Smiley face

সময়ের খেলা- টাইম ট্র্যাভেল যখন সিনেমায়

maxresdefault
তানিম নুর
সময়...
শব্দটা শুনতে যতোটা সাধারণ মনে হয়, এটা ঠিক ততোটাই জটিল একটা। মহাবিশ্বের যত নিগুঢ় রহস্য রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম- সময়। সৃষ্টির শুরু থেকে যার যাত্রা, থেমে নেই এক মুহূর্তের জন্য। প্রতি মুহূর্তেই সে বর্তমানকে অতীতে ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে। সমগ্র বিশ্বজগতকে সে আঁটকে রেখেছে অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী এক বেড়াজালে। কোন কিছুর সাধ্য নেই এর বাইরে যাবার।
আসলেই কি তাই? সবকিছু কি আসলেই সীমাবদ্ধ সময়ের বেড়াজালে!
এর বাইরে যাবার কোন উপায় কি আসলেই নেই? বিজ্ঞান কিন্তু বলছে- আছে। বিশ্বের বড় বড় সব বিজ্ঞানীরা এমন ধারণাই দিয়ে গেছেন আমাদের। সহজ ভাষায় যাকে আমরা বলতে পারি- টাইম ট্র্যাভেল। এতোটাই জটিল এবং রহস্যময় ব্যাপার এই ‘টাইম ট্র্যাভেল’ যা নিয়ে আজ অবধি চলছে নানা রকম গবেষণা। বিজ্ঞানীরা টাইম ট্র্যাভেলকে সম্ভব বললেও সাথে জুড়ে দিয়েছেন বেশ কিছু শর্ত। সে ব্যাপারে আলোচনা হবে শেষের দিকে। টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে বিজ্ঞানীদের এসকল ধারণার উপর ভিত্তি করেই লেখা হয়েছে অসংখ্য কালজয়ী সব গল্প, উপন্যাস। তৈরি হয়েছে অজস্র নাটক এবং সিনেমা। টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে সিনেমাই আজকের আলোচ্য বিষয় । প্রথমেই বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, গল্পের কাঠামো এবং আরও কিছু বিষয় মাথায় রেখে তুলে ধরতে চাই আলোচ্য কনসেপ্টে অন্যতম সেরা কিছু সিনেমার কথা...
 
বাটারফ্লাই ইফেক্ট (২০০৪)
It has been said something as small as the flutter of a butterfly's wing can ultimately cause a typhoon halfway around the world. - Chaos Theory
image001
‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ মূলত গণিত শাস্ত্রের Chaos Theory/ বিশৃঙ্খলা তত্ত্বের একটি হাইপোথিটিক্যাল উদাহরণ। সহজ ভাষায় বাটারফ্লাই ইফেক্ট হচ্ছে- কোন ঘটনার মধ্যে সামান্য একটি পরিবর্তন, কিভাবে সে ঘটনার পুরো ফলাফলকেই পাল্টে দেয়। টাইম ট্র্যাভেলে এই ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ কেমন ভূমিকা রাখতে পারে- সেই আইডিয়ার উপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছে ২০০৪ এর অনবদ্য একটি সিনেমা ‘দ্যা বাটারফ্লাই ইফেক্ট’।
স্টোরিলাইন- ইভানকে ছোটবেলায় বেশ কিছু ভয়াবহ ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যার ফলে মেমোরি লস, ব্ল্যাক আউটের মতো রোগের শিকার হয় ইভান। বড় হয় সে। কলেজে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছরে তার একবারও ব্ল্যাক আউট হয়নি। তার ধারণা- সে সুস্থ হয়ে গেছে। ছোটবেলা থেকেই ডায়েরী লেখার অভ্যাস ছিলো ইভানের। একদিন বান্ধবীর অনুরোধে ছোটবেলার একটি ডায়েরী পড়তে শুরু করে ইভান। পড়তে পড়তে চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যায়... ব্ল্যাক আউট।
ইভান নিজেকে আবিষ্কার করে. তার ছোটবেলার ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার মাঝে। ইভান বুঝতে পারে, অতীতে চলে গেছে সে। এরপর শৈশব-কৈশোরের কিছু ঘটনা অতীতে ফিরে পরিবর্তন করতে থাকে ইভান। এদিকে বাটারফ্লাই ইফেক্টের কারণে সেই পরিবর্তনের ফলাফল হতে থাকে ভয়াবহ। মূল কথা, অতীতের ঘটনাগুলোকে পরিবর্তনের ফলে তার ভবিষ্যৎ টাইমলাইনেও পরিবর্তন হতে থাকে।
মূল ভূমিকায় ছিলেন- অ্যাস্টন কুচার এবং অ্যামি স্মার্ট। সাইকোলজিক্যাল- থ্রিলার দ্যা বাটারফ্লাই ইফেক্ট ব্যবসাসফল এবং দর্শকনন্দিত একটি সিনেমা। যদিও বেশিরভাগ ক্রিটিকদের কাছে এটি যথেষ্ট আবেদন তুলতে পারেনি। তবে টাইম ট্র্যাভেল কনসেপ্টের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ আর সিনেমা প্রীতি- দুটি বিষয় যদি কারো মধ্যে থাকে তবে অবশ্যই ‘দ্যা বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ তার জন্য বেশ উপভোগ্য একটি সিনেমা।
এক কথায় ‘দ্যা বাটারফ্লাই ইফেক্ট’- Magnetic!
 
 
দি টাইম মেশিন (১৯৬০)
সাহিত্য ভালো লাগে আর এইচ জি ওয়েলস-এর নাম শোনেননি- এরকম কাউকে এই জগতে পাওয়া যাবে কি? অসম্ভব। সাহিত্যে অমর কীর্তির জন্য ৪ বার নোবেল পুরষ্কারে মনোনীত এই ইংরেজ উপন্যাসিককে বলা হয় ‘ফাদার অফ সাইন্স ফিকশন’। ১৮৯৫ সালে তার একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় যার নাম- দ্যা টাইম মেশিন। হৈচৈ পড়ে যায় গোটা বিশ্বে। টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে এরকম উত্তেজনাময় অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী ওয়েলস-এর আগে কেউ লেখার সাহস করেনি। ১৯৬০ সালে এই উপন্যাসটিকে কেন্দ্র করেই তৈরি করা হয় ‘দ্যা টাইম মেশিন’ সিনেমাটি। এখনকার সিজিআই, ভিএফএক্স এর ছোঁয়া থেকে অনেক দূরে ছিলো ৬০’ এর এই সিনেমাটি। কিছু দৃশ্য তাই বর্তমান সিজিআই প্রজন্মের কাছে দৃষ্টিকটু লাগতে পারে। তবে ‘দ্যা টাইম মেশিন’ সিনেমার গল্পের কাঠামো এতোটাই নিখুঁত যে ওসব ধর্তব্যই হবেনা।
image002
স্টোরিলাইন- জর্জ; ইংরেজ ধনকুবের এবং একজন উদ্ভাবক। নিজের ল্যাবরেটরিতে তৈরি করেছে এমন এক মেশিন, যা তাকে নিয়ে যাবে সুদূর অতীতে, কিংবা অপার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতে। বন্ধুদেরকে সে এই আবিষ্কারের কথা বলে, ট্রায়াল দিয়েও দেখায়। বন্ধুরা তারপরও বিশ্বাস করতে পারেনা। তারা ভাবে- মাথা খারাপ হয়ে গেছে জর্জের। একমাত্র জর্জই বুঝতে পারে- সে তৈরি করে ফেলেছে মানব জাতির স্বপ্নের বস্তু, যার নাম- ‘টাইম মেশিন’।
নিজের মেশিনে চড়ে বসে জর্জ। ভবিষ্যতের দিকেই চালনা করে তার ‘টাইম মেশিন’, পৌছায় ৮০২৭০১ সালে। দেখা পায় আজব এক মানব সভ্যতার। সিল্কের কাপড় পরিহিত একঝাঁক সুশ্রী তরুণ-তরুণী। বাগানে বসে অবসর সময় কাটানো আর জলকেলি করা ছাড়া তাদের আর কোন কাজ নেই। কিছুক্ষণ পরেই জর্জ বুঝতে পারে এই প্রজন্ম সম্পূর্ণ আগ্রহশূন্য। এদের কোন কৌতূহল নেই, জগতের অনেক কিছুই তারা জানেনা। কোনদিন বই পড়েনি, এমনকি আগুনের সঙ্গেও তারা পরিচিত নয়। নিজেদের নিয়েই তারা ব্যস্ত। প্রোগ্রাম করা রোবোটের মতো তাদের চালচলন, এমনকি রোবোটিক রিং থেকে প্রাপ্ত তথ্য ছাড়া আর কিছু জানা নেই তাদের। জর্জ ভেবেছিল মানব সভ্যতার পরিণতি বেশ সুখের, আসলে তা পুরোটাই হোপলেস। নিরর্থক এ প্রজন্ম, যাদেরকে কন্ট্রোল করে মাটির নীচে বসবাসকারী এক শ্রেণীর বন্য জাতি- ‘মোরলক’। জর্জ বুঝতে পারে- সভ্যতার এই উৎকর্ষের যুগেও মানব সমাজ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদল শাসন করছে, আরেকদল শোষিত হচ্ছে। মানুষ যতো উন্নতিই করুক না কেন, এই বিভেদ তাদের মাঝে সর্বদাই বিরাজ করবে। এই হোপলেস প্রজন্মকে টিকে থাকতে হলে তাদেরকে সোচ্চার হতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে মাথা তুলে। কিন্তু সেটা করবে কে? বই-পুস্তকহীন এ প্রজন্মের মাঝে নৈতিকতার শিক্ষা তো নেই! বাধ্য হয়ে এগিয়ে আসে জর্জ।
অ্যাডভেঞ্চার শেষে জর্জ বুঝতে পারে, একটি সভ্যতাকে সঠিকভবে গড়ে তুলতে পারে বই। জর্জ ফিরে আসে তার নিজের সময়ে। সেদিন রাতেই সে আবার রওনা হয় ভবিষ্যতে। সাথে নিয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ ৩টি বই। হাজার হোক, হোপলেস ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্বটা তো তাকেই নিতে হবে।
মূল উপন্যাসটিতে ওয়েলস সে সময়কার সামাজিক এবং রাজনৈতিক কিছু বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। সে অর্থে চমৎকার একটি প্রতীকী উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল ‘দ্যা টাইম মেশিন’। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে- ‘টাইম মেশিন’ এই শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এই শব্দটিকে বেশ গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করা হয়। এই ‘টাইম মেশিন’ শব্দটির উদ্ভাবক কিন্তু এইচ জি ওয়েলস। তিনিই সর্বপ্রথম তার উপন্যাসে এই শব্দটিকে ব্যাবহার করেছেন এরপর তা ছড়িয়ে পরেছে সারা বিশ্বে।
এক কথায় ‘দ্যা টাইম মেশিন’- Inspiring!
 
 
মিডনাইট ইন প্যারিস (২০১১)
Can you picture how drop dead gorgeous this city is in the rain? Imagine this town in the '20s. Paris in the '20s, in the rain. The artists and writers!
স্টোরিলাইন- ঢং... ঢং... ঢং... ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা। মিডনাইট। প্যারিস।
ছুটি কাটাতে আসা ‘গিল’ বাগদত্তা ‘ইনেজ’ এর উপর অভিমান করে একাকী হাঁটতে বেড়িয়েছে। একপর্যায়ে ফেরার পথ গুলিয়ে ফেললো সে। ঠিক সে সময় ১৯২০ সালের চকচকে একটি পূজহ (Peugeot) গাড়ি এসে দাঁড়ায় তার সামনে। মোহাচ্ছন্ন গিল কি মনে করে তাতে চড়ে বসে। গাড়ি থামে পুরনো একটি ভবনের সামনে। পার্টি চলছে ভেতরে। প্রবেশ করতেই গিল হতবাক! সবার পরনে কেমন ওল্ড ফ্যাশনের পোশাক! কয়েকজনের চেহারা বেশ চেনা চেনাও ঠেকছে! কিছুক্ষণ সময় লাগলো ব্যাপারটা বুঝতে। সে এখন আর বিংশ শতাব্দীতে নেই। চলে এসেছে ১৯২০’ এর প্যারিসে। পার্টিতে দেখা পেলো- স্কট ফিটযেরাল্ড, কোল পোর্টার, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের !!!
হেমিংওয়ে গিল এর পরিচয় জানতে চাইলো। গিল পেশায় হলিউডের একজন স্ক্রিনরাইটার। দৃঢ় কল্পনাশক্তি থাকলেও, নিজের ক্রিয়েটিভি ঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না। নিজের সাম্প্রতিক উপন্যাস নিয়েও বেশ হতাশ। হেমিংওয়ে প্রস্তাব দেয়, সে এবং গারট্রুড স্টাইন তার উপন্যাস রিভিউ করবে এবং শেষ করতে সাহায্য করবে।
image003
২০’ দশকের প্যারিস। সময়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বসেরা সঙ্গীতজ্ঞ, সাহিত্যিক, চিত্রকর, উপন্যাসিকদের আনাগোনায় তখন মুখরিত ‘পারী’। সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা সম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তির কাছে এই সময়টা স্বপ্নের, বলা যায় গোল্ডেন এজ। গিল এমনই একজন সাহিত্যপ্রেমিক লোক। বৃষ্টিতে পারী’র রাস্তা ধরে হেঁটে এর সৌন্দর্য অনুভব করতে চায়, কল্পনার রাজ্যে ডুব দিয়ে সেখান থেকে মণি-মুক্তা তুলে আনতে চায়। আমেরিকার বদ্ধ শহুরে পরিবেশে কল্পনার রাজ্যে ডুব দেয়া বেশ কঠিন। ওদিকে তার বাগদত্তা ইনেজও তার এইসব কর্মকাণ্ড পছন্দ করে না। তার মতে বৃষ্টিভেজা পারী দেখায় বিশেষ কিছু নেই।
তবে গিল বুঝতে পারে এটাই হচ্ছে তার জন্য উপযুক্ত জায়গা। প্রতিদিন মিডনাইটে চলে তার টাইম ট্র্যাভেল। একসময় পাবলো পিকাসোর প্রেমিকা অ্যাড্রিয়ানা’র প্রেমে পরে যায় গিল। টাইম ট্রাভেল করতে করতে একসময় দেখা পায় পল গঁগিন, এডগার ডেগাস, মান রে, সালভাদর ডালি, লুই বুনয়েল, টি.এস এলিয়ট সহ বেশ কিছু কিংবদন্তীর; যারা একবাক্যে বলে- রেনেসাঁ যুগটাই আসল গোল্ডেন এজ। অ্যাড্রিয়ানা গিল’কে প্রস্তাব দেয়, তার সাথে ১৮৯০ এর দশকে থেকে যেতে।
ডিরেক্টর উডি অ্যালেন, বিশ্বের প্রথম সারির একজন ডিরেক্টর। সম্ভবত এই সময়ের সেরা চিত্রনাট্যকার। একজন সত্যিকারের ক্রিয়েটিভ মানুষ হতে হলে ডুব দিতে হবে কল্পনার রাজ্যে। নিজ দক্ষতা আর সেরাদের অভিজ্ঞতা ঘেঁটে সেখান থেকেই তুলে আনতে হবে মূল্যবান মণিমুক্তা। গল্পের মূল বিষয়বস্তুটা এরকমই। ওয়েন উইলসন, র‍্যাচেল ম্যাকঅ্যাডামস এর সাবলীল অভিনয় ছিল অসাধারণ। এছাড়া বিভিন্ন চরিত্রে দেখা পাওয়া যায় মারিয়ন কোতিয়্যা, ক্যাথি বেটস, অ্যাড্রিয়ান ব্রডি, টম হিডেলস্টনের। এই সিনেমায় টাইম ট্র্যাভেল কনসেপ্টকে অনেকটা ফ্যান্টাসি হিসেবে দেখানো হয়েছে। যদিও অনেকে ব্যাপারটাকে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে। অনেকের মতে গিল যে গাড়িটিতে করে অন্য শতাব্দীতে ট্রান্সফার হয়েছে, সেই গাড়িটাতে মূলত কোন ট্রান্সপোর্ট ম্যাকানিজম ছিলো এবং সেই রাস্তার ধারেই কোথাও ওয়ার্মহোলে ছিলো যেটি দিয়ে সে চলে গেছে ১৯২০ এর পারীতে। এগুলো আসলে দর্শক এবং ভক্তদের নিজস্ব থিওরি। উডি অ্যালেন’কে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে জানান- টাইম ট্র্যাভেলের বিশদ বর্ণনায় না যেয়ে একটি কথাই মাথায় রাখতে হবে। তা হলো- Something magical happens around midnight.
এক কথায় ‘মিডনাইট ইন প্যারিস’- Magical!
 
 
ইন্টারস্টেলার (২০১৪)
Do not go gentle into that good night, Old age should burn and rave at close of day; Rage, rage against the dying of the light. Though wise men at their end know dark is right, because their words had forked no lightning they. Do not go gentle into that good night.
কিছু চলচ্চিত্র আছে যা দেখার পর অদ্ভুত এক অনুভূতি মনটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। দীর্ঘ সময় লেগে যায় এর রেশ কাটতে। টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে যতো সিনেমাই হোক না কেন, ইন্টারস্টেলার কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যগুলোর চেয়ে স্বতন্ত্র। ব্ল্যাকহোল, সিঙ্গুলারিটি, স্পেসটাইম, ওয়ার্মহোল ইত্যাদি জটিল বিষয়গুলো সিনেমাটিতে রয়েছে। ক্রিস্টোফার নোলানের এই সিনেমাটিকে বেশিরভাগ ফিল্ম ক্রিটিকই আখ্যা দিয়েছেন ‘মডার্ন মাস্টারপিস’ হিসেবে।
 
image004স্টোরিলাইন- গল্পের প্রেক্ষাপট এমন সময়কে ঘিরে, যখন পৃথিবী প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। মানুষ ফিরে গেছে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায়। কুপার- নাসার সাবেক পাইলট এবং অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ার। বাকিদের মতো তিনিও মহাকাশ চড়ে বেরানোর পাট চুকিয়ে, মনোযোগী হয়েছেন মৌলিক চাহিদা কৃষিপণ্য উৎপাদনে। তার ১০ বছরের মেয়ে মার্ফ, বাবাকে জানায় কদিন যাবত তার ঘরে প্যারানরমাল কিছু ঘটনা ঘটছে। কুপার সে ঘটনার নেপথ্যে খুঁজে পায় এক ধরনের বাইনারি সংকেত। কে বা কারা মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাইনারি কোডের মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে কুপারের সাথে। কোন একটি নির্দিষ্ট জায়গার ব্যাপারে ইঙ্গিত করছে কোডটি। বেড়িয়ে পরে কুপার। স্থান- নাসার সিক্রেট আর্কাইভ। সেখানে তার দেখা হয় প্রফেসর ব্র্যান্ড এর সাথে। তিনি জানান, নাসা এখনও গোপনে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের গবেষণা।
পৃথিবী খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের দিকে। মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে অতিসত্বর পৃথিবী ছাড়তে। কুপারকে অংশ নিতে হয় মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার অনিশ্চিত এই মিশনে। প্রফেসর ব্র্যান্ডের মেয়ে অ্যামেলিয়া, ডয়েল, রোমিলি এবং দুই রোবট টার্স ও কেইস’কে নিয়ে ‘এনডিওরেন্স’ নামক মহাকাশযানে যাত্রা শুরু করে কুপার।
পৃথিবীতে কেটে যায় অনেকগুলো বছর। মার্ফ ততদিনে প্রাপ্তবয়স্ক। বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দিয়েছে নাসায়। প্রফেসর ব্র্যান্ডের অসমাপ্ত রিসার্চে কাজ করে যাচ্ছে সে। এদিকে স্পেসশিপ ‘এনডিওরেন্স’- এর জ্বালানী শেষের দিকে। পরিভ্রমণের এক পর্যায়ে, ব্ল্যাকহোল ‘গারগেনচুয়ার’ প্রবল টানে কুপার এবং টার্স দিশেহারার মতো ছিটকে পরে ব্ল্যাকহোলের ভেতরে। নিজেদেরকে আবিষ্কার করে একটি টেসের‍্যাক্ট- ফাইভ ডাইমেনশনের ভেতরে। কুপার বুঝতে পারে এই ফাইভ ডাইমেনশন, ওয়ার্মহোল আসলে ভবিষ্যতের উন্নত প্রজন্মের মানব তৈরি একটি পথ। যোগাযোগ স্থাপনের জন্য এটি তৈরি করে রাখা হয়েছে।
ম্যাথিউ ম্যাককোনাহের অভিনয় নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। চরিত্রের মূলে ঢুকে যাওয়াটা তার কাছে ডাল- ভাত। এছাড়া অ্যান হ্যাথাওয়ে, মাইকেল কেইন, জেসিকা চ্যাস্টেইন, ছোট মার্ফ- ম্যাকেনজি ফয়, প্রত্যেকের দুর্দান্ত অভিনয়- সিনেমাটিকে অনবদ্য মাস্টারপিসে পরিণত করেছে। আর হান্স জিমারের জাদুকরী মিউজিক সিনেমাটিকে নিয়ে গেছে সম্পূর্ণ অন্য লেভেলে। এ এক সম্মোহনী মিউজিক। সিনেমার কনসেপ্টের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কতোটা পারফেক্টলি চমৎকারভাবে মিশে যেতে পারে- ইন্টারস্টেলার তার দুর্দান্ত প্রমাণ। ওয়ার্মহোল, স্পেসটাইম, সিঙ্গুলারিটির মতো দুর্বোধ্যসব ব্যাপারগুলো নিয়ে যতো সিনেমা হয়েছে তার মধ্যে ইন্টারস্টেলার সিনেমার সায়েন্টিফিক অ্যাকুরেসি সবচাইতে বেশি। কারণ, সিনেমার সায়েন্টিফিক কনসালটেন্ট হিসেবে ছিলেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফিজিসিস্ট ‘কিপ থর্ন’। যার ফলে সিনেমায় দেখানো জটিল এই বিষয়গুলোর অ্যাকুরেসি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নেই। স্বনামধন্য ফিজিসিস্ট, কসমোলজিস্ট ‘নিল ডিগ্রাস টাইসন’ এবং আরও কিছু মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সিনেমাটিকে ১০ এ ৮ এমনকি ৯ পর্যন্ত রেটিং করেছেন। নোলান বলেন, ইন্টারস্টেলার সিনেমা তৈরিতে তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে বেশ কটি সিনেমা যার মধ্যে-  Metropolis (1927), 2001: A Space Odyssey(1968), এবং Blade Runner (1982) উল্লেখযোগ্য। প্রোডাকশন ডিজাইনের সময় মাথায় রেখেছেন- Star Wars (1977) এবং Alien (1979) এর কথা। এছাড়া তারকোভস্কির The Mirror (1975) নাকি ইন্টারস্টেলার এর আবহ তৈরিতে তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলো।
এক কথায় ‘ইন্টারস্টেলার’- Mesmerizing!
 
 
ব্যাক টু দ্যা ফিউচার (১৯৮৫)  
৮৫’ তে রিলিজ পাওয়া সারা জাগানো টাইম ট্র্যাভেল অ্যাডভেঞ্চার সিনেমার নাম ‘ব্যাক টু দ্যা ফিউচার’। টাইম ট্র্যাভেলকে সবচাইতে সহজভাবে ব্যবহার করে এই কনসেপ্টে নির্মিত মজার একটি সিনেমা এটি। টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে অনেক সিনেমা থাকলেও বেশিরভাগ ক্রিটিকরাই এই সিনেমাটিকে সবসময়ই স্থান দেন প্রথম দিকে। সিনেমাটি নিয়ে রজার ইবার্ট এরকম কিছু কথা বলেছিলেন- পৃথিবীর সব টিন-এজ ছেলেমেয়েরাই নাকি মানতে চায় না যে তাদের বাবা মা কোনকালে টিনএজার ছিল। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কেন তারা তাদের টিন-এজ ছেলেমেয়েদের আবদার, আগ্রহ বুঝতে চায় না? ‘ব্যাক টু দ্যা ফিউচার’ এরকমই একটি সিনেমা যেখানে একই ধারনা পোষণ করা মার্টি ম্যাকফ্লাই স্বয়ং পৌঁছে যায় সেই সময়ে। চাক্ষুষ সাক্ষী হয়ে যায় বাবা মা’র টিন-এজ সময়কালের!
image005
স্টোরিলাইন- মার্টি ম্যাকফ্লাই; মিউজিক প্রিয় চনমনে এক তরুণ। গার্লফ্রেন্ড জেনিফারকে নিয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছিল। যদিও তার রিলেশন নিয়ে মা ‘লরেন’ এর যথেষ্ট আপত্তি। মাঝে মাঝেই সে নিজের প্রেমের স্মৃতি রোমন্থন করে। কিভাবে তার বাবার গাড়ির ধাক্কায় আহত হয় জর্জ, অর্থাৎ মার্টির বাবা। এরপর কিভাবে তাদের প্রেম গড়ে ওঠে- সেই রোমান্টিক ইতিহাস। মার্টির সায়েন্টিস্ট বন্ধু ড. ব্রাউন। সম্প্রতি তাকে নিজের এমন এক আবিষ্কারের কথা জানান যা শুনে মার্টির চোখ কপালে ওঠে।
ড. ব্রাউন ‘ডি'লরেন’ মডেলের পুরনো একটি গাড়ির ইঞ্জিনকে এতোটাই গতিময় করে তুলেছেন যে, তা আলোর বেগের চেয়ে দ্রুত ছুটতে পারবে। এক রাতে ঘটনাচক্রে মার্টি গাড়িটায় চেপে বসে, গতি বাড়াতে থাকে। প্রচণ্ড গতির এক পর্যায়ে তার চোখের সামনে সব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
মার্টি নিজেকে আবিষ্কার করে ১৯৫৫ সালের পৃথিবীতে, অর্থাৎ নিজের সময়ের চেয়ে ৩০ বছর পেছনে। দেখা পায় জর্জ অর্থাৎ নিজের বাবার তরুণ সত্ত্বার আর মা লরেনের সাথে। মার্টি বুঝতে পারে- ভয়াবহ ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছে সে। যেখানে তার বাবা জর্জ এর থাকার কথা, সেখানে সে নিজে চলে এসেছে। ঘটনার মোড় ঘুরে যেতে থাকে।
এই মুভির ডিরেক্টর রবার্ট জেমেকিস। অনবদ্য ডিরেকশন, দুর্দান্ত স্ক্রিপ্ট, চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফী, টগবগে উত্তেজনাপূর্ণ ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর- সবকিছুই ছিলো ১০০ তে ১০০। যার ফলে হলিউড ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি মাস্টারপিস হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ব্যাক টু দ্যা ফিউচার। সিনেমায় মার্টি চরিত্রের জন্য একমাত্র পছন্দ ছিল- মাইকেল জে. ফক্স। তিনি তখন একটি টিভি সিরিজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। যার ফলে সময় দেয়া অসম্ভব ছিলো। বাধ্য হয়ে রোলটা দেয়া হলো এরিক স্টোলজ (পাল্প ফিকশনের সেই ড্রাগ ডিলার) কে। সবাই বুঝতে পারছিলো কাস্টিং মনমতো হয়নি। আবারও নক করা হয় মাইকেল জে. ফক্স’কে। এবার রাজি হয় সে। টিভি সিরিজের কাজের প্রেশার কিছুটা কমিয়ে নেয়। আরেকজনের কথা না বললেই নয়, তিনি ক্রিস্টোফার লয়েড অর্থাৎ ড. ব্রাউন। এই দুজনের দুর্দান্ত অভিনয়ই ছিলো সিনেমার মূল প্রাণশক্তি। বাকিদের অভিনয়ও সমানভাবে প্রশংসনীয়। আর সেই ঐতিহাসিক ব্যাকগ্রাউন্ড থিম মিউজিক যা এখনো শরীরে টগবগে উত্তেজনা তৈরি করতে আগের মতোই একশো ভাগ সক্ষম । ১৯৮৫ সালের হায়েস্ট গ্রসিং ফিল্ম ছিল ‘ব্যাক টু দ্যা ফিউচার’। সেই সাথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অ্যাওয়ার্ডও জুটেছিল।
এক কথায় ‘ব্যাক টু দ্যা ফিউচার’- Amazing!
================
টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে এই পাঁচটি ভিন্ন স্বাদের সিনেমা ছাড়াও, যে চলচ্চিত্রগুলোর নাম না বললেই নয় সেগুলো হলো-  Donnie Darko (2001) , Primer (2004), Somewhere in Time (1980), Time Bandits (1981), The Terminator: Judgement Day (1984), Bill & Ted's Excellent Adventure (1989),  Groundhog day (1993), 12 Monkeys (1995), Timecrimes (2007), Looper (2012), Predestination (2014), Safar-e Jadui (1990- ইরানী). ইতাদি।
এটা কমপ্লিট লিস্ট না। এর বাইরেও চমৎকার কিছু সিনেমা আছে তবে এগুলোর কথাই সচরাচর বেশি উচ্চারিত হয়। ক্ল্যাসিফিকেশনের হিসেবে এই সিনেমাগুলোতে সাধারণত- ডাইমেনশনাল ট্র্যাভেল, রিমোট টাইম ট্র্যাভেল, কোয়ান্টাম ম্যানিপুলেশন, টেম্পোরাল স্পীড, টাইম পোর্টাল ক্রিয়েশন, টেলিপোর্টেশন – টাইম ট্র্যাভেলের এই ক্যাটাগরিগুলোই কোন না কোনভাবে ব্যাবহার করা হয়েছে।
শেষ কথা- শুরুতেই বলা হয়েছিলো টাইম ট্র্যাভেল সম্ভব। বিজ্ঞানীরা অন্তত সেরকম ধারণাই দিয়েছেন, তবে কিছু শর্তও দিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের মতে- টাইম ট্র্যাভেল যদি ভবিষ্যতের দিকে হয় তাহলে সেটা অদূর ভবিষ্যতে থিওরিটিক্যালি হয়তো কোনদিন সম্ভব হতেও পারে, তবে এই ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আর অতীতে ট্র্যাভেল করা প্রকৃতপক্ষে কখনোই সম্ভব হবেনা। এর জন্য ট্রান্সপোর্ট ম্যাকানিজমের যে পরিমাণ নেগেটিভ এনার্জি প্রয়োজন তা মানুষের পক্ষে কখনই উৎপন্ন করা সম্ভব হবেনা। সম্প্রতি ‘সাইন্স চ্যানেল’ এর একটা ডকুমেন্টারিতে মরগান ফ্রিম্যানের কণ্ঠে শেষ কথাগুলো ছিলো এরকম-
 “Time travel into the past might be theoretically possible, but it requires inconceivable amounts of energy and god-like technology. Every human has to live with the fact that life is short and time is precious. For now, at least, we can't turn back the clock. But...We'll keep trying”….
 
 লেখক পরিচিতি:
তানিম নুর- লিমিটেড লাইফে মুভির সংখ্যা আনলিমিটেড, তাই ছেঁকে মুভি দেখার অভ্যাস। দুই ঘণ্টার একটা গার্বেজ দেখা মানে একটা মূল্যবান মাস্টারপিস মিস করা। ক্ল্যাসিক এবং ইরানি মুভির পাঁড় ভক্ত। সত্যজিৎ রায়ের নির্মাণশৈলী দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। তার মতে- বৃষ্টিস্নাত রাত মুভি উপভোগ করার পারফেক্ট সময়। বর্তমানে Game of Thrones-এর Sansa Stark এর প্রেমে নিমজ্জিত। প্রিয় উক্তি: We think too much and feel too little- Charles Chaplin (The Great Dictator)

1 Comment

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com