Smiley face

জীবন থেকে নেয়া : গল্প হলেও সত্যি

0518fdf6c4dd2ed120d7447b4420065e-
স্নিগ্ধ রহমান
একটি দেশ
একটি সংসার
একটি চাবির গোছা
একটি আন্দোলন
একটি চলচ্চিত্র…
অতি সরল পাঁচটি লাইন। কিন্তু এই সারল্যের মাঝে কত না অসাধারণভাবে একটি গল্প লুকিয়ে আছে। একটি দেশের গল্প, সে দেশের মানুষের কষ্টের গল্প, অত্যাচার আর ক্ষতের গল্প। জীবন থেকে নেয়া ছবির বিজ্ঞাপনে উপরোক্ত পাঁচটি লাইন ব্যবহার করা হয়েছিল।
জীবন থেকে নেয়ার গল্প এক পরিবারকে নিয়ে। খান আতাউর রহমান পেশায় একজন আইনজীবী। বাইরে জাঁদরেল উকিল হলেও, ঘরে বৌয়ের কাছে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে থাকতে হয় তাকে। শুধু তিনি নন, পরিবারের সবাইকে কঠোর হস্তে শাসন করেন রওশন জামিল। পরিবারে আরও আছে রওশন জামিলের দুই ছোট ভাই- শওকত আকবর ও রাজ্জাক। এক সময় এই দুই ভাইয়ের স্ত্রী হিসেবে ঘরে আসে দুই বোন- রোজি সামাদ ও সুচন্দা। বড় বোনটি কোমল স্বভাবের হলেও, ছোট বোন সুচন্দা প্রতিবাদী। একদম যেন তার ভাইয়ের স্বভাব পেয়েছে। তাদের বড়ভাই আনোয়ার হোসেন একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। রওশন জামিল বুঝতে পারেন, এভাবে চলতে থাকলে তার একক কর্তৃত্বের দিন শেষ। অতি আকাঙ্ক্ষিত চাবির গোছাটিও হাতছাড়া হয়ে যাবে। ফন্দি আঁটতে থাকলেন কিভাবে দুবোনের মাঝে বৈরিতা সৃষ্টি করে, চাবির গোছাটি চিরতরে নিজের করে নেওয়া যায়।
061জহির রায়হানকে ব্যাপকভাবে স্পর্শ করে গিয়েছিল ৫২’র ভাষা আন্দোলন। গ্রেফতারকৃত প্রথম ১০ ভাষা সৈনিকদের মাঝে তিনি ছিলেন অন্যতম। তার বিভিন্ন লেখায় বার বার উঠে এসেছে ভাষা আন্দোলনের কথা। তাইতো, “সোনার কাজল, কাঁচের দেয়াল, সঙ্গম, বাহানা” প্রভৃতি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরেও তার মনে অতৃপ্তি কাজ করছিল।  ১৯৬৫ সালে জহির রায়হান “একুশে ফেব্রুয়ারি” নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাইলে, সরকার থেকে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে জহির রায়হান একটু ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন।  সেন্সর বোর্ডের ধরা-বাঁধা নিয়মের মাঝে থেকেই, একটা রূপকধর্মী চলচ্চিত্র তৈরী করার সিদ্ধান্ত নেন। যার ফলশ্রুতিতে জীবন থেকে নেয়ার জন্ম। “তিনজন মেয়ে ও এক পেয়ালা বিষ” নামে একটি ছবি নির্মাণের অনুমতি এফ.ডি.সি থেকে নিয়ে সপ্তাহখানেক বাদেই ছবির নাম পাল্টে রাখেন জীবন থেকে নেয়া। এর বছর দশেক পরে ঠিক এমন একটি কাজ করেছিলেন কিংবদন্তী পরিচালক সত্যজিৎ রায়। তৎকালীন সরকারকে ব্যাঙ্গ করে নির্মাণ করেছিলেন তার রূপকধর্মী ছবি “হীরক রাজার দেশে”।
এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের আবডালে জহির রায়হান তুলে ধরেন তৎকালীন রাজনৈতিক আন্দোলন, সামরিক শাসন তথা একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান। ছবির বড় বোনের চরিত্রটি যেমন পাকিস্তানী শাসকদের প্রতিভূ (ছবির শেষ পর্যায়ে খান আতাউর রহমান রওশন জামিলকে হিটলারের সাথে তুলনা করেন) অন্যদিকে আনোয়ার হোসেনের চরিত্রটি যেন মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতাকালীল এক অবিসংবাদিত নেতাকে। এই ছবিতেই প্রথমবারের মত মহাসমারোহে ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের দৃশ্য দেখানো হয়। সত্যিকারের প্রভাতফেরীর দৃশ্য ধারণ করা হয় ছবিটির জন্য।
ছবির গল্পের মত গানগুলোও ছিল ইঙ্গিতপূর্ণ। শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুর করা “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী” গানটি যেমন একুশের বেদনাকে ধারণ করেছিল, তেমনি 535abdf93112a-4“কারার ঐ লৌহ কপাট” গানটি প্রতিবাদের সুর তুলে ধরেছে। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অসংখ্যবার প্রচারিত হয়েছে গানটি। ছবির আরেক গান “আমার সোনার বাংলা” তো স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায়। আপাত দৃষ্টিতে সবচে “নিষ্পাপ” গান “এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে”-ও আদতে বাঙালীর হৃত অধিকারের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ছবির নির্মাণ কাজটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিলনা। ‘দৈনিক সংবাদ’-এ এক সাক্ষাৎকারে জহির রায়হান বলেন, “যদি পত্রিকার পৃষ্ঠায় গণআন্দোলনের খবর লেখা যেতে পারে- তবে সে আন্দোলনকে বিষয়বস্তু করে চলচ্চিত্র করা যাবে না কেন? এদেশের কথা বলতে গেলে রাজনৈতিক জীবন তথা গণআন্দোলনকে বাদ দিয়ে চলচ্চিত্র কি সম্পূর্ণ হতে পারে? আমি তাই গণআন্দোলনের পটভূমিতে ছবি করতে চাই।” এ সাক্ষাৎকার প্রকাশের পরেই ছবির উপর পাকিস্তানী জান্তাদের “নেক নজর” পড়ে। বাধাগ্রস্ত হয় নির্মাণকাজ। তবে জহির রায়হান সমঝোতায় আসেন, ছবির ব্যাপারে সেন্সর  বোর্ডের সিদ্ধান্ত তিনি মাথা পেতে নেবেন। সেন্সর বোর্ডের ৮ সদস্যের ছয় জনই ছবির সাথে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মিল খুঁজে পান। আটকে যায় ছবির মুক্তি। কিন্তু জনতার প্রতিবাদের মুখে বাধ্য হয়ে সরকার নির্ধারিত তারিখের এক দিন পরে ১১ এপ্রিল, ১৯৭০ সালে ছবিটি মুক্তি দেয়।
জীবন থেকে নেয়া ছবির বিষয়বস্তু ভাষা আন্দোলন হবার পরেও, এটা মুক্তিযুদ্ধের ছবি হয়ে গিয়েছে সমাপ্তির জন্য। ‘পারিবারিক আন্দোলন’ এর শেষে জন্ম নেয় এক নতুন শিশু। আনোয়ার হোসেন তার নাম রাখেন “মুক্তি”। ইয়াহিয়া সরকার আঁচ করতে পেরেছিল, জহির রায়হান আর দশটা চলচ্চিত্রের মত সাধারণ কিছু নির্মাণ করছেন না। এই ছবিটি নিশ্চয়ই ভিন্ন কোন অর্থ বহন করছে। সেই ভয় থেকেই শুটিঙের মাঝে তারা ছবিটির এক্সপোজড ফিল্ম আটক করে। জহির রায়হানকে নির্দেশ দেয় চিত্রনাট্যের পূর্ণাঙ্গ কপি জমা দিতে। কিন্তু স্ক্রীপ্ট পড়ে তাদের ধারণা হয় এই ছবির চরিত্রগুলো কাল্পনিক। তারা কস্মিনকালেও ভাবেনি, চতুর জহির রায়হানের ছবির সব চরিত্র কাল্পনিক হলেও গল্পটা বাংলাদেশের জীবন থেকে নেয়া।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com