88076d1e1c5fd372ac3a62c20b4e94df-57d3b6bd991c5
আজ সারা দেশে মুক্তি পেয়েছে অমিতাভ রেজা পরিচালিত বহু প্রতীক্ষিত বাংলা চলচ্চিত্র ‘আয়নাবাজি’। ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে দেখে এসে অনুভুতির কথা জানাচ্ছেন আশিকুর রহমান তানিম।
এটা ঠিক প্রথাগত কোন সিনেমা রিভিউ নয়। সিনেমা সমালোচকেরা সিনেমার ব্যাকরণগত ভুলত্রুটি কাঁটাছেড়া করেন, চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন- কিন্তু এটি যেহেতু কোন সিনেমা সমালোচকের লেখা নয়, নিতান্তই আপনাদের মতই এক সিনেমাপাগল দর্শকের লেখা অভিমত (রিভিউ'র চেয়ে অভিমত শব্দটাই বরং বেশি প্রযোজ্য) সেহেতু এর আগাগোঁড়াই প্রশংসাপূর্ণ শব্দে ঠাসা থাকবে
“চারপাশ বদলে যায়, থেমে যায় সময়। মিথ্যা তখন সত্যি হয়। সবার জন্য সব সত্যি, আর আমার জন্য অভিনয়।” - আয়না
এই লাইন গুলোই এই সিনেমার আদ্যোপান্ত তুলে ধরছে দর্শকদের সামনে; তবে রহস্যের মোড়কে। আর সেই রহস্যের জট খুলতে হলে দেখতে হবে আয়নার আয়নাবাজি। কাহিনীর আগা থেকে গোঁড়া পুরোটাই সমান উপভোগ্য। তাই, খামাখা সিনোপ্সিস জানানোর প্রয়োজন নেই আসলে। শুধুমাত্র আইএমডিবিতে যা লেখা আছে সেটাই বলি- "আয়না একজন অভিনেতা, ধুরন্ধর অভিনেতা। আর বাকিসব অভিনেতাদের সাথে তার একটাই পার্থক্য, আয়নার অভিনয়ের মঞ্চ হচ্ছে জেলখানা!" কি মনে হচ্ছে? একদমই অন্যরকম এক বাংলা সিনেমার গল্প না?
যেকোন সিনেমারই যেদিকটা সবচেয়ে গুরূত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, সেটা হচ্ছে গল্প। শেষমেশ সিনেমা তো হাজারটা দৃশ্য আর শব্দ জোড়া দিয়ে একটা গল্প বলে যাওয়াই, তাই না? তাই গল্পটাই কোন সিনেমার বিল্ডিং ব্লক বোধহয়। সেদিক থেকে আয়নাবাজির গল্প লেটার মার্ক্স পাওয়ার মত।  সিনেমার গল্প আমাদের খুব চেনা এই ঢাকা শহর আর শহরের বুকে ঘটে চলা কিছু অপরাধকে কেন্দ্র করেই। অথচ, অপরাধের সাথে প্রথাগত ভাবে হিরো-ভিলেইন এই চরিত্রগুলা আসেনি এই গল্পে। বরং গল্পের সব চরিত্র গল্পে এতটাই দ্রবীভূত যে, মাঝে মাঝে ধন্দ্বে পড়ে যেতে পারেন, গুলিয়ে ফেলতে পারেন ভালোমন্দের হিসাব নিকাশ! তাছাড়া আমাদের দেশের, আমাদের এই জাদুর শহরকে নিয়ে ঠিক এরকম ক্রাইম/থ্রিলারই তো এতদিন দর্শকরা খুঁজেছে  যেটা দেখলে মনে হবে না অ্যাকশন টা চেন্নাই থেকে, চেজিং সিন টা হলিউড থেকে, ট্যুইস্ট টা কোরিয়া থেকে ধার করা! এই গল্পটা একদম আমাদের নিজেদের গল্প, মৌলিক গল্প! এমন এক গল্প যা বাংলা চলচ্চিত্রে এর আগে দেখা যায়নি।

 

13138772_1016237221796903_3773540653727344313_n

ভালো গল্পের জন্য ভালো গল্প বলিয়েও দরকার হয়। অমিতাভ সেই গল্প বলায় প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে অমিতাভের ভক্ত ২০০৯ সালে তার একদল টিন-এজার কে নিয়ে করা 'ইচ্ছে হলো' নামের ভিন্নধর্মী এক 'কামিং অফ এইজ' ধারাবাহিক দেখার পর থেকে। পাশাপাশি যে দু একটি খণ্ড নাটক দেখেছি, সেগুলোতেও মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়েছেন তিনি। প্রত্যাশার পারদটা ছিলো তাই উঁচুতেই। অমিতাভ কে টুপি খুলে একটা কুর্নিশ, বাংলা সিনেমার এই দুর্দিনে ভিন্নধর্মী কাজ করার সাহস দেখানোর জন্য । আরেকটা কুর্নিশ আমাদের আশাহত না করার জন্য!
চঞ্চল চৌধুরী এই সিনেমার নিউক্লিয়াস। তার অভিনয় দক্ষতা নিয়ে তো কারোই কোন সংশয় ছিলো না; সেটা মনপুরা, রূপকথার গল্প, টেলিভিশনের মত চলচ্চিত্রসহ বহু টিভি নাটকেই প্রমাণিত হয়ে গেছে। তবে, এই সিনেমায় বোধহয় এখন পর্যন্ত চঞ্চল তার সেরা কাজটা দেখালেন। চঞ্চলকে একটু পরপরই  ট্যাক্সি ড্রাইভারের ডি নিরোর মত দুর্দান্ত লাগছিলো! ট্যাক্সি ড্রাইভারের চেয়েও বরং এটা মাল্টিডাইমেনশনাল ছিলো। তাই চঞ্চলকে এমন একটা কাজের জন্য সাধুবাদ দিতেই হয়! সেই সাথে বড়পর্দায় নবাগতা নাবিলাও ছিলো খুব ভালো, সাবলীল; একবারও জড়সড় লাগেনি। এই চরিত্রের জন্য এমন একটা নেক্সট ডোর গার্লই দরকার ছিলো। আর, পার্থও অসাধারণ কাজ করেছেন। সেই সাথে গাউসুল আলম শাওন, রবির বিজ্ঞাপনের পিচ্চিটা, লুতফর রহমান জর্জ আর দুই তিনটা ক্যামিও রোল করা প্রমুখও ছিলেন ফুল সুইং এ! কাউকেই অতি অভিনয় কিংবা আবেগশূন্যতার জন্য দৃষ্টিকটু লাগেনি।
আর, আবহ সঙ্গীতের কাজও ছিলো দুর্দান্ত, শ্রুতিমধুর। সাসপেন্স এর জায়গাগুলোতে বোধহয় আরেকটু সাসপেন্সফুল হতে পারতো মিউজিক, এই যা। সিনেমায় গাওয়া অমিতাভের লেখায় অর্ণবের 'এই শহর আমার' গানটা নিজেই তো রীতিমত একটা মিউজিফিল্ম! আর, তাছাড়া, চিরকুটের করা দুনিয়া গানটা আর সাথে গানের চিত্রায়ণ মিলে সোনায় সোহাগা হয়ে গেছে। হাবিবের করা রোমান্টিক গানটা সুন্দর, ফুয়াদের করা 'লাগ ভেলকি' গানটা তো মগজেই গেঁথে যাওয়ার মত!
সিনেম্যাটোগ্রাফি নিয়ে একটা কথাই বলতে হবে, অমিতাভের ছবির ব্যাপারে আর কিছু না হোক এটা নিশ্চিত ছিল সিনেমাটোগ্রাফী হবে দুর্দান্ত। তাইই হয়েছে। আমার শহর, আপনার শহর এই ঢাকাকে নতুন করে দেখবেন রাশেদ জামানের ক্যামেরায়।
বেশ কিছু দৃশ্যই মুগ্ধ হওয়ার মত। শুধু সিনেমাটোগ্রাফির জন্য না, ছবির অন্তরালে থাকা দর্শনের জন্যও! যেমন, ছাদে একটা এসাইনমেন্ট কমপ্লিট করে এসে ক্যারাক্টার চেইঞ্জ করার আগে নিজেকে ধুঁয়ে মুছে সাফ করার প্রতীকি গোসল এর দৃশ্যের পেছনের দর্শন মুগ্ধ করেছে। এরকম আছে আরো বহু দৃশ্য!
ছবির শেষ ভাগে একটু টেনে লম্বা করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। আর পার্থ কিভাবে চঞ্চলের আসল পরিচয় জানতে পারলেন সেটা ঠিক পরিস্কার নয়। নাবিলার চরিত্রটির ইন্ট্রো ব্যতিক্রম কিছু হওয়ার আশা জাগিয়েও, শেষ পর্যন্ত তা বাংলা সিনেমার তথাকথিত নায়িকা হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেছে। এই ছোটখাটো বিষয় গুলো বাদ দিলে আয়নাবাজি একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। দর্শক যদি সিনেমা মনোযোগ দিয়ে দেখা শুরু করে আর গল্পের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে, তাহলে চারপাশে আয়নার বায়োস্কোপই দেখা যাবে কেবল, শুনতে পাওয়া যাবে আয়নার লাগ ভেলকি লাগ ভেলকি হাঁক। সেই ভেলকি ছেড়ে বেরুতে পারবেন কেবল সিনেমা শেষ হলেই। আর, না পারলেও কি? আরেকবার দেখবেন নাহয়!
আপনার আয়নাবাজি অভিজ্ঞতা হোক দুর্দান্ত! জয়তু বাংলা সিনেমা!
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *