Smiley face

নুসফার জন্য ভালোবাসা

image001
চলচ্চিত্রে আসার পর থেকেই নুসরাত ফারিয়া শিকার হচ্ছেন একের পর এক সমালোচনা ও নেতিবাচক শিরোনামের। এর কতটা তার প্রাপ্য? উত্তর খুঁজেছেন আতাউর রহমান
নুসরাত ফারিয়ার আগমন এমন একটি সময়ে, যখন বাংলাদেশী চলচ্চিত্র প্রবলভাবে ‘নায়িকা’ সংকটে ভুগছে। নুসরাতের আগে-পরে অনেকেই এলেন, আবার চলেও গেলেন। দু’একজন আশার আলো দেখালেও, শেষ পর্যন্ত কিন্তু তা গুড়েবালিই। আর পুরনো নায়িকারা সিনেমা ছেড়ে এখন ঘরকন্নাতেই বেশি মনোযোগী হয়েছেন (নতুনরাও অবশ্য পিছিয়ে নেই)। অথবা প্রিয় নায়কের উপর মান করে নির্বাসনে আছেন। অন্যদিকে সবে মাত্র দু’টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে নুসরাতের। আর তাতেই নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন হালের এই হার্টথ্রব অভিনেত্রী। কারণ, নায়িকা হবার সব গুণাবলীই যে নুসরাতের আছে। সৌন্দর্য তো রয়েছেই সঙ্গে পর্দায় গ্ল্যামারাস উপস্থিতি, অভিনয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা আর স্মার্টনেস- সব মিলিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজের নাম নুসরাত ফারিয়া। মেধা আর যোগ্যতার বিচারেও নুসরাত সমসাময়িক অনেকের চেয়ে বহুলাংশে এগিয়ে থাকবেন।
নুসরাতের পুরো নাম নুসরাত ফারিয়া মাজহার। ফারিয়ার বাবা মাজহারুল ইসলাম এবং মা ফেরদৌসি বেগম। তিন ভাই-বোনের মধ্যে নুসরাত মেজ। বড় বোন মারিয়া এবং ছোট ভাই ফরিদ। শহীদ আনোয়ার থেকে
এসএসসি (এ+) ও রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি (গোল্ডেন এ+) পাস করেন নুসরাত। এরপর ভর্তি হন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি)-এ ব্যবসায় প্রশাসনে।
ফারিয়াকে প্রথম টিভি পর্দায় দেখা যায়, ২০১০ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক’ প্রতিযোগিতায়। সেবার সেরা বক্তার পুরস্কারও জিতে নেন তিনি। ২০১২ সালে আরটিভির কুইজ শো ‘ঠিক বলছেন তো!’ এর মাধ্যমে প্রথম বারের মত উপস্থাপনায় নাম লেখান। একে একে উপস্থাপনা করেন আরটিভির ‘লেট নাইট কফি উইথ নুসরাত ফারিয়া’, এটিএন বাংলার ‘ট্রেন্ড’ এবং চ্যানেল আই এর ‘ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসামঃ দ্য image002আল্টিমেট ম্যান’-এর মত জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলো। তবে ২০১২ সালে এনটিভির ‘থার্টিফাস্ট ধামাকা - কক্সবাজার’ অনুষ্ঠানটি ফারিয়ার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে ধরা দেয়। এসবের ফাঁকে ফাঁকে মডেলিংটাও করতে থাকেন সমান তালে। ফেয়ার এন্ড লাভলি, সিম্ফনি, বাংলালিংক, মি: কুকি সহ এখন পর্যন্ত বিশটিরও বেশি বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছেন তিনি। আরজে হিসেবেও রেডিও ফুর্তির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নাইট শিফট উইথ নুসরাত ফারিয়া’ এর জন্য দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি।
২০১৫ সালের কোরবানি ঈদে জাজ মাল্টিমিডিয়া ও এসকে মুভিজের যৌথ প্রযোজনার ‘আশিকী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিষেক হয় নুসরাত ফারিয়ার। অশোক পাতী ও আব্দুল আজিজ পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে অঙ্কুশ এর বিপরীতে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচক মহলে দারুণ সমাদৃত হয়। এই চলচ্চিত্রের জন্য দর্শক ভোটে মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার ২০১৫ এর সেরা নবাগত এর পুরস্কার ছিনিয়ে নেন নুসরাত। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পায় জাজ-এসকে মুভিজের হিরো ৪২০। ওম এর বিপরীতে এই সিনেমাতেও তার কাজ প্রশংসিত হয়। এবারের রোজার ঈদে মুক্তি পাচ্ছে তার অভিনীত তৃতীয় ছবি ‘বাদশা-দ্য ডন’ সিনেমাটি। সিনেমায় তার বিপরীতে রয়েছেন কলকাতার সুপারস্টার জিত। জাজ-এসকে এর প্রযোজনায় সিনেমাটি পরিচালনা করছেন বাবা জাদব। এছাড়াও শ্যুটিং শুরু করেছেন চতুর্থ সিনেমা ‘প্রেমী ও প্রেমী’-এর। জাকির হোসেন রাজুর পরিচালনায় এই সিনেমায় তার বিপরীতে আছেন আরিফিন শুভ। এটিও জাজ-এসকে মুভিজের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হচ্ছে।
চলচ্চিত্রে নুসরাতের আগমনে বেশ বড়সড় একটা চমকই ছিলো। গত বছর জাজ মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে তাদের চুক্তিবদ্ধ নায়িকা মাহিয়া মাহির সম্পর্কের আকস্মিক অবনতি ঘটার কিছুদিন পর, পাঁচ তারকা হোটেলে এক জাঁকজমক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রযোজনা সংস্থাটি তাদের নতুন নায়িকা হিসেবে নুসরাত ফারিয়া ও জলির নাম ঘোষণা করেন। যদিও, সহসা জাজ-মাহির বাঁধন যাবেনা ছিঁড়ে বলেই সবার ধারণা ছিলো। এভাবেই চলচ্চিত্রে সুযোগ পেয়ে যান নুসরাত।
নুসরাত কিন্তু তখন ক্রেডিট ট্রান্সফার করে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছিলেন, কাগজ-পত্রও রেডি ছিল। কিন্তু অ্যাঙ্কর স্টেপ নামে এক অনুষ্ঠানে তার নাচ ও চ্যানেল আইয়ের একটি লাইভ প্রোগ্রামে তার পারফর্ম্যান্স দেখে, জাজ মাল্টিমিডিয়া থেকে তাকে সিনেমা করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়। গায়িকা কনা তাকে সবসময় নায়িকা বলে ডাকতেন। তাই হয়তো অনেক নাটকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও, সিনেমা করতে রাজি হয়ে যান। আট মাস সময় নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেন।

https://www.youtube.com/watch?v=unWWjaW90Zw

যেহেতু জাজ মাল্টিমিডিয়ার সব সিনেমার নায়িকা ছিলেন মাহিয়া মাহি, তার ভক্তরা ধরে নিলো মাহির বিদায়ের জন্য নুসরাতই দায়ী। অথচ ঘটনা সম্পূর্ণ উল্টো। মাহির সাথে সম্পর্কের ক্রমাগত অবনতির সূত্র ধরেই জলি ও নুসরাতের জাজের ব্যানারে আগমন। ফলস্বরূপ মাহি ভক্তদের রোষের শিকার হলেন নুসরাত। তার সাথে যোগ দিলো আরো দুটি গ্রুপ, যারা কিনা জাজ ও যৌথ প্রযোজনার বিপক্ষে। তাই পূর্বাপর কোন অপরাধ ছাড়াই, নুসরাত ফারিয়াকে তিনটি গ্রুপের আক্রমণের তীর সহ্য করতে হচ্ছে।
এর সাথে যোগ হলো আরেকটি গ্রুপ। এমনিতেই মিডিয়াতে যারা কাজ করে, তাদের গালি দিয়ে সবাই আমোদ পায়। তার উপর বাংলা সিনেমা করলে তো সরাসরি পাঞ্চিং ব্যাগ হিসেবে তাকে ব্যবহার করা যায়। এরপর সেimage003 যদি হয় নারী এবং সুন্দরী! আর যাবে কোথায়। চালাও বাক্যবাণ! যার প্রমাণ নুসরাতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অফিসিয়াল পেজে গেলই পাওয়া যায়। তবে, নুসরাতের আহ্লাদী ভিডিও বা জাজ মাল্টিমিডিয়াকে (Jaaz Multimedia) ঢং করে জ্যাজ (Jazz) মাল্টিমিডিয়া বলাটা যে বিরক্তির জন্ম দেয় না, এমনটা বললে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু সেলেব্রিটিরা তো বরাবরই ড্রামা কুইন ধাঁচের।
নুসরাত ফারিয়া প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন, টিভির জনপ্রিয়তা বেশি ও ফলোয়ার বিষয়ক মন্তব্য করে। পুরো ইন্ডাস্ট্রীই তখন অনলাইনে-অফলাইনে ফারিয়াকে হুইল ওয়াশিং পাউডার দিয়ে ধুতে থাকেন। নিঃসন্দেহে খুবই বেফাঁস মন্তব্য আর ফারিয়া পরে এর জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন। ঐ মন্তব্যর বাস্তবতা বা যৌক্তিকতা বিচারে যাব না। অনেক নায়িকাই কিন্তু সাংবাদিকদের সাথে দুর্ব্যবহার থেকে শুরু করে আরো অনেক আপত্তিকর আচরণ করেছেন। হঠাৎ করে সকলের নয়নের আলো বনে যাওয়া "অগ্নিকন্যা"ও এই লিস্টে আছেন।
বলতে পারেন, সেসব ঘটেছে দেশের অভ্যন্তরে। আর এখানে তো অন্যদেশের মিডিয়ার সামনে বাংলাদেশকে "হেয়" করেছে সে। সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, বছরখানেক আগে বাংলাদেশের এক ব্যান্ড তারকাও কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার কাছে নিজের মাদক ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছিলেন। তখন কারও সম্মান খোয়া যায়নি আর তাকেও সবাই একহাত দেখেনি। সবচে বড় ব্যাপার, মিডিয়ার কাজই খবর বেচা। জীবিকার তাগিদে সাংবাদিকরা অনেক সময়ই স্বাভাবিক কথাকেও পেঁচিয়ে বিপণনযোগ্য করে তোলেন। আর নেতিবাচক সংবাদ যে বেশি বিকোয়, সেটা তো সর্বজনবিদিত। এই অপরাধে সদ্য নায়িকা হওয়া এক মেয়েকে সবাই যেভাবে শূলে চড়ালো, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
আর হিরো ৪২০-এ নুসরাত যখন বলিউডের রিয়া সেনের সাথে পাল্লা দিয়ে নাচে বা অভিনয় করে, তখন তো কাউকে একটা প্রশংসার কথাও বলতে শোনা যায় না। ভদ্রতার খাতিরে এখানে পাল্লা দিয়ে বললাম, আসলে image005সেখানে রিয়া সেনের চেয়ে সব দিক থেকে নুসরাত ফারিয়ার কাজ বেটার ছিল (হতে পারে এটা আমার বায়াসড বাংলাদেশী চোখের সীমাবদ্ধতা)। হিরো ৪২০-এর প্রমোশনের সময় রিয়া সেন পদে পদে কিভাবে বাধার জন্ম দিয়েছেন, সে কথা নুসরাত নিজেই প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন। সে বেচারী কলকাতায় তো লড়াই করছেই, বাংলাদেশের অবস্থা আরো খারাপ। আমরা নিজেরাই চেষ্টা করছি তাকে টেনে নামানোর।
নুসরাত ফারিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটা শোনা যায়, তা হলো তিনি শুধু যৌথ প্রযোজনার সিনেমা করেন। এখানে একটি ব্যাপার বলে রাখি, নুসরাতের শুরুটা কিন্তু খাঁটি বাংলাদেশী ছবি দিয়েই হতো। রেদওয়ান রনি'র মরীচিকা নামের একটি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি কন্ট্রাক্টও সাইন করেছিলেন। যদিও ছবিটা আর শেষ পর্যন্ত হয়নি।
প্রথমত নুসরাত ফারিয়া অভিনেত্রী, প্রযোজক নন। সুতরাং প্রযোজক কার সাথে অংশীদারিত্বে যাবে, এটা কিছুতেই নুসরাত ফারিয়া ঠিক করে দিতে পারেন না। আর তিনি জাজ মাল্টিমিডিয়ার সাথে চুক্তিবদ্ধ। জাজ বর্তমানে যৌথ প্রযোজনা ব্যতীত কোন সিনেমাই বানাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, নুসরাত যখন অভিনয় শুরু করেছেন, তখন থেকে যৌথ প্রযোজনারও এক প্রকার জোয়ার শুরু হয়েছে। আর একসময় যৌথ প্রযোজনার জলে "নাববো না, নাববো না" ঘোষণা দিয়েও, এখন তো সবাই সেই জলেই "চান" করে আসছেন।
তারপরও সমালোচকরা থেমে নেই। কিন্তু নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে তরতর করেই এগিয়ে যাচ্ছেন নুসরাত। সন্দেহ নেই তাকে এখনও পাড়ি দিতে হবে বহুটা পথ। শিখতে হবে অনেক কিছু, হতে হবে আরো পরিপক্ব। কিন্তু এই স্বল্প উপস্থিতিতেই রুপালি পর্দার প্রতি তার ডেডিকেশান জানান দিচ্ছে ঢালিউড রাজত্ব করতেই এসেছেন তিনি। তাই নিন্দুকেরা মেনে নিক বা না নিক, নুসরাতের আবির্ভাব দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বিশুষ্ক সাহারায় এক ফোঁটা জলের মতই প্রশান্তির বার্তা দিচ্ছে। প্রিয় নুসফার জন্য রইলো ভালোবাসা।
 
 

 

লেখক পরিচিতিঃ
আতাউর রহমান, চলচ্চিত্রকর্মী

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com