তখন অবস্থা ভয়ংকর রুপ ধারণ করে। ক্যারলের হ্যালুসিনেশন মাত্রা ছাড়ায়। হলওয়ে সংকুচিত হতে থাকে, দেয়ালে দেখা দেয় আরো ফাটল। দেয়াল ভেঙ্গে এক সময় হাত বেরিয়ে আসে। সে হাত তাকে ধরতে চায়, পেতে চায়। সে হাত আক্রমণে উদ্যত। হেলেন যখন বাসায় ফিরে ততক্ষণে দু’টা খুন সংঘটিত হয়ে গেছে। ক্যারলকে আবিষ্কার করা হয় বিছানার নিচে, মূর্তিবৎ।
ফিল্মের শেষভাগে পোলানস্কি ক্যারলের এই রিপালশনের পেছনের কারণ দেখিয়ে দেন ছোট্ট একটা ফটোগ্রাফের মাধ্যমে। ফটোটাতে বালিকা বয়সী ক্যারলকে দেখা যায় চোখে একরাশ ঘৃণা নিয়ে এক পুরুষের (খুব সম্ভবত তার বাবা) দিকে তাকিয়ে আছে।

২. Rosemary’s Baby (1968):

rosemarys_baby
অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজির দ্বিতীয় ফিল্ম রোজমেরিস বেবি। ইরা লেভিনের বেস্টসেলার উপন্যাস “রোজমেরিস বেবি” অবলম্বনে ফিল্মটা নির্মিত। “রিপালশন” ছিল পোলানস্কির প্রথম ব্রিটিশ ফিল্ম, এ ফিল্ম তার প্রথম ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ফিল্মও বটে (“নাইফ ইন দ্য ওয়াটার” ছিল পোলিশ ভাষায় নির্মিত)। আর রোজমেরিস বেবি তার প্রথম হলিউড ছবি। এবং একটু ঝুঁকি নিয়ে বলে ফেলা যায় যে, অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজির মাঝে রোজমেরিস বেবি-ই সবচেয়ে বিখ্যাত। রোজমেরিস বেবির তুঙ্গস্পর্শী খ্যাতির মাঝে কেন জানি চাপা পড়ে যায় রিপালশন ও টেনান্ট, যদিওবা রোজমেরিস বেবির চেয়ে কোন অংশে কম না ফিল্ম দুটো। তবে সত্য কথা হলো যে, পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতিকর ফিল্মের ছোটখাট একটা লিস্ট করলেও সেখানে রোজমেরিস বেবি’র নাম থাকবে। এরকমই সুনাম ফিল্মটার।
কাহিনীতে আসি। ছবির প্রথম ভাগেই আমরা দেখি রোজমেরি দম্পতিকে বাসা পাল্টাতে। তারা বাসা পাল্টিয়ে ম্যানহাটনের এক গথিক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে গিয়ে উঠেন। সেই বিল্ডিংয়ের আবার একটা ইতিহাস আছে, সদ্য আগত ভাড়াটিয়ার জন্য সেই ইতিহাস আবার অত আশাজাগানিয়া নয়।
হরর নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করেন, তারা হয়তোবা আমার এই লাইন পড়ে নড়েচেড়ে বসেছেন, তাদের মুখে ফুটে উঠেছে সবজান্তার হাসি-“আরে এটা তো হন্টেড হাউজ টাইপ গল্প।” প্রথমেই তাদের আশায় পানি ঢেলে দেই। না, এটা হন্টেড হাউজ মার্কা গল্প না। এখানে নেই কোন ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানো। এখানে আছে ভিন্ন কিছু। ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানোর চেয়েও যা ভয়ংকর।
যাই হোক আবারো কাহিনীতে ফিরি। অ্যাপার্টমেন্টের এক বৃদ্ধ দম্পতির সাথে রোজমেরিদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। রোজমেরির স্বামীপ্রবর, গাই উডহাউজ, পেশায় যিনি একজন অভিনেতা, বেশ সময় কাটাতে শুরু করেন ওই দম্পতির সাথে। তার ধুঁকতে থাকা ক্যারিয়ারের পালেও হাওয়া লাগে, নতুন একটা নাটকে অভিনয়ের সুযোগ মিলে যখন অরিজিন্যাল অভিনেতা হঠাৎ করেই অন্ধ হয়ে পড়ে। এদিকে অদ্ভুত কিছু জিনিস ঘটতে থাকে অ্যাপার্টমেন্ট ঘিরে। টেরি নামের এক তরুণী বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে লাফ মেরে আত্নহত্যা করে, রোজমেরি উদ্ভট সব স্বপ্ন দেখে, শুনে বিদঘুটে সব আওয়াজ। এর মাঝে রোজমেরি প্রেগনেন্টও হয়। এবং আরো অনেক প্রেগনেন্ট মহিলার মত রোজমেরির মনেও নানা সন্দেহ দানা বাঁধে। তার সন্দেহ বৃদ্ধ দম্পতির ওপর, তার সন্দেহ নিজের উদাসীন স্বামীর ওপর-তারা সবাই তার বাচ্চাটার ক্ষতি করতে চায়। তারা সবাই কোন এক কাল্টের সদস্য আর সেই কাল্ট একজনকেই পূজা করে-স্বয়ং শয়তান! আরো অনেক নাটকীয়তার পর রোজমেরি’র বাচ্চা জন্মায়। কিন্তু তার চোখ দু’টো এরকম রক্ত লাল কেন? উত্তর জানতে চান? তাহলে দেরি না করে দেখে ফেলুন ফিল্মটা।
ছোট্ট একটা ট্রিভিয়া দেই। প্রবাদপ্রতিম ফিল্মনির্মাতা স্ট্যানলি কুবরিকের খুব প্রিয় একটা ফিল্ম রোজমেরি’স বেবি।

৩. The Tenant (1976):

the-tenant-vai4_905-300x425
অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি’র শেষ ছবিটার নাম দ্য টেনান্ট। ট্রিলজির বাকি দুটো ফিল্মের চেয়ে এটা একটু ভিন্ন এই অর্থে যে এখানে পোলানস্কি শুধু ক্যামেরার পিছনেই থাকেন না, তাকে ক্যামেরার সামনেও দেখা যায়। হ্যাঁ, দ্য টেনান্টের প্রোটাগনিস্ট ট্রেলকোভস্কি চরিত্রে পোলানস্কি নিজেই অভিনয় করেন। ট্রিলজি’র বাকি দুটো ফিল্মের চেয়ে এটা একটু কম বিখ্যাত। ফিল্মটা বক্স অফিসেও মুখ থুবড়ে পড়ে। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মাঝে সেলিব্রিটি স্ট্যাটাস প্রাপ্ত রজার এবার্ট তো তার রিভিউয়ে টেনান্টকে ধুয়ে দিয়েছেন, মাত্র একটা স্টার জুটেছে টেনান্টের কপালে। ইবার্টের মতে ফিল্মটা “শুধু খারাপই না, লজ্জাজনক” (কানে কানে বলে রাখি, ইবার্ট মাঝে মাঝে কালজয়ী কিছু ফিল্মকেও এভাবেই উড়িয়ে দিয়েছেন। দ্য ইজুয়াল সাসপেক্টস, ব্লু ভেলভেট এবং অ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ এরকমই কিছু ছবি) ।
ফিল্মে ফেরা যাক। আগেই বলেছি ফিল্মটার প্রোটাগনিস্ট ট্রেলকোভস্কি নামক একজন ইমিগ্র্যান্ট। আমরা দেখি মানুষ হিসেবে ট্রেলকোভস্কি বেশ লাজুক, অর্ন্তমুখী, একটু মিনমিনে টাইপের। সাত চড়ে রা করে না এমন অবস্থা। ট্রেলকোভস্কি একজন ব্যুরোক্র্যাট, প্যারিসে এসে সে এমন একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছে যার প্রাক্তন বাসিন্দা (সিমন শুল) জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্নহত্যা করেছে। এই-ই হলো ছবির প্রেমিস। মানছি প্রেমিস হিসেবে এটা খুব আহামরি কিছু না। কিন্তু একটু ধৈর্য্য ধরুন।
পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত!
ট্রেলকোভস্কি অ্যাপার্টমেন্টে উঠার পরই কিন্তু দ্য টেনান্ট ছবির আসল কাহিনী শুরু। অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংটা নীরব ও ভূতুড়ে। ছবির মেজাজটাও বিল্ডিংটার মতই। নীরব ও ভূতুড়ে (অবশ্য কথাটা পোলানস্কি’র বেশিরভাগ ফিল্মের ক্ষেত্রেই কী প্রযোজ্য না?)। ট্রেলকোভস্কি আবিষ্কার করে অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারা বড়ো বেশি খিটখিটে। সামান্য শব্দতেই তারা অভিযোগ জানায়, সামান্য বিচ্যুতিতেই তাদের ভ্রু কুঁচকে উঠে। অ্যাপার্টমেন্টে ওঠা উপলক্ষে একটা পার্টি দিলে তার জন্যও ট্রেলকোভস্কিকে কথা শুনতে হয়। এবং তা স্বয়ং বাড়িওয়ালার কাছ থেকে।
তারপরও ট্রেলকোভস্কি  চেষ্টা করে নতুন অ্যাপার্টমেন্টে মানিয়ে নিতে। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠে না। অ্যাপার্টমেন্ট বাসীদের অভিযোগ থামে না। চেয়ার সরালে সমস্যা, ড্রয়ার খুললে সমস্যা, রেডিও শুনলে সমস্যা এমনকি কাশলেও সমস্যা। অ্যাপার্টমেন্ট বাসীদের আচরণও উদ্ভট থেকে উদ্ভটতর হতে থাকে। অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে গিয়েও কিন্তু স্বস্তি মিলে না ট্রেলকোভস্কির। রেস্টুরেন্টে গিয়ে এক অর্ডার দিলে ওয়েটার বারবার ভিন্ন অর্ডার নিয়ে আসতে থাকে। ওয়েটারের নিয়ে আসা ওই অর্ডারটাই সদ্য মৃত সিমন শুল দিতেন।
লাজুক, অর্ন্তমুখী ট্রেলকোভস্কি বিরক্ত হয়, মেজাজ হারায়। অন্যের ইচ্ছা মোতাবেক চলতে চলতে সে আপন সত্ত্বাই হারাতে বসে। তার ধারণা হয় সমগ্র প্যারিসবাসী এক জোট হয়েছে তাকে মৃত সিমন শুলের ধাঁচে গড়ার। কিন্তু সে যে ট্রেলকোভস্কি , ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন সত্ত্বা, ভিন্ন ভাবে দুনিয়া দেখে!
প্রবল আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগতে শুরু করে সে। সকালের নাস্তায় শুল যা খেত, তা-ই খায়, নিজের সিগারেট ব্র্যান্ডও সে পাল্টে ফেলে। এমনকি অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে সে মাথায় উইগ পরে, ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়, চোখে দেয় আইলাইনার। সে আর ট্রেলকোভস্কি থাকে না, সে হয়ে যায় সিমন শুল!
অনেকেই বলেন দ্য টেনান্ট পোলানস্কির সবচেয়ে ব্যক্তিগত ফিল্ম। সেজন্য নিজেকেই তিনি ছবিটাতে কাস্ট করেছেন। আমি জানি না কথাটা কতটুকু সত্য। তবে পোলানস্কির পাঁড় ভক্ত হিসেবে বলতে পারি, টেনান্ট পোলানস্কির সিগনেচার ফিল্ম। যেসব থিম নিয়ে এ মহান ফিল্মমেকার কাজ করেন তার সবকিছুর আলামত টেনান্টে পাওয়া যাবে।
পোলানস্কির পাঁড় ভক্ত হিসেবে আরেকটা দাবিও আমি করতে পারি। সেটা হচ্ছে টেনান্টের পর যুগান্তকারী কোন সৃষ্টি তার হাত দিয়ে আর বেরোয় নি। টেনান্ট বেরোয় ১৯৭৬-এ। এরপর তার আরো বেশ কিছু ছবি বেরিয়েছে। ফ্রানটিক, বিটার মুন, গোস্ট রাইটার, ডেথ এন্ড দ্য মেইডেন, দ্য পিয়ানিস্ট। এর মধ্যে পিয়ানিস্ট খুব সম্ভবত তার সবচেয়ে নামকরা ছবি। কিন্তু পিয়ানিস্টে আমরা অসম্ভব প্রতিভাধর, নিয়ত সৃষ্টিশীল পোলানস্কিকে পাই না, আমরা পাই অন্যের উদ্ভাবিত ফর্মূলা মেনে চলা একজনকে। মানুষের সিমপ্যাথি খোঁজা একজনকে।
পোলানস্কির পাঁড় ভক্ত এই আমি হতাশ হই। অন্যের ফর্মূলা কেন পোলানস্কি মেনে চলবেন? পোলানস্কি নিজেই নিজের ফর্মূলা বানাবেন। যে রকম ফর্মূলা তিনি তার প্রথম ছবি নাইফ ইন দ্য ওয়াটারে বানিয়েছেন, কুল-দে-সাকে বানিয়েছেন, চায়নাটাউনে বানিয়েছেন আর অতো অবশ্যই অ্যাপার্টমেন্ট ট্রিলজি’তে বানিয়েছেন।
ওই ছবিগুলোতেই যে আসল পোলানস্কিকে পাওয়া যায়।
About

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com