tesis
আমাদের অনুভূতি আর আকাঙ্ক্ষাগুলোকে কে নিয়ন্ত্রণ করে? আমরা নিজেরা নাকি আমাদের অন্তরমহলে লুকিয়ে থাকা কোনও মিঃ হাইড? তা যদি নাইবা হবে, তবে কিভাবে একই মানব হৃদয় থেকে সুকুমার বৃত্তি আর সবচে কদর্য চিন্তার উৎসারণ ঘটে! স্প্যানিশ পরিচালক আলেহান্দ্রো আমেনাবার এর প্রথম ছবি Tesis মানব মনের এই সব অন্ধকার গলি-ঘুপচির সুলুক খোঁজে।।
Tesis বা টেসিস শব্দটার ইংরেজী প্রতিশব্দ হল Thesis। ছবির প্রধান চরিত্র অ্যাংহেলা মার্কেজ (Ana Torrent) মাদ্রিদের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্কুলের ছাত্রী। সময়কাল ১৯৯৫। থিসিস করার জন্য অ্যাংহেলা বেছে নিয়েছে এক অদ্ভুত বিষয়- Audio-Visual Violence। অ্যাংহেলার থিসিস সুপারভাইজার প্রফেসর ফিগেরা প্রথমেই জানিয়ে দিলেন কাজটা সহজ হবে না। কারণ গবেষণার জন্য যেসব উপাত্তের প্রয়োজন, তা সর্ব সাধারণের নাগালের বাইরে। তবে প্রফেসর কথা দিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভ থেকে সহায়ক কিছু ভিডিও ক্যাসেট আনার চেষ্টা করবেন। আর্কাইভ থেকে ফিল্ম আনতে গিয়ে প্রফেসর আবিষ্কার করলেন এক গোপন পথ। সেই পথের শেষে এক রুমে রয়েছে সারি সারি ভিডিও ক্যাসেট। কৌতুহলবশত এক ভিডিও ক্যাসেট এনে, স্কুলের স্ক্রীনিং রুমে ছবিটা দেখতে বসলেন প্রফেসর ফিগেরা।
অপরদিকে অ্যাংহেলাও বসে ছিল না। তার ক্লাসের এক ছেলে চেমাকে (Fele Martínez) গিয়ে ধরল।
ছন্নছাড়া চেমার ভায়োলেন্ট ভিডিওর বিশাল কালেকশন রয়েছে। চেমার বাসায় গিয়ে একটা ভিডিও দেখেও আসলো অ্যাংহেলা। পরবর্তী দিনে প্রফেসর ফিগেরাকে খুঁজতে গিয়ে, তাকে স্ক্রীনিং রুমে মৃত অবস্থায় খুঁজে পেল অ্যাংহেলা। কি ছিল ঐ ভিডিওটাতে, যার ধাক্কা সামলাতে পারলেন না বুড়ো মানুষটি? এটা জানার জন্য ভিডিও ক্যাসেটটা নিয়ে চেমার বাসায় গেল অ্যাংহেলা। ভিডিওতে তাদেরই ক্লাসের মেয়ে ভেনেসাকে আবিষ্কার করলো দুজনে। দু বছর আগে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যায় ভেনেসা। কিন্তু ভিডিও দেখে অ্যাংহেলা বুঝতে পারে, ভেনেসাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর পুরো হত্যাকাণ্ডটি শুট করে নির্মাণ করে হয়েছে একটি স্নাফ ফিল্ম (Snuff Film)। খুব যত্ন করে এডিট করা হয়েছে স্নাফ ফিল্মটি, যাতে করে হত্যাকারী সম্পর্কে কোন তথ্য না পাওয়া যায়। তারপরও খড়ের গাদায় সূচের সন্ধানে নামল চেমা আর অ্যাংহেলা। সূত্রের সাহায্যে গিয়ে পৌঁছল সুদর্শন বসকো (Eduardo Noriega) আর তার গার্লফ্রেন্ড ইয়োলান্ডার কাছে। ইয়োলান্ডার কাছে অ্যাংহেলা জানতে পারলো, বসকো আর চেমা দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর তারা ভেনেসাকে এক “অন্যরকম” ছবিতে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। দিশেহারা হয়ে গেল অ্যাংহেলা। কে মিথ্যে বলছে? বসকো? চেমা? ইয়োলান্ডা? নাকি তিনজনেই?
Tesis-এর গল্প লিখেছেন মাতেও গিল আর আমেনাবার নিজেই। নিঃসন্দেহে এখনকার অন্যতম সেরা স্প্যানিশ পরিচালক হলেন আলেহান্দ্রো আমেনাবার। মাত্র ২৩ বছর বয়সে এই স্প্যানিয়ার্ডের প্রতিভার ঝলক মুগ্ধ করার মত। অসম্ভব গোছানো স্ক্রীপ্ট আর যত্ন নিয়ে তৈরী করা হয়েছে ছবিটি।প্রথম ছবি হওয়ায় খুব স্বল্প বাজেটে (মাত্র ৬০০০০০ ইউরো) সাড়ে পাঁচ সপ্তাহের মাঝে ছবিটি নির্মাণ করতে হয় তাকে। ১৯৯৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ সাতটি Goya Award (স্প্যানিশ অস্কার) পায়।
টেসিস এর পরে আমেনাবার আরও চারটি ছবি পরিচালনা করেন (Open Your Eyes, The Others, The Sea Inside, Agora)। The Others বাদে সব কয়টি ছবির কাহিনীকার মাতেও গিল। প্রতিটি ছবিই দর্শক-সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। Tesis ছবির বসকো তথা Eduardo Noriega-কে নিয়ে বানিয়েছিলেন “আব্রে লো ওহোস (Open Your Eyes)“। সাথে ছিলেন পেনেলোপে ক্রুজ। এই ছবিটা পরে হলিউডেও রিমেক করা হয় Vanilla Sky নামে। মূল চরিত্রে ছিলেন টম ক্রুজ। হরর মুভি The Others-এ ছিলেন নিকোল কিডম্যান। আর The Sea Inside -এর জন্য তো আলেহান্দ্রো অস্কারটাই পেয়ে যান। আলেহান্দ্রোর সর্বশেষ ছবি Agora। এটি স্পেনের সবচে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র।
ছবির গল্পটা খুব শক্তিশালী। পুরোটা সময়েই দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখে। আর বিষয়বস্তু-ও কিছুটা ভিন্ন ধরণের। মূলধারার ছবিতে স্নাফ ফিল্ম খুব বেশি ওঠে আসেনি। স্নাফ ফিল্ম মূলত চলচ্চিত্রের একটি ধারা। স্নাফ ফিল্মগুলোতে সত্যিকারের হত্যাকাণ্ড ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে কোন ধরণের মেক-আপ, ইফেক্ট বা টেকনিক ব্যবহার করা হয়না। কোন র‌্যান্ডম হত্যাকাণ্ডের ভিডিও/ফুটেজ থাকলেই সেটা স্নাফ ফিল্ম হয়না। শুধুমাত্র ছবির উদ্দেশ্য হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলে, সেটা স্নাফ ফিল্ম বলে পরিগণিত হয়। ছবির এক দৃশ্যে আমেনাবার দুটো সাউন্ডট্র‌্যাককে একইসাথে ডায়জেটিক সাউন্ড ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর হিসেবে ব্যবহার করেন। টেসিস ছবির আবহ সঙ্গীতের কাজও আমেনাবার নিজেই করেছেন। তবে, টেসিসের সবচে শক্তিশালী দিক হল এর সিনেম্যাটোগ্রাফি। ক্যামেরার মাধ্যমে গল্প কথনের পাশাপাশি দর্শকদের সাথে সংযোগস্থাপন ও সূত্র দেওয়ার কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছেন চিত্রগ্রাহক হান্স ব্যুরম্যান।
আমরা আসলে মুখে যতই সভ্যতার বুলি আওড়াই না কেন, আমাদের ভেতরে এখনো আদিম প্রবৃত্তিগুলো সক্রিয়। ছবির বিভিন্ন দৃশ্যে আমেনাবার সেটিই দেখিয়েছেন। পুলিশের নিষেধ সত্বেও অ্যাংহেলা নিজের অজান্তেই ট্রেনে দ্বিখণ্ডিত লাশটি দেখতে এগিয়ে যায়। চেমার বারণ ভুলে সে ভেনেসার হত্যা দৃশ্যটা চোখের সামনে থেকে আঙুল সরিয়ে দেখে। নিষেধ অমান্য করা, নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করা সর্বোপরি লুকিয়ে সব দেখার এক ভয়ারিস্টিক মানসিকতাকে পরিচালক ছবিটাতে তুলে ধরেছেন। আমেনাবার টেসিস ছবিটা শেষ করেছেন এক হাসপাতালে। টিভিতে ঘোষণা দেওয়া হয়, ভেনেসাকে মেরে ফেলার দৃশ্যটি (অর্থাৎ কিনা, স্নাফ ফিল্মটি) দেখানো হবে। হাসপাতালের বিছানায় থাকা সব রোগী, উন্মুখ হয়ে স্নাফ ফিল্মটি শুরু হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। এখানে রোগীরা এসেছে রূপক অর্থে। আমেনাবার আসলে সমগ্র মানবজাতির মানসিক বৈকল্যকে তুলে ধরেছেন। শ্রেণী, পেশা, জেন্ডার নির্বিশেষে মানুষ মুখোশের আড়ালে নিজেদের অসুস্থ চিন্তাকে ঢেকে রেখেছে।
টেসিস তুলে ধরে সেই ডিসটোপিয়ান পৃথিবীকে। অপরাধ তো সবাই করে। অন্যায় তো সবাই সহে। আর মুখোশ! সেটা তো সবাই পড়ে।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *