Smiley face

আব্বাস কিয়ারোস্তামি : চলচ্চিত্রের নান্দনিক এক কবি

roads_to_kiarostami_cover

কাউসার রুশো

সানগ্লাসপ্রিয় আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে একবার এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি কী সবসময়ই সানগ্লাস পরেন?’ মজা করে তিনি উত্তর দিলেন, ‘চিন্তা করবেন না, অন্তত গোসলের সময় এটা খুলে রাখি।’
আব্বাস কিয়ারোস্তামি সম্পর্কে জাপানি গ্রেট ফিল্মমেকার আকিরা কুরোসাওয়ার আবেগী স্বীকারোক্তি, ‘বাক্যের ক্ষমতা নেই আমার অনুভূতিকে প্রকাশ করার। আমি শুধু বলি তার চলচ্চিত্রগুলো দেখুন। সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর আমি ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু কিয়ারোস্তামির ছবি দেখার পর স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি, সত্যজিতের অভাব পূরণের জন্য যথার্থ এক মানুষকে পাঠানোর জন্য।‘ সত্যিই আব্বাস কিয়ারোস্তামির নেতৃত্বেই ইরানি চলচ্চিত্রাঙ্গন পাল্টে গেছে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে ইরানি চলচ্চিত্রকে প্রভাবশালী ও স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘ছবি আঁকতে গিয়ে যদি দেখ, কোনো রঙ বা জল এলোমেলো গড়িয়ে পড়ছে, নষ্ট করে দিচ্ছে নান্দনিকতাকে, তবে চিন্তার কারণ নেই। বরং তুমি গড়িয়ে পড়া রঙটাকেই অন্য একটা উপাদান ভাব, নতুন কিছু আবিষ্কার এখান থেকেই শুরু হোক।
আব্বাস কিয়ারোস্তামির জন্ম ১৯৪০ সালের ২২জুন, তেহরানে। আঠারো বছর বয়সে ঘর ছেড়েছেন। চিত্রকলার প্রবেশিকা পরীক্ষায় ফেল করে যোগ দেন ট্রাফিক পুলিশের চাকরিতে। কিছুদিন পর আবার পরীক্ষা দিয়ে চিত্রকলায় উত্তীর্ণ হন। যোগ দেন বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। ১৯৬০-৬৯ এর মধ্যে তিনি পঞ্চাশটিরও বেশি বিজ্ঞাপন তৈরি করেন। বিজ্ঞাপন বানাতে বানাতেই ক্যামেরার সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠে তার। আরো বড় কিছু করার চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। শেষ পর্যন্ত বানিয়ে ফেললেন জীবনের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দি ব্রেড এন্ড অ্যালেই’। এরপর তার ধ্যান-জ্ঞান সবকিছুই ছিলো চলচ্চিত্রে। হোক তা স্বল্পদৈর্ঘ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য বা প্রামাণ্যচিত্র।
আব্বাস কিয়ারোস্তামি এমন একটি নাম, যিনি নান্দনিকতা ও সৃজনশীলতার প্রশ্নে বরাবরই আপসহীন। তার চলচ্চিত্রে সরাসরি অংশগ্রহণ করে দর্শক। তিনি চান, ছবি দেখে দর্শক চিন্তা করবে, তার চলচ্চিত্রের ভেতরে প্রবেশ করবে। শেষমেশ নিজেরাই ব্যাখ্যা দাঁড় করাবে। তাই আব্বাসের চলচ্চিত্রগুলো রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মতো ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ ধরনের। আব্বাসের চলচ্চিত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি অপেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পেশাদার অভিনেতা মানেই খারাপ কিছু তা আমি মনে করি না। তবে অপেশাদার অভিনেতা ব্যবহারের সুবিধা হলো, ছবিতে তারাই আমার চিত্রনাট্য ঠিক করে দেয়। আমি যেটা লিখি তা যদি তারা মুখে না-ই আনতে পারে বা ঠিকভাবে বলতে না পারে তাহলে আমি ধরে নিই, আমি যা লিখেছি তা ভুল। সঙ্গে সঙ্গে আমি চিত্রনাট্যে পরিবর্তন আনি।’
ছবি বানানোর পাশাপাশি আব্বাস কাজ করেছেন চিত্রকর, ইলাস্ট্রেটর, আলোকচিত্রী, ভিডিও সম্পাদক হিসেবে। সাহিত্যিক আর কবি হিসেবেও নিজ দেশে তার সুনাম আছে। আর চলচ্চিত্রকার হিসেবে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রিক্স রবার্তো রসোলিনি (১৯৯২), ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৩), পিয়ার পাওলো প্যাসোলিনি অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৫), ইউনেস্কোর ফ্রেডরিকো ফেলেনি গোল্ড মেডেল (১৯৯৭), গ্রিসের গোল্ডেন আলেকজান্ডার অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৯), আকিরা কুরোসাওয়া অ্যাওয়ার্ড (২০০০), কলকাতা আন্তর্জাতিক ফিল্ম উৎসবের ওয়ার্ল্ড’স গ্রেট মাস্টার্স (২০০৭), ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভেলের গ্লোরি টু দ্য ফিল্মমেকার অ্যাওয়ার্ড (২০০৮) ইত্যাদি। এছাড়া ২০০৫ সালে দ্য ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট থেকে অর্জন করেন ফেলোশিপ।
কিয়ারোস্তামি নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো- ক্লোজআপ (১৯৯০), থ্রৌ দ্য অলিভ ট্রিজ (১৯৯৫) টেস্ট অব চেরি (১৯৯৭), দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস (১৯৯৯), এবিসি আফ্রিকা (২০০১), টিকেটস (২০০৫), চাকান অন সিনেমা (২০০৭) প্রভৃতি। ‘ফাইভ’ (২০০৩) আব্বাস নির্মিত খুবই বিখ্যাত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। আব্বাসের টেস্ট অব চেরি ১৯৯৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার পাম ডি ওর জিতে নেয়। আর ‌’ দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’ ১৯৯৯ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার গোল্ডেন লায়ন জয় করে।
(তথ্যসূত্র: আইএমডিবি, উইকিপিডিয়া, ফিল্মমেকারের ভাষা এবং দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা)

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com