m111

১৯৯৬ সালের ৫ই এপ্রিল মুক্তি পেয়েছিল মালেক আফসারী পরিচালিত “এই ঘর এই সংসার”। যাকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ফ্যামিলি ড্রামা বললেও, বোধ করি খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। চলচ্চিত্রটির বিশ বছর উপলক্ষ্যে স্মৃতিচারণা করেছেন স্বয়ং মালেক আফসারী। ‘মুখ ও মুখোশ’ এর পক্ষ থেকে পাঠকদের জন্য ঈদের প্রধান উপহার এই লেখাটি:

বাংলাদেশে পিওর ফ্যামিলি ড্রামার সংখ্যা হাতেগোনা, আর সেগুলো খুব একটা চলেওনি। তারপরও আমি এই ঘর এই সংসারের মতো একটা ফ্যামিলি ড্রামা বানালাম। কেন? কারণ প্রাণী হিসেবে মানুষ খুব স্বার্থপর, আমিও তাই। এই ছবিটা বানাবার পেছনে আমারও একটা বিশাল স্বার্থ কাজ করেছে। নাহ, কোন আর্থিক স্বার্থ নয়, ভালাবাসার স্বার্থ।

তখন রোজী (আফসারী) ভীষণ অসুস্থ। একটা কিডনি সম্পূর্ণ ড্যামেজ হয়ে গিয়েছে, আরেকটার অবস্থাও তেমন ভালো না। ৬৫ ভাগের মতো নষ্ট। সাথে ডায়াবেটিসও ছিলো। চিকিৎসার জন্য শুধুমাত্র ভারতের ভেলোর শহরটাতেই যেতে হয়েছিলো সতেরোবার। স্বাভাবিকভাবেই রোজী অনেকদিন ক্যামেরার সামনে যেতে পারছে না। সবমিলিয়ে ওর মন কিছুটা খারাপ থাকতো। এই সিরিঞ্জ আর ওষুধের বোতল থেকে ওর মনটা ঘোরাবার জন্য একদিন প্রস্তাব দিলাম, “চলো তোমাকে নিয়ে একটা সিনেমা বানাই”। রোজী মানা করে দিল, “একই ধরণের মা-ভাবীর চরিত্র আর ভালো লাগে না, আফসারী”। আমি আশ্বাস দিলাম, “এই গল্পটা অন্যরকম। আমার মনে হয় তোমার ভালো লাগবে”। আমি সেদিন প্রথমবারের মতো এই ঘর এই সংসারের একটা দৃশ্য বর্ণনা করতে শুরু করলাম।

দিলীপ কুমারের একটা সিনেমা আমরা একসাথে দেখছিলাম (সিনেমাটার নাম সম্ভবত ‘দুনিয়া’)। সেখানে একটা দৃশ্য ছিলো, দিলীপ কুমারের স্ত্রী অ্যাকসিডেন্ট করেছে, তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। দিলীপ কুমার রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কোন গাড়ি থামছে না। ঐ দৃশ্যটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিলো। আমি বললাম, “আমি তোমাকে নিয়েও এমন একটা দৃশ্য রাখতে চাই, রোজী; যদি তুমি সিনেমাটা করতে রাজি থাকো”। এখানে একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে দেই। আমরা স্বামী-স্ত্রী ঠিকই, কিন্তু কাজের ব্যাপারে আমরা খুব প্রফেশনাল ছিলাম। আমার সিনেমা হলেই সে অভিনয় করবে বা আমি সিনেমা বানালেই ওকে নিব, এমন কোন জবরদস্তি কখনো ছিল না। পেশাদারীত্বের এই শিক্ষাটা আমি রোজীর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।

m22দৃশ্যটা শুনে রোজী রাজী হয়ে গেল আর আমিও লিখতে শুরু করলাম। সিনেমার জন্য গল্প ভাবা কিন্তু খুব একটা কঠিন না, কঠিন হলো চিত্রনাট্য বা স্ক্রীনপ্লে। উপস্থাপনার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। এই সিনেমায় আমি অন্যরকম একটা প্রেম দেখাতে চেয়েছি। সেখানে রোজীকে যুবতী দেখালে একদমই মানাতো না, তাই ওর সাথে বুলবুল আহমেদকে বেছে নিলাম। তাদের প্রেমের গল্পটা এমন, রোজী রোজ অফিসে এসে দেখে তার টাইপরাইটারের উপরে একটা কাগজ রাখা। সেখানে অনেকবার করে একটা মাত্র লাইন লেখা, “মমতা, তুমি আমার ভালোবাসা”। রোজী রোজ এমন কাগজ পেত। একদিন দেখলো কোন কাগজ নেই। কেন! কারণ বুলবুল আহমেদ রান্না করতে গিয়ে তার দুটো আঙুল পুড়ে গিয়েছে। বুলবুল আহমেদের চরিত্রটা একা থাকে। বিয়ে করেনি, আত্মীয়-স্বজনও নেই। তাই তার নিজেরই রান্না করতে হতো। আঙুল পুড়ে যাওয়াও বেচারা আর সেদিন চিঠি লিখতে পারেনি। এভাবে দুজনের ভালোবাসা ও বিয়ে হলো। ওদিকে রোজীর ছোট দুটো ভাই আছে, যাদেরকে মানুষ করতে হবে। তাই বিয়ের পরও দুজনে কোন সন্তান নেয়নি। যেহেতু বুলবুল আহমেদের কোন আত্মীয়-স্বজন নেই, তাই এটা নিয়ে বুলবুল আহমেদের ক্যারেক্টারের উপর কোন প্রেশারও আসবেনা। আমি চরিত্রগুলোকে লজিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

রোজীর চরিত্রটা কিন্তু, বাস্তবের রোজীর উপরেই ভিত্তি করে লেখা। রোজীও এভাবেই তার দুই ভাই আর তিন বোনকে মানুষ করেছে। শুধু এটুকুই জীবন থেকে নেওয়া, বাকি সব চরিত্র কাল্পনিক। যাই হোক, এভাবে গল্পটা লিখে শেষ করলাম। গল্প লিখতে টাকা লাগে না, দুই দিস্তা কাগজ আর একটা বল পয়েন্ট কলম হলেই চলে। কিন্তু সিনেমা বানাতে অনেক টাকা লাগে। আমি মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি, রোজী ফিল্মস থেকে হয়তো ছবিটা বানাতে হবে। প্রি-প্রোডাকশন চলছে, একমাস পরে কাজ শুরু করবো। এমন সময়ে একদিন খলিল ভাই (খলিল উল্লাহ খান) আমার অফিসে এসে হাজির। তিনি আনসার বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। ঐদিন উনি সম্ভবত রিটায়ার করেছিলেন অথবা পেনশনের টাকা পেয়েছিলেন। খলিল ভাই আমাকে পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে বললেন, “টাকাটা রাখেন”। এর কিছুক্ষণ আগে খোকনের (শহীদুল ইসলাম খোকন) কাছ থেকে ফোনে জেনেছিলাম, খলিল ভাই তাকেও পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে এসেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ঘটনা কি! টাকা এভাবে ছিটাচ্ছেন কেন?” জানলাম, খলিল ভাই খোকনকে টাকা দিয়েছেন সাময়িক সময়ের জন্য। ছবি মুক্তির পর খোকন টাকাটা ফেরত দিয়ে দেবে (আমাদের ইন্ডাস্ট্রীতে তখন এই সংস্কৃতিটা ছিল। প্রয়োজনের সময় আমরা একে-অপরের পাশে গিয়ে দাঁড়াতাম)। কিন্তু আমাকে দেবার পেছনে খলিল ভাইয়ের অন্য একটা উদ্দেশ্য আছে। তিনি একটা সিনেমা বানাতে চান। আমি তখন এই ঘর এই সংসারের গল্পটা তাকে শোনালাম। গল্পটা খলিল ভাইয়ের অনেক ভালো লাগলো। ঠিক হলো রোজী ফিল্মস আর খলিল ফিল্মস যৌথভাবে ছবিটা প্রযোজনা করবে। মানুষ ভালোবাসার জন্য সিংহাসন ছাড়ে, কেউবা সিংহাসনে বসে তাজমহল বানায়। আমি ছবি বানাতে শুরু করলাম।

এই সিনেমায় আমি দুই ভাইকে দেখালাম। আলীরাজ একটু সহজ-সরল, বোকা। সর্বোপরি পরিস্থিতির শিকার। এই ছবিতে আসলে নিয়তি ভিলেন। কারণ, আলীরাজ কিন্তু তমালিকাকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছিল। সে সাহায্য না করলে, তমালিকাকে বিয়ে না করলে, আলীরাজের পরিবারে কখনোই এমন দুর্দিন আসতো না। আলীরাজ যদিও নেগেটিভ ক্যারেক্টার বেশি করে, তারপরও ওকে নিলাম। কারণ ক্লাইম্যাক্সের দৃশ্যে আমার ড্রামাটিক অভিনয় দরকার ছিল। যেটা কিনা সে খুব ভালোভাবে ডেলিভার করেছে। আরেকটা কারণ হলো, ওর প্রথম বিখ্যাত চরিত্রটাও একটু বোকাগোছের ছিল। এই চরিত্রে আমি চালাক চেহারার কাউকে নিলে সেটা কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য হতো না।

এই সিনেমায় তমালিকা কর্মকার নেগেটিভ একটা ক্যারেক্টার প্লে করে। তমালিকার ক্যারেক্টার সম্পর্কে আমি কিন্তু একদম প্রথমেই ধারণা দিয়েছি। সিনেমায় দেখা যায়, তমালিকা আর তার মাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাদের থাকার জায়গা নেই, বাধ্য হয়ে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে আছে। সেই পুকুর পাড়ে বসেও কিন্তু তমালিকা সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে- চুল আঁচড়াতে থাকে, পাউডার নেয়। আলীরাজ তমালিকার মাকে সাহায্যস্বরূপ কিছু টাকা দিতে চায়। তমালিকার মা না নিলেও, তমালিকা কিন্তু হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে নেয়। তো গোড়াতেই বুঝিয়ে দিয়েছি এর মানসিকতা কিরকম। এর কাছ থেকে কিন্তু সাবধান থাকতে হবে। এ বিভেদ সৃষ্টি করবে, বোকা বানাবে। ছবি শেষে দেখা যায়, তমালিকাই আসলে সবচে বড় বোকা। কারণ সে আলীরাজের ভালোবাসাটা বুঝতে পারেনি। তাই সে নিজেকে একটা রুমে বন্দী করে ফেলে। ক্যামেরাও তমালিকাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে জানালার শিককে ফোকাস করে, বোঝায় তার বন্দীত্ব (সেল্ফ ইমপ্রিজনমেন্ট) শুরু হয়েছে।

এই সিনেমায় তমালিকা কর্মকার নেগেটিভ একটা ক্যারেক্টার প্লে করে। খেয়াল করবেন, তমালিকার ক্যারেক্টার সম্পর্কে আমি কিন্তু একদম প্রথমেই ধারণা দিয়েছি। সিনেমায় দেখা যায়, তমালিকা আর তার মাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাদের থাকার জায়গা নেই, বাধ্য হয়ে তাই পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে আছে। সেই পুকুর পাড়ে বসেও কিন্তু তমালিকা সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে- চুল আঁচড়াতে থাকে, পাউডার নেয়। আলীরাজ তমালিকার মাকে সাহায্যস্বরূপ কিছু টাকা দিতে চায়। তমালিকার মা না নিলেও, তমালিকা কিন্তু হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে নেয়। গোড়াতেই বুঝিয়ে দিয়েছি, ওর মানসিকতা কিরকম। এর কাছ থেকে কিন্তু সাবধান থাকতে হবে। এ বিভেদ সৃষ্টি করবে, বোকা বানাবে। ছবি শেষে দেখা যায়, তমালিকাই আসলে সবচে বড় বোকা। কারণ সে আলীরাজের ভালোবাসাটা বুঝতে পারেনি। সেজন্য সে নিজেকে একটা রুমে বন্দী করে ফেলে। ক্যামেরাও তখন তমালিকাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে জানালার শিককে ফোকাস করে, বোঝায় তার বন্দীত্ব (সেল্ফ ইমপ্রিজনমেন্ট) শুরু হয়েছে।

তমালিকার সাথে আমার কোন পূর্ব পরিচয় ছিল না। ওকে নিয়েছিলাম কারণ, প্রথমত ও ভালো শিল্পী ছিল। আর তাছাড়া, এই নেগেটিভ চরিত্রটার জন্য আমি নতুন একটা মুখ খুঁজছিলাম। আরো অনেকেই তখন ভ্যাম্পের ক্যারেক্টার করতো। তাদের নিলে আমি খুব সিনেম্যাটিক এক্সপ্রেশন্স পেতাম, কিন্তু আমি রিয়েল কিছু চাচ্ছিলাম। আমার তো মনে হয় এই চরিত্রটায় তমালিকা যতটা ভালোভাবে অভিনয় করেছে, অন্য কেউ এভাবে পারতো না।

m33

সালমানের সাথে হিরোইন হিসেবে নতুন নায়িকা বৃষ্টিকে ইন্ট্রোডিউস করলাম। বৃষ্টির মায়ের সাথে খলিল ভাইয়ের পরিচয় মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে। সেই সূত্রে বৃষ্টিকে দেখলাম। আমার বেশ ভালো লাগলো- স্মার্ট মেয়ে, নাচও জানে। বৃষ্টি তখন কুয়েত এয়ারলাইন্সে এয়ারহোস্টেসের পোস্টে অ্যাপ্লাই করেছে। সিনেমা করা নিয়ে তার মাঝে কিছুটা দোনোমনা কাজ করছিলো। আমি তাকে ফিল্মে একটা চান্স নিয়ে দেখতে বললাম। ছবিটা যখন প্রথম এক-দেড় মাসে ভালো ব্যবসা করলো না, ও তখন কুয়েত এয়ারলাইন্সে জয়েন করে ফেললো। পরে লোকে তাকে খুঁজেছে সিনেমায় নেবার জন্য, কিন্তু ততদিনে এয়ারলাইন্সের সাথে তার কন্ট্রাক্ট সাইন করে হয়ে গিয়েছে। ফলে নায়িকা চরিত্রে অফার পেয়েও, সে আর অভিনয় করতে পারলো না। এটাই ছিল তার প্রথম ও শেষ ছবি।

একটা ভাই আলীরাজকে যেহেতু বোকা দেখালাম, তাই আরেক ভাইকে ভালো দেখাতে হবে। কারণ গল্পে তো নায়কের প্রয়োজন আছে। মানুষকে পজেটিভ দিক, আশার দিকটা দেখতে চায়। সেই আশার দিকটা হলো সালমান শাহ। আমি দুই লক্ষ টাকা (মূল সম্মানীর ফিফটি পার্সেন্ট) সাইনিং মানি দিয়ে সালমানকে ছবিতে নিলাম। দেখতাম, ও সারাক্ষণ চেষ্টা করতো কিভাবে তার শটগুলোকে ইমপ্রুভ করা যায়। নতুন একটা শট নেবার আগে, কিছুটা সময় লাগে লাইট-সেট ঠিক করতে। সালমান শুনে নিত পরের শটটা কি হবে, ও কোথায় দাঁড়াবে। এই দুই শটের মাঝের টাইমটা সে ক্যারেক্টারের মাঝে ডুবে থাকতো। সিনেমায় তো রিহার্সালের চল নেই। তারপরও ও প্রতিটা শটের আগে কো-অ্যাক্টরদের সাথে কথা বলে, সব গুছিয়ে নিত। “ভাবী, আমি কথাটা বলে মাথা নিচু করবো। আপনি কিন্তু তখন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন।”

মানুষ হিসেবে সালমান কেমন ছিলো,  তা বোঝানোর জন্য একটা ঘটনা বলি। সেটা ছিলো শুটিঙের দ্বিতীয় দিন। শুটিং হচ্ছে আমার বোন বাবলীর ঝিগাতলার বাসায়। লাঞ্চ ব্রেক শেষে দেখি বুলবুল m44আহমেদ, রোজী, খলিল ভাই, তন্দ্রা ইসলাম, নাসির খান, তমালিকা, বৃষ্টি সবাই আছে, শুধু সালমান নাই। আমি তো অবাক। আরে, সালমান কোথায়! জানলাম, সালমান নাকি বাসায় ভাত খেতে গিয়েছে। সালমানের বাসা ছিলো বাংলামোটরে, ও আসলো আরো এক ঘণ্টা পর। আমার তো খুবই মেজাজ খারাপ হলো। বললাম, “তুমি আমাকে না বলে গেছো কেন? আজ থেকে শুটিং অফ! তোমাকে বাদ দিয়ে অন্য নায়ক নিয়ে সিনেমাটা বানাবো।” এই বলে আমি ছাদে এসে সিগারেট ধরালাম। আধা ঘণ্টা পরে খলিল ভাই সালমানকে নিয়ে এসে বলছে, “মাফ করে দেন একে”। আমি তাকিয়ে দেখি,  কাঁদতে কাঁদতে সালমানের চোখ দুইটা ফুলে লাল হয়ে গিয়েছে। সালমানের আবার মেক-আপের দরকার পড়তো না। জাস্ট টাওয়েল দিয়ে মুখটা মুছে শট দিয়ে দিত। সালমান কিন্তু অনেক নরম মনের ছেলে ছিল। সেই ছেলে এই আধা ঘণ্টার পুরোটা সময় ধরেই নাকি কেঁদেছে। আমি বললাম, “ধুর মিয়া, আমি তো ছাদে এসেছি সিগারেট খেতে। আর তোমাকে ধমক দিয়েছি ভয় পাওয়ানোর জন্য। আজ তো সেকেন্ড ডে, থার্ড ডে থেকে যাতে তুমি এমন কাজ আর না করো।” বলে, সালমানকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কিন্তু ওর চোখ-মুখ এতটাই ফুলেছিল যে, পরের দুই ঘণ্টার মাঝে আর কোন শট নেওয়া গেল না। আর ওটা ছিল একটা হ্যাপি মুডের সিকোয়েন্স। সেদিন কথা বলে বলে সালমানকে নরমাল করে, তারপর শুটিং শুরু করতে পেরেছিলাম। আমার মনে হলো সালমান শুধু নায়ক না, ও একজন শিল্পী। কারণ সালমান শাহ তখন যে মাপের স্টার ছিলো, ও তখনি ফিল্ম ছেড়ে চলে যেতে পারতো। ওর কিচ্ছু আসতো-যেতো না। ও কিন্তু সেটা করে নাই। সালমান সত্যিকারের শিল্পী ছিল, মনে-প্রাণে।

মুক্তির পর এই ঘর এই সংসার তেমন একটা ব্যবসা করলো না। আমার ছবিটার কাছাকাছি সময়ে আরও কিছু অশ্লীল ছবি মুক্তি পেয়েছিল। এদের ভীড়ে এই ঘর এই সংসার তেমন সুবিধা করতে পারলো না। কারণ আমার ছবিটায় কোন ভালগারিজম নাই, ক্লাইম্যাক্সে গান-ফাইটিং নাই। এটা একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। কিন্তু সালমানের মৃত্যুর পর এটা সবার অ্যাটেনশন পেলো, মানুষ ধীরে ধীরে ছবিটা পছন্দ করতে শুরু করলো। আমার প্রচুর হিট ছবি আছে। কিন্তু মানুষ মালেক আফসারীকে চিনে এই ফ্লপ ছবিটা দিয়ে। ছবিটা আমাকে তেমন একটা টাকা দেয় নাই, কিন্তু মানুষের অগাধ ভালোবাসা দিয়েছে।

আরেকটা কারণে ছবিটা আমার হৃদয়ের অনেক কাছের। ফিল্মটা বানানোর সময় রোজীকে খুব সতেজ দেখেছি। রোজ শুটিং করতো, কাজের মাঝে থাকতো; ওর ভালো লাগতো। অসুস্থতার কারণে রোজী তখন অনেক রোগা হয়ে গিয়েছিল। ও যে অনেকগুলো ওষুধ খায়; এটা জানলে ইন্ডাস্ট্রীতে একটা ব্যাড পাবলিসিটি হতো, ওর ইমেজটা নষ্ট হতো। শিল্পীরা কিন্তু এসব ব্যাপারে অনেক প্রটেক্টিভ। তাই আমি লুকিয়ে মেক-আপ রুমে নিয়ে ওকে ওষুধ খাওয়াতাম। ডাক্তাররা রোজীকে সময় বেঁধে দিয়েছিল সাড়ে তিন থেকে চার বছর। কিন্তু ও বেঁচেছিল আরো অনেক, অনেক দিন। আমার ধারণা, “এই ঘর এই সংসার” রোজীকে নতুন জীবন দিয়েছিল।

 (অনুলিখনঃ স্নিগ্ধ রহমান)

সহপাঠ : আমি আর রোজী

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *