Smiley face

কোরিয়ান কিলার্স

image003
সাউথ কোরিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সিরিয়াল কিলিং নিয়ে নির্মিত হয়েছে দারুণ সব চলচ্চিত্র। তেমনই কিছু কোরিয়ান সিরিয়াল কিলার মুভির কথা জানাচ্ছেন মিজানুর রহমান অপু।
সাউথ কোরিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তার গল্প ও গল্প বলার ঢঙ্গের কারণেই আর দশটা ইন্ডাস্ট্রি থেকে আলাদা। এখানে সিরিয়াল কিলিং নিয়ে নির্মিত হয়েছে দারুণ সব চলচ্চিত্র। শুরুতেই একটু জেনে নেই, সিরিয়াল কিলার বা ক্রমিক খুনী কাদের বলা হয়? যারা নির্দিষ্ট সময়, সেটা হতে পারে এক মাস, এক সপ্তাহ অথবা এক বছর, পর পর একই প্যাটার্নে সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছায় তিন বা তার অধিক সংখ্যক খুন করে থাকে, তারাই মূলত সিরিয়াল কিলার। এ খুনের পিছনে প্রধানত কাজ করে রাগ, উত্তেজনা, কাম। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ভিক্টিম অর্থাৎ যাদের খুন করা হয়েছে, তাদের সাথে কিলারদের সরাসরি কোন সম্পর্কই থাকেনা এবং খুনের সাথে আর্থিক বা অন্যান্য কোন স্বার্থ জড়িত থাকে না। শুধু মানসিক শান্তির জন্য তারা এমনটা করে থাকে।
কি ভয়ানক, তাই না? হুম, এই ভয়ানক মানুষগুলোর কথা ভাবতেই তো গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠে। আর এইসব মানুষের জীবনকাহিনী নিয়ে যখন সিনেমা তৈরি হয়, তখন একরকম উত্তেজনা কাজ করাটাই স্বাভাবিক। একটা ড্রামাটিক মুভিতে আপনি বোর হয়ে যেতে পারেন, একটি অ্যানিমেশন মুভিতে একঘেয়েমি চলে আসতেই পারে। কিন্তু কোন মুভিতে একই সাথে যদি থাকে সাসপেন্স, থ্রিল আর রহস্যের কম্বিনেশন, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় সেই মুভিটা আপনার আগ্রহ ধরে রাখবেই। একজন কিলার আর ডিটেকটিভের ক্যাট অ্যান্ড মাউজ গেম যখন মুভিতে দ্রুত ঘটতে থাকে, তখন কিন্তু দর্শকের অন্য কিছু ভাবার সুযোগ থাকেনা। সে বিবেচনায় কোরিয়ান সিরিয়াল কিলার মুভিগুলো আদর্শ। নাহ, বানিয়ে বা বেশী বলছি না বরং আপনাকে চ্যালেঞ্জ করছি। কোরিয়ান একটা সিরিয়াল কিলার মুভি নিয়ে বসে দেখুন তো, শেষ না করে উঠতে পারেন কিনা। তবে সব মুভিই যে ভালো হবে তা বলছি না আর তাই উল্লেখযোগ্য কোরিয়ান সিরিয়াল কিলার মুভিগুলো নিয়েই আজকের এই লেখা।
সাউথ কোরিয়ার ইতিহাসে সিরিয়াল কিলিঙের ঘটনাটা খুবই ইন্টারেস্টিং। ১৯২৯ সালে সিউল (সাউথ কোরিয়ার রাজধানী)-এ দুইজনকে হত্যা করার দায়ে এক খুনীকে আটক করা হলেও, প্রমাণের অভাবে তাঁকে ছেড়ে দেয়া। ১৯৭৫ সালে সাউথ কোরিয়ায় প্রথম সিরিয়াল কিলারের দেখা মেলে, যার নাম ডাই-ডু-কিম। কিম ১৭ জনকে হত্যা করেছিল মাত্র দুই মাসে। তার কাপড়ে রক্তের দাগ দেখে লন্ড্রিম্যান সন্দেহবশত পুলিশকে খবর দেয়। এভাবেই কিম ধরা পড়ে এবং তার ফাঁসিও হয়।
সাউথ কোরিয়ার প্রথম সিরিয়াল কিলার

সাউথ কোরিয়ার প্রথম সিরিয়াল কিলার

এছাড়াও গো-জাই-বং, উ-সুন-কিউং, জী-জিওন-পা, ইউ-উয়ং-চুল নামে অসংখ্য কিলারকে সাউথ কোরিয়ায় দেখা গিয়েছে। তবে সবচে বেশী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে কোরিয়ার ইতিহাসে বিখ্যাত Hwaseong Serial Murder Case। হাউসিওং কোন সিরিয়াল কিলারের নাম নয়, সাউথ কোরিয়ার একটি স্থানের নাম। যেখানে একই প্যাটার্নে সেপ্টেম্বর ১৫, ১৯৮৬ থেকে এপ্রিল ৩, ১৯৯১ পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জন নারীকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। ১৪-১৭ বছর নারীদের বেছে নিত কিলার। বেশীরভাগ ভিক্টিমদের মারা হত শ্বাসরুদ্ধ করে, তাদের নিজের কাপড় দিয়েই। কেসটি সল্ভ করতে পুলিশ দুই মিলিয়ন ম্যান-আওয়ার এবং ২১ হাজারেও বেশী মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও খুনিকে চিহ্নিত করতে পারেনি। ঘটনাটি পুরো সাউথ কোরিয়াকে কাঁপিয়ে দেয়, ঘুম হারাম করে দেয় ডিটেকটিভদের। ব্যাপারটি যে সত্যি, ভাবতেও তো অবাক লাগে!
এমনই অবাক করা সব ঘটনার সাক্ষী কোরিয়ার পরিচালকেরা। ২০০৩ সালে বং-জুন হ তৈরি করেন সিরিয়াল কিলার মুভি 'মেমোরিজ অফ মার্ডার' এবং সাড়াও পেলেন প্রচুর। দুইজন অসাধারণ নায়ককে দিয়ে কাজ করালেন কাং-হ-সাং এবং সাং-কিউং-কিম। যারা কোরিয়ান মুভি দেখা শুরু করতে চান, তারা টান টান উত্তেজনাপূর্ণ এই ছবিটি দিয়ে শুরু করতে পারেন। অসাধারণ পরিচালনা, দুর্দান্ত অভিনয় এবং চোখ ধাঁধানো সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে তৈরি 'মেমোরিজ অফ মার্ডার' নিঃসন্দেহে মনে দাগ কেটে থাকবে ।
পরের যে নামটি মনে আসছে, তা হলো  'দ্যা চেজার (২০০৮)'। এটিও সত্যিকারের সিরিয়াল কিলার ইউ-উয়ং-চুল-এর জীবন নিয়ে নির্মিত। ভয়ানক এই সিরিয়াল কিলার পতিতা এবং ধনী ব্যক্তিদের খুন করতো। পরিচালক হং-জিন-না অসাধারণ সাসপেন্স ধরে রেখে মুভিটি তৈরি করেন এবং প্রচুর পুরস্কারও বাগিয়ে নেন। ২০০৮ সালে সাউথ কোরিয়ায় সবচে জনপ্রিয় মুভি হিসাবে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। পরবর্তীতে বলিউডে রিমেক করা হয় মুভিটি মার্ডার টু নামে।  তৃতীয় স্থানে রাখবো পরিচালক সাং-হং-কিমের-এর 'মিসিং' ('সিল-জং, ২০০৯)।' অসাধারণ থ্রিলিং মুভি! শহরের অদূরে ঘুরতে আসা এক জুটির নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিয়ে নির্মিত ছবিটির প্রতিটি সিকোয়েন্স আপনাকে চুম্বকের মত ধরে রাখবে। এরপর ২০১০ সালে মুক্তি পায় 'আই স দ্যা ডেভিল'। যদিও এইটা রিভেঞ্জ মুভি, কিন্তু  হতাশ হবার কোন কারণ নেই। এই ছবিটা ভালো লাগবে। ২০১০ সালে নির্মিত 'মিডনাইট এফএম' ও ২০১১ সালে নির্মিত আরেক ব্লকবাস্টার মুভি 'দ্যা ব্লাইন্ড'-ও দেখতে ভুলবেন না। এগুলো কিন্তু গতানুগতিক মুভি নয়। প্রত্যেকটি মুভির মেকিং অসাধারণ। আর এই মুভিগুলো কোরিয়ান সিনেমা ইতিহাসেও প্রভাব ফেলেছে।
কোরিয়ান সিরিয়াল কিলার মুভির ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। ২০০৩ থেকেই মূলত ভালো মুভিগুলো রিলিজ পেতে শুরু করেছে। কিন্তু এর আগে কি সিরিয়াল কিলার মুভি হতো না? হুম অবশ্যই আছে। যেমন : 'টেল মি সামথিং-১৯৯৯', 'এইচ-২০০২'। কোরিয়ান কিছু সিরিয়াল কিলার মুভি আছে যা খুব বেশী সমাদৃত নয়, কিন্তু দেখার পর মনে হবে সিনেমাটির উপর অবিচার করা হয়েছে। যেমন 'দ্যা ট্রাক (২০০৮)'। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে এই মুভিটির নাম বদলে করা রাখা হয়েছে '২৪ আওয়ার্স টু ডাই'। কেন এমনটি করা হয়েছে, আমার জানা নেই। 'হরর স্টোরিস-২০১২' এবং 'দ্যা গিফটেড হ্যান্ড-২০১৩' দেখলে বোঝা যায়, সাই ফাই হরর বানাতে কোরিয়ান পরিচালকরা কতটা দক্ষ। সত্যি বলতে কি, ভালো কোরিয়ান মুভির অভাব নেই। তবে লেখার টপিকটাই যেহেতু সিরিয়াল কিলার রিলেটেড, তাই এই জেনার থেকেই ভালো মুভিগুলোর সন্ধান দিচ্ছি। 'দ্যা ফাইভ-২০১৩' , 'ম্যানহল-২০১৪' , 'কনফেসন অফ মার্ডার-২০১২' , 'ভয়েস অফ মার্ডার-২০০৭' এবং 'সেভেন ডেইস-২০০৭'-এর মত অসংখ্য থ্রিলিং এবং সাসপেন্স এ ভরা মুভি রয়েছে কোরিয়ানদের দখলে। যদি আগের যুগের ইনভেস্টিগেশনের স্বাদ পাওয়া যাবে 'দ্যা  ব্লাড রেইন- ২০০৫' মুভিটি দেখলে।
সব কথার শেষ কথা থ্রিলার প্রেমীদের জন্য কোরিয়ান মুভি উপরে কিছু নেই।
 
লেখক পরিচিতি:
মিজানুর রহমান অপু পেশায় একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। ভালোবাসেন সব ধরনের সিনেমা দেখতে, তবে পছন্দের জনরা থ্রিলার এবং হরর। ভালো লাগে একটি ভালো মুভির দেখার পর সবাইকে সেটার কথা জানিয়ে দিতে এবং পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকে ফিডব্যাক পেতে।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com