Smiley face

পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি ২-অগোছালো ড্রইংরুম

wpid-11951164_543094312522500_3073165622313569895_n1-960x520

স্নিগ্ধ রহমান

বাংলাদেশে স্পোর্টস মুভির সংখ্যা আঙুলে গোনা যায়। একই কথা বাংলাদেশী সিক্যুয়েল ছবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি প্রোডাকশনের শুরু থেকেই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ছবির গল্প দুই সেলিব্রেটিকে নিয়ে। জয়া বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মডেল। শাকিব খান দেশ সেরা ক্রিকেটার। আস্তে আস্তে সে সম্পর্ক প্রেমের দিকে আগায়। কিন্তু জয়া ভালোবাসি বলা থেকে বিয়ে করা, সব কিছুতেই নারাজ। কারণ তার ছোট ভাই অসুস্থ আর জয়ার কাছে তার ফ্যামিলিই সব।
প্রিক্যুয়েলে আরিফিন শুভ ছিলেন প্রেমে অন্ধ এক ভিলেন। এবার তার ক্যারেক্টারকে ভেঙে দু’টুকরো করা হয়েছে। ভিলেনের টুকরাটা পেয়েছেন ইমন আর প্রেমে পাগলের খণ্ডিত ভগ্নাংশটি জুটেছে মৌসুমি হামিদের কপালে। ও আচ্ছা বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম, captain-e1441794626926ইমনও কিন্তু শাকিব খানের মতো জাতীয় দলের খেলোয়াড় প্লাস বর্তমান অধিনায়ক। সেই সাথে জয়াকেও ইমনের ভালো লাগে। একসময় শকিবের কাছে নায়িকা আর অধিনায়কত্ব দুটোই চলে যায়। লাড়কি আর ছোকড়ি দুটোই হারিয়ে ইমন ঠিক করে প্রতিশোধ নেবে। ছবির শুরুতেই আমরা জানতে পারি, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সিরিজ হচ্ছে আর ১৬ ডিসেম্বর সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ। এক বুকি বা বাজিকর কিডন্যাপ করে জয়াকে। তাদের শর্ত একটাই, শাকিবকে আউট হতে হবে শূন্য রানে। এখন কি করবেন শাকিব?
পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি-১ এর মতো এবারও গল্প লিখেছেন রুম্মান রশিদ খান আর পরিচালক ছিলেন সাফি উদ্দিন সাফি। গত কয়েক বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত সাফি উদ্দিন সাফির সব ছবিই দেখা হয়েছে। দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে কাজগুলো ভালোও হচ্ছে। সাফি সেই সৌভাগ্যবান গুটিকয়েক ডিরেক্টরদের একজন, যিনি নিয়মিতভাবে বড় বাজেটের ছবি করছেন। গল্পটা মৌলিক। গল্পের ন্যারেশনের জন্য এবারও ভিন্নধর্মী অ্যাপ্রোচ নেওয়া হয়েছে। গতবার ছিলেন সোহেল রানা আর ববিতা। এবারের প্ল্যাটফর্ম জ.ই.মামুনের অনুষ্ঠান আর সেখানে দুই আমন্ত্রিত অতিথি-আসিফ আকবর আর হাবিবুল বাশার। নিঃসন্দেহে খুব ডিফরেন্ট আর মজাদার আইডিয়া। কিন্তু আইডিয়াটা
নিয়ে খুব বেশি কাজ করা হয়নি। বাশার প্রফেশনাল অ্যাক্টর নন। কিন্তু তার অংশগুলো কি আরেকটু যত্ন করে শ্যুট করা যেত না? শুধু তাই না, পুরো ছবি জুড়েই এক অবস্থা। sakib1_603071311ভাল ভাল কিছু আইডিয়ার সমাহার। কিন্তু কোন কনসেপ্টকেই ঠিকমতো মেলে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়নি। কোনটা ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট আর কোনটা সাবপ্লটকে, এই সংজ্ঞাটা গুলিয়ে ফেলেছেন কাহিনীকার। শাকিব জয়ার মাঝে প্রেম, সেই প্রেমে জয়া আবার রাজি না। ইমন জয়াকে আর মৌসুমী শাকিবকে পছন্দ করে। বাংলাদেশ-পাকিস্তান সিরিজ চলছে, ১৬ তারিখ সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ। সেই ম্যাচে হারার জন্য জুয়াড়িরা শাকিবকে চাপ দিচ্ছে। দেখতেই পাচ্ছেন, আড়াই ঘণ্টার একটা ছবির জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উপকরণ মজুদ রয়েছে। এরপরেও যোগ করা হয়েছে তিন-তিনটা সাবপ্লট:
  • জয়ার ভাই অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগছে।
  • শাকিবের লোভী বাবা আর সৎ মা (আসল মা আবার আত্মহত্যা করেছে এবং মরার আগে শাকিবকে দিব্যি দিয়েছে পিতার অনুগত থাকতে)-এর কারণে সে ব্যক্তিগত জীবনে অসুখী, মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত।
  • মৌসুমীর বাবা সুব্রত বিশাল ধনী, মেয়ের সুখের জন্য প্রয়োজনে সবাইকে গুলি করে মারবো (হুঁ, বাংলা সিনেমার এই বিখ্যাত ক্যাচফ্রেজটা সুব্রত অনেকবার আউরেছেন)। সাবপ্লটগুলো শুরু করে, প্রয়োজন ছাড়া টেনে একটু পর ভুলেও গিয়েছেন সেগুলোকে। ফলস্বরূপ, দর্শকদের কোন চরিত্রই এমনকি নায়ক-নায়িকার সাথেও কোন অ্যাটাচমেন্ট তৈরী হয় না।
ছবির মাঝে প্রচুর ইনকোহেরেন্স আছে। এটা স্ক্রীপ্টের ত্রুটি নাকি এডিটিং প্যানেলের কাঁচির প্রভাব বলা মুশকিল। প্রথমেই বলে নেই, নামে সিক্যুয়েল হলেও দুটো ছবির গল্প, চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মূলত, “পূর্ণ দৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি” ব্র্যান্ড নেমটা ব্যবহার করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। বলিউডে ভাটদের হরদম এমনটা করতে দেখা যায়। এটা নিয়ে আমার তেমন কোন সমস্যা নেই। ছবির শুরুতে আমরা জানতে পারি, শাকিব অনেকদিন সেঞ্চুরি বা sakib-2হাফ-সেঞ্চুরি করছে না। তারপর সেইদিনের ম্যাচের হাইলাইটসে দেখানো হয় শাকিব চার মেরে অর্ধ শতক পূর্ণ করলো। বিভিন্ন অংশে কিছু টুইস্ট আনা হয়েছে। যেগুলো ফাঁপা এবং (অনলাইন পত্রিকার শিরোনামের মতো) মিসলিডিং।যেমন জয়ার খেলনা বন্দুক দিয়ে শাকিবকে কিডন্যাপ করা বা ইমনের বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হওয়া। যে টুইস্টের সন্তোষজনক সমাপ্তি দেখানো যায় না, সে টুইস্ট শুরু না করাই ভালো। গল্পে চিকন আলীর ক্যারেক্টারটা কোন ইন্ট্রোডাকশন ছাড়াই হঠাৎ করেই আসলো। ছোট-খাট ত্রুটিগুলোকে বাদই দিলাম (যেমন: এক ব্যাটসম্যান প্যাভিলিয়নে ফিরছে, হাতে ব্যাট-হেলমেট। অথচ মাথায় ক্যাপ পরে আছেন। অথবা শাকিবের ফোন বাজছে, দুটিই স্যামসাং। কিন্তু রিসিভ করার পরে সেটা হয়ে গেল আইফোন )। আমার কাছে সবচে দুর্বল লেগেছে ছবির শেষভাগটা। সে কথায় পরে আসছি।
ছবির প্রিক্যুয়েলের তুলনায় এবারের গানগুলো ততটা জমেনি। লোকেশনগুলো সুন্দর। “প্রেম করবো, প্রেমে পড়বো” গানটা ভালো লেগেছে। bg-Puron-Doirgho20160403203532শাকিব আর মৌসুমীর একটা গানে সিক্সটিজ এর একটা ফ্লেভার পেলাম। এই গানটার কোরিওগ্রাফি, এডিটিং অনেক ডিফরেন্ট ছিল। আবার ঠিক উল্টোভাবে মুভির একমাত্র স্যাড সংটার জঘন্য এডিটিং দেখে হতবাক হতে হয়।
অভিনয়ের কথা বলি-শাকিব খানের কাজ ছিল দুর্দান্ত। রোম্যান্টিক, ইমোশনাল, নাচ, ফানি সিকোয়েন্স সব জায়গাতেই তার কাজ ভালো ছিল। এই চরিত্রটা ইন্ডাস্ট্রীর বর্তমান অন্য কোন নায়কের পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। আগেরবারের মতো, এবারও জয়ার অভিনয় আমার কিছুটা লাউড লেগেছে। তবে, এই লাউড অ্যাকটিং বা এই পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতে স্বল্পদৈর্ঘ্য পোশাক পরাটা, বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের জন্য তার ইচ্ছাকৃত একটা সিদ্ধান্ত (বা নিরীক্ষা) বলেই আমার মনে হয়।
এই সিনেমায় ইমন নেগেটিভ ক্যারেক্টার করেছেন। যদি বলি, শুভকে মিস করিনি। তবে মিথ্যে বলা হবে। ইমনের অভিনয়ের প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। তবে সচরাচর যে ইমনকে আমরা দেখি, তার তুলনায় এই ইমনের কাজ ভালো ছিল। বিশেষ করে, ফোর্থ ওয়াল ব্রেক করার দৃশ্যগুলোয়। সমস্যা হয়েছে, pdpk_2_BG_banglanews24_270259249ইমনের ক্যাচফ্রেজটা (ছক্কা) সংলাপে কোন কারণ ছাড়াই, হুটহাট ব্যবহার করে বিরক্তির জন্ম দিয়েছে। একই কথা অন্য ক্যাচফ্রেজগুলোর বেলায়ও খাটে। শাকিবের বাবা সাদেক বাচ্চু প্রতিটা সংলাপ নামতার সাথে ছন্দ মিলিয়ে বলে। কিন্তু তাই বলে সব সংলাপে দুই ঘর পর্যন্ত বলতে হবে! “দুই এক্কে দুই, দুই দুগুণে চার, এবার আমায় মার।” এখানে প্রতিবারই দুই এক্কে দুই তো না বললেও চলে। এসব পরিমিতিবোধ কবে আসবে? সাদেক বাচ্চু, সাচ্চু এরা স্বল্প সময়েও ভালো কাজ দেখিয়েছেন। মৌসুমী হামিদকে কাজ করার তেমন স্পেস দেওয়া হয় নাই। মৌসুমী হামিদের সব কয়টা সিনেমা আমার দেখা। বেশিরভাগ ছবিতেই তাকে সাইড ক্যারেক্টার করতে দেখছি। মৌসুমী জেনে-বুঝেও এমন পার্শ্বচরিত্রগুলো নিচ্ছেন। তারপরও মৌসুমী ছবিগুলো করছেন। সিনেমার প্রতি তার এই ডেডিকেশন ভালো লাগলো।
ছবিতে ইমন ওপেনিং ব্যাটসম্যান, তার চাচাও (ওমর সানী) দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন (ইমনের চরিত্রটা কাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বোঝা গেল কি? ভালোই রগড় করেছেন লেখক)। আর মৌসুমি হামিদ সম্ভবত এইচ.জি.ওয়েলস-এর ইনভিজিবল ম্যানের মতো অথবা মিঃ ইন্ডিয়ার মতো (রুম্মান রশিদ খান তো হিন্দি ছবি অনেক পছন্দ করেন। তাই তার বোঝার সুবিধার্থে একটা হিন্দি মুভির নাম দিলাম) কোন জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী। কারণ, মৌসুমী যেভাবে বিভিন্ন জায়গায় আবির্ভূত হচ্ছিলেন এবং সবার অলক্ষ্যে হাপিশ হয়ে যাচ্ছিলেন; তা একমাত্র উপরোক্ত চরিত্র দুটির পক্ষেই সম্ভব। জয়াকে কিডন্যাপ করে যেখানে নিয়ে আসা হল, হাওয়ার মধ্যে থেকে সেখানে এসে উপস্থিত মৌসুমী। কিছুক্ষণ জয়াকে লুকিয়ে দেখে আবার কেউ কিছু বোঝার আগেই, সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। ছোটবেলায় মিঃ ম্যাগু নামে একটা কার্টুন দেখতাম। মিঃ ম্যাগু’র চোখ ভয়াবহ খারাপ, হাতের সামনে হাতী থাকলেও দেখে না।Purno-Doirgho-Prem-Kahini-2-2 কিডন্যাপারের আস্তানার প্রতিটা শিষ্যর দৃষ্টিশক্তি মিঃ ম্যাগু’র মতো। নইলে মৌসুমীর মতো লম্বা-চওড়া একটা মানুষকে না দেখার অন্য কোন যুক্তি নাই।
এবার আসি ছবির শেষভাগে। এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, আর দশটা ছবির মতো এই ছবির ক্লাইম্যাক্সের কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু ভিলেন-হিরোর ফাইটিং নয়, ম্যাচের ব্যাট-বলের লড়াই। লড়াইয়ের ময়দান কিন্তু ভিলেনের আস্তানা নয়, খেলার মাঠ। সে কারণেই ভিলেনের আস্তানায় শাকিবের উপস্থিতি ছিল অতি স্বল্প সময়ের জন্য। দেশের পর্দায় এমন কিছু দেখার সুযোগ আমাদের হয় না। সুতরাং, দর্শকদের একটা নতুন স্বাদের সাথে পরিচয় করানোর জন্য, এই অংশটা ভালোভাবে এক্সিকিউট করা খুবই জরুরী ছিল। দুঃখজনকভাবে ছবির, এই অংশটা সবচে অগোছালো। এলোমেলো শটের সংকলনের সাথে যোগ হয়েছে দুর্বোধ্যতা। কোথা থেকে কি হচ্ছে, কে আসছে, কে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যায় না। অথচ, এটা খুব সহজেই এড়ানো যেত। শুধুমাত্র একজন ধারাভাষ্যকার থাকলেই হতো। এখানে উল্লেখ্য যে, উপমহাদেশেরই আরেক স্পোর্টস ফিল্ম Lagaan-এ কিন্তু আমরা দেখেছি সময়ে সময়ে একজন এসে চোঙায় করে ম্যাচের বিবরণী দিচ্ছেন। এটা যতটা না মাঠে উপস্থিত দর্শকদের জন্য করা, তার চেয়ে অনেক বেশি পর্দার এপাশে থাকা দর্শকদের জন্য। যেখানে আঠারশো শতকের একটা পিরিয়ড ফিল্মে কমেন্টেটর ছিলেন, সেখানে সমকালীন ছবিতে কেন ধারা ভাষ্যকার ছিলেন না! 1438501822এখানে চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফতের মতো রঙিন কোন ক্যারেক্টার এনে, গল্পটাকে আরো মজাদার করা যেত। মাঠে শাকিব খানের প্রবেশ করার ধরণ নিয়ে অনেককে হাসাহাসি করতে দেখলাম। কিন্তু একজন হিরোর এমন ড্রামাটিক এন্ট্রি আমার কাছে দূষণীয় মনে হয়নি।
পরিশেষে বলতে চাই, পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি হয়তো কাগজে-কলমে খুব ভালো একটা স্টোরি ছিল, কিন্তু ছবিটি উপভোগ্য হয়নি। ছবিটা যেন একটা ড্রইংরুমের মতো। চাকচিক্যময় সব কিছুই আছে, কিন্তু বড্ড অগোছালো।
About

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com