Smiley face

রেখা : দি বলিউড ডিভা

rekha3
মারজিয়া প্রভা
 
“মুম্বাই ছিল আমার কাছে একটা জঙ্গলের মতন! চারপাশে থাকত হিংস্র বাঘ-ভাল্লুকের মত কিছু মানুষ, তারা ছিল সুযোগসন্ধানী। আমাকে গ্রাস করতে চাইত। আমি নিজে কেবল ভাবতাম, কি করছি আমি! আমার তো স্কুলে থাকার কথা এখন! বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবার কথা, আইসক্রিম খাওয়ার কথা! অথচ আমাকে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি খাবার খেতে হচ্ছে শরীর ঠিক রাখার জন্য! আমাকে সুন্দর দেখানোর জন্য একগাদা গয়না, পোশাক পরান হচ্ছে। এক স্টুডিও থেকে আরেক স্টুডিও দৌড়ে যাচ্ছি কেবল!!! ১৩ বছর বালিকার জন্য এর চাইতে ভয়াবহ জীবন কি হতে পারে?”
১৩ বছরের কথা বলছি কেন! জন্ম থেকেই কি জীবনের ভয়াবহতা দেখেননি তিনি? rekha1ভানুরেখা গনশেন জন্মেছিলেন জনপ্রিয় তামিল অভিনেতা জেমিনি গনশেন এবং তেলেগু অভিনেত্রী পুস্পাভ্যাল্লীর ঘরে। জেমিনি আর পুস্পা পরস্পরকে বিয়ে করেননি কোনদিন।
গেমেনির ছিল বিশাল নারীপ্রীতির ইতিহাস। মাত্র ১৯ বয়সে বিয়ে করেন অ্যালামেলুকে। অ্যালামেলুই জেমিনির একমাত্র ‘বিয়ে করা বউ”, যার ঘরে জন্মেছিল চারজন কন্যা। বিয়ের পর তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল পুস্পাভ্যাল্লী এবং সাবিত্রীর সঙ্গে। পুস্পাভ্যাল্লীর সঙ্গে জন্ম হয় ভানুরেখা আর রাধার। সাবিত্রীর সঙ্গেও জন্ম নেয় দুই কন্যা আর এক পুত্র! ৭৮ বছর বয়সে গিয়ে আবার বিয়ে করেন গেমেনি ৩৬ বছরের জুলিয়ানাকে। এত নারীর সঙ্গে সম্পর্কগুলো খুব চুপিসারে রাখতেই ভালোবাসতেন তিনি। তাই ভানুরেখা গনশেন জন্ম নিলে অস্বীকার করেন তাকে। ১৩ বছরে নয়, জন্মের পরেই বিশাল ধাক্কা পেল ভানুরেখার ছোট্ট জীবনটা।
বিনুনি ঝুলিয়ে স্কুলে যেতেন। চেন্নাইয়ের চার্চ পার্ক কনভেন্টে পড়তেন। নামী স্কুল। কিন্তু পড়া বেশীদিন সইল না। পরিবারের আর্থিক অবস্থার জন্য, মা আর বোনের দিকে তাকিয়েই অল্প বয়সে ভানুরেখাকে নামিয়ে দেওয়া হল বলিউডের কঠিন রাস্তায়! যে রাস্তায় তিনি হারিয়ে যেতেই পারতেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে কানাড়া মুভি “অপারেশন জ্যাকপট নেইল” এ নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন। আর এভাবেই সিনেমায় আসেন বলিউড ডিভা রেখা।
১৯৬৯ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বলিউডে যাত্রা শুরু হয় রেখার। ‘আনজানা সফর’ নামে একটি মুভিতে অভিনয় করেন রেখা। এই মুভিতেই অনস্ক্রিন প্রথম চুমু খায় বাঙালি অভিনেতা বিশ্বজিতকে। এই চুমুর ছবিটা ক্যাপচার করে কিছু ম্যাগাজিনে ছাপিয়ে দেওয়া হয়! যা হল আর কি! এই সময়ে চুমু টুমু নিয়ে যে কথা হয়! ঐ সময় একটা নিস্পাপ চুমু সিনের জন্য সিনেমাটি সেন্সর বোর্ডে আটকে গেল। কিন্তু তারপরও কাহিনী রয়ে যায়! বলছি সে কথা!
ভাষাটাই ছিল রেখার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। শুরু হল হিন্দি শেখা। এরপরই রেখা rekha 2উপহার দিতে থাকেন কিছু ব্যবসাসফল কমার্শিয়াল ছবি। রামপুর কা লক্ষণ, প্রাণ যায়ে পার ভাচান না যায়ে, কাহানি কিসমত কি। তবে সমস্যা থেকে গেল! বলিউড ইন্ডাস্ট্রি তাজ্জব হয়ে দেখতে লাগল “ Ugly Ducking” ফেস নিয়ে কি করে সিনেমায় নাম করে মেয়ে? রেখার নিজে কষ্ট লাগত অনেক, যখন তাকে সবার সামনে আর দশটা হিরোইনের সঙ্গে তুলনা করে বোঝান হত “সে আসলে কিছুই না”।
বিচ্ছিরি খাওয়া আর ব্যায়ামের সঙ্গে নিজের জীবনকে মানিয়ে নিল রেখা। আর তারপর উপহার দিল এক আশ্চর্য ফিগার আর রুপ! যে রুপের সন্ধানে আজও কত যুবক ডুব দেয় অরুপরতনে! যে রুপের এক ফোটা পেলেই বর্তে যায় তরুণীরা!
রেখার সিনেমা জীবন আর ব্যাক্তিজীবন- এই দুই জীবনের ব্রেকথ্রুই অমিতাভের সঙ্গে “দো আনজানে” সিনেমায় অভিনয়।  একে একে এই জুটি উপহার দেয় সুহাগ, মুকাদ্দার কি সিকান্দার, রাম বলরাম, নটবর নটলাল এর মত জনপ্রিয় ছবি। তাদের লিপে ডুয়েট গান মানেই এক একটা ইতিহাস!
 
রেখা প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মুখ দেখেন অভিনয় জীবনের নয় বছর পর। ১৯৭৮ সালে “ঘর” ছবিতে এক ধর্ষিত গৃহবধূর চরিত্রে। সেই প্রথম গ্ল্যামার অভিনয়ের বাইরে গিয়ে রেখা প্রমাণ করলেন নিজের অভিনয়সত্তাকে।
রেখা অভিমান করে একবার বলেছিলেন, “সব মুভিতেই আমি নিজেকে ঢেলে দিতে চাই! কিন্তু যখন আমি ‘খুবসুরুত’ করি লোকে বলে আমি ফিরে এসেছি, ‘সিলসিলা’ করি তখনও বলে আমি ফিরে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি ‘উমরাও জান’ এর সময়! কিন্তু কথা হল আমি গিয়েছিটা কবে?”
রেখা অমিতাভের শেষ ছবি ছিল ‘সিলসিলা’। রেখা-অমিতাভ-জয়ার বাস্তব ট্রায়াংগাল সম্পর্ককে পর্দায় এনেছিলেন যশ চোপড়া। ততদিনে চারদিকে চাউর হয়ে গিয়েছিল রেখার বাংলোতে অমিতাভের যাওয়া কিংবা রেখার জন্য সহকর্মীর গায়ে হাত তোলার গল্প। কিন্তু তবুও এই সিনেমার সময় জয়া রেখাকে ডাকেন বাড়ির দাওয়াতে। দাওয়াত শেষে যাবার সময় রেখাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন জয়া, “অমিতাভকে ছাড়ছেন না তিনি”।
এভাবেই সিলসিলা ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় ছবির শুটিংয়ের সাথে সাথেই। কিন্তু সিনেমায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত রোমান্টিক সিনগুলা দেখে কেউ ভাবতেই পারছিল না, “এই সম্পর্ক আর থাকছে না”। আদতেই যোগ্য অভিনেত্রীর আচরণই করেছিলেন রেখা। তাই আজও স্পষ্ট করে অমিতাভের সঙ্গে তার প্রেমের গল্প বলেন না। অমিতাভকে বরাবর “শুভাকাঙ্ক্ষী” বলেই পরিচয় দিয়ে এসেছেন।
অমিতাভ ছাড়াও বিটাউন মুখর থাকত জিতেন্দ্র, কিরণ কুমার, বিনোদ মেহরার সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্প নিয়ে। এমনকি বিনোদ মেহরাকে তিনি বিয়ে করেছেন এমন কথাও চাউড় হয়েছিল সেইসময়। বহু পরে সিমি গারওয়ালের এক অনুষ্ঠানে উড়িয়ে দেন সেই কথা।
rekhahyubby2১৯৯০ সালে বিয়ে করেন ব্যবসায়ী মুকেশ আগারওয়ালকে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মুকেশ সুইসাইড করেন। এরপর আর বিয়ে করেননি রেখা। তবে প্রায় অনুষ্ঠানে সিঁদুর পরে যান! সে কি কেবলই ফ্যাশন? এক অনুষ্ঠানে তিনি স্বীকার করেন, ‘তার দুইবার বিয়ে হয়েছে। সেকেন্ড হাজব্যান্ড মুকেশ”। তাহলে প্রথমজন কে? না চাইতেও আঙ্গুল চলে যায় অমিতাভের দিকে। তবে সে গল্পের আর গুজবের কখনই শেষ নেই।
রেখার ভীষণ নামডাক হবার পর, বাবা জেমিনি পিতৃপরিচয় দিতে এসেছিলেন। রেখা প্রত্যাখ্যান করে তার স্বীকৃতি। শুধু তাই নয়। যে চুমু খাওয়ার অপরাধে আটকে গিয়েছিল প্রথম সিনেমা, সেই সিনেমাও “দো শিকারি” নাম দিয়ে বের হয় ১৯৭৮ সালে। একেই বলে “তেলের মাথায় তেল দেওয়া”।
এসবে রেখার কিছুই যায়ে আসে না। নিজের আনন্দে কাজ করে গিয়েছেন তিনি। উমরাও জান ছবিতে অভিনয় করে অর্জন করেছেন জাতীয় পুরস্কার। পেয়েছেন পদ্মশ্রীও।
এত বয়সেও দিব্যি অভিনয় করে যাচ্ছেন। অভিনয় ছাড়া তিনি থাকতেই পারবেন না। এই বয়সেও তার রুপের কমতি ঘটে নি এতটুকু।
বলিউডের মাসলা দুনিয়ার গসিপ হলেও, রেখার জীবন থেকে পাওয়া যায় এক সংগ্রামী নারীর গল্প। মেয়েদের জন্য শ্বাপদসংকুল কদর্যতায় ভরা বলিউডে একাই উড়িয়েছেন জয়ের কেতন। আজ এত নায়িকার ভীড়েও, রূপে-গুণে-অভিনয়ে রেখার সমকক্ষ কারো দেখা পাওয়া যায় না। বলিউডে রেখা যে একজনই!
তথ্যসুত্রঃ উইকিপিডিয়া, আই লাভ ইন্ডিয়া ডটকম, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এইটএটি ডটকম
 
 
 
লেখক পরিচিতি :
অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙে পড়াশুনা করলেও, মারজিয়া প্রভা লেখালিখিকে ভালবেসে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতাকে। বর্তমানে ক্রিয়েটিভ রাইটার হিসেবে জড়িত রয়েছেন অনলাইন পোর্টাল Bdyouth.com এর সঙ্গে। এছাড়া প্রতিষ্ঠা করেছেন Feminismbangla.com নামক নিজস্ব ব্লগ। প্রচুর বই পড়া, মুভি দেখা আর নারী উন্নয়ন ও মুক্তি নিয়ে কাজ করা তার প্যাশন। পছন্দের মুভিঃ  নায়ক, হারানো সুর, জীবন থেকে নেয়া, অশনি সংকেত, মেঘে ঢাকা তারা, The Shwshank Redemption, One flew over the cuckoo’s nest। প্রিয় পরিচালকদের মাঝে আছেন জহির রায়হান, ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, অপর্না সেন, কল্পনা লাজমি, অজয় কর, আলমগির কবির ও মোরশেদুল ইসলাম।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com