Smiley face

বাকানো! প্রথাগত আনিমে থেকে আলাদা ও অনবদ্য

image002
জনপ্রিয় আনিমে সিরিজ বাকানো! নিয়ে লিখেছেন তাহসিন ফারুক
 
ওয়েস্টার্ন পটভূমিতে মাফিয়াদের মধ্যে যুদ্ধ ও সেই সঙ্গে অ্যালকেমির মত সুপারন্যাচারাল ঘটনার রহস্য, দুর্দান্ত অ্যাকশন এবং অল্প সময়ের মধ্যে হাজির হওয়া অসংখ্য মন মত চরিত্রের উপস্থিতি — অল্পের মধ্যে বলতে গেলে বাকানো!-কে এতগুলি আলাদা জিনিসের অসাধারণ এক সংমিশ্রণ বলেই উল্লেখ করতে হবে। জাপানিজ গল্পলেখক রিয়োগো নারিতার লেখা “বাকানো!” (Baccano!) নামের একাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত লাইট নভেলের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়ে উঠে আনিমেটি। ওয়েস্টার্ন গল্পের বড় ধরণের প্রভাব পাওয়া যায় এই ননলিনিয়ার গল্পে।
১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকে শিকাগোর এক নামকরা ট্রেইন ‘ফ্লায়িং পুসিফুট’ তার এক যাত্রাকালে বড় ধরণের এক দুর্ঘটনার শিকার হয়। অন্যদিকে কাছাকাছি সময়ে কয়েকটি মাফিয়া দলের মধ্যে যুদ্ধ বেশ প্রকট আকার ধারণ করে। এদিকে ১৭১১ সালে কয়েকজন অ্যালকেমিস্ট অমরত্বের সন্ধান লাভ করে। ১৯৩২ সালে এসব ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে নামে এক নিউজপেপার কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তার অ্যাসিস্ট্যান্ট। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকলেও একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক রয়েছে সেটি প্রমাণ করতেই উঠেপড়ে লাগে তারা।
 
গল্প:
গল্পের সারমর্ম অল্পের মধ্যে তুলে ধরা কঠিন হতে পারে, এবং প্রথম বসাতে দর্শককে বেশ বেগ পেতে হতে পারে। এর প্রধান কারণ একাধিক স্থানের, একাধিক চরিত্রের এবং বিভিন্ন সময়ের ঘটনা একই সঙ্গে পাশাপাশি দেখাতে থাকে এই গল্পে। ১৯৩০ সালের কিছু মাফিয়া সদস্যদের অমরত্বের রহস্য খুঁজবার গল্প যেমন দেখানো হয় কিছুক্ষণ, তেমনই সঙ্গে সঙ্গে গল্পের ফোকাস চলে যায় ১৯৩১ সালের এক ট্রেইন দুর্ঘটনার দৃশ্যে। আবার কিছুক্ষণ পরেই দেখানো হয় ১৯৩২ সালে এক ছোট মেয়ের তার বড় ভাইকে খুঁজে বেড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টার ঘটনা। আবার কিছুদূর গিয়ে গল্পের ফোকাস চলে যায় এক অজানা সময়ের এক জাহাজে অবস্থান করা কিছু অ্যালকেমিস্টদের দিকে। তবে এতগুলি আলাদা আলাদা ঘটনা একত্রে দেখাতে থাকলেও ১৯৩১ সালের সেই ট্রেইন দুর্ঘটনাই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। গল্প যত অগ্রসর হতে থাকে, এত সব ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ঘটনার সম্পৃক্তি ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে।
ওয়েস্টার্ন গল্পের বেশ অনেক প্রভাব এখানে লক্ষণীয়, আর কিছু সাধারণ আনিমে স্টাইল না থাকলে এটাকে ওয়েস্টার্ন কার্টুন বলেই অনেকে ধরে নিতে পারেন। যেহেতু একাধিক সময়ের ঘটনা একত্রে দেখানো হতে থাকে, তাই শুরুতেই দর্শক জেনে যাবেন গল্পের শেষটা কেমন হবে। তবে গল্পের শেষ জানতে পারাটাই সব নয়, অন্তত এই সিরিজের জন্যে মূল আকর্ষণ এটা নয়। গল্পের মূল আকর্ষণ হল এত তালগোল পাকানো সব ঘটনা এক বিন্দুতে এসে কিভাবে মিলিত হয় সেটা হিসাব করে খুঁজে বের করাটা। শেষ পর্যন্ত সবকিছুর একীভূত হওয়াটা দর্শকের কাছে বেশ ফলপ্রসূ বলেই মনে হবে।
image004
অ্যানিমেশন:
‘ব্রেইন্স বেজ’ নামক আনিমে স্টুডিও এই সিরিজটি তৈরি করেছে, এবং একটি ছোট স্টুডিও হবার পরেও নিজেদের কাজের দক্ষতা দেখাতে পেরেছে চমৎকার সুন্দর আর্ট ও অ্যানিমেশন ব্যবহার করে। এমনকি অনেক বড় বড় স্টুডিওর পক্ষেও যা হয়ে উঠে না সেটা তারা করে দেখিয়েছে সিরিজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজের মান একইরকম রেখে; বিশেষত এরকম একটা সিরিজ যেখানে গল্পের উল্লেখযোগ্য চরিত্রের সংখ্যা মোট পর্বের চাইতে বেশি সেখানে প্রত্যেক চরিত্রকে আলাদা আলাদাভাবে সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যেন একবার দেখাতেই চরিত্রটিকে মনে রাখা যায় সহজে। যথাযথ অ্যাকশন দৃশ্যের ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় দ্রুত গতিবিধি অ্যানিমেশনটিকে চোখের জন্যে বেশ আরামদায়ক করে তুলেছে।
চরিত্র:
১৩ পর্বের সিরিজে এত বড় কাস্টিং খুব কমই চোখে পড়বে সম্ভবত। গ্যাংস্টারদের মারামারির মুহুর্তগুলোতে সিরিয়াস চরিত্ররা যেমন অ্যাকশন দৃশ্যের জন্যে আদর্শভাবে উপস্থিত হয়, তেমনই কমিক রিলিফ মুহূর্তের জন্যে রয়েছে মুখে হাসি এনে দেওয়া চরিত্ররা। কিছু হরর ধাঁচের দৃশ্য আছে যেগুলোর জন্যেও রয়েছে আদর্শ কিছু সাইকোপ্যাথিক চরিত্র। গল্পের সব পরিস্থিতির জন্যেই রয়েছে সেসব অবস্থাকে মনে ধরিয়ে দেবার মত জুতসই অনেক চরিত্র। তবে অনেকগুলো প্রধান চরিত্র থাকবার জন্যে অনেকের ধারণা হতে পারে চরিত্রদের ক্রমবিকাশে বাধা এসেছে কিনা; এক্ষেত্রে বলতে হয় গল্পকার বেশ সফলভাবেই সবাইকে উপস্থাপিত করতে পেরেছেন।
সাউন্ড:
মাফিয়াদের পটভূমির গল্প বলে জ্যাজ ও লাউঞ্জ মিউজিকের অসাধারণ ব্যবহার এখানে সবার আগে কানে বেজে উঠবে, সঙ্গে রয়েছে মানানসই কিছু পিয়ানো সোলো। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে যায় এমন চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের উপস্থিতি সহজভাবেই গল্পটি উপভোগের সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে ওপেনিং গান “গান’স এন্ড রোজেজ” আনিমের ইতিহাসের সেরা সব ওপেনিং গানের মধ্যে প্রথম দিকে থাকবার মত। এন্ডিং গানটিও সুন্দরভাবে মানিয়ে গিয়েছে পুরা সিরিজের সঙ্গে।
ভয়েস এক্টিং:
সিরিজটির জাপানিজ ভয়েস এক্টিং ভাল হবার সঙ্গে সঙ্গে এর ইংরেজি ডাবিং-ও খুবই মানসম্মত। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইংরেজি ডাবিং-এ অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হয়েছে দর্শকদের জন্যে গল্প বুঝবার সুবিধার্থে। ওয়েস্টার্ন সেটিং-এ গল্প বলে ইংরেজি ডাবিং আরও বেশি উপযোগী সিরিজটার জন্যে।
 
বাকানো! একই সঙ্গে ড্রামা, অ্যাকশন ও কমেডির এক সফল মিশ্রণ। যদিও এত বড় কাস্টিং ও এতগুলো আলাদা গল্প নিয়ে একটি সিরিজ হয়ে থাকলেও পর্ব সংখ্যা বেশ কম, কিন্তু সেটা আসলে ভালোর জন্যেই হয়েছে। গল্পটা একটি সুন্দর গতি নিয়ে এগিয়েছে এবং যেখানে শেষ হওয়া দরকার ঠিক সেখানে সুন্দরভাবে ইতি টেনেছে। যদিও মেইন সিরিজ শেষ হবার পরেও তিনটি বোনাস পর্ব রয়েছে, সেগুলোও গল্পের কিছু পার্শ্ব চরিত্রের ঘটনাকে উপরি পাওনা হিসাবে নিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে বাকানো! তথাকথিত আনিমে থেকে আলাদা ও অনবদ্য এক সৃষ্টি।
 
 
 
লেখক পরিচিতি :
তাহসিন ফারুক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে পড়ছেন। গান, মুভি, টিভি সিরিজ, কার্টুন, আনিমে, গেম, অঙ্কন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সময় কাটে; তবে সবচাইতে বেশি সময় ব্যয় করেন এল্ডার স্ক্রোলস গেমগুলির পিছনে। পছন্দের বিষয়ের অভাব নেই, তাই কোন এক বিষয়ে সাময়িক বিরতি নেবার ইচ্ছা থাকলেও ব্যস্ত হবার জন্যে অন্য জিনিসের অভাব হয় না। এম্বিয়েন্ট, সেল্টিক, ফিউশন, সিন্থ, ট্রিপ হপ মিউজিক তার সবচাইতে বেশি পছন্দ। গল্পের বই আর কমিক্সের পিছনে সময় ব্যয় করতে ভালোবাসেন। আর ভালোবাসেন ঘুমাতে — কাজ না থাকলে দিনে ১৫-২০ ঘণ্টা ঘুমাতেও আপত্তি নাই তার।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com