Smiley face

ইতালিয়ান নিওরিয়্যালিজমের জনক রবার্তো রোজেলিনি

image001
ইতালিয়ান মাস্টার ফিল্মমেকার রবার্তো রোজেলিনির জীবন, প্রেম ও কর্ম নিয়ে লিখেছেন সান্তা রিকি
 
“I try to capture reality, nothing else.”
--- Roberto Rossellini
রবার্তো রোজেলিনির জন্ম হয়েছিল ইতালির রোমে। রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেয়া এই মানুষটির পিতা অ্যাঞ্জেলো গিউসিপ্পে বেপ্পিন্নো রোজেলিনি ছিলেন কন্সট্রাকশন ফার্মের মালিক আর মা এলেট্রা গৃহিণী। রোজেলিনির বাবা রোমে প্রথম থিয়েটার বানিয়েছিল, যার নাম ছিল “বারবেনি”। সেখানে সিনেমা দেখানো হতো এবং এভাবেই খুব অল্প বয়সেই সিনেমার দর্শক হিসেবে অভিষেক হয়েছিল রবার্তোর। তার বাবা এবং এই থিয়েটারের কল্যাণে মুভি ইন্ডাস্ট্রির অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রোজেলিনির। ১৯৩২ সালে বাবার মৃত্যুর পরে, রোজেলিনি মাত্র ২৬ বছর বয়সে রুপালী পৃথিবীকে নিজের জীবিকার জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
 
রবার্তো ফিল্মে সাউন্ডমেকার হিসেবেই কাজ শুরু করে । ভিন্ন ভিন্ন ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে বাস্তব ইফেক্ট আনতো সে। ১৯৭৩ সালে এক সাক্ষাতকারে নিজের পূর্ব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ব্যক্ত করতে গিয়ে রবার্তো বলেছিল, “যেমন ধরুন, মুচড়ে থাকা খবরের কাগজ দিয়ে দরজায় আঘাত করলে সাগরের ইফেক্ট যে খুব সুন্দরভাবে তৈরি হয়, সে বিষয়টি একদিন হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেছিলাম আমি।” একটি সিনেমা তৈরিতে যেসব নিজস্ব দক্ষতার প্রয়োজন হয়, সেসব কাজ সে নিজ দক্ষতায় শিখে নিয়েছিল। যেমন স্ক্রিন এডিটিং, ডাবিং এবং সেট ডিজাইনিং। এসব সঞ্চয়কৃত অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৩৭ সালে রোজেলিনি নিজের প্রথম ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিল, যার নাম ছিল ‘প্রিলুড অ্যা ল্যাপ্রিস মিডি ডান ফন’। প্রাণীদের উপরে নির্মিত এই ডকুমেন্টারি নিয়ে এক সাক্ষাতকারে
রবার্তো বলেছিল, “আমি ডকুমেন্টারি বানাতে ভীষণভাবে ভালোবাসতাম। সবসময়েই ডকুমেন্টারি তৈরি করার image002জন্য একটা ঝোঁক কাজ করত আমার। তবে তা মোটেও ভাসাভাসা ভাবে নয় বরং গবেষণা হিসেবে”। এরপরে আরও দুইটি ডকুমেন্টারি বানিয়েছিল সে, ‘ইল রাসসেল্লো ডি রিপাসোট্টিলে’ এবং ‘ফ্যান্টাস্টিয়া সট্টোমারিনা’।
 
এরপর, গফ্রেডো অ্যালেসান্ড্রিনির সহযোগী হিসেবে ডাক পড়েছিল তার; ‘লুসিয়ানো সেরা পাইলটা’ তৈরির জন্য। বিশ শতাব্দীর অর্ধেক সময় পর্যন্ত যা ছিল ইতালির সব থেকে ব্যবসাসফল সিনেমা। ১৯৪০ সালে, ফ্রান্সেস্কো ডি রবার্তিসের ‘ইউমিনি সাল ফন্ড’ সিনেমাতে সহযোগী হিসেবে ডাক পায় রবার্তো। কিছু কিছু লেখক, তার জীবনের প্রথম অংশকে ট্রিলজির সিক্যুয়েন্স হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করে থাকে। তার প্রথম ফিচার ফিল্ম, ‘লা ন্যাভি বিয়াঙ্কা (১৯৪১)’ রোজেলিনির ফ্যাসিস্ট ট্রিলজির প্রথম সিনেমা। যার পরের দুই অংশ যথাক্রমে ‘উন পাইলটা রিটর্না (১৯৪২)’ এবং ‘উমো ডাল্লা ক্রসি (১৯৪৩)’। এই সময় থেকেই তার সঙ্গে ফ্রেডেরিকো ফেলিনি এবং অ্যালডো ফ্যাবরিজির সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৩ সালে ফ্যাসিস্টদের শাসনামলের অবসান ঘটলে রোজেলিনি নিজের অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ফিল্ম “রোমা সিট্টা আপার্তা (রোম, ওপেন সিটি ১৯৪৫)” তৈরির কাজ সম্পন্ন করে। ফেলিনি তাকে স্ক্রিপ্ট লেখার কাজে সাহায্য করেছিলেন, সেই সঙ্গে ফ্যাব্রিজি প্রিস্টের ভূমিকায় অভিনয়ও করেছিলেন। তুমুল জনপ্রিয়তা পাবার পর রোজেলিনি কিছু অপেশাদার অভিনেতা নিয়ে নিওরিয়্যালিস্টিক ট্রিলজির দ্বিতীয় সিনেমা ‘পাইসা (১৯৪৬)’ বানায়এর তৃতীয় ভাগের নাম ছিল ‘জার্মানিয়া আন্নো জিরো (১৯৪৮)’। নিওরিয়্যালিস্টিক ট্রিলজি তৈরির পরে, রোজেলিনি দুটি সিনেমা তৈরি করেছিল, এখনকার ভাষাতে যাকে “ট্রানজিশনাল ফিল্ম” বলা হয়ে থাকে ; ‘এল’আমোরে (১৯৪৮)’ এবং ‘লা ম্যাসিন্না আম্মাজ্জাক্টিভি (১৯৫২)”। যেখানে বাস্তব এবং সত্য কিছু ঘটনাকে আগের সিনেমাগুলোর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছিল সে। কিংবদন্তী এই পরিচালক ১৯৭৭ সালে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করে।
 
রোজেলিনি এবং দ্য ফ্যাসিস্ট ট্রিলজি:
ডি রবার্টিসের সঙ্গে কাজ করার পর থেকে রোজেলিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং মুসোলিনির ছেলের সঙ্গে তার ভালো সখ্যতা থাকাতে বিষয়টাতে কিছুটা সুবিধাও পেয়েছিল। অবশেষে ১৯৪১ সালে সে প্রথম সুযোগটি পেয়ে যায়। "সেন্ট্রো সিনেমাটোগ্রাফিও ডেল মিনিস্টেরো ডেল্লা ম্যারিনা" ইটালিয়ান নৌবাহিনীর উপরে সিনেমা বানানোর জন্য অর্থের যোগান দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ডি রবার্টিস রোজেলিনিকে সেই সময় পরিচালক হিসেবে সুপারিশ করে। অবশেষে এভাবেই তৈরি হয়েছিল ‘লা ন্যাভি বিয়াঙ্কা image003(দ্য হোয়াইট শিপ, ১৯৪১)’। ফিকশনাল এই ডকুমেন্টারিটি যুদ্ধে নৌবাহিনীর ভূমিকা উপস্থাপন এবং নৌবাহিনীর সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্যস্বরূপ নির্মিত হয়েছিল। লা ন্যাভি বিয়াঙ্কাকে ইতালির অন্যতম ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল মোস্ট্রা ডি ভেনেজিয়ার নবম আসরে দেখানো হয়েছিল, যেখানে তা ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টির তরফ থেকে পুরস্কার জিতে নেয়।
এই পুরস্কারের মাধ্যমে রোজেলিনি তার দ্বিতীয় সিনেমাটি তৈরি করার যথেষ্ট সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। ফ্যাসিস্ট ট্রিলজির দ্বিতীয় সিনেমা, ‘উন পাইলটা রিটর্না (এ পাইলট রিটার্নস, ১৯৪২)’ তৈরি হয়েছিল এয়ার ফোর্সের অর্থায়নে এবং প্রথম ফিল্মের মতোই এতে দেশমাতৃকার জন্য পাইলটদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছিল। যদিও এইবার সেন্সরশিপ বোর্ডের সঙ্গে রোজেলিনির কিছুটা মতভেদ তৈরি হয়। যুদ্ধের কিছু অংশকে অযাচিতভাবে অলঙ্কৃত করতে অস্বীকার করেছিল সে। এই কারণে কিছুটা সমালোচিত হয় সিনেমাটি এবং তাকে সেই সিনেমার সংলাপ আবারও নতুনভাবে প্রথম কপির আদলে লিখতে বলা হয়েছিল। রোজেলিনি ফ্যাসিস্ট ট্রিলজির তৃতীয় সিনেমা “উমো ডাল্লা ক্রসি (ম্যান অফ দ্য ক্রস, ১৯৪৩)” তৈরি করেছিল সশস্ত্রবাহিনীর কোন সাহায্য কিংবা অর্থায়ন ছাড়াই। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে যখন সিনেমার শ্যুটিং শুরু হয়েছিল, তখন ইতালিয়ান সৈন্যদের অপরিমিত অস্ত্র, যন্ত্রপাতি, খাদ্য এবং বস্ত্র দিয়ে রাশিয়ান ফ্রন্ট থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। সিনেমার ফোকাস পয়েন্ট ছিল রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে ইতালিয়ানদের বিজয়। যেখানে বাস্তবে তারা পরাজিত হয়ে এবং কিছু সৈন্য হারিয়ে দেশে ফিরেছিল। সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল তখন, যখন মিত্রশক্তির সৈন্যরা সিসিলি দখল করে নিয়েছিল এবং দখল নেবার এক মাসের মাথাতে সিনেমাটি থিয়েটার থেকে সরেও গিয়েছিল।
 
 
রোজেলিনি এবং দ্য নিওরিয়্যালিস্ট ট্রিলজি:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে যখন পারিপার্শ্বিক পরিবেশে মানুষের আর্ত চিৎকার এবং শত্রুপক্ষের বোমা পতনের শব্দ পাওয়া যেত, সেই সময় ইতালিতে অপরাধ এবং সামাজিক নৈরাজ্য আধিপত্য বিস্তার করেছিল। সমাজকে মুক্ত করার অভিপ্রায়ে এবং দমনাত্মক শাসনাবস্থা উপেক্ষা করেই ফিল্মমেকাররা সেসময় পুনর্জন্ম নেয়া ইতালিয়ান সমাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টায় রাস্তায় নেমেছিল। কঠোর বাস্তব ঘটনাগুলোতে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিল্মমেকাররা এগুলোকে তাদের ক্যামেরাতে ধারণ করে ফিল্মমেকিং এর দুনিয়ায় নতুন এক স্টাইলের সূচনা করে, যা নিওরিয়্যালিজম নামে আখ্যায়িত হয়। ফ্রেঞ্চ ফিল্ম তত্ত্ববিদ এবং সমালোচকের মতে, নিওরিয়্যালিজম সত্য, বাস্তব, অকৃত্রিম এবং বেশ কিছুটা ব্যাপ্তিকালের সিনেমারই নামান্তর। ইতালিয়ান সিনেমাতে এই
নিওরিয়্যালিজমের ঘটনার সূত্রপাত ঘটে তখন, যখন ফ্যাসিস্টদের শাসন মুখ থুবড়ে পড়েছিল। ইতোপূর্বে ফিল্মমেকারদের স্বাধীনভাবে নিজেদের শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা প্রায় বিশ বছর অবধি image004ছিল। দমনাত্মক ফ্যাসিস্ট যুগের পরিসমাপ্তির মাধ্যমেই ইতালিয়ান নিওরিয়্যালিজমের পথ চলাটা শুরু হয়।
 
নিওরিয়্যালিজম সিনেমাগুলো তারা তৈরি করত অপেশাদার কলাকুশলীদের নিয়ে, যেখানে স্থানীয় ভাষা ব্যবহৃত হতো এবং মূলত তৎকালীন সময়ে সমাজের বিভিন্ন সমস্যার দিক ফুটিয়ে তোলা হতো। অকৃত্রিম উপস্থাপন ভঙ্গিতে সামাজিক বার্তা প্রদানের মাধ্যম ছিল এই নিওরিয়্যালিস্টিক সিনেমা। ১৯৪৫ সালের দিকে, সেই নিওরিয়্যালিজমের পথ ধরেই সিনেমা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের জন্ম হয়েছিল, রাতারাতি যে “নিওরিয়্যালিজমের জনক” হিসেবে অ্যাখ্যাও পেয়ে যায়। যুদ্ধ শেষের পর মুসোলিনির দমনাত্মক শাসনকালের অস্তমিত পর্যায়ে; রোজেলিনি নিজের কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা লাভ করেছিল, যা আগে কখনো পায়নি। ফ্যাসিস্টদের বিশ বছরের শাসনামলের পর; অলঙ্করণ নির্ভর সিনেমা বানানো থেকে মুক্তি লাভ করে, নৈতিকতা নির্ভর সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল রবার্তো। রোমের স্বাধীনতা লাভের দুই মাস পরে, একটি সিনেমা বানানোর কাজে হাত লাগায় সে। যা পরবর্তীতে তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্যমণ্ডিত সিনেমাতে পরিণত হয়েছিল এবং ‘রোমা সিট্টা অ্যাপার্তা (রোম ওপেন সিটি, ১৯৪৫)’ নাম ছিল সিনেমাটির। কোন প্রযোজক না পাওয়ায়, নিজের বাড়ির আসবাব বিক্রি করে, কিছু ঋণ নিয়ে এবং বন্ধু-বান্ধবের সহায়তায় প্রায় সাত-আট মিলিয়ন লিরা যোগাড় করে ফেলেছিল রবার্তো রোজেলিনি। প্রোডাকশন খরচ কমানোর লক্ষ্যে এবং কয়েকশো লিরা বাঁচানোর অংশ হিসেবে সে পোস্ট-সিনক্রোনাইজেশন সাউন্ডের কাজ করে সেটিকে সাইলেন্ট ফিল্মে রূপান্তর করেছিল। সারা বিশ্বের বক্স অফিসে তুমুল সাড়া ফেলেছিল তার এই সৃষ্টি এবং সমালোচক ও ফিল্মবোদ্ধাদের কাছ থেকে অনেক সুখ্যাতি কুড়িয়েছিল। এবং এভাবেই রোজেলিনির হাত ধরে সিনেমাজগতের বিপ্লবও এসেছিল।
 
নিওরিয়্যালিস্ট ট্রিলজির দ্বিতীয় সিনেমা, ‘পাইসা (১৯৪৬)’ সিনেমার বিপ্লবের পথে অন্যতম অংশ ছিল। সে তার ক্যামেরাম্যানকে সরগরম নগরীর মূল রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিতো এবং দর্শক হিসেবে সিনেমার কাজ দেখার জন্য এগিয়ে আসত, তাদের মাঝ থেকে অভিনেতা নির্বাচন করতো। আমেরিকান প্রযোজক রড গেইজার তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার স্ক্রিপ্টে সে বিখ্যাত অভিনেতা গ্রেগরি পেক এবং অভিনেত্রী লানা টার্নারকে দিয়ে অভিনয় করাবে। কিন্তু তার বদলে সে যখন কিছু থিয়েটার অভিনেতাদের নিয়ে আসে, রোজেলিনি নিরাশ হয়েছিল তাতে। যেহেতু সিনেমাটির মূল থিম ছিল দুইটি ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পারিক সমঝোতাবোধ, তাই যখন সে তার অভিনেতাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্বন্ধের ব্যাপারটা খেয়াল করেছিল, একমাত্র তখনই সে স্ক্রিপ্ট চূড়ান্ত করেছিল।
 
নিওরিয়্যালিস্ট ট্রিলজির তৃতীয় এবং শেষ সিনেমা “জার্মানিয়া আন্নো জিরো (জার্মানি ইয়ার জিরো, ১৯৪৭)” একটি ট্রাজিক ঘটনার ভিত্তিতে নির্মিত। ১৯৪৬ সালে তার পুত্র মার্কো রোমানোর মৃত্যুর পরে, রবার্তো সেটিকে বানিয়েছিল কষ্ট, জুলুম এবং দুঃখবোধের আলোকে। তার পুত্রের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে জীবনের গুরুত্বের বিষয়টি অন্যভাবে উপলব্ধি করেছিল সে। ফ্রেঞ্চ প্রোডাকশন হাউজের অর্থায়নে সিনেমাটি তৈরি হয়েছিল, যার শ্যুটিং হয়েছিল বার্লিন সেক্টরে। তার আগের সিনেমাগুলোর মতো, রোজেলিনি প্রথমে তার অভিনেতাদের বার্লিনের রাস্তাতেই খুঁজে পেতে চেয়েছিল। টাউন স্কোয়ারে সে তার ক্যামেরাম্যানকে এই কারণে বসিয়েও রাখতো। কিন্তু এক্ষেত্রে উৎসুক বা অনুসন্ধিৎসু সেরকম কোন মানুষ এগিয়ে না আসায় রোজেলিনি সফল হচ্ছিল না। খাদ্য অন্বেষণ তখন ফিল্মমেকিং দেখার আগ্রহের চেয়ে বেশি প্রকট ছিল। অবশেষে, লোকাল সার্কাসে সে তার সিনেমার মূল চরিত্র এডমন্ডকে পেয়েছিল, যেখানে তার বাবা-মা ঘোড়সওয়ার ছিল। এডমন্ডের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছিল যে, সে আগের বছরগুলোতে কিছু নির্বাক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিল। রোজেলিনি তাকে আবিষ্কার করেছিল এক পাবলিক হাসপাতালে। সিনেমাতে তার ভাইয়ের চরিত্রে যে অভিনয় করেছিল, সে এক ইউনিভার্সিটির সম্মানজনক পরিবার থেকে এসেছিল এবং বাস্তবজীবনেও যুদ্ধের সময় গেস্টাপোদের কাছে বন্দি ছিল! এডমন্ডের বোনের চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রীকে রোজেলিনি আবিষ্কার করে ব্রেড লাইনে, যেখানে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়েছিল সে। মেয়েটি প্রাক্তন ব্যালেরিনা ছিল, যার মুখশ্রীর হতাশাভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল রোজেলিনি এবং এভাবেই তৈরি হয়েছিল তার নিওরিয়্যালিস্ট ট্রিলজির সর্বশেষ কিস্তি ‘জার্মানিয়া আন্নো জিরো’।
 
 
রোজেলিনি এবং তার ট্রানজিশনাল ফিল্ম:

image005

নিওরিয়্যালিস্ট ট্রিলজির পরে রোজেলিনি বাস্তবতাকে তুলে ধরার জন্য আরও কিছু মৌলিক এবং উদ্ভাবনী তত্ত্ব খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় নেমে পড়েছিল। ‘এল’ আমোরে’ এবং ‘লা ম্যাসিন্না আম্মাজ্জাক্টিভি’ এমন দুই সিনেমা যাদের মাধ্যমে রোজেলিনি তার নিওরিয়্যালিস্ট সিনেমাগুলোর ইতি টানে। এগুলো তার ফিল্ম ক্যারিয়ারের বিবর্তনমূলক নতুন পদক্ষেপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, যেখানে মনোস্তত্ত্ববিষয়ক বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছিল সে। এই সূত্র ধরেই সে প্রথমে ‘এল’ আমোরে’ বানিয়েছিল। টু এপিসোডের এই সিনেমা নায়িকা কেন্দ্রিক ছিল এবং এতে আন্না ম্যাগনানি অভিনয় করেছিল। এই সিনেমাতে রোজেলিনি সর্বপ্রথম তার সাবজেক্টকে প্লান-সিক্যুয়েন্স টেকনিকে ফিল্মিং করে। এই তত্ত্ব অনুসারে, সাবজেক্টকে প্রাথমিক ফোকাস হিসেবে এক্সট্রিম ক্লোজ-আপ শট নিয়ে, পরবর্তীতে সাবজেক্টের পারিপার্শ্বিকতাকে ক্যাপচার করা হতো। এরপরে ‘লা ম্যাসিন্না আম্মাজ্জাক্টিভি’ তৈরি করেছিল সে, যা বাস্তব এবং সত্য ঘটনা চিত্রায়নের ক্ষেত্রে এক অন্যতম ভূমিকা রেখেছিল। অন্যান্য সিনেমার মতো রোজেলিনি এতেও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিয়েছিল। দুটো ভিন্ন ধরনের পথ সংমিশ্রণ করে, রোজেলিনি তার এই ট্রানজিশনাল ফিল্মকে অতিরঞ্জিত অ্যাকশন এবং অর্থহীন রসবোধে সাজিয়েছিল।
 
রোজেলিনি এবং ইংগ্রিড বার্গম্যান:
 
১৯৪৮ সালে রোজেলিনি বিখ্যাত এক অভিনেত্রীর কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছিল। চিঠির বিষয়বস্তু অনেকটা এরকম:
 

 

“ডিয়ার মিস্টার রোজেলিনি,
আমি আপনার ওপেন সিটি ও পাইসা দেখেছি এবং সিনেমা দুটো অনেক উপভোগ করেছি। যদি আপনার কোন সুইডিশ অভিনেত্রীর দরকার পড়ে, যে ইংরেজি খুব ভালোভাবে বলতে পারে, জার্মান ভাষাশিক্ষা সেভাবে ভুলেনি, ফ্রেঞ্চ খুব ভালোভাবে বোঝে না এবং ইতালিয়ান বলতে শুধুমাত্র ‘তে আমো’ বোঝে; সেক্ষেত্রে আমি আপনার সঙ্গে একই ফিল্মে কাজ করতে প্রস্তুত।
-ইংগ্রিড বার্গম্যান ”
সিনেমার ইতিহাসের সবথেকে আলোচিত প্রেম কাহিনীটার শুরুটা হয়েছিল এভাবেই, যখন রোজেলিনি এবং বার্গম্যান উভয়েই নিজেদের ক্যারিয়ারের শিখরে অবস্থান করছিলেন। যৌথভাবে তাদের প্রথম কাজ ছিল ‘স্ট্রোমবলি টেরা ডি ডিও (১৯৫০)’। তাদের এই প্রণয় তৎকালীন সময়ে অনেক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। কারণ তারা দুজনেই তখন বিবাহিত। তাদের এই সম্পর্কের কেলেঙ্কারির আরো বাড়ে, যখন ইংগ্রিড অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। তাদের দুজনের তিনটি ছেলেমেয়ে ছিল, রবার্তো ইঙ্গমার রোজেলিনি, ইসাবেলা রোজেলিনি এবং তার image006জমজ বোন ইংগ্রিড ইসোট্টা। যৌথভাবে ইংগ্রিড- রোজেলিনি জুটি কিছু সিনেমা করেছিল, যাদের মধ্যে ‘ইউরোপা’৫১ (১৯৫২)’, ‘সিয়ামো ডন্নি (১৯৫৩)’, ‘জার্নি টু ইতালি (১৯৫৪)’, ‘লা পৌরা (১৯৫৪)’ এবং ‘গিওভান্না ডি’ আর্কো আল রোগো (১৯৫৪)’ অন্যতম। ১৯৫৭ সালে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর আমন্ত্রণে সে ভারতে ‘ইন্ডিয়া’ নামের একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করতে গিয়েছিল এবং ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু সময় কাটিয়েছিল। বার্গম্যানের সঙ্গে বিবাহিত সম্পর্ক থাকার পরেও, সেখানে চিত্রনাট্যকার সোনালি দাসগুপ্তের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তার। নেহেরু এই কারণে রোজেলিনিকে ভারত ছেড়ে চলে যেতে বলেন এবং এরপর পরই বিচ্ছেদ ঘটে বার্গম্যান ও রোজেলিনি জুটির।
 
রোজেলিনি এবং দ্য সলিচ্যুড ট্রিলজি:
১৯৪৮ সালে বিখ্যাত সুইডিশ অভিনেত্রী ইংগ্রিড বার্গম্যানের সঙ্গে পরিচয়ের পরের বছরে, যৌথভাবে তারা সলিচ্যুড ট্রিলজির প্রথম ফিল্ম “স্ট্রোম্বলি টেরা ডি ডিও” তৈরির কাজ শুরু করেছিল। সিসিলিয়ান এক ছোট্ট দ্বীপে শ্যুটিং হয়েছিল সিনেমাটির। যার কারণে অভিনেত্রী বার্গম্যানকে সেসব সুযোগ সুবিধা ছেড়ে আসতে হয়েছিল, যা image007আমেরিকাতে পেত সে। যেহেতু রোজেলিনি স্বাভাবিকভাবে উত্থিত আবেগ ধারণ করতে পছন্দ করতো, সেহেতু এসব কারণে এই সিনেমার কোন শ্যুটিং স্ক্রিপ্ট পর্যন্ত তৈরি করেনি সে। এমনকি পুরো সিনেমাতে কোন স্ট্যান্ট ডাবল ছাড়াই, বার্গম্যানকে পুরো সিনেমার স্ট্যান্ট করতে হয়েছিল সেইসময়। তাদের চলমান ব্যক্তিগত এবং বিষয়গত সম্পর্কের দ্বিতীয় সিনেমা এবং সলিচ্যুড ট্রিলজির দ্বিতীয় মুভি ‘ইউরোপা’৫১’ আসে ১৯৫২ সালে। রোজেলিনি এই সিনেমাটি তৈরি করেছিল মাত্র ৪৬ দিনে এবং মাত্র ১৬০০০ মিটার ফিল্ম ব্যবহার করেছিল, যাতে তার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নবীনত্ব বজায় থাকে। ১৯৫৩ সালে রোজেলিনি ‘ভিয়াজ্ঞিও ইন ইতালিয়া’ তৈরি করে, যা ইতালিতে সমালোচিত হলেও ফ্রান্সে সমাদৃত হয়েছিল। ইতালিয়ান বামপন্থি সমালোচকরা বলেছিল, রোজেলিনির পরবর্তী সিনেমাগুলো সামাজিক ইস্যু অথবা সামাজিক কোন থিম বাদ দিয়ে অন্য দিকে মোড় নিয়েছিল; যেখানে ডানপন্থীরা তার ব্যক্তিগত জীবন তথা বার্গম্যানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে ক্রোধান্বিত ছিল। এবং এভাবেই সলিচ্যুড ট্রিলজিটা তার অন্য দুই ট্রিলজির তুলনায় একটু কম প্রশংসিত হয়েছিল।
 
   তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, বায়োগ্রাফি.কম, ব্রিটানিকা.কম    
লেখক পরিচিতি:   
সান্তা রিকি পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ব ও খনিবিদ্যা বিষয়ে। বই পড়তে আর সিনেমা দেখতে ভালো লাগে। বিশেষ করে ক্রাইম-থ্রিলার, মিস্ট্রি এবং অনুবাদ জগতের প্রতি তার অন্য ধরণের ভালো লাগা কাজ করে। ইতোমধ্যে টেস গেরিটসেনের একটি বই অনুবাদও করেছেন। দ্য সার্জন নামের সেই বইটি প্রকাশিত হয়েছে বাতিঘর থেকে। সান্তা বর্তমানে ত্রৈমাসিক একটি ম্যাগাজিনের চলচ্চিত্র বিভাগে নিয়মিত লেখালেখি করেন।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com