image001
খ্যাতিমান জার্মান পরিচালক ওয়ার্নার হারজগের আগুয়েরে, দ্য র‌্যাথ অভ গড আর অ্যামেরিকান মায়েস্ত্রো ফ্রান্সিস ফোর্ড ক্যাপোলার অ্যাপোকালিপস নাও সিনেমা হিসেবে পৃথক হলেও ফিল্ম ‍দুটিতে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায় - থিমের দিক দিয়ে, টোনের দিক দিয়ে, গল্প বলার স্টাইলের দিক দিয়ে। সেই মিলগুলোই ধরিয়ে দিচ্ছেন জাহিদ হোসেন।
 
অ্যাপোকালিপস নাও এর পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড ক্যাপোলা নিজেও স্বীকার করে নিয়েছেন যে তাঁর ছবি ওয়ার্নার হারজগের মাস্টারপিস আগুয়েরে, দ্য র‌্যাথ অভ গড দ্বারা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত। তাঁর নিজের বয়ানে, “অবিশ্বাস্য দৃশ্যকল্পসমৃদ্ধ আগুয়েরে ছিল বিশাল এক অনুপ্রেরণার নাম, যা স্বীকার না করলে অন্যায়ই হবে।”
হ্যাঁ, এটা ঠিক অ্যাপোকালিপস নাও অনেক ক্ষেত্রেই ঋণী হারজগের ছবিটার প্রতি। আগুয়েরে না থাকলে হয়তোবা আমরা অ্যাপোকালিপস নাও পেতাম না। পেলেও হয়তোবা ভিন্নভাবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওপর নির্মিত আর দশটা ছবি থেকে হয়তোবা তখন আর আলাদা করা যেত না অ্যাপোকালিপস নাও’কে।
১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া আগুয়েরে কাহিনী দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদী বেয়ে এগিয়ে চলে। আর ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যাপোকালিপস নাও এর কাহিনী এগিয়ে চলে ভিয়েতনামের নাং নদী বেয়ে কম্বোডিয়ার দিকে। নদীর পাশে ঘন জঙ্গল, ওঁত পেতে থাকা বিপদ-আপদ, রোগ-বালাই। দৃশ্যে কোন নতুনত্ব নেই। একঘেয়ে, খানিকটা ধীরগতির। সেই একই নদী, একই জঙ্গল, একই ধরণের বালা-মুসিবত কিংবা একই ধরণের হুমকি। সেই হুমকি হয়তোবা স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের (আগুয়েরে) কিংবা ভিয়েতকংদের (অ্যাপোকালিপস)। ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত উন্মত্ততা গ্রাস করে অভিযাত্রীদের। এক ব্যাখ্যাতীত, ‍দু’কূলপ্লাবী উন্মাদনা। একে চাইলে হ্যালুসিনেশনও বলা যায় কিংবা আখ্যা দেয়া যায় উদ্ভট স্বপ্ন হিসেবে।
শেষ পর্যন্ত আগুয়েরে, দ্য র‌্যাথ অভ গডঅ্যাপোকালিপস নাও-এর সবচেয়ে বড় সাদৃশ্য এই উন্মত্ততায়, এই উন্মাদনায়, এই স্বপ্নে, এই হ্যালুসিনেশনে।
আগুয়েরে, দ্য র‌্যাথ অভ গড (১৯৭২): ফিল্মি দুনিয়ায় ওয়ার্নার হারজগ এক কিংবদন্তীর নাম, এক পথপ্রদর্শকের নাম। অনেক বিখ্যাত পরিচালক তাকে গুরু বলে মানেন। খ্যাতিমান নির্মাতা, ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ আন্দোলনের ‍গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো তাঁর সম্পর্কে রায় দিয়েছিলেন- “জীবিত পরিচালকদের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ” হিসেবে। সমালোচক শিরোমণি রজার এবার্টও তার ব্যাপারে বলতে গিয়ে প্রশংসার ছিপি খুলে বলে বসেন, “হারজগের ব্যর্থ ফিল্মও অসাধারণ।” কিন্তু সাধারণ দর্শকদের কাছে হারজগ কেন জানি একটু অচেনাই। ছবির কাহিনীতে আসি।
image003
আগুয়েরে, দ্য র‌্যাথ অভ গড ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে একদল স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের নিয়ে, যাদের নেতৃত্বে আছেন গঞ্জালো পিজ্জারো। সেই অভিযাত্রী দলের লক্ষ্য পেরুর মিথিক্যাল স্বর্ণনগরী, পরম আরাধ্য এল ডোরাডো খুঁজে বের করা। কিন্তু সমস্যা হলো পিজ্জারোর রসদ ফুরিয়ে গেছে। এখন কী করা?
পিজ্জারো ছোট্ট একটা দল বাছাই করলেন। সে দলটি এগিয়ে যাবে। এক সপ্তাহের ভিতরে তারা যদি পারে এল ডোরাডো খুঁজে বের করবে। তা নাহলে ফেরত আসবে। ছোট্ট দলটির নেতৃত্বে থাকলেন ডন পেদ্রো দি উরসুয়া, আর তার সহকারী ডন লোপে দি আগুয়েরে। উরসুয়ার সঙ্গে তার মিস্ট্রেস ডোনা ইনেস, আগুয়েরের সঙ্গে তার মেয়ে ফ্লোরেস।
এগিয়ে চলে ছোট্ট অভিযাত্রী দলটি। আর আমরাও ধীরে ধীরে আগুয়েরে’র উচ্চাকাঙ্ক্ষা, এল ডোরাডো নিয়ে তার মাত্রাতিরিক্ত অবসেশনের পরিচয় পেতে থাকি। এক পর‌যায়ে উরসুয়া ফিরে যেতে চাইলে আগুয়েরে বেঁকে বসে।
সামনে অপেক্ষা করছে কিংবদন্তীর এল ডোরাডো, সামনে অপেক্ষা করছে হার্নান কর্তেজ হওয়ার হাতছানি; আর সে কিনা এ সবকিছু ফেলে ফিরে যাবে? কর্তেজ তো নির্দেশ অমান্য করে মেক্সিকো জয় করেছিল। আগুয়েরেও তাই করবে।তার নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয়। তার ক্ষমতার লোভে জায়গা ছেড়ে দিতে হয় উরসুয়াকে। বন্দী করে রাখা হয় তাকে। উরসুয়ার জায়গায় নতুন নেতা হন ডন দি গুজম্যান, কিন্তু পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে যায় আগুয়েরে নিজে।অভিযাত্রীদের রসদ ফুরাতে থাকে। অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটতে থাকে তাদের। অসন্তোষও ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলে। এ সুযোগ নেয় আগুয়েরে। গুজম্যানকে হত্যা করানো হয়, আর বন্দী উরসুয়াকে ঝুলিয়ে দেয়া হয় গাছে।
এদিকে খিদের চোটে উল্টাপাল্টা দেখতে থাকে সবাই। কাঠের জাহাজ গাছের মগডালে লটকাতে দেখে তারা, শরীরে বিদ্ধ হতে থাকা ধনুককে অবিশ্বাসে উড়িয়ে দেয়। শয়ে শয়ে ধনুক উড়ে আসে, আক্রমণকারী হয়তোবা স্থানীয় ইন্ডিয়ান, হয়তোবা অন্য কেউ। একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকে ভেলার সবাই, আগুয়েরের মেয়ে ফ্লোরেসসহ।
আগুয়েরেই শুধুমাত্র দাঁড়িয়ে থাকে, ভেলায় তখন হাজির হয়েছে একপাল বানর। ভেলাজুড়ে তারা কিঁচকিঁচ করতে থাকে। আগুয়েরে তখন বদ্ধ উন্মাদ, তার দু’চোখে বুনো দৃষ্টি। মৃত মেয়েকে আঁকড়ে ধরে প্রলাপ বকতে থাকে সে-“আমি আগুয়েরে, ঈশ্বরের ক্রোধ…”
ক্যামেরা ভেলা ঘিরে ঘুরতে থাকে। বানরের উন্মাদ লম্ফঝম্ফ, কিঁচমিচ শোনা যায়। এ সবকিছুর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে আগুয়েরে একা…
image005
খ্যাপাটে আগুয়েরে’র চরিত্রে রুপদান করেছেন খ্যাপাটে অভিনেতা হিসেবে পরিচিত ক্লস ক্লিনস্কি। হারজগের প্রথম চয়েস ক্লিনস্কিই ছিলেন। ক্লিনস্কি এক সময় হারজগদের পারিবারিক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। সেই থেকে তার সঙ্গে পরিচয় হারজগের। উন্মাদ আগুয়েরে চরিত্র যাতে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ক্যামেরায় ফুটে উঠে সেজন্য হারজগ শুটিং চলাকালীন সময় ইচ্ছে করে ক্লিনস্কিকে খোঁচাতেন, ক্ষ্যাপাতেন। ক্লিনস্কিও খেপে যেতেন। কথিত আছে, হারজগ ক্লিনস্কির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে থ্রেট দিয়েছিলেন একবার। তবে হারজগ-ক্লিনস্কি দুজনই কথাটা উড়িয়ে দিয়েছেন। ফিল্মজুড়ে যে রোমাঞ্চকর আবহসংগীত শিহরিত করে রাখে তার স্রষ্টা পোপল ভহ। স্ক্রিনপ্লে’টা নিজেই লিখেছেন হারজগ। স্ক্রিপ্টটা লিখতে তার আড়াই দিনের মত লেগেছিল। যদিওবা ফিল্মে যথেষ্ট পরিমাণে ঐতিহাসিক উপাদান রয়েছে। পিজ্জারো, আগুয়েরে এরা কিন্তু ঐতিহাসিক চরিত্র। কিন্তু আগুয়েরে কোন ঐতিহাসিক ফিল্ম না। হারজগ ইচ্ছেমত ফ্যাক্টের সঙ্গে ফিকশন মিশিয়েছেন, ফিকশনের সঙ্গে ফ্যাক্ট।
মানুষের মাত্রাতিরিক্ত অবসেশন ও উন্মত্ততা যে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে এটাই যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আগুয়েরে
image006
অ্যাপোকালিপস নাও (১৯৭৯): সময়টা ১৯৭৫। ফ্রান্সিস ফোর্ড ক্যাপোলা ততদিনে হলিউডের এলিট সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে পড়েছেন। আর হবেন নাইবা কেন? ততদিনে তিনি ফিল্ম ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রিলজির প্রথম ‍দুটা বানিয়ে ফেলেছেন- গডফাদার-১। ছবি দু’টো বক্স অফিসে আলোড়ন তুলেছে, সমালোচকদেরও মন জয় করে নিয়েছে। যে কোন পরিচালকের জন্যই এ এক অনন্য অর্জন, যে কারোরই এতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার কথা।কিন্তু ক্যাপোলার মত পরিচালক তাতে সন্তুষ্ট হবেন কেন? শুরু করলেন ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে ছবি বানানো । এই তো কয়দিন আগে ভিয়েতনাম থেকে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে এসেছে মাইটি আমেরিকা। পরাজয়ের সেই দগদগে ক্ষত এখনো শুকোয়নি। অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি নিলেন জোসেফ কনরাডের কালজয়ী উপন্যাস-হার্ট অভ ডার্কনেস। ওয়ার্নার হারজগের আগুয়েরে থেকেও নিলেন প্রয়োজনীয় রসদ। তারপর যা দাঁড়ালো তা অনেকটা এরকম-
ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইউএস আর্মির ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন উইলার্ডকে একটা সিক্রেট অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়। স্পেশাল ফোর্সের কর্নেল ওয়াল্টার কার্টিজকে খুঁজে বের করে হত্যা করা। কুর্টজের মানসিক বিকার ঘটেছে। সে তার অনুচরদের নিয়ে ভিয়েতনাম সীমান্ত ঘেঁষে কম্বোডিয়ায় আপন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে কার্টিজ ঈশ্বর-তুল্য। সেই ঈশ্বর-তুল্য, মনোবিকারগ্রস্ত কার্টিজকে মারার উদ্দেশ্যে নাং নদী বেয়ে কম্বোডিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় উইলার্ড। সঙ্গে একটা পেট্রল বোট ও চারজন সঙ্গী। অ্যাপোকালিপস নাও সেই যাত্রারই কাহিনী।
ফিল্মের কাঠামো তো ঠিক হলো, এখন টাকা-পয়সার বন্দোবস্তও করা লাগবে। সেটারও ব্যবস্থা হলো। ক্যাপোলা-লুকাসের প্রোডাকশন কোম্পানি আমেরিকান জোট্রোপ দিবে বাজেটের কিছু, আর বাকিটা ইউনাইটেড আর্টিস্ট। অ্যাপোকালিপস নাও-এর প্রাথমিক বাজেট ছিল ১২-১৪ মিলিয়ন ডলার। অনেক চিন্তাভাবনার পর ফিল্মের লোকেশন হিসেবে বেছে নেয়া হলো ফিলিপাইনকে। এ জন্য ফিলিপাইনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফার্ডিনান্ড মার্কোসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকও সেরে নেয়া হয়।
ভিয়েতনাম ওয়্যার এপিক বানানোর স্বপ্নে তখন বিভোর ক্যাপোলা। এপিক তিনি ঠিকই বানাতে সক্ষম হন। কিন্তু এর জন্য যথাযথ মূল্য তাকে দিতে হয়েছে। মূল্য দেয়া শুরু কাস্টিং থেকেই। অ্যাপোকালিপস নাও-এর ন্যারেটর ক্যাপ্টেন উইলার্ডের চরিত্রটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তার চোখ দিয়েই আমরা সবকিছু দেখি। ক্যাপোলা চাচ্ছিলেন এ চরিত্রে শক্তিশালী কাউকে নিতে। তার প্রথম পছন্দ ছিলেন স্টিভ ম্যাককুইন। ম্যাককুইন তাকে ফিরিয়ে দিলেন। শুটিংয়ের জন্য তিনি এতদিন আমেরিকা ছেড়ে থাকতে পারবেন না।
যোগাযোগ করা হয় জ্যাক নিকলসন, ক্লিন্ট ইস্টউড, রবার্ট রেডফোর্ড, জেমস কানদের সঙ্গে। কিন্তু কেউই রাজি হয় না এতদিন ফিলিপাইনে থাকতে। ইস্টউডের অজুহাত ছিল ভিন্ন। তার মতে উইলার্ডের চরিত্রটা নাকি একটু বেশিই ডার্ক! শেষমেষ ক্যাপোলা দ্বারস্থ হন আল পাচিনোর কাছে-যে পাচিনোকে স্টার বানানোর কৃতিত্ব অনেকাংশে তাঁর। কিন্তু পাচিনোও তাকে ফিরিয়ে দেন। অজুহাত? ঐ একই। ফিলিপাইনের জঙ্গলে কে যায় মরতে! ক্যাপোলা রাগের চোটে তাঁর পাঁচটা অস্কারের পাঁচটাই বাড়ির জানালা দিয়ে নিচে ফেলে দেন।
হার্ভে কিটেলকে জোগাড় করা হয়। কিটেল সপ্তাহ দুয়েক শুটিংও করেন। কিন্তু কিটেল উইলার্ড না। উইলার্ড হওয়ার জন্য যে পারসোনা থাকা দরকার, তা কিটেলের ছিল না। অবশেষে স্বল্পপরিচিত মার্টিন শীন চরিত্রটা বগলদাবা করেন।
কিন্তু মার্টিন শীনও শুরু করে দিলেন ভেজাল। ছবির প্রথমভাগে মাতাল উইলার্ডের মেন্টাল ব্রেকডাউন দেখানো হয়। সেই দৃশ্যে মার্টিন শীন আনতে চাইলেন কঠোর বাস্তবতার ছোঁয়া। এমনিতেই বোতলপ্রিয় হিসেবে সুখ্যাতি ছিল তার, তার ওপর এরকম একটা দৃশ্য। মেথড অ্যাক্টিংয়ের ধ্বজাধারী মার্টিন শীনের চোখ লোভে চকচক করার কথা। ফলাফল? বেহেড মাতাল হয়ে আয়নার কাঁচ-টাচ ভেঙ্গে রীতিমত রক্তারক্তি কান্ড ঘটিয়ে দিলেন তিনি। এমনকি ক্যাপোলাকে তেড়েফুঁড়ে মারতেও যাচ্ছিলেন। ঘটনা এখানেই শেষ না। এর মাঝেই হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয় তার। হয়তোবা জঙ্গলের অসহনীয় গরম এই হার্ট অ্যাটাকের পিছে দায়ী, কিংবা তার মাত্রাতিরিক্ত বোতল প্রীতি অথবা উইলার্ডের মত চরিত্র করার জন্য মানসিক ও শারীরিক ধকল-এ সবকিছুই হয়তোবা এর পিছনে রসদ জুগিয়েছে।
ফলস্বরুপ ছয় সপ্তাহ কাজে ফিরতে পারেননি মার্টিন শীন। ফিল্মের শিডিউল পেছাতে থাকে, খরচ বাড়তে থাকে, ক্যাপোলার টেনশনও ক্রমান্বয়ে বাড়ে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে টাইফুন আঘাত হানে, জঙ্গলে নির্মিত সেট লন্ডভন্ড করে দেয়। ফিলিপাইনের বৈরি আবহাওয়ার সঙ্গে ক্রুরাও মানিয়ে নিতে পারছিল না, অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। ফিল্মের জন্য যে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছিল তা যখন তখন প্রেসিডেন্ট মার্কোস ডেকে পাঠাচ্ছিলেন। মার্কোস তখন নিজ দেশের বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত, ফিল্ম চুলোয় যাক!
image009
ক্যাপোলাও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিলেন। তার মাথায় কোন আইডিয়া কাজ করছিল না। তার ফিল্মের চরিত্রের মত তিনিও তখন উন্মত্ততার দ্বারপ্রান্তে। ছয় সপ্তাহ শুটিংয়ের জন্য ফিলিপাইন এসেছিলেন তিনি, এখন লাগছে মাসকে মাস (শুটিং শেষ হতে ১৬ মাস লেগেছিল। টাকাও খরচ হচ্ছে বানের জলের মত। প্রাথমিক বাজেটের টাকা তো অনেক আগেই শেষ, এখন নিজের গাঁটের টাকা খরচ করা লাগছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে ক্যাপোলা আত্নহত্যা করার চিন্তাও করেছেন।তার ওপর মার্লোন ব্রান্ডো তো ছিলেনই। ফিল্মে ব্রান্ডো কর্নেল কুর্টজের চরিত্রে অভিনয় করেন। কার্টিজ চরিত্রটা ছিল লম্বা, ছিপছিপে শরীরের। কিন্তু ব্রান্ডো যখন সেটে হাজির হন তখন তার ওজন কমসে কম তিনশো পাউন্ড। গ্রিন বেরেট ইউনিফর্ম শরীরে গলাবেন কী, ওই সাইজের ইউনিফর্ম ত্রিভূবনে নাই। তার ওপর কনরাডের হার্ট অভ ডার্কনেস পড়েন নাই তিনি, স্ক্রিপ্টও না। ক্যাপোলার এক সপ্তাহ লাগে তাকে স্ক্রিপ্ট পড়ে শুনাতে। বাইরে পুরো ইউনিট তখন অপেক্ষায় রত। এভাবেই ক্যাপোলা তার মহাকাব্যিক অ্যাপোকালিপস নাও বানিয়েছেন।
image010
ফিল্ম দু’টোই কনরাডের হার্ট অভ ডার্কনেস দ্বারা অনুপ্রাণিত, কাজেই মিল তো থাকবেই। দু’টোর ভিজ্যুয়ালে মিল আছে, মিল আছে পেসিংয়ে ও মিউজিকে। কুর্টজের চরিত্রের সঙ্গে আমরা সহজেই আগুয়েরের চরিত্রের মিল খুঁজে পাই। ঐ একই উন্মত্ততা, ঐ একই অবসেশন। আগুয়েরে এল ডোরাডো’র স্বপ্নে বিভোর এক উন্মাদ, আর কার্টিজ যুদ্ধের নিস্ফলতা নিয়ে।শেষ পর্যন্ত আর সবকিছু ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, এল ডোরাডো, বাঁচা, মরা-সবকিছু। সব। শুধু উন্মত্ততা জেগে থাকে। শুধুই উন্মত্ততা।
 
 
লেখক পরিচিতিঃ
জাহিদ হোসেন পেশায় একজন ব্যাংকার, কিন্তু প্যাশনের দিক দিয়ে একজন রাইটার। লিখতে ভালোবাসেন, পড়তে ভালোবাসেন, শুনতে ভালোবাসেন, দেখতে ভালোবাসেন। তার পছন্দ থ্রিলার, মিস্ট্রি, হরর, অকাল্ট, হিস্ট্রিক্যাল কন্সপিরেসি। বাতিঘর থেকে তার দুটি বই বেরিয়েছে-ঈশ্বরের মুখোশ ও ফিনিক্স।

 

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *