Smiley face

দ্যা কিউরিয়াস কেস অফ ওয়ান পাঞ্চ ম্যান

image001 (1)
গত বছর শুরু হওয়ার পর থেকেই, প্রতি সপ্তাহে ওয়ান পাঞ্চ ম্যানের কীর্তিকলাপ দিয়ে আনিমে ফোরামগুলো সয়লাব হয়েছে। তো কী আছে এই সিরিজে যা পুরো কমিউনিটিকে গ্রাস করে ফেলেছিল? জানান দিচ্ছেন তারিকুল ইসলাম পনির

 

 
গল্পটা এক শখের সুপারহিরো সাইতামার। সাইতামা এক ঘুষিতে যেকোনো শত্রুকে শেষ করে দিতে পারে। গল্পটা আসলে এইটুকুই। সুপারহিরো হিসেবে সাইতামা অবশ্যই চমকপ্রদ। কিন্তু যে এক ঘুষিতে সব শত্রুকে শেষ করে দিতে পারে তাকে নিয়ে তৈরি আনিমে কিভাবে বারটি সফল পর্ব উপহার দিল। আসলে এই জায়গাটাতেই এক ঘুষি মানব বেশ উজ্জ্বল এবং আলাদা, যে কারণে এটি শোনেন ফ্যানদের কাছে বেশ ভালো বাজার পেয়েছে। বেশিরভাগ image003 (2)শোনেন আনিমেগুলো একটি ক্ষেত্রে সবসময়ই সফল – ক্যার‍্যাক্টারাইজেশন বা চরিত্রাঙ্কন। শোনেন আনিমে এর চরিত্রগুলো ‘দেখলেই চেনা যায়’ গোছের। ড্রাগন বলের গকু চিরচেনা এক চরিত্র। গকুর স্বাভাবিক একটি মডেল দেখলেই সদা হাস্যজ্জ্বল নায়কের কথা মনে পড়ে, যে কিনা ফ্যামিলিম্যান। অন্যদিকে ফাইটিং এর সময়ের মডেল দেখলে, তার ক্ষমতার একটি স্বাদ কোন এনিমেশন ছাড়াই আন্দাজ করে নেয়া যায়।
 
অন্যদিকে নারুতো এরও এরকম দুটো ভঙ্গির মডেল পাওয়া যাবে। কিন্তু এগুলোর অন্যান্য সাপর্টিং চরিত্রগুলো বরং একমুখী। নারুতোর কাকাশি, সাসকে, ইটাচি চরিত্রগুলো বরং সিঙ্গেল ডাইমেনশনাল। নারুতোর গল্পে এদের রোল সাপোর্টিং ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু এরপরেও এই চরিত্রগুলো উজ্জ্বল, ওয়ালপেপারে শোভা পায়; স্থিরচিত্রেই প্রবলভাবে নিজেদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য জানান দিচ্ছে। এমনকি যে ভিলেন মাত্র কয়েক পর্বের জন্য আনিমেতে আসে সেও নিজের বৈশিষ্ট্যে অন্য সবার থেকে আলাদা হয়ে যায়। প্লেসহোল্ডার ক্যার‍্যাক্টার থাকে না বললেই চলে। একই রকম ক্যার‍্যাক্টারাইজেশন পাওয়া যাবে ওয়ান পাঞ্চ ম্যানে। সাইতামার নাম শুনলেই টাক মাথার হলুদ স্যুট পড়া সুপারহিরোকে মনে আসবে। দেখতে সে সুদর্শন নয় কিন্তু যেকোনো শত্রুকে এক ঘুষিতে শেষ করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে, তাই শোনেন এর হিরোজ জার্নি অংশটুকু আগেই বাদ(!)। কিন্তু একই সাথে সে এসব শত্রু সম্পর্কে উদাসীন মনোভাব পোষণ করে এবং এই উদাসীনতাই অন্যান্য শোনেন আনিমে থেকে এক ঘুষি মানবকে আলাদা আকরে দেয়। সাপোর্টিং ক্যার‍্যাক্টার সাইবর্গ ‘জেনোস’ বরাবরের মতই সিঙ্গেল ডাইমেনশনাল ‘এপিক্যালি কুল ক্যার‍্যাক্টার’।
 
ক্যার‍্যাক্টারাইজেশন তো গেল। এবার কিছুটা গল্প করা যাক থিম নিয়ে। মূলত শোনেন আনিমের প্যারোডি হিসেবে শুরু হয় ওয়ান পাঞ্চ ম্যান। অন্যান্য শোনেন আনিমেতে হিরো তার যাত্রা শুরু করে একদম তলানি থেকে, একে একে বাঁধা অতিক্রম করে সে পাহাড়ের চুড়োয় উঠে যায় (হিরোজ জার্নি)। কিন্তু সাইতামা শুরু থেকেই শক্তির দিক থেকে সবার উপরে। সে স্বপ্ন দেখে এমন এক শত্রু আসবে যাকে শেষ করতে তার এক ঘুষির চেয়ে বেশি কিছু লাগবে। কিন্তু এরকম শত্রুর সে দেখা পায় না, আর এভাবে আনিমে এর গল্পও আগাবে না। তখনি গল্পে আসে জেনোস, যে কিনা প্রতিশোধ নিতে ঘুরছে। সাইতামার সামর্থ্য দেখে সে সাইতামার শিষ্য হয়ে যায়। শোনেন image002 (2)দর্শকদের ভালো ফাইট দেখার যে স্পৃহা, সেটা পূরণ করে জেনোস। জেনোস আনিমেতে একই সাথে দুটো ক্যার‍্যাক্টার প্লে করে। একটা হল সে সাইতামা, আরেকটা হল সে সাইতামার প্রতিদ্বন্দ্বী। এই বাক্যটার আরেকটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। শোনেন আনিমের (হিরোজ জার্নির) একটি কমন ক্লিশে হল, হিরো শত্রুকে কখনই শেষ করতে পারবে না; শত্রু সবসময় হিরোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে। কিন্তু হিরো হঠাৎ (ব্যাখ্যা সহ অথবা ছাড়া) শত্রুর চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং এই বাঁধা অতিক্রম করবে। এই জায়গাটিতে জেনোস আর সাইতামা একসাথে কাজ করে। জেনোস একটি শত্রুর সাথে অনেকক্ষণ মারামারি করবে, বিভিন্ন নতুন নতুন গ্যাজেট বের করবে, কিন্তু কখনোই শত্রুকে কিছু করতে পারবে না। শেষমেশ সাইতামা এসে ওই শত্রুকে এক ঘুষিতে নিধন করবে।
 
এই ব্যাপারটা সুন্দরভাবে উঠে এসেছে ‘ডিপ সি কিং’ আর্কে। যেখানে একের পর এক সুপার হিরো ডিপ সি কিংকে হারাতে চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শুধু সাইতামাই সফল হয়। আর্কটি দু’পর্বের হয় শুধু একটি কারণেই যে সাইতামা পথ হারিয়ে ফেলেছিল! অন্যদিকে জেনোস যতই চেষ্টা করুক সে কখনই সাইতামার সমান হতে পারবে না। শোনেন আনিমে এর আরেকটি কমন ক্লিশে হল, হিরোর একজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে যে কিনা কখনই হিরোর সমান পারদর্শী হবে না। হিরো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিছু জন্মগত সুবিধা নিয়ে এগিয়ে থাকে (ড্রাগন বলে গোকু এলিয়েন, নারুতোর আছে নয় লেজের শেয়াল) যেটা প্রতিদ্বন্দ্বী পায় না। সেদিক দিয়ে জেনোস বেশ যুতসই ভাবে এই চরিত্রটাও করে ফেলে। ক্যার‍্যাক্টারাইজেশন এবং শোনেন থিমকে একটু অন্যরকমভাবে তুলে ধরার দিক দিয়ে ওয়ান পাঞ্চ ম্যান বেশ সফল।
 
কিন্তু একটি যায়গায় এসে একটু থমকে দাড়াতেই হবে। ওয়ান পাঞ্চ ম্যান শুরু থেকেই ‘শোনেন’ জনরার প্যারোডি হিসেবে দাঁড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু শোনেন জানরার ভেতরে থেকে শোনেন জনরার ক্যর‍্যাক্টারাইজেশনকে সঙ্গে নিয়ে প্যারোডি হিসেবে বেশিদূর আগানো কষ্টকর। সিনেমা হিসেবে সাফল্য পাওয়া যেতে পারে; যেমনঃ জম্বি জানরার শন অফ দ্যা ডেড। আবার বিফল সিনেমার সংখ্যাও অনেক; স্পাইফিল্ম জনরায় রিসেন্ট ফ্লপ হল আমেরিকান আল্ট্রা। দুটোর মধ্যে পার্থক্য হল দ্বিতীয়টিতে চরিত্রগুলো নিজেদের খুব সিরিয়াসলি নিয়েছে, তাই কমেডি না হয়ে বরং একগাদা ক্লিশে সমৃদ্ধ একটি ছবি হয়ে গেছে। সেদিক দিয়ে ওয়ান পাঞ্চ ম্যান একটি মাঝামাঝি পথ অবলম্বন করেছে। এখানে জেনোস সম্পূর্ণ সিরিয়াস একটি চরিত্র, সাইতামা পুরটাই কমেডিক। তারা একে অপরের পরিপূরক; উপরের আলোচনা অনুসরণ করলে বলতে হয় দুটো মিলে আসলে একটি চরিত্র। বাকি চরিত্রগুলো কমেডি আর সিরিয়াসনেস এর মিশেল। এরপরেও যতই অগ্রসর হয়েছে গল্পটি শোনেন জানরার ক্লিশে গুলোকে সাগ্রহে গ্রহণ করেছে। সিরিজের শেষ ফাইটটিতে সাইতামাকে এক ঘুষির চেয়ে বেশি শক্তি খরচ করতে হয়েছে। এনিমেশন এর স্টাইল হিসেবে  ড্রাগন বলকে অনুকরণ করা হয়েছে। অনেকের মতে, সিরিজ ফিনালে হিসেবে একটি বড় ফাইট উপহার দেয়া হয়েছে। কিন্তু আসলে যেটা হয়েছে সেটা হল, শোনেন জনরাকে প্যারোডি করতে গিয়ে উলটা সেটাকে অনুকরণ করেই এন্ডিংকে একটি অর্থ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যেটা সিরিজের আগের ন্যারেটিভে কিছুটা হলেও ছেদ তৈরি করে। তাই যেখানে এটি একটি জানরা ব্রেকডাউন করার মত এনিমে হতে image005 (1)পারত, সেখানে দিনশেষে এটি শুধুই একটি ‘এনজয়েবল’ আনিমে থেকে যায়। হয়ত স্কোপ আরো ছোট করলে সেটি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রতি পর্বে সিরিজটি ডালপালা বড় করতে করতে একটি ‘অন্যরকম হিরো সমৃদ্ধ শোনেন আনিমে’তে রূপান্তরিত হয়।
এছাড়া এনিমেশন আর মিউজিক চয়েসের দিক দিয়ে ভালোভাবে পার পেয়ে যাওয়াতে মতই আনিমে এটা। ম্যাড হাউজের অ্যানিমেশন এমনিতেই চোখ ধাঁধানো হয়। কিন্তু একটু বিশেষ কিছু আনতে শুরুর দিকের পর্ব গুলো ছিল আউটসোর্স করা যেখানে ইন্ডাস্ট্রি লিডার অনেক আর্টিস্ট কাজ করেছেন। তাই সেম ফাইটে তিন চারটে এনিমেশন স্টাইল দেখা হয়ে যাবে, অভিজ্ঞ চোখ হলে এই স্টাইলগুলো কোন আনিমে থেকে নেয়া হয়েছে তাও বোঝা যাবে সহজেই। একদিক দিয়ে একটি মাত্র এসথেটিকে আবদ্ধ না থাকাটা বেশ ভালোভাবেই আন্দাজ করা যায়। প্রথমত, প্যারোডি হিসেবে বিভিন্ন আনিমের রেফারেন্স দেয়া দরকার ছিল। অন্যদিকে, রিপিটিটিভ গল্পে রিপিটিটিভ স্টাইল অনুসরণ করলে দর্শক হারানোর ভয় ছিল। সেদিক দিয়ে বেশ দারুণ একটি সিদ্ধান্ত।
 
সিরিজটি দেখে কেউ পস্তাবেন না। ইন্ডাস্ট্রির নামকরা মানুষজনের কাজ একটি প্যাকেজে দেখার জন্য বেশ ভালো এবং উপভোগ করার মত সিরিজ। শোনেন ফ্যানদের জন্য কিছু ফ্রেশ এয়ার নিয়ে আসে, সাথে আছে প্যারোডিক উপাদান। কিন্তু ভালোমতো এনালাইসিস করলে দেখা যায় এটি আসলে শোনেনকেই গ্লোরিফাই করছে।
 

 

 লেখক পরিচিতি :
তারিকুল ইসলাম পনির বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ কৌশলে মাস্টার্স করছেন। একসময় অনেক বই পড়লেও, অতি সম্প্রতি দর্শনে আগ্রহ জন্মেছে। এনিমেশনের এসথেটিক নিয়ে আগে থেকেই বেশ আগ্রহী ছিলেন। কোন একটা স্টাইল ঠিকমত ধরতে পারলে, নিজেই চেয়ার ছেড়ে ইউরেকা বলে লাফিয়ে উঠে। মাঝে মাঝে আঁকার চেষ্টা করে, কিন্তু বেশিরভাগই ধুর ছাই বলে শিফট ডিলিট করে দিতে হয়। আনিমের জগতে প্রিয় পরিচালক সাতোশি কন আর ইসাও তাকাহাতা।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com