Smiley face

Owl and the Sparrow – গ্রীষ্মের মাঝে কোকিলের ডাক

image002 (1)

 

ভিয়েতনামীজ চলচ্চিত্র Owl and the Sparrow নিয়ে লিখেছেন খালেদ ইমাম সৌরভ
সমাজ জিনিসটা বড় বিচিত্র। সবাইকে নিয়ে বসবাস করাই সমাজের মূল কাজ হলেও, যুগ যুগ ধরে সমাজ নিজেই তার অবকাঠামোতে বিভিন্ন স্তরের সৃষ্টি করেছে। সমাজের মানুষরাই এক থাকার নাম করে নানাভাবে ফালি ফালি করে কেটেছেন সমাজের স্তর। একেক স্তরে বসবাস একেক রকমের মানুষের। সবাই একসাথে থাকার অভিনয় করলেও, কোথায় যেন একটা দূরত্ব সবসময়ই থেকে যায়। এক স্তরের মানুষের অন্য স্তরে পাওয়া সুবিধা ভোগ করা যেন পাপের কাজ। কিন্তু কিছু মানুষ ভাংতে চায় এই বৃত্ত। বেড়িয়ে এসে স্বাদ নিতে চায় সমস্ত কিছুর।
 
সমাজে মাঝের স্তরে যারা অবস্থান করে, তাদের চেয়ে অভাগা মনে হয় কেউ নেই। তারা না পারে উঁচুদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে, না পারে নিচুদের সাথে খাপ খাওয়াতে। কথায় আছে, মধ্যবিত্তদের একমাত্র সম্বল তাদের সম্মান। উচ্চবিত্তদের মত টাকাও নেই, নিম্নবিত্তদের মত লজ্জাহীনতাও নেই। সম্মান হারাবার ভয়ে তটস্থ image001মধ্যবিত্তরা সারাজীবন জীবনসংগ্রামে ঝুঝতে থাকে। owl and sparrow এই মাঝের স্তরে থাকা মানুষদের মুভি। তাদের দুঃখ, বেদনা, হাসি, কান্না, বৃত্তের বাইরে বেড়িয়ে আসার জন্য সংগ্রাম, সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, প্রেম, কি নেই মুভিতে? সব কিছু মিলিয়ে এ যেন আমাদের কথা বলাই এক আয়না, যার এপাশে দাঁড়িয়ে খুব সহজেই খুঁজে নেয়া যায় ওপাশে থাকা নিজের প্রতিচ্ছবিকে।
 
owl and sparrow ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া একটি ভিয়েতনামী চলচ্চিত্র। পরিচালক Stephane Gauger এর প্রথম মুভি এটি। প্রথম মুভি হিসেবেই বেশ ভালো মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি। এতে অভিনয় করেছে Cat Ly, Le The Lu, Pham Gia Han প্রমুখ। পরিচালকের প্রথম মুভি হলেও প্রাপ্ত পুরষ্কারের সংখ্যা একেবারে কম নয়। ভিয়েতনামের সেবারের সেরা মুভি, সেরা পরিচালক আর সেরা ডেব্যুটেন্ট অভিনেত্রীর এর পুরস্কার জিতে নেয় মুভিটি।
 
মুভির গল্প দশ বছর বয়সী ছোট্ট মেয়ে Thuy-কে নিয়ে। আরো স্পেসিফিক্যালি বললে, তার জীবনের ঘটনাবহুল মাত্র ৫ দিনকে কেন্দ্র করে। সে কাজ করে তার আংকেলের ফ্যাক্টরিতে। বাবা-মা নেই তার। অল্প বিস্তর পড়াশুনা, অনেকটা কাজ আর সারাদিন আংকেলের ঝাড়ি; এই নিয়ে কাটছিল তার জীবন। খাঁচায় বন্দী এ পাখিটি মুক্তির আশায় পালিয়ে চলে আসে সায়গন শহরে। সাধারণভাবে এইটুকু বয়সের ছেলেমেয়ে একাকী যে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, সে সমস্যাই শুরু হয় তার জীবনে। থাকার যায়গা নেই, টাকা নেই, খাবার নেই। এর মাঝেও জীবন সংগ্রামে লড়াই করা মানুষগুলির ভালো দিকগুলির সাথে পরিচিত হতে থাকে সে। পোস্ট কার্ড আর ফুল বিক্রি করার কাজ শুরু করে। এর মাঝেই Lan নামের এক এয়ার-হোস্টেজের নজর পড়ে তার উপর। Lan তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। ঘটনাক্রমে পরদিন চিড়িয়াখানায় আরেক জীবন সংগ্রামে পোড় খাওয়া ভালো ব্যক্তির (Hai) সাথে পরিচয় হয় Thuy-র। Thuy এই দুজনকেই খুব সহজে আপন করে নেয়। দুজনের মিল দেখে তাদের দেখা করাবার প্রয়োজন অনুভব করে Thuy। টিকে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকা এই মানুষগুলির ভাগ্যে কি ঘটবে? অল্প কয়েকদিনের অকস্মাৎ ঘটনা তাদের জীবনকে পারবে বদলে দিতে? Thuy-র ভাগ্যেই বা কি ঘটবে? জানার জন্য মুভিটি শেষ করতে হবে সবাইকে। আমন্ত্রণ রইল।
 
এ ধরণের মুভিতে যা দেখা যায়, পরিচালকেরা কঠিন বাস্তবতাকেই মূল কেন্দ্র করে মুভি তৈরি করে। কিন্তু এই মুভিতে পরিচালক Stephane কঠিন বাস্তবতার সাথে মিশে থাকা ছোট্ট ছোট্ট সুখের সব অনুভূতিগুলিকে খুব যত্ন নিয়ে তৈরি করেছেন। এত শক্ত পরিবেশেও হালকা সুখের অনুভূতি তাই সবসময় সাথী হয়েই থাকে। Stephane আমেরিকা প্রবাসী, তবু তার মাতৃভূমি দর্শন দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায়না। সব মিলিয়ে ছোট্ট ১০ বছরের বাচ্চার চোখে দেখা খুব বাহুল্যতা বিবর্জিত একটি মুভি।
 
পরিচালক নিজে সিনেমাটোগ্রাফিতেও ছিলেন। অনেক অনেক ক্লোজ শট দেখা যায় মুভিতে। ধ্যান তাই সবসময় চরিত্রের মাঝেই থাকে। স্ট্যান্ড ব্যবহার না করে হাতের ক্যামেরাতে দৃশ্য ধারণ করাও এই মুভির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এতে করে ঘটনাগুলিকে নিজের চোখের সামনে ঘটতে থাকা বলে মনে হয়। সায়গন শহরটাকেই বলা হয় City of Lost Children। সেখানে এমন একটা চরিত্র ফুটিয়ে তোলার পিছনে অভিনয়ের সাথে সাথে image003 (1)পরিচালকও বাহবা পাবার যোগ্য। বয়সে ছোট কিন্তু মানসিকভাবে পরিপক্ব একজোড়া চোখ দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন শহরের কানাগলি, ঘুপচিতে লুকিয়ে থাকা জীবন। এই শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যাওয়া যায় এই মুভি দিয়ে, সহজেই।
 
মুভিতে অভিনয় সবাই ভালই করেছে। কিন্তু বিশেষভাবে নজর কাড়বে ১০ বছরের মেয়ে Thuy এর চরিত্রে অভিনয় করা Han। সে যেন একাই মুভির চালিকাশক্তি। অল্প বয়সে বাস্তবের কষাঘাতে আবেগ হারিয়ে ফেলা একটি চেহারা। খাবারের অভাবে থাকার যায়গায় অভাব হয়ত তার চেহারাতে আবেগের কোনও ছাপ ফেলে না। কিন্তু তার ভিতরের সত্তা তখনও যে ভালবাসার কাঙাল তা এক নজর দেখেই বলে দেয়া যায়। ক্যামেরার সামনে অকুতোভয় চরিত্রের চোখে সারাক্ষণ একটি পরিবারের খোঁজ। সে যেন মিথের সেই কিউপিড। ভালোবাসার মায়া মাখানো তীর নিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে আসল মানুষটিকে। যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনও দেবতা। কিছু মানুষের বলতে না পারা দুঃখ ঘুচানোই তার কাজ।
 
Owl and Sparrow আবেগের মুভি, কঠিন বাস্তবতার মুভি। কিন্তু একই সাথে আশা সঞ্চারণ করার মত মুভি। শহুরে জীবনের বলতে না পারা কষ্ট আর ছোট ছোট প্রাপ্তির কথা কোন মুভি এত ভালো করে বলতে পারে? প্রতিনিয়ত চলতে থাকা সকল জটিলতার কষাঘাতের দাবদাহের মাঝে Owl and Sparrow হালকা সুখের পরশ জোগানো এক পশলা বৃষ্টি।
 
 

 

লেখক পরিচিতি :
 খালেদ ইমাম সৌরভ পেশায় এখনো ছাত্র (দেশের সবচেয়ে বড় কাজের শাখা)। ভালোলাগা বিষয়ের শেষ নেই। সিনেমা, নাটক, টুকটাক অভিনয়, খেলা, ভিডিও গেমস, অ্যানিমেই, বই, কমিক্স, টেকনোলজি সব বিষয়েই সমান আগ্রহ। ভালবাসেন ভালোলাগার বিষয়গুলি নিয়ে থাকতে আর সেগুলি নিয়েই কথা বলতে, লিখতে। চেনা এসব জগতের বাইরে অনেকটাই অচেনা সৌরভ ।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com