Smiley face

দি রোড হোম-ভালবাসা যেখানে রৌদ্র ছড়ায়

image001
চীনের ছোট্ট একটি গ্রামে দারুণ উত্তেজনা। শহর থেকে তাদের গ্রামে একজন শিক্ষক আসবেন। চারিদিকে তাই নিয়ে যত আলোচনা, অপেক্ষা। কিশোরী ঝাও দি- ও অন্যদের মত উত্তেজিত। সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে একদিন সেই শিক্ষক আসেন তাদের গাঁয়ে। তরুণ সেই শিক্ষককে দেখতে অন্যদের মত ঝাও দি ও আসে এবং প্রথম দর্শনেই শিক্ষককে তার ভাল লেগে যায়। আর ভিড়ের ফাঁকে শিক্ষকও আবিষ্কার করেন মিষ্টি একটি মুখ। শুরু হয় তাদের ভালবাসার গল্প।
১৯৯৯ সালে চীনের বিখ্যাত পরিচালক ঝ্যাং ইমুর পরিচালনায় মুক্তি পায় রোমান্টিক ঘরনার ছবি ‘দি রোড হোম’।  গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে মিষ্টি একটি প্রেমের গল্প নিয়ে এগিয়ে যায় ছবির কাহিনী। ছবিটিকে যদি এক কথায় বলতে বলা হয়, তাহলে ‘দারুণ’ বলতে কোন দ্বিধা নেই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে কাহিনী এখানে দেখান হয়েছে তা হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। খুবই সাধারণ একটি ভালবাসার গল্প উপস্থাপনে অসাধারণ হয়ে উঠেছে। ছবিটির যে দিকটি সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হল সাদা-কালো এবং রঙিন অংশের বিষয়টি। পুরো কাহিনী দুইটি ভাগে বিভক্ত – অতীত এবং বর্তমান। তবে বর্তমান কাহিনী দেখান হয়েছে সাদা-কালো প্রেক্ষাপটে আর অতীত রঙিন প্রেক্ষাপটে। এটাই এখানে নতুনত্ব। প্রথমে দেখলে হয়ত দর্শক সাদা-কালো ছবি ভেবে কিছুটা অবাক হতে পারেন। কিন্তু
ছবি মূল ঘটনায় প্রবেশ করার পর সেই সেই অবাক ভাবটা না থেকে বরং ছবি দেখার আগ্রহ ক্রমশ বাড়ে।
‘দি রোড হোম’- যে পথ দিয়ে শুরু একটি ভালবাসার গল্পের। ছবির বিশেষত্ব মনে হয় এখানেই। যেখানে দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও ত্যাগ আর তার সাথে জীবনের ওপারে চলে গিয়েও ভালবাসার পথ মিশে হয়েছে একাকার। এখানে সুচিন্তিতভাবেই বর্তমানকে করা হয়েছে সাদা-কালো আর অতীতকে রঙিন। শুরুতেই যখন দেখা যায় বাবার আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ছেলে শহর থেকে চলে আসে তখন এই সাদা-কালোর আবহ দেখলে মনে হয় চারপাশটা শোকে মুহ্যমান। বৃদ্ধা ঝাও দি তার ভালবাসার মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার সাথে সাথে জীবনের সমস্ত রঙও যেন চলে গিয়েছে। কাহিনীর ধারাবাহিকতায় ছেলে ইউস্যাং যখন তার বাবা- মা ভালবাসার গল্প বলতে আরম্ভ করে তখনই সব কিছু রঙিন হয়ে যায়। যেন ভালবাসা এক নতুন বসন্ত সেখানে হাজির। মনের সব রঙ প্রজাপতির ডানায় ভর করে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েতে শুরু করেছে। তেমনি আবার কঠিন তুষারপাতের মাঝে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাও দি- র অপেক্ষা তাদের বিচ্ছেদের সুরকে ফুটিয়ে তুলেছে বলে মনে হয়েছে। যেন তাদের জীবনের ওপর দিয়েও ক্রমশ একটা ঝড় বয়ে চলছিল। যাকে দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
image003
একই সাথে একজন শিক্ষক যে সবার শ্রদ্ধা আর সম্মানের পাত্র সেটিও এই ছবিতে সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। শুরুতে দেখা যায় শিক্ষককে নিজের হাতে পানি তুলে আনতে বাধা দেয় গ্রামের মানুষ। বরং তার কাজগুলো তারাই করে দিতে চায়। এরপর বৃদ্ধ অবস্থায় লুও চ্যাংগু মারা গেলে শেষের দিকে দেখা যায় তার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তার ছাত্ররা যে যেখানে ছিল সেখান থেকে ছুটে এসেছে। কেউ শহর থেকে, কেউ তার চেয়েও দূর থেকে। তারাই তাদের শিক্ষকের কফিন বহন করতে চেয়েছে, তাকে সেই সম্মান দিতে চেয়েছে। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার এই কারিগরকে শ্রদ্ধার দৃশ্য তাই আবেগের সৃষ্টি করে।  এখানে যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয় তা হল, ছবিতে ঝাও দি এর ভালবাসা আর আবেগের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি এসেছে। তার পাশে নায়ক লুও চ্যাংগু এর ভূমিকা খুব কম ছিল। পুরো ছবিতে, অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত দি এর চোখের ভাষাতেই তার ভালবাসার শক্তিশালী দিকটি বোঝা সম্ভব হয়েছে। বরং নায়কের ভালবাসা এবং উপস্থিতি অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে। এছাড়া লুওকে কেন হঠাৎ করে গ্রাম ছাড়তে হয় সেটিও এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
 
পাশাপাশি ইমুর এই ছবিতে নারীর অবস্থানের কিন্তু কোন পরিবর্তন নেই। তারা সেই রান্না করা, ঘর সামলানো আর স্বপ্নের মানুষের জন্য অপেক্ষা করার মধ্যেই আটকা পরে ছিল। যদিও তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করলে অর্থাৎ ২০ বা ৩০ দশকের সময়ের সামন্তীয় সমাজের কথা ভাবলে বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী বলে মনে হয়। তবে ইমুর ব্যাপারে বরাবরই একটি অভিযোগ পাওয়া যায় যে তিনি পশ্চিমাদের সন্তুষ্ট করার জন্য রিপ্রেসিভ চায়নাকে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই পশ্চিমা গেইজকে সন্তুষ্ট করার জন্য চলচ্চিত্র পণ্ডিত রে চাও চলচ্চিত্রকর্মকে ‘ওরিয়েন্টালস ওরিয়েন্টালিজম’ বলেছেন।
ঝ্যাং ইমু এ চলচ্চিত্রে আর যেসব বিষয়গুলো দিয়ে নাড়া দিতে পেরেছেন তা হল ল্যান্ডস্কেপ ভিউ,  রঙের ব্যবহার এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। এই ল্যান্ডস্কেপ ভিউ আর রঙের ক্ষেত্রে কিছু চমৎকার দৃশ্য পাওয়া গেছে। যেমন – ঝাও দি- র লুওকে দেখার জন্য
গাছের আড়ালে আড়ালে হেঁটে চলা কিংবা শেষ দৃশ্যে গ্রামের সেই মেঠো পথটি দেখানো। পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দেওয়া হয়েছে তা একজন দর্শকের মনকে সেইসব দৃশ্যের সাথে, সেই সময়টুকুর সাথে একাত্ম করতে সক্ষম। এছাড়া আপাত দৃষ্টিতে ছোট ছোট কিছু ঘটনাকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যা হাস্যরসের সাথে সাথে ভালবাসার গভীরতা বেশ ভালভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে।
সবকিছু মিলিয়ে ইমুর ‘দি রোড হোম’ প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ দোষ- ত্রুটির ঊর্ধ্বে কোন কিছু নয়। ছবিটির গল্প, উপস্থাপন- সব কিছু মিলিয়ে চমৎকার একটি ছবি উপভোগ করার সুযোগ হয়েছে। যারা ছবিটি এখনও দেখেনি তারা দেখে নিতে পারেন। আশা করছি নিরাশ হবেনা।
 
 
 
লেখক পরিচিতি:
সারা মনামী হোসেন পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। বর্তমানে কর্মরত আছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষক হিসেবে।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com