Smiley face

‘কাঁকড়া রেইল’ এর ফিল্মপাড়া

11
ঐতিহ্যবাহী কাকরাইল ফিল্মপাড়া কেন হারাচ্ছে জৌলুশ সেই কারণ খুঁজেছেন সি. এফ. জামান
কাকরাইল ফিল্মপাড়া, নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে অসংখ্য লোকের ভিড়ে গিজগিজ করা একটা এলাকা। যেখানে চায়ের দোকানে জোরে সাউন্ড দিয়ে গান বাজবে, হোটেল-রেস্টুরেন্টে থাকবে বিভিন্ন তারকার আড্ডা, আর প্রযোজকদের অফিসে থাকবে সিনেমাপ্রিয় মানুষের ভিড়। প্রতিদিন শত ব্যস্ততার মাঝে এখানে সিনেমা সম্পৃক্ত মানুষদের একটা মিলনমেলা বসবে, কারণ জীবিকার পাশাপাশি এটা তাঁদের বিনোদনেরও একটা খোরাক। এক সময় বাস্তবেও ঠিক এরকমই ছিল কাকরাইলের এই ফিল্মপাড়া, কিন্তু এখন নেই!
কেন নেই সেটা জানার আগে একটু কাকরাইলের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। ১৮৬৪ সালের ২৫শে মে উপমহাদেশে কয়লার ইঞ্জিন চালিত রেল সার্ভিস চালু হয়। এর পরের বছর পরীক্ষামূলকভাবে এর সাথে একটি বগি ব্যবহার করে একটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হয় যাতে শুধু ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম সারির কর্মকর্তারা চলাফেরা করতেন, এই বগি দেখতে অনেকটা কাঁকড়ার মত ছিল। এই বিশেষ ট্রেনকে স্থানীয় লোকজন কাঁকড়া রেইল বলে ডাকতেন। ১৮৭৪ সালের ২৫শে মে লর্ড ডালহৌসি উপমহাদেশে রেল সার্ভিসের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা গেইট পার করে ঢাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাঁকড়া রেইল করে ঘুরতে যান। কিন্তু রমনার পূর্ব পাশের জঙ্গলে এসে কাঁকড়া রেইলটি বিকল হয়ে যায়। যেহেতু এটি অতিরিক্ত রেললাইন ছিল, সেহেতু কাঁকড়া রেইলটি এই জঙ্গলেই পড়ে থাকে। ধারণা করা হয়, যখন জঙ্গল পরিষ্কার করে এলাকাটি জনগণের ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়; তখন সেই কাঁকড়া রেইলের নাম অনুসারে এলাকাটির নাম কাঁকড়া রেইল রাখা হয়। যা পরবর্তীতে লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে কাকরাইল হয়ে যায়।
222তো এই কাকরাইল এলাকাতেই যে ফিল্মপাড়ার গোড়াপত্তন, তা নয় কিন্তু! যখন ঢাকায় নতুন ঢাকা গড়ে উঠেনি এবং পুরনো ঢাকাও পুরনো হয়ে যায়নি, তখন অনেক ফিল্ম ব্যবসায়ীর অফিস গুলিস্তান এবং এর আশেপাশের এলাকায় ছিল। সর্বপ্রথম খান আতাউর রহমান নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সেভেন আর্টস ইউনাইটেড এর অফিস কাকরাইলে নেন। এরপর ধীরে ধীরে ফিল্মের সাথে জড়িত আরো অনেকে এখানে এসে থিতু হন। আর হবেনই না বা কেন! তখন কাকরাইল ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী সমস্ত হলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হওয়ায়, কাকরাইল ফিল্ম ব্যবসায়ীদের জন্য এক আদর্শ স্থলে পরিণত হয়। বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের সাথে কাকরাইলের সম্পর্ক কোন কালেই অস্বীকার করার যাবেনা। কোনদিন যদি এদেশে ফিল্ম বানানো বন্ধও হয়ে যায়, তবেও “কাকরাইল মোড়”-কে সবাই ফিল্মপাড়া নামেই চিনবে। তাহলে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, কাকরাইল ফিল্মপাড়ার জৌলুশ কমে গেল কিভাবে?
এই অশনির সূচনা সেই ’৯০ দশক থেকে। বাংলা চলচ্চিত্রের অবস্থা তখন রমরমা। যেখানে কলকাতার সিনেমা হলের সংখ্যা ২০০’ও পার হতে পারেনি সেখানে বাংলাদেশের তখন ১২০০’র উপরে হল। রাজ্জাক, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেল, মান্নাদের মত সিনিয়র অভিনেতাদের পাশাপাশি সালমান শাহ, ওমর সানী, অমিত হাসান, নাঈমদের মত তরুণ অভিনেতারা দাপটের সাথে ফিল্মের দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবাই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, কিন্তু তা অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সুস্থ প্রতিযোগিতা। ঠিক সেই সময়েই, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে উত্থান শুরু হয়, যারা স্বাধীনতা বিরোধী পক্ষ হিসেবেই বেশী পরিচিত। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের শোষণের বিরুদ্ধে তৎকালীন বাংলার সংগীত ও সংস্কৃতি, বিশেষ করে ফিল্ম- জনগণের আওয়াজ সোচ্চার করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। নিজেদের মাস্টারপ্ল্যান সচল করতে সেই দল তখন নিজেদের তত্ত্বাবধানে কিছু পিনআপ পত্রিকা প্রকাশ করে, যেগুলোতে জনপ্রিয় নায়িকাদের নগ্ন ছবি থাকার হেডলাইন থাকতো। সুপার ইমপোজ করা সেইসব ছবি দেখে এটাও বুঝা সম্ভব ছিলনা যে, সেগুলো নারীর ছবি না পুরুষের; কিন্তু লোকমুখে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। যে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি একসময় দেশের অন্যতম সম্মানিত ইন্ডাস্ট্রি ছিল, সেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকেই অনেকে বাঁকা চোখে দেখা শুরু করল।
মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে ’৯০ দশকের শেষ দিকে কিছু অসাধু প্রযোজক ও পরিচালক মিলে অশ্লীল দৃশ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করলেন। আগে যেখানে ধর্ষণের দৃশ্য নায়িকার পড়ে যাওয়া ও হাতের চুড়ি ভেঙ্গে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তারা সেই ধর্ষণের দৃশ্যে নিয়ে আসেন অবর্ণনীয় নগ্নতা। পরবর্তীতে সেই বিশেষ দল যখন সরকারের অন্যতম অংশীদার, তখন তাদের চোখের সামনেই সেইসব অসাধু ব্যক্তিবর্গ নগ্নতাকে প্রথমে গানে এবং ধীরে ধীরে পুরো ফিল্মে ঢুকিয়ে দেন। ভদ্র, শিক্ষিত ও গুণী মানুষজন ফিল্ম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। স্বভাবতই: কাকরাইলের সাথেও তাঁদের সম্পর্কে ভাটা পড়ে। যে কাকরাইল একসময় রাজকীয় পরিবেশের অধিকারী ছিল, সেই কাকরাইল পুরো শহরের কাছে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা হিসেবে গণ্য হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত অশ্লীলতা বিরোধী টাস্কফোর্স ফিল্ম থেকে নগ্নতাকে দূর করতে পারলেও, পারেনি কাকরাইলকে তাঁর আগের মর্যাদায় ফিরাতে। সেই গুরুদায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে নিয়ে নেন ফিল্মের মানুষজন, যারা আবার সুস্থ দর্শকদের হলমুখী করতে একের পর এক পদক্ষেপ নিতে থাকেন। কিন্তু ততদিনে এক গুরুতর ক্ষতি সাধন হয়ে গেছে। তা হল ফিল্ম ও টিভির মানুষজনের মধ্যে এক বিশাল বড় বিভেদ। কাকরাইলের রমরমা মৌসুমে এই ফিল্মপাড়া, ফিল্ম ও টিভির মানুষজনের মধ্যে এক যোগসূত্র হিসেবে কাজ করত; যা অশ্লীল চলচ্চিত্রের সময়ে ভেঙ্গে যায়। টিভির মানুষজন ফিল্মকে মিডিয়ার বাইরের বস্তু ভাবতে আরম্ভ করে দেন, আর ফিল্মের মানুষজন টিভিকে তাঁর স্ক্রিনের চেয়েও ছোট ভাবতে থাকেন।
সেই ভাঙ্গনের সময় বেশ কিছু সুবিধাবাদী মানুষ কাকরাইলে একটা বিশেষ জায়গা তৈরি করে নেয়, যাদের সাঙ্গপাঙ্গদের বদৌলতে আজও সেই ভাঙ্গন বিদ্যমান। দুইপক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও ফিল্মের সেই পরিবর্তনটা হচ্ছেনা যা অনেক আগেই হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ’৯০ দশক থেকে ফিল্মের সাথে জড়িত এক বিখ্যাত প্রযোজক বলেন টিভির নির্মাতাদের প্রতি তাঁর আক্ষেপের কথা, “টিভি থেকে যেসব নির্মাতারা ফিল্ম বানাতে আসেন, তাঁদের অনেকেরই এর আগে কোন ফিল্মে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকেনা। এমনকি তারা ফিল্মের লোকদের কাছে মতামত বা উপদেশ কিছুই চান না। ফলাফল দর্শক হলে গিয়ে ফিল্ম দেখতে পায়না, পায় ফিল্মের ফ্রেমে বন্দী এক লম্বা নাটক বা টেলিফিল্ম।” টিভি থেকে আসা এক নির্মাতা আবার গান উলটো সুর, “কাকরাইলের লোকেরা নাকি কোন মতামত বা উপদেশ তো দূরে থাক, সামান্য কথাও নাকি বলতে চান না। বরং ফিল্ম বানিয়ে নিয়ে যাবার পর তারা একের পর এক খুঁত ধরা শুরু করেন, যা অনেক সময়ই অযৌক্তিক হয়। সেইসাথে আরেকটা মানসিকতা কাকরাইলের ফিল্ম ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাজ করে, আর তা হল তাঁরা কাকরাইলের বাইরে কোন ফিল্মের ব্যবসা হতে দিবেন না।” শোনা যায় আরেক টিভি নির্মাতার দৈন্যের কথা। কাকরাইলের সমস্ত নিয়ম কানুন মানা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র কাকরাইলের বাইরে থেকে ছবি পরিবেশনার কাজ করায় যাকে অত্যন্ত বিরূপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
কাকরাইলের প্রতি বিরক্ত আরেক নবাগত প্রযোজক ও পরিচালক, যার মতে কাকরাইলের একটা বিল্ডিং থেকে যতদিন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি পরিচালিত হবে, ততদিন এই দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উন্নতি অসম্ভব। সিনেমা হল থেকে নাকি টাকা নিয়ে গোলমাল শুরু হয়। যা হল প্রতিনিধি হয়ে বুকিং ম্যানেজারের হাত ঘুরে যখন সেই নবাগত পরিচালকের হাতে আসে, তখন তা এতই নগণ্য হয় যে তিনি মুখে বলে প্রকাশ করতে পারেন না। কাকরাইলে অনেকেই সরকারী ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে এদেশে কোন বক্স অফিস প্রতিষ্ঠা করতে দেন নি। ইন্ডাস্ট্রির বাইরের মানুষদের কাকরাইলের লোক মারফত জানতে হয়, কোন ছবি হিট আর কোন ছবি ফ্লপ। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র একটা সুষ্ঠু বক্স অফিস প্রতিষ্ঠা হলে ট্যাক্স দিয়েও যে টাকা প্রযোজকের ঘরে ফিরবে, তা বর্তমান অংকের চেয়ে অনেক বেশী হবে।
সবশেষে ফিরে যেতে হয় সেই কাঁকড়া রেইলের প্রসঙ্গে। কাঁকড়া রেইলটি বিকল হয়ে পড়ে থাকায় এলাকাটির নাম কাকরাইল হয়, সেই কাকরাইল এর কল্যাণেই আজ এই দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এখনও সচল। শুধু টিভি ও ফিল্ম না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাথে ফিল্মের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করার জন্য কাকরাইলের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। কিন্তু সেই সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার এই উন্নত সময়েও, এলাকার বাইরের কাজকর্মের প্রতি কাকরাইলের মানুষজনদের অনীহা দিনশেষে ফিল্মের উন্নতিকেই বাধাগ্রস্ত করছে। এখনই সঠিক সময়, হয় ফিল্মের মানুষদের মাথায় ঢুকে থাকা পুরনো কাঁকড়া রেইলকে ঝেড়ে সরাতে হবে; নয়তো কাঁকড়া রেইলের মতই এই ইন্ডাস্ট্রিও একদিন বিকল হয়ে যাবে। কাকরাইলের সেই জৌলুশও ধীরে ধীরে হয়ে যাবে ইতিহাস!

 

লেখক পরিচিতি:
সি. এফ. জামান চলচ্চিত্র পরিবারের সন্তান, জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পেশায় মার্কেটার, পাশাপাশি প্রকাশনা ও চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফেসবুক মার্কেটার। নেশা চলচ্চিত্র ও আড্ডা। অত্যন্ত বন্ধু ও প্রাণীবৎসল।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com