Smiley face

ট্যাক্সি ড্রাইভার: ডায়েরি অফ অ্যান ইনসমনিয়াক

tumblr_mlez6qB7bw1qeb24eo1_1280

আসছে ২১ শে এপ্রিল ট্যাক্সি ড্রাইভার সিনেমার ৪০ বছর পূর্তি হবে। এই উপলক্ষ্যে ট্রিবেকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সিনেমাটির স্পেশাল স্ক্রিনিং হচ্ছে যেখানে উপস্থিত থাকবেন পরিচালক মার্টিন স্করসেসি, সিনেমার অন্যতম কুশীলব রবার্ট ডি নিরো ও জোডি ফস্টার। আমাদেরও লক্ষ্য ছিলো কালজয়ী এ সিনেমাটির উপর আলোকপাত করা। মুখ ও মুখোশের পক্ষ থেকে স্টিয়ারিং হুইলে বসেছেন আশিকুর রহমান তানিম।

অনেক খ্যাতনামা চলচ্চিত্র সমালোচক এর মতেই, ট্যাক্সি ড্রাইভার পোস্ট মডার্ন যুগের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী সিনেমা। এমনিতে এখন পর্যন্ত সেলুলয়েড জগতকে প্রভাবিত করার মত পরিচালক, লেখক, প্রযোজক, চিত্রধারণকারী কম আসেনি ইন্ডাস্ট্রিতে। তারা সবাইই কাউকে না কাউকে প্রভাবিত করেছেন, কখনো কখনো নিউ ওয়েভের মত নতুন সিনেমা দৃষ্টিভঙ্গির দ্বার উন্মোচন করেছেন এদের কেউ, আবার কখনো গল্প বলার কিংবা দৃশ্যায়ণ করার আঙ্গিকই বদলে দিয়েছেন। কিন্তু, শুধু একটি সিনেমা হিসেবে যদি হিসেব করা হয় তাহলে ট্যাক্সি ড্রাইভার এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকায় যতটা সফল, তা আর অন্য কোন সিনেমাই নয়।
ট্যাক্সি ড্রাইভার একটা একাকী মানুষের গল্প। ট্র্যাভিস বিকল তখনকার আমেরিকান লক্ষাধিক তরুণের মতই একজন, যে ইউএস ম্যারিনের হয়ে সদ্য-সমাপ্ত ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশে ফিরেছে। পুরো আমেরিকায় তখন চলছে এক অস্থির সময়। সমগ্র একটা জেনারেশন তখন মোটামুটি হতাশ, দিকভ্রান্ত। ট্র্যাভিস সেই জেনারেশনেরই একজন প্রতিনিধি। (সম্ভবত) যুদ্ধের আফটারম্যাথের কারণে ঘুমাতে না পারা ট্র্যাভিস ভয়ানক ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে, রাতের বেলা ট্যাক্সি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আর কোনকিছু থেকে না; শুধু জেগে থাকা দুর্বিষহ সময়টুকু কাটানোর জন্যই, একটু ক্লান্ত হওয়ার জন্য!

 

td1

সিনেমার প্রায় পুরোটাই ট্র্যাভিস বিকলের স্বগতোক্তিতে; ডায়েরিতে লেখা বর্ণনা। ভয়েসওভারে জার্নাল লিখে চলা নিস্তরঙ্গ সেই স্বরে বিষাদ আর একাকিত্ব ছাড়া আর কোনকিছুরই ছাপ নেই। সিনেমার ওপেনিং ক্রেডিট রোল হতে হতেই দর্শক ট্যাক্সি ড্রাইভারের বিহ্বল চোখ দেখতে পায়, যেই চোখে কেবল বিপন্ন বিষ্ময়! অতঃপর সিনেমার শুরুতেই দেখা যায় ট্র্যাভিস বিকল নামের ২৬ বছরের এক যুবক ট্যাক্সি ড্রাইভার এর চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে আসে। যখন গ্যারাজ ম্যানেজার জিজ্ঞেস করে, তোমার ড্রাইভিং রেকর্ড কেমন? মুখে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটিয়ে ট্র্যাভিস বিকলের উত্তর দেয়, “পরিস্কার! একদম আমার বিবেকের মতই পরিস্কার!” যেন ভিয়েতনাম যুদ্ধ ফেরত ২৬ বছরের এই যুবক এই ক’দিনেই বুঝে গেছে, দুনিয়ায় পরিস্কার ও সাচ্চা বলে আর কোন কিছু নেই, মানুষ তো বহু দূরের কথা!

 

এরপর সিনেমা এগিয়ে গেছে ট্র্যাভিসের হলুদ ট্যাক্সি ক্যাবের মতন। ব্যাকগ্রাউন্ডের জ্যাজ মিউজিকের মতন ঢিমেতালে। আমরাও ট্র্যাভিসের মস্তিষ্কের নিউরণে ঢুকেছি আস্তে আস্তে। সেখানে শুধু শূন্যতা। ট্র্যাভিস যখনই কাউকে বা কিছু আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে, সবাই তখন যেন তাকে আরো চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, “অবশেষে জেনেছি মানুষ একা/ জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!”
প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী প্যালেন্টাইনের পলিটিকাল ক্যাম্পেইনে কাজ করা বেটসির প্রেমে পড়েছিলো ট্র্যাভিস। বেটসিকে পর্নো থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ায় বেটসি ভুল বুঝে ট্র্যাভিসকে। এভাবেই তাকে হারাতে হয়েছে বেটসিকে। ষোড়শী নিশিকন্যা আইরিস কে যৌনপেশাবৃত্তি থেকে বাঁচাতে গিয়ে বরংচ ভয়ই পাইয়ে দিয়েছে ট্র্যাভিস! এমনকি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী প্যালেন্টাইনকে সরিয়ে দিতে গিয়ে শুধু সতর্ক করেই ফেরত আসতে হয়েছে। এতটাই একাকী আর ব্যর্থ ছিলো ট্র্যাভিস বিকল যে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বই ছিলো তার একমাত্র কথা বলার সঙ্গী। আর সব একাকী মানুষের মত নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করে “You talkin’ to me?” যা বিশ্ব চলচিত্র ইতিহাসেরই অন্যতম সিগনিফক্যান্ট ডায়লগ।

আদতে সিনেমাটির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বোধহয় সিনেমাটির চিত্রনাট্যকার পল শ্র্যাডারের। পল তখন ২৭ বছরের এক তরুণ, মাত্র ক’দিন আগেই ঘটা স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স, আমেরিক্যান ফিল্ম ইন্সটিটিউটের সাথে বিবাদ আর সমালোচকের চাকরি হারানো নিয়ে যে রীতিমত বিধ্বস্ত! পকেটে তখন ফুটা পয়সাও নাই, সম্বল বলতে নিজের গাড়িতেই দিন-রাত কেটে যাচ্ছে কোনরকম। পুসিক্যাট থিয়েটার নামের এক পর্নোগ্র্যাফিক থিয়েটারে গিয়ে রাতের ঘুম সেড়ে নিতে হত। ঐরকম সময়েই আলসার খুব বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হলেন শ্র্যাডার। আর, তখনই তার মনে হল, আমেরিকার রাস্তায় ট্যাক্সি নামের চলমান লোহার কফিনে তিনি দেখেছেন তার মতই আরো অনেককে! চোখে-মুখে কোনরূপ অভিব্যক্তি ছাড়া হাজারো তরুণ হলুদ ট্যাক্সির স্টিয়ারিং হাতে পিছনে নিশিকন্যা, গুণ্ডা-পাণ্ডা, বারবণিতা কতজনকে সওয়ার করে চলেছে রাত-বিরেতে, যেন তারা সবাই মিলে এই সমাজ তৈরি করেছে, অথচ প্রত্যেকেই আসলে একা! এরপর এক মাসের মত প্রাক্তন এক প্রেমিকার বাসায় বসে ৬০ পৃষ্ঠার একটা খসড়া লিখে ফেলেন শ্র্যাডার, যেটা পরবর্তীতে জন্ম দেয় চলচ্চিত্র জগতের এক মাইলফলকের!
স্করসেসি’র নিজেরও এই ছবি পরিচালনা করার কথা ছিলোনা। ব্যাপারটা নেহাতই দৈবাৎ। পল শ্র্যাডার প্রথমে সিনেমার স্ক্রিপ্ট দেখান ‘স্কারফেইস’, ‘দ্যা আনটাচেবলস’ ইত্যাদি খ্যাত কিংবদন্তী পরিচালক ব্রায়ান ডি পালমাকে। ব্রায়ান ডি পালমা তখন থাকতেন নিকোলস বিচে, সেখানে তার প্রতিবেশী ও প্রযোজক মাইকেল ফিলিপ্স কে একদিন এসে বললেন যে, হাতে নতুন এক স্ক্রিনরাইটারের লেখা একটা স্ক্রিপ্ট আছে। স্ক্রিপ্টটা ঠিক তার জিনিস না কিন্তু ফিলিপ্স এতে আগ্রহী হতে পারেন। ফিলিপ্স পড়েই সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এই সিনেমা বানাবেন। এরপর খোঁজাখুঁজি শুরু হয় পরিচালকের। শ্র্যাডার আর ফিলিপ্স দুইজনই স্করসেসির “মিন স্ট্রিটস” দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তরুণ পরিচালক মার্টিন স্করসেসিই হবেন তাদের এই কাহিনীর পরিচালক। ও আচ্ছা, মিন স্ট্রিটসের জনি বয়কে দেখে তারা এটাও ঠিক করে ফেলেন যে, রবার্ট ডি নিরোই হবেন তাদের সিনেমার ট্যাক্সি ড্রাইভার। এরপরের কাহিনীটুকু তো তাবৎ সিনেমা জগতেরই ইতিহাস!
ট্যাক্সি ড্রাইভার আসলে ধ্রুপদী সিনেমার চেয়েও বেশি কিছু। আর তাই মুক্তির ৪০ বছর পরও ট্যাক্সি ড্রাইভার আশ্চর্য রকমের প্রাসঙ্গিক! ট্র্যাভিস বিকল খুব আনকনভেনশনাল হিরো হওয়া স্বত্বেও তার মাঝে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় সহজেই। কারণ আদতে আমরা সবাই কখনো না কখনো তার মতনই একা। ট্র্যাভিস দেশের হয়ে যুদ্ধ করে আসার পরও বেটসির সাথে প্রথম কথোপকথনেই বোঝা যায় আসলে সে রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের যেকোন কিছু নিয়ে কোনদিনই মাথা ঘামায়নি। অথচ, রাষ্ট্র তাকে ইতোমধ্যেই চুষে জড়বস্তু বানিয়ে ফেলেছে! ট্র্যাভিস আমাদের নিজেদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যের সাথে অস্বস্তিকর পরিচয় করিয়ে দেয় নিজের দ্বারা। প্রেসিডেন্টকে মেরে ফেলার মত অসীম সাহসী কাজে হার মানতে হয়; শেষমেশ  প্রস্টিটিউট আইরিসকে বাঁচানোর মাধ্যমেই দুধের স্বাদ ঘোলে মিটে ট্র্যাভিসের। আমাদেরও কি প্রতিনিয়ত তাই হয়না?
 এভাবেই আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই বাস করে চলেছে এক একাকী ট্যাক্সি ড্রাইভার…
About

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com