Smiley face

ঋত্বিক ঘটকঃ জীবন, কর্ম ও দর্শন

rgt
অরিন্দম গুস্তাভো বিশ্বাস
ঠোঁটে পাতার বিড়ি আর হাতে বাংলা মদের বোতল। মাথাভর্তি উদভ্রান্তের মত এলোমেলো চুল, ক্ষুরের স্পর্শাভাবে গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ধুলিমলিন পাজামা-পাঞ্জাবীর সাথে কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, সে চোখে কৌতুক মেশানো ধারালো দৃষ্টি। ‘তিনি কে’ এই প্রশ্ন কেউ করলে কোনরকম হেঁয়ালী না করেই সরাসরি জবাব দিয়ে দেবেন – ‘আমি এক মাতাল। ভাঙ্গা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল’। এই হল কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের লেন্সের ভেতর দিয়ে নিজেকে দেখার উপলব্ধি।
পুরো নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক। জন্মেছিলেন ঢাকায়, ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর। বাবার নাম সুরেশ চন্দ্র ঘটক, মা ইন্দুবালা দেবী। পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই শিল্প-সাহিত্যের চর্চা ছিল। বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হলেও কবিতা ও নাটক লিখতেন। খ্যাতিমান লেখক মনীশ ঘটক ছিলেন ঋত্বিকের বড় ভাই। ঋত্বিক ঘটক ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ এবং ১৯৪৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম.এ. কোর্স শেষ করলেও পরীক্ষাটা আর দেওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং সর্বোপরি ১৯৪৭ এর ভারত ভাগের ফলে ঘটক পরিবার কলকাতায় চলে যেতে বাধ্য হয়। নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে শরনার্থী হবার মর্মবেদনা ঋত্বিক কোনদিন ভুলতে পারেননি এবং তাঁর জীবন-দর্শন নির্মাণে এই ঘটনা ছিল সবচেয়ে বড় প্রভাবক যা পরবর্তীকালে তার সৃষ্টির মধ্যে বারংবার ফুটে ওঠে।
গল্প-কবিতা লিখে ঋত্বিকের সাহিত্যচর্চার শুরু হয়েছিল দেশভাগের সময়টাতেই, কলকাতায় গিয়ে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়লেন থিয়েটার [ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)] এবং রাজনীতির [কম্যুনিস্ট পার্টি(সিপিআই)] সাথে। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ছিল ভারতের প্রথম সুসংগঠিত নাট্য আন্দোলন যেটা তাদের প্রদর্শিত নাটকের মাধ্যমে সামাজিক অবিচার ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এই সংঘের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সাথে ঋত্বিক কাজ করা শুরু করেন ১৯৪৮ সালে এবং একই বছরে লেখেন তাঁর প্রথম নাটক কালো সায়র  এবং অভিনয় করেন বিজন ভট্টাচার্যের ১৯৪৪ সালের নাটক নবান্নতে। ধীরে ধীরে গল্প-কবিতার চেয়ে থিয়েটারের দিকে আগ্রহ বাড়তে থাকে ঋত্বিকের, তাঁর যুক্তি ছিল, ‘গল্প পড়ার চেয়ে মানুষ নাটক বেশি দেখে’। নিজের সৃষ্টিকে বেশী মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার ইচ্ছাটা শুরু থেকেই ঋত্বিকের মধ্যে প্রবল ছিল। তাঁর লেখা নাটকগুলোর মধ্যে আছে কত ধানে কত চাল, ইস্পাত, জ্বলন্ত, নেতাজীকে নিয়ে, সাঁকো এবং সেই মেয়ে। অভিনীত নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিজেন্দ্রলাল রায়ের চন্দ্রগুপ্ত, রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর, বিজন ভট্টাচার্যের কলঙ্ক, শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ ও দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পন। এরপর ক্রমে তিনি নাটক লেখা ও অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনাও দিতে থাকেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জ্বালা(১৯৫১) ও দলিল(১৯৫২)। দলিল নাটকে দেখা যায় যে, দেশভাগের ফলে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ দু’ভাগ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ দুঃখ ভারাক্রান্ত ও বিচলিত। এই অবস্থাতেই একটি চিঠিতে কলিমুদ্দিন গোপালকে লিখছে, ‘ওরা আমাদের মাতৃভূমিকে ভাগ করতে পেরেছে, কিন্তু আমাদের হৃদয়কে কোনদিন আলাদা করতে পারবে না’। দুই বঙ্গের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের এক অসাধারণ উপস্থাপনা। জ্বালা ছিল ঋত্বিকের নির্দেশনায় সর্বশেষ নাটক যেটা তিনি পরিচালনা করেন ১৯৫৭ সালে। মৌলিক নাটক লেখা ছাড়াও তিনি বের্টোল্ট ব্রেশ্‌ট-এর দ্যা লাইফ অফ গ্যালিলিও(গ্যালিলিও চরিত)দ্যা ককেশীয়ান চক সার্কেল(খড়ির গন্ডি), নিকোলাই গোগোল-এর গভর্ণমেন্ট ইন্সপেক্টর(অফিসার, ১৯৫৩) এবং ম্যাক্সিম গোর্কির দ্যা লোয়ার ডেপথস(নীচের মহল) বাংলায় অনুবাদ করেন।
সিনেমার সাথে ঋত্বিকের সংশ্লিষ্টতা থিয়েটারের প্রায় সমসাময়িক। ১৯৪৮ সাল থেকেই কিছু উৎসাহী বাঙ্গালী যুবকেরা কলকাতার প্যারাডাইস ক্যাফে নামের একটা চায়ের দোকানে ফিল্ম ও ফিল্মমেকিং নিয়ে আড্ডা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মিলিত হতেন। এই আড্ডাবাজদের দলেই ছিলেন ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের মত ফিল্মমেকাররা। ১৯৪৭ সালে চলচ্চিত্রসমালোচক চিদানন্দ দাশগুপ্ত ও সত্যজিৎ রায় মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি’। কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির কার্যক্রমের ফলেই এইসব নতুন ফিল্মমেকারদের প্রথমবারের মত পরিচয় ঘটে ইউরোপিয়ান ও সোভিয়েত ফিল্মের সাথে। ১৯৫২ সালে কলকাতাসহ ভারতের চারটি শহরে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং এই উৎসবেই ভারতীয় দর্শকরা প্রথমবারের মত ইতালির নিওরিয়্যালিস্ট ফিল্ম ভিত্তোরিও ডি সিকার বাইসাইকেল থিভস এবং আকিরা কুরোসাওয়ার জাপানী ফিল্ম রশোমন এর মত ফিল্মগুলো দেখার সুযোগ পান।
এসব দেখেশুনে ঋত্বিকের মনে হল যে ফিল্ম নাটকের থেকেও শক্তিশালী মাধ্যম, এর মাধ্যমে আরও বেশী মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। তাই তিনি এবার ফিল্মের দিকে ঝুঁকে এলেন। ঋত্বিকের এই বারবার শিল্পমাধ্যম পরিবর্তনের ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দিয়েছিলেন এভাবে, ‘ছবি লোকে দেখে। ছবি দেখানোর সুযোগ যতোদিন খোলা থাকবে, ততোদিন মানুষকে দেখাতে আর নিজের পেটের ভাতের জন্য ছবি করে যাবো। কালকে বা দশ বছর পরে যদি সিনেমার চেয়ে ভালো কোনো মিডিয়াম বেরোয় আর দশবছর পর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাবো। সিনেমার প্রেমে নেশায় আমি পড়িনি। আই ডু নট লাভ ফিল্ম’।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, তিনি ফিল্ম ভালবাসেন না কিন্তু শিল্পচর্চার মাধ্যমে অধিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর তাঁর এই তাগিদের উদ্দেশ্যটা কি? এই বিষয়ে ঋত্বিকের মতামত হল, ‘প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। শিল্প ফাজলামি নয়। যারা প্রতিবাদ করছে না তারা অন্যায় করছে। শিল্প দায়িত্ব। আমার অধিকার নেই সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার। শিল্পী সমাজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সে সমাজের দাস। এই দাসত্ব স্বীকার করে তবে সে ছবি করবে’।
তাই ঋত্বিকের দৃষ্টিতে সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম হয়ে থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। আইজেনস্টাইনের ব্যাটলশিপ পতেমকিন, পুদোভকিনের মাদার এবং বুন্যুয়েলের নাজারিন এর মত সিনেমা দেখে যার দীক্ষাগ্রহন, তিনি তাঁর শিল্পের মাধ্যমে তাঁর দর্শনটা ছড়িয়ে দেবেন এটাই স্বাভাবিক।

ritwik_ghatak_collage

নিমাই ঘোষের ১৯৫০ সালের বাংলা সিনেমা ছিন্নমূল এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রজগতে অভিষেক ঘটে ঋত্বিক ঘটকের। চলচ্চিত্রটিতে তিনি একইসাথে সহকারী পরিচালক এবং অভিনেতা হিসাবে কাজ করেন। বাংলা সিনেমায় বাস্তবতা প্রদর্শনের চলচ্চিত্রিক ধারা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা। দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে শরনার্থী হয়ে কলকাতায় চলে আসা একদল কৃষকের গল্পই এই ছবির বিষয়বস্তু। এই সিনেমায় শিয়ালদহ রেলস্টেশনকে লোকেশন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, এখান দিয়েই দেশভাগের পরবর্তী সময়ে শরনার্থীরা শহরে প্রবেশ করত।
১৯৫১ সালে ঋত্বিক ঘটক প্রথমবারের পরিচালকের দ্বায়িত্ব পান। বেদেনী নামের এই সিনেমাটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৯৫০ সালের দিকে, কিন্তু স্টুডিওতে আগুন লেগে যাওয়ায় পরবর্তীতে মূলত অর্থনৈতিক কারণে সিনেমাটির শূটিং বন্ধ হয়ে যায়। নির্মল দে’র পরিচালনায় এটি নির্মিত হচ্ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাগিনী নামক ছোটগল্প থেকে। পরিচালকের দ্বায়িত্ব পাওয়ার পর ঋত্বিক এর গল্প ও চিত্রনাট্য নতুন করে লেখেন এবং নাম দেন অরূপ কথা। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে প্রায় ২০ দিন ধরে শূটিং করা হয় কিন্তু ক্যামেরার যান্ত্রিক ক্রুটির ফলে ফিল্ম এক্সপোজ না হওয়াতে সিনেমাটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
ঋত্বিকের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ১৯৫২ সালে নির্মিত নাগরিক। এটিই ছিল খুব সম্ভবত বাংলা আর্ট ফিল্মের প্রথম উদাহরণ। দূর্ভাগ্যবশত এটি রিলিজ হয় দীর্ঘ ২৪ বছর পরে, ঋত্বিকের মৃত্যুর পর।
দেশভাগ পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসা একটি রিফুজি পরিবারের জীবনধারণের যুদ্ধই নাগরিক এর গল্প। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র রামু। বাবা-মা আর বড় বোনকে নিয়ে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে রামুর বসবাস। বোনকে বিয়ে দেবার ব্যার্থ চেষ্টা চলে বারবার। শিক্ষিত রামু স্বপ্ন দেখে চাকরি করে জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনয়নের, প্রেমিকা উমাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে চায় তার ঘরের দেয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারের ছবিটির মত কোন এক জায়গাতে। কিন্তু হায়! সেই চাকরি যে সোনার হরিণের মত, তার পেছনে রামু দৌড়ে চলে অবিরাম। অবশেষে ব্যর্থ ভগ্ন রামু তার পরিবারকে নিয়ে বস্তির উদ্দেশ্যে নিরুদ্দেশ যাত্রা করে, সাথে করে নিয়ে যায় আশা আর বেঁচে থাকার স্বপ্নটাকে।
প্রথম সিনেমার জন্য এ ধরণের গল্পকে বেছে নেবার পেছনে খুব সম্ভবত ছিন্নমূল এর একটা প্রভাব ছিল। চল্লিশ দশকের মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর জীবনচিত্র, যুবসমাজের বেকারত্ব, প্রান্তিক জীবনের প্রেম-ভালবাসা, শরনার্থী জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা, বিয়ের মেয়ে দেখার হীনমণ্য প্রক্রিয়া, নাগরিক জীবনের অনিশ্চয়তা ইত্যাদি ফুটে ওঠে নাগরিক সিনেমাতে। নিজের প্রথম চলচ্চিত্র সম্পর্কে ঋত্বিক বলেন, ‘নাগরিকের চিত্রনাট্য ১৯৫০-৫১ সালের রচনা। তখনকার দিনে বাংলাদেশে(উভয় বঙ্গে) বাস্তববাদী ছবি মোটেও হতো না। সেদিক থেকে একটা ভালো বিষয় নিয়ে ছবি করার চেষ্টা করেছিলাম। চলচ্চিত্রটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বাংলার মধ্যবিত্তের জীবন যন্ত্রণার প্রথম বস্তুনিষ্ঠ শিল্পরূপ। এক টুকরো নিশ্চিন্ততার সন্ধানে দৃঢ় প্রত্যয় নাগরিকের জীবন পথপরিক্রমা এটির বিষয়বস্তু’।
সিনেমাটির শেষ দৃশ্য দেখে অনেকের মনে পড়ে যেতে পারে জহির রায়হানের উপন্যাস হাজার বছর ধরে এর শেষ লাইনটি – ‘রাত বাড়ছে, হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত’। বাক্যটির উদ্দেশ্য ঘটনার একটি বৃত্তাকার আবহ সৃষ্টি করা। ঋত্বিকের সিনেমাগুলো সরলরৈখিক নয়, বেশীরভাগ সময়ই ঋত্বিক একটি বৃত্ত রচনা করেন। সে বৃত্ত হতে পারে ঘটনার, হতে পারে দর্শনের। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেখানে এসেই সিনেমাটি শেষ হয়। রামুরা যে স্বপ্ন নিয়ে এই বাসায় এসেছিল, তাদের চলে যাবার সময় আরেকটি পরিবার সেই একই স্বপ্ন বুকে নিয়ে সেই বাসায় এসে ওঠে। এই বৃত্ত সৃষ্টির মাধ্যমে ঋত্বিক বুঝিয়ে দেন যে এটি শুধু রামুর পরিবারের গল্প নয়, বরং এইরকম অসংখ্য পরিবারের জীবনযুদ্ধের চালচিত্র।
১৯৫৫ সালে ঋত্বিক তিনটি তথ্যচিত্র নির্মান করেন। আদিবাসী ওরাওঁ সম্প্রদায়ের জীবন-যাত্রা নিয়ে ওরাওঁ, বিহারের আদিবাসীদের জীবন নিয়ে আদিবাসীও কা জীভন স্রোত, এবং বিহারের দর্শনীয় স্থানগুলো নিয়ে বিহার কি দর্শনীয় স্থান। বিহার থেকে ফিরে তিনি সুরমা দেবীকে বিয়ে করেন। তিনিও ছিলেন একজন থিয়েটার কর্মী এবং থিয়েটারের মাধ্যমেই তাদের পরিচয় হয়েছিল। এর কিছুদিন পর সলিল চৌধুরীর সাহায্যে ঋত্বিক বোম্বের ফিল্মিস্তান স্টুডিওতে একটি চাকরি নেন। প্রথমদিকে তিনি হৃষীকেশ মুখার্জির সাথে থাকতেন এবং তাঁর পরিচালনায় নির্মিত মুসাফির(১৯৫৭) সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লেখেন। ঋত্বিকের জীবনে শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যিক সাফল্য আসে তাঁর চিত্রনাট্য থেকে ১৯৫৮ সালে নির্মিত বিমল রায়ের মধুমতি সিনেমার মাধ্যমে। পুনর্জীবনের ধারণা নিয়ে তৈরী হওয়া প্রথমদিকের সিনেমার মধ্যে এটি একটি। পরবর্তীকালে তিনি আরও কিছু ছবির জন্য চিত্রনাট্য লেখেন যার মধ্যে রয়েছে স্বরলিপি(১৯৬০), কুমারী মন(১৯৬২), দ্বীপের নাম টিয়ারং (১৯৬৩), রাজকন্যা(১৯৬৫)হীরের প্রজাপতি(১৯৬৮)। প্রবন্ধ ও চিত্রনাট্য লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বোম্বের বাণিজ্যিক ধাঁচের সিনেমার জন্য নিয়মিত চিত্রনাট্য লেখার চাহিদার চাপ ঋত্বিকের জন্য অসহ্য হয়ে উঠছিল। তাই বোম্বের নিশ্চিত আয়ের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে ঋত্বিক আবার ফিরে আসেন কলকাতায়।
ঋত্বিকের দ্বিতীয় ছবি অযান্ত্রিক মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে। সুবোধ ঘোষের একটি ছোটগল্প থেকে তিনি এটা নির্মাণ করেন। একজন মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সৃষ্ট সম্পর্ক নিয়েই তৈরী এই সিনেমাটি। একটি ছোট্ট পাহাড়ী গ্রামের ট্যাক্সিচালক বিমল। এ জগতে আপন বলতে তাঁর আছে শুধু ১৯২০ সালের লক্কড়-ঝক্করমার্কা একটা পুরনো শেভ্রোলে ট্যাক্সি, যাকে সে আদর করে নাম দিয়েছে জগদ্দল। জগদ্দলকে সে যন্ত্র বলে মেনে নিয়ে নারাজ, তাই সে বলে, ‘জগদ্দলও যে একটা মানুষ, সেটা ওরা বোঝে না’। জানা যায়, যে বছর বিমলের মা মারা যায়, সে বছর থেকেই জগদ্দল বিমলের সাথে আছে। জগদ্দল যেন তাঁর মায়ের মত, অসময়ে-দূর্দিনে বিমলকে আগলে রাখে। কিন্তু যন্ত্রেরও দিন ফুরায় একদিন, মানুষের মতই থেমে যায় তার হৃদস্পন্দন। অসহায় বিমলের সামনে দিয়ে জগদ্দলকে ভেঙ্গেচুরে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যায় লোহালক্কড় ব্যবসায়ীরা। এসময় ফ্রেমে গোরস্থানের ক্রুশ দেখিয়ে যেন যন্ত্রের শবযাত্রার কথাই বোঝাতে চেয়েছেন ঋত্বিক। আশা-ভরসাহীন বিমলের সামনে যখন হতাশার অন্ধকার, তখনই ঋত্বিক তার বৃত্ত সম্পূর্ণ করেন। বিমলকে অবাক করে দিয়ে একটি শিশুর হাতে ভাঙা গাড়িটার পরিত্যক্ত হর্নটি বেজে উঠে। এই ঘটনাটি সামনে এগিয়ে যাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করে, একটি নতুন শুরুর কথা ঘোষণা করে যেটা শেষ দৃশ্যে বিমলের অভিব্যক্তিতে সঞ্চারিত হয়।
ঋত্বিক এই সিনেমাতে একটি জড় বস্তুকে একটি চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, এমন উদাহরণ এর আগে খুব বেশী নেই। ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমলের যে চরিত্র ঋত্বিক নির্মাণ করেন তার সাথে পরবর্তীতে মিল পাওয়া যায় সত্যজিৎ এর অভিযান(১৯৬২) সিনেমার ট্যাক্সি চালক নারা সিং ও মার্টিন স্করসেসির ট্যাক্সি ড্রাইভার (১৯৭৬) এর ট্রাভিস বিকেল চরিত্রের। অযান্ত্রিক ১৯৫৯ সালের ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রদর্শিত হয়। সেখানে ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা বিখ্যাত সমালোচক জর্জেস সাডৌল বর্ণনা করেন এভাবে, ‘অযান্ত্রিক কথাটার অর্থ কি? আমার জানা নেই এবং আমার বিশ্বাস ভেনিস ফেস্টিভালের কারোরই এটা জানা ছিল না। আমি পুরো গল্পটাও বলতে পারব না, কারণ সেখানে কোন সাবটাইটেল ছিল না। কিন্তু এতদস্বত্বেও আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি দেখেছিলাম’। সত্যজিৎ রায় এ ছবিটি দেখে ঋত্বিককে বলেছিলেন, ‘ঋত্বিকবাবু, সিনেমাটা সময় মত রিলিজ করলে আপনি পথিকৃৎ হতেন’।
একই বছর ঋত্বিক মুক্তি দেন তার তৃতীয় চলচ্চিত্র বাড়ী থেকে পালিয়ে। মূল গল্প শিবরাম চক্রবর্তীর। ঋত্বিকের প্রতিটি ছবিতেই শিশু ও নারী চরিত্রগুলোর গুরুপ্তপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এবার তিনি গোটা সিনেমাটাই একজন শিশুর চোখ দিয়ে আমাদের দেখালেন। ছোট্ট ছেলে কাঞ্চন, চোখে এলডোরাডোর স্বপ্ন। বাবার ভয়তে ট্রেনে চড়ে পালিয়ে যায় কলকাতায়। বিভিন্ন ধরণের মানুষকে দেখে তার স্বপ্নের সাথে সেই নগরের কোন মিল সে পায় না। চারিদিকে সে দেখে শুধু অভাব, হতাশা আর দুঃখ। এসবের কারণ বুঝতে না পেরে তাই চানাচুরওয়ালা হরিদাসের কাছে তার সরল জিজ্ঞাসা, ‘এ শহরে এত দুঃখ কেন?’। অবশেষে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে এই নগরখাঁচা থেকে সে বাড়ীতে ফিরে যায়। পথ চেয়ে থাকা বাবা-মা তাকে বরণ করে নেন পরম মমতায়। পরিবারের সাথে কাঞ্চনের পুনর্মিলনের ফলেই ঋত্বিকের বৃত্ত পূর্ণ হয়।
কাঞ্চনের চোখ দিয়ে তৎকালীন কলকাতার বাস্তব চালচিত্র দেখা যায়। বিয়ে বাড়ির বিপুল আয়োজন আর পরদিন সকালে কিছু মানুষের ডাস্টবিনে খাবার খোঁজার মাধ্যমে ঐ সময়ের নিম্নবিত্ত মানুষের অভাবের ভয়াবহতার চিত্র পাওয়া যায়। সিনেমাটোগ্রাফিতে ডীপ ফোকাসের ব্যবহার লক্ষনীয়। এই সিনেমার সাথে ফ্রান্সের ন্যুভেল ভাগের বিখ্যাত সিনেমা ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ(১৯৫৯) এর কাহিনীর সাদৃশ্য রয়েছে।
১৯৫৯ সালে কত অজানারে নামের একটি সিনেমার কাজ অনেকদূর সম্পন্ন করেও অর্থনৈতিক কারণে সেটা আর শেষ করতে পারেননি ঋত্বিক। এর পরের বছর শক্তিপদ রাজগুরুর কাহিনী অবলম্বনে তিনি নির্মান করেন তার পরবর্তী চলচ্চিত্র মেঘে ঢাকা তারা। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলোর মধ্যে এটিই ছিল সর্বাধিক ব্যবসাসফল। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসা এক রিফুজি পরিবারের জীবন সংগ্রাম এই সিনেমার মূল বিষয়। এই সিনেমার প্রোটাগনিস্ট নীতা, পরিবারের বড় মেয়ে। বাবা একটা স্কুলে পড়ান, মা গৃহিনী। বেকার বড়ভাই শঙ্কর বিখ্যাত গায়ক হবার স্বপ্নে বিভোর। ছোটবোন গীতা চায় স্বাচ্ছন্দ্য আর ছোটভাই মন্টু নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না। পরিবারের মূল রোজগেরে সদস্য নীতা, অভাবের ভয়ে তাঁর মা তাকে বিয়ে দিতেও নারাজ। নীতা তবু স্বপ্ন দেখে তার প্রেমিক সনৎকে নিয়ে, বড়ভাই শঙ্করকে নিয়ে। ঘটনার পরম্পরায় নীতার বাবা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন, প্রেমিক সনৎ বিয়ে করে ফেলে ছোটবোন গীতাকে, মন্টু কারখানায় এক্সিডেন্ট করে পড়ে থাকে হাসপাতালে। মানসিক ও শারিরীক যন্ত্রণায় নীতার জীবনীশক্তি ফুরিয়ে আসতে থাকে কিন্তু তবুও সে সংসারের হাল ছাড়ে না, রোগাক্রান্ত অবস্থায় নিজ বাড়িতেই স্বেচ্ছানির্বাসিত অবস্থায় বেঁচে থাকে নীতা। একদিন সংসারে সুখের দিন আসে, শঙ্কর বিখ্যাত গায়ক হয়ে ফেরে, বাড়িতে নতুন শিশুর আগমনের সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু এই সুখের সময় নীতাকে কেউ মনে রাখেনা, পরিবারের কাছে সে করুণার পাত্র হয়ে পড়ে। অবশেষে পাহাড়ের উপরে একটি হাসপাতালে নীতাকে ভর্তি করায় শঙ্কর। সেখানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে নীতা চিৎকার করে শঙ্করকে জানায়, ‘দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম’। পাহাড় থেকে পাহাড়ে ধ্বনিত হয় নীতার বেঁচে থাকার আকুতি। সিনেমার প্রথম দৃশ্যে নীতার স্যান্ডেল ছিঁড়ে যাওয়ার মত শেষ দৃশ্যে অন্য একটি মেয়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ে যাওয়া ঘটনাটি আবহমানতাকে প্রকাশ করে এবং ঋত্বিকের বৃত্ত সৃষ্টি সম্পন্ন হয়।
এই সিনেমায় ঋত্বিক শব্দ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। দক্ষিণ ভারতীয় হংসধ্বনি রাগ এবং এ রাগভিত্তিক খেয়াল ব্যবহার করেন সিনেমার আবহ সংগীত হিসেবে। ঋত্বিক প্রথমবারের মত রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করেন এই ছবিতে, এছাড়াও বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। আবহ সঙ্গীতের সাথে সাথে ইফেক্ট মিউজিক/সাউন্ড নিয়েও পরীক্ষা করেছেন ঋত্বিক। ভাত ফোটার শব্দের ফিড বাড়িয়ে দিয়ে মা’র মনের অবস্থা বুঝিয়েছেন, নীতার কষ্টের মুহুর্তে চাবুকের আওয়াজ ব্যবহার করে নীতার দুঃখটা ফুটিয়ে তুলেছেন, আবার শঙ্করকে মায়ের তিরস্কার করার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে বাচ্চাদের নামতা পড়া ব্যবহার করে আলাদা আবহ সৃষ্টি করেছেন। সিনেমাটোগ্রাফিতে ডীপ ফোকাসের বহুল ব্যবহার লক্ষনীয়। উল্লেখযোগ্য কিছু কম্পোজিশনও রয়েছে। বিশেষ করে চরিত্রের নড়াচড়ায় ফলে কম্পোজিশনের পরিবর্তন, এবং তার ফলে আরেকটি নতুন কম্পোজিশনের সৃষ্টির ব্যাপারটির অসাধারণ চিত্রায়ণ করেছেন ঋত্বিক। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে গীতার অন্তঃস্বত্ত্বা হওয়ার ব্যাপারটা একটা মন্তাজ দিয়ে বুঝানো হয়েছে।
মেলোড্রামা ব্যবহারের কারণে ঋত্বিক সমালোচিত ছিলেন কিন্তু তিনি মেলোড্রামার ব্যবহারকে বলেছিলেন তাঁর বার্থরাইট এবং একে একটা ‘সিনেমাটিক ফর্ম’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। ঋত্বিকের এই গঠন হয়েছিল গণনাট্য সংঘে বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী থিয়েট্রিক্যাল দর্শনের মাধ্যমে। তিনি ব্রেশ্‌ট ও স্ট্যনিস্লাভস্কির থিয়েট্রিক্যাল দর্শন দ্বারা যেমন প্রভাবিত ছিলেন, একইভাবে তাঁর মধ্যে ছিল বাংলার লোকসংস্কৃতি, গান ও যাত্রার প্রভাব। এর সাথে আইজেনস্টাইন, বুন্যুয়েলের মত পরিচালকদের সিনেমাটিক দর্শনের মিশেলের ফলে ঋত্বিকের নিজস্ব একটা মেলোড্রামাটিক ধরণ তৈরী হয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনী, উপনিষদ, কার্ল জাং এবং মার্ক্সবাদের দর্শনকে একত্র করে একটা মেলোড্রামাটিক ফর্ম তৈরী করার চেষ্টা ঋত্বিকের মধ্যে সচেতনভাবেই ছিল। তাঁর বক্তব্য প্রকাশের জন্য তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং কাকতালীয় ঘটনার ব্যবহার করতেন। পৌরাণিক কাহিনী, বিচ্ছিন্নতার প্রভাব এবং কাকতাল ব্যবহারের ব্যাপারে ব্রেশ্‌ট এর প্রভাব ঋত্বিক নিজেই স্বীকার করেছেন। আবার তাঁর সিনেমাটিক ধরণের মধ্যে আছে ওয়াইড এ্যাঙ্গেল লেন্সের বহুল ব্যবহার, অপ্রচলিত এ্যাঙ্গেল থেকে শট নেওয়া, অভিনয়ে অধিক অভিব্যক্তি প্রদর্শন, গান ও সাউন্ড ইফেক্ট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদি। বাংলা সিনেমার ‘বাস্তব’ রূপ এর পাশাপাশি ঋত্বিকের এই ‘মেলোড্রামা’ ধাঁচকে অনেক সমালোচক ভাল চোখে দেখেননি। তাই হয়ত ঋত্বিক বলেন, ‘আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব যে, ইট ইজ নট এন ইমেজিনারি স্টোরি বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে হাতুড়ি মেরে বোঝাব যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি, সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েন্ট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে উঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে উঠেন, আমার প্রোটেস্টটাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা’।
মেঘে ঢাকা তারা ঋত্বিকের এই ধাঁচ থেকে বাইরে নয়। নীতা চরিত্রটি এই সিনেমাতে অনেক কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে। পৌরাণিক চরিত্র দূর্গার আদলে নীতার চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন ঋত্বিক, তাই দেখা যায় যে নীতা সর্বংসহা, অন্যের সুখ শান্তির জন্যই তাঁর সারাজীবন কেটে যায়। একই কারণে নীতা পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য এবং জগদ্ধাত্রী পূজোর দিন নীতার জন্মদিন। আবার নীতা চরিত্রের সাথে মিল পাওয়া যায় উমা বা পার্বতীর। ঋত্বিক বলেন, ‘শত শত বছর ধরে বাঙ্গালী নারী ও বধূদের উমারূপেই দেখা হয়ে আসছে’। তাই আমরা দেখি পরিবারের কারণে নীতার স্ত্রীসত্ত্বা ও মাতৃসত্ত্বা বিকশিত হতে পারে না। নীতার বাবা যখন নীতাকে পালিয়ে যেতে বলেন তখন ব্যবহৃত ‘আয়গো উমা’ লোকগানের মাধ্যমে এই ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন ঋত্বিক। নীতাকে এখানে কোন নতুন বধূ হিসেবে নয়, একজন নির্বাসিত হিসেবে দেখা যায়। এই গানের মাধ্যমে আরও বোঝা যায় যে, উমার সময় এসেছে তার স্বামী শিবের সঙ্গে মহামিলনের। হিন্দু পুরান অনুসারে, হিমালয় পর্বতে এ মহামিলন হয়েছিল। তাই পরের শটে নীতাকে একটি পাহাড়ে দেখা যায়। কিন্তু পৌরাণিক ঘটনাকে উল্টে দিয়ে মিলনের জায়গায় নীতার আসন্ন মৃত্যুর আভাস দিয়ে ঋত্বিক যেন নীতার মৃত্যুকে আরও মহিমান্বিত করতে চেয়েছেন। নীতা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে ঋত্বিক মূলত বৃহত্তর বঙ্গদেশকেই বুঝাতে চেয়েছেন, বাঙ্গালী সমাজ যাকে দেশভাগের মাধ্যমে বলি দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু হার না মানা ঋত্বিক তবু স্বপ্ন দেখান এক নতুন আরম্ভের। তাই এক সাক্ষাতকারে ঋত্বিক বলেছিলেন, ‘মানুষের অবক্ষয় আমাকে আকর্ষণ করে। তার কারণ এর মধ্য দিয়ে আমি দেখি জীবনের গতিকে, স্বাস্থ্যকে। আমি বিশ্বাস করি জীবনের প্রবাহমানতায়। আমার ছবির চরিত্ররা চিৎকার করে বলে আমাকে বাঁচতে দাও। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সে বাঁচতে চায়- এ তো মৃত্যু নয়, জীবনেরই জয় ঘোষণা’।
সিনেমার দর্শনের ব্যাপারে ঋত্বিক বলতেন, ‘সিনেমা কোন গূঢ় ব্যাপার নয়। আমি মনে করি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই সিনেমা নির্মাণ শুরু হয়। কারও যদি নিজস্ব কোন দর্শন না থাকে, তার পক্ষে কোন কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব নয়’। ঋত্বিকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর সিনেমাগুলোতে স্পষ্ট, দেশভাগের ফলে শরনার্থী হবার যে যন্ত্রণা তাঁর মধ্যে ছিল সেটা তিনি নানাভাবেই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। ঋত্বিকের নিজের ভাষায়, ‘বাংলা ভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহন করতে পারিনি – আজও পারিনা। ইতিহাসে যা হয়ে গেছে তা পাল্টানো ভীষন মুশকিল, সেটা আমার কাজও নয়। সাংস্কৃতিক মিলনের পথে যে বাধা, যে ছেদ, যার মধ্যে রাজনীতি-অর্থনীতি সবই এসে পড়ে, সেটাই আমাকে প্রচন্ড ব্যথা দিয়েছিল’।
ঋত্বিক যে সাংস্কৃতিক মিলনের কথা বলেছেন সেটা তিনি চিত্রায়ণ করেছিলেন তাঁর পরের সিনেমাতে যার নাম কোমল গান্ধার। নির্মাণ করেছিলেন ১৯৬১ সালে। কোমল গান্ধার উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি রাগ বিশেষ। এই রাগের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই সিনেমার এই নামকরণ। এ ছবির মূলসুর দুই বাংলার মিলনের। আজীবন দেশভাগের যে যন্ত্রণা ঋত্বিককে সহ্য করতে হয়েছে এ যেন তারই নৈবেদ্য। একই পাড়ার নাটকদলের সদস্যরা বিভক্ত হয়ে দুইটি আলাদা দল গঠন করে। ‘দক্ষিণাপথ’ দলে আগত নতুন সদস্য অনুসূয়া এবং ‘নিরীক্ষা’ দলের ভৃগু এই সিনেমার প্রধান চরিত্র। তারা দুজনেই ছিন্নমূল, দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে বিতাড়িত। স্বপ্নভঙ্গ ও নতুন করে স্বপ্ন দেখা— এই আশা-নিরাশার দোলাচলে ভৃগু ও অনুসূয়ার অবস্থানই চলচ্চিত্রের বিষয়। মুর্শিদাবাদের কাছে পদ্মার তীরের যে রেললাইনটা অবিভক্ত বাঙলায় যোগচিহ্নের মত ছিল সেটা এখন কেমন যেন বিয়োগ চিহ্ন হয়ে গেছে, সেখান থেকে দেশটা কেটে দু’টুকরো হয়ে গেছে। সেই সীমান্তে দাঁড়িয়ে ভৃগু-অনসূয়ার স্মৃতি রোমন্থন, কিন্তু বাস্তবতা হল তাঁরা আর কোনদিন সেখানে ফিরে যেতে পারবেনা, ওটা বিদেশ। কোমল গান্ধার এর বাইরের ব্যাপারটা একটি নাট্য আন্দোলন হলেও এখানে প্রকৃত বিষয়টা অতীত ও বর্তমানকেই নির্দেশ করে। সাতচল্লিশের দেশভাগের প্রতীকী রূপ বহন করে কোমল গান্ধার। তাই শেষে দেখা যায় যে, যৌথ উদ্যেগে একটি নাটক মঞ্চস্থ করার চেষ্টা কিছু সুবিধাবাদী, ঈর্ষাতুর মানুষের চক্রান্তে ভেস্তে যায়। ঋত্বিকের ভাষায় যেভাবে সাংস্কৃতিক মিলনের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতি-অর্থনীতির মত বিষয়গুলো। কিন্তু আশাবাদী ঋত্বিক হাল ছাড়েন না। বহু বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে ভৃগু আর অনুসূয়ার মিলনের মাধ্যমে ঋত্বিক আমাদের একটা স্বপ্নময় আরম্ভে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
এই সিনেমার বক্তব্য প্রকাশে আবহসঙ্গীতের একটি মূখ্য ভূমিকা রয়েছে। সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন জোতিরিন্দ্র মৈত্র। এই ছবিতে ঋত্বিক দুইটি রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি’ গানটি ব্যবহার করেন, এছাড়াও বিয়ের প্রাচীন সুরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। সুপ্রযোজ্য দুইটি লেইট মোটিফের ব্যবহার করেছেন ঋত্বিক। একটি বিচ্ছেদ দেখাতে, অন্যটি মিলন। দেশভাগের ফলে ভৃগু ও অনুসূয়ার শরনার্থী হবার কষ্টটাকে দর্শকদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে রেল লাইনের ট্র্যাকের উপরে ঋত্বিক যে ট্রলি শটটা নিয়েছিলেন, তার পেছনে তিনি ‘দোহাই আলী, দোহাই আলী’ কথাটি আবৃত্তির মত করে শুনিয়েছিলেন। এই একই কথাটি আবার তিনি ফিরিয়ে আনেন সিঁড়ির উপর থেকে নেওয়া অনুসূয়ার একটি হাই-এ্যাঙ্গেল শটের সময়, যখন ফার্দিনান্দ নামক যুবকটির অকস্মাৎ আগমনের ফলে অনুসূয়ার সাথে ভৃগুর বিচ্ছেদের সম্ভাবনা দেখা দেয়। আবার ভৃগু-অনুসূয়ার প্রথম সাক্ষাতের সময় যে বিয়ের গানটি বাজে, সেটিই পুনরায় বেজে ওঠে পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে ভৃগু-অনুসূয়ার পূর্ব বাংলার স্মৃতি রোমন্থনের সময়, সেটাই আবার সিনেমার শেষে ভৃগু-অনুসূয়ার মিলনের দৃশ্যে লেইট মোটিফ হিসেবে ফিরে আসে। সিনেমাটির সংলাপও যথেষ্ঠ শক্তিশালীভাবে বক্তব্য প্রকাশ করতে পেরেছে। নাটকের মঞ্চে পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতা চলে আসা বৃদ্ধ শরনার্থী যখন বলে, ‘আমার মায়েরে আমি আজ পর বানাইলাম, আমার নিজের মায়েরে’, তখন তাঁর মনের বেদনা অনুভব করতে দর্শকদের কোন সমস্যা হয় না।
কোমল গান্ধার যেমন সাংস্কৃতিক মিলনের কথা বলে, তেমনভাবে ঋত্বিকের পরের ছবি সুবর্ণরেখা বর্ণনা করে দেশভাগের কুফলসমূহ। ১৯৬২ সালে তৈরী হলেও মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৫ সালে। দেশভাগের ফলে ছিন্নমূল হয়ে কলকাতা চলে আসে ঈশ্বর ও তাঁর ছোটবোন সীতা, আরেক শরনার্থী হরপ্রসাদের মতই আশ্রয় নেয় নবজীবন কলোনীতে। ছোট্ট সীতার চোখে নতুন বাড়ির স্বপ্ন। বোন সীতাকে যেন অভাবে মরতে না হয় এই কামনায় ঈশ্বর চাকরি নেয় সুবর্ণরেখা নদীর ধার ঘেঁষা ছাতিমপুরে। সেখানে সাথে করে আরও নিয়ে যায় মা হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট ছেলে অভিরামকে। বহুবছর কেটে যায়, ঈশ্বরের জীবনে অভাব কেটে যেতে থাকে, সীতা-অভিরাম বড় হয়। একটা সময় সীতা ও অভিরাম পরষ্পরকে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু জাতের পার্থক্যের কারণে বেঁকে বসে ঈশ্বর। তাই সীতা-অভিরাম পালিয়ে যায় কলকাতায়, তাদের ছেলে বিনুর জন্ম হয়। কিন্তু সীতার কপালে বেশীদিন সুখ সয় না, দূর্ঘটনায় মারা যায় অভিরাম। অনন্যোপায় সীতা পতিতাবৃত্তি বেছে নিতে বাধ্য হয় আর ঘটনাক্রমে তাঁর প্রথম খদ্দের হিসেবে মাতাল অবস্থায় হাজির হয় বড়ভাই ঈশ্বর। আত্মহননের মাধ্যমে সীতার জীবনের সমাপ্তি ঘটে কিন্তু থেকে যায় ছেলে বিনু। তাকে সঙ্গে করেই আবার নতুন বাড়ির সন্ধানে যাত্রা শুরু হয় ঈশ্বরের, ঋত্বিকের বৃত্তরচনা সম্পন্ন হয়।
ঋত্বিক তিনটি প্রজন্মের গল্প বলেছেন এই সিনেমাতে। প্রথম প্রজন্ম ঈশ্বর, হরপ্রসাদ। দ্বিতীয় প্রজন্ম সীতা, অভিরাম। তৃতীয় প্রজন্ম বিনু। দেশভাগ ও তার ফলাফলের কারণে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে প্রথম দুইটি প্রজন্মের স্বপ্ন-আকাঙ্খা। তৃতীয় প্রজন্ম মাত্র তাঁর যাত্রা শুরু করেছে, তাঁর ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা আমরা জানি না। তবে ঋত্বিক চেয়েছিলেন যেন তা সুন্দর হয়, তাই সিনেমার শেষে লিখে দিয়েছিলেন, ‘জয় হোক মানুষের, ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের’। সীতা চরিত্রটিকে ঋত্বিক নির্মাণ করেছেন পৌরাণিক কাহিনীর আদলে। মিথিলার জনক রাজা একদিন হাল চাষ করতে করতে মাটির মধ্যে পেয়েছিলেন ছোট্ট মেয়ে সীতাকে, পৃথিবীর কন্যা সীতা সপ্তকান্ড রামায়ণের শেষে আবার পৃথিবীর কোলেই ফিরে গিয়েছিল। সিনেমাতে সীতার আত্মহননের মাধ্যমে ঋত্বিক সেই ফিরে যাওয়াকেই নির্দেশ করেছেন। আবার সতীর পৌরাণিক কাহিনীর সাথে সীতা চরিত্রের মিল আছে। সতীর বাবার নাম ছিল দক্ষ এবং তিনি সতীকে শিবের সাথে বিয়ে দিতে মোটেই রাজী ছিলেন না। সুবর্ণরেখাতে ঈশ্বর হচ্ছেন দক্ষের প্রতিনিধি, যিনি সীতার বাবার মত, আর অভিরাম চরিত্রটি শিবের প্রতিনিধিত্ব করছে। সতীকে যেমন তাঁর সতীধর্ম প্রমাণের জন্য আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল তেমনি সীতার ক্ষেত্রেও একই পরিণতি আমরা দেখতে পাই। আবার সীতার মুখে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ব্যবহার করে ঋত্বিক চরিত্রটিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন রাধা রূপে। যে কিনা কৃষ্ণের প্রতীক্ষায় আছে, সীতার ক্ষেত্রে যেটা অভিরাম। এই রাধা-কৃষ্ণের বিচ্ছেদবেদনার রূপকের মধ্য দিয়ে ঋত্বিক যে ডিলেমা সৃষ্টি করেছেন, এর মাধ্যমে তিনি দেশভাগের যন্ত্রণা এবং একটি মিলনের আকুতি ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি ঋত্বিক লেইট মোটিফ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বাল্যকালে সীতা এই গানটি গেয়ে ঘুরে বেড়াত, সেটাই সে তাঁর ছোট্ট ছেলেকে শিখিয়ে দিয়ে যায়। সিনেমার শেষদিকে বিনুর কন্ঠে যখন গানটি বেজে ওঠে, তখন ঘটনা প্রবাহের সাথে মিলেমিশে তা এক অসাধারণ মেটাফোরের সৃষ্টি করে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি ঋত্বিক যেন আরও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন। শুঁড়িখানার দৃশ্যে আর সীতার আত্মহননের সময় যে বাজনাটা ব্যবহার করা হয়েছে তার নাম ‘প্যাট্রিসিয়া’। নিনো রোটার এই কম্পোজিশনটি ফেদেরিকো ফেলিনি ব্যবহার করেছিলেন তাঁর লা দলচে ভিতা সিনেমার উন্মত্ততান্ডবের দৃশ্যে, যেখানে তিনি গোটা পশ্চিমী সভ্যতার মুমূর্ষুতাকে ধরে চাবকেছেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে এই একই ধরণের একটা কথা বলার ইচ্ছা থেকেই ঋত্বিক এটা ব্যবহার করেছিলেন।
মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধারসুবর্ণরেখা এই তিনটি সিনেমাকে একত্রে ‘পার্টিশন ট্রিলজী’ বা ‘দেশভাগ ত্রয়ী’ বলা হয়ে থাকে। তিনটি মুভিতেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি বড় ভূমিকা আছে। একটি সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক বলছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারি না। আমার জন্মের অনেক আগেই তিনি আমার সমস্ত অনুভূতি জড়ো করে ফেলেছিলেন। তিনি আমাকে বুঝেছিলেন এবং সেসব লিখেও ফেলেছিলেন। আমি যখন তাঁর লেখা পড়ি তখন আমার মনে হয় যে সবকিছুই বলা হয়ে গেছে এবং নতুন করে আমার আর কিছুই বলার নেই’।
অযান্ত্রিক এর সময় থেকে ঋত্বিকের অল্প অল্প মদ্যপানের শুরু। সিনেমাগুলোর বাণিজ্যিক অসফলতার কারণে বাড়তে লাগল হতাশা আর সেই সাথে মদ্যপানের মাত্রা। ১৯৬২ সালে বানালেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সিজর্স ও ১৯৬৩ সালে ডকুমেন্টরী ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান। এই সময় বগলার বঙ্গদর্শন নামে একটি সিনেমার কাজ শুরু করলেও আর শেষ করতে পারেননি। কোমল গান্ধার ফ্লপ হওয়াটা ছিল কফিনের শেষ পেরেক। ১৯৬৫ সালের দিকে বাংলা মদ ধরলেন, এমনকি গোসল করাও ছেড়ে দিলেন। তাঁর এমন জীবনযাত্রার ফলে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর স্ত্রী ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হলেন। মদ্যপান নিয়ে একটা মজার ঘটনা প্রচলিত আছে। এক রাত্রে ঋত্বিক ফিরছেন, ঠিক হেঁটে ফেরার অবস্থায় নেই তখন আর। ট্যাক্সি, অগত্যা, পকেটে পয়সা না থাকা সত্ত্বেও।
‘ভাড়া, স্যার…’
‘আমার কাছে টাকা নেই। তুমি এক কাজ করো – এখান থেকে সোজা ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে চলে যাও। সেখানে গিয়ে দেখবে, একটা ঢ্যাঙা লোক দরজা খুলবে। ওকে বোলো, ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি করে ফিরেছে, সঙ্গে টাকা ছিল না। ও টাকা দিয়ে দেবে’।
সেই দীর্ঘকায় ব্যক্তি, যা শোনা যায়, সেইবার, এবং এরপর বারবার, ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছিলেন। ঋত্বিক তাঁকে উত্যক্ত করতেন, কিন্তু মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করতেন, ‘ভারতবর্ষে সবথেকে ঠিকঠাক ক্যামেরা বসাতে জানে ঐ ঢ্যাঙা লোকটাই’। তারপর অবিশ্যি যোগ করতেন, ‘আর হ্যাঁ, আমি খানিকটা জানি’।
দীর্ঘকায় ব্যাক্তিটি, যার মতে সিনেমার সম্ভাব্য কোন বিষয় নিয়ে লিখতে ঋত্বিক বাদ রাখেননি, ছিলেন আরেক কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়।
১৯৬৬ সালে ঋত্বিক পুনের ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন এবং পরে ভাইস প্রিন্সিপাল হন। এখানে শিক্ষকতা করার সময় তিনি ফিয়াররঁদেভূ নামের দুইটি সিনেমার সাথে যুক্ত ছিলেন। ঋত্বিক তার এই শিক্ষকতা জীবনকে চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের উপরেই স্থান দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি মনে করি, আমার জীবনে যে সামান্য কয়েকটি ছবি করেছি সেগুলো যদি পাল্লার একদিকে রাখা হয়, আর মাস্টারি যদি আরেক দিকে রাখা হয় তবে মাস্টারিটাই ওজনে অনেক বেশি হবে। কারণ কাশ্মীর থেকে কেরালা, মাদ্রাজ থেকে আসাম পর্যন্ত সর্বত্র আমার ছাত্র-ছাত্রীরা আজকে ছড়িয়ে গেছে। তাদের জন্য আমি যে সামান্য অবদান রাখতে পেরেছি সেটা আমার নিজের সিনেমা বানানোর থেকেও বেশী গুরুপ্তপূর্ণ’। এরপর ১৯৬৯ সালের দিকে অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় ঋত্বিককে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে এইসময়কালে কোন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে না পারলেও তিনি কিছু তথ্যচিত্র ও শর্টফিল্মের কাজ করেন। এর মধ্যে আছে সায়েন্টিস্টস্‌ অফ টুমরো(১৯৬৭), ইয়ে কিঁউ(১৯৭০), পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য নিয়ে পুরুলিয়ার ছৌ(১৯৭০), লেনিনের ১০০তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমার লেনিন(১৯৭০), বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে দূর্বার গতি পদ্মা(১৯৭১) এবং আরও পরে ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজকে নিয়ে তথ্যচিত্র রামকিঙ্কর(১৯৭৫, অসমাপ্ত)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরনার্থীদের জন্য সাহায্য সংগ্রহে ঋত্বিকের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথাও শোনা যায়।
ঋত্বিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে ফিরে আসেন ১৯৭৩ সালে। একজন বাংলাদেশী প্রযোজকের প্রযোজনায় অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস থেকে তৈরী করেন তিতাস একটি নদীর নাম। তিতাস নদীপাড়ের জেলেদের জীবন নিয়ে এই সিনেমার গল্প। ছোটবেলা থেকেই কিশোর আর সুবলের পথ চেয়ে থাকে বাসন্তী। দূর গ্রামে গিয়ে রাজার ঝিকে বিয়ে করে কিশোর কিন্তু তাঁর অন্তঃস্বত্তা বৌকে উঠিয়ে নিয়ে যায় ডাকাতের দল। বৌয়ের শোকে বদ্ধ পাগল হয়ে গ্রামে ফেরে কিশোর। বাসন্তী বিয়ে করে সুবলকে কিন্তু ঘটনাক্রমে সুবল মারা যায় বৌভাতের পরের দিন। দশবছর পরে রাজার ঝি তাঁর অচেনা স্বামীর খোঁজে ছেলে অনন্তকে নিয়ে তিতাসের তীরে আসে। ঘটনার আবর্তে কিশোর আর রাজার ঝি দুইজনেই মারা যায়। অনাথ অনন্তের দায়িত্ব নেয় নিঃসঙ্গ বাসন্তী, কিন্তু সেও অনন্তকে ধরে রাখতে পারে না। এদিকে কিছু সুবিধাবাদী মানুষের ষড়যন্ত্রে মালো সমাজের একতা নষ্ট হয়ে যায়, তারা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। শুকিয়ে যেতে থাকে তিতাসের জল, জেলেদের উপর নেমে আসে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়। নদী শুকিয়ে চর জেগে ওঠে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় মালোপাড়া। কিন্তু শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, চরে গজিয়ে ওঠা নতুন ঘাসের মধ্যে দিয়ে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে ছুটে আসছে একটি শিশু। নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়ে সিনেমাটি শেষ হয়। ঋত্বিকের ভাষায়, ‘একটি সভ্যতাকে কি চিরতরে ধ্বংস করে ফেলা যায়? না, যায় না। এর শুধু রূপান্তর ঘটে। এটাই আমি এই ফিল্মের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলাম’।
এই সিনেমাতে ঋত্বিক একটি এপিক মন্তাজের ব্যবহার করেছিলেন। মায়ের কাছ থেকে অনন্ত শিখেছিল যে ভগবতী মানে সকলের মা। তাই অনন্তের মা মারা যাবার পর সে ভগবতী/দূর্গারূপে তার মা’কে কল্পনা করে। সিনেমার থিম মিউজিকটি ঋত্বিক নিজেই তৈরী করেছিলেন, বাকীগুলো করেছিলেন ওস্তাদ বাহাদুর খান। বিয়ের দৃশ্যে ‘লীলাবালি লীলাবালি’ গানটি একটি সুপ্রযোজ্য সঙ্গীত ব্যবহারের উদাহরণ। এই জনপদের গল্প বলার জন্য ঋত্বিক বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ গানগুলোকেই বেছে নিয়েছিলেন। হাইপারলিঙ্ক ফরম্যাটে বর্ণনা করা প্রথমদিকের সিনেমাগুলোর মধ্যে তিতাস একটি নদীর নাম অন্যতম। এই সিনেমা সম্পর্কে ঋত্বিক বলেন, ‘তিতাস পূর্ব বাংলার একটা খণ্ডজীবন, এটি একটি সৎ লেখা। ইদানীং সচরাচর বাংলাদেশে (দুই বাংলাতেই) এ রকম লেখার দেখা পাওয়া যায় না। এর মধ্যে আছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান, আছে দর্শনধারী ঘটনাবলী, আছে শ্রোতব্য বহু প্রাচীন সঙ্গীতের টুকরো – সব মিলিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ ও অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করা যায়। ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়ার জন্য জন্ম থেকেই কাঁদছিল। … অদ্বৈতবাবু অনেক অতিকথন করেন। কিন্তু লেখাটা একেবারে প্রাণ থেকে, ভেতর থেকে লেখা। আমি নিজেও বাবুর চোখ দিয়ে না দেখে ওইভাবে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে। বইয়ে তিতাস একটি নদীর নাম। তিনি এর পরের পুণর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরেও এই পুণর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার যৌবনবতী। আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা’। এই পুণর্জীবন ধারণের মাধ্যমেই ঋত্বিক আমাদের একটি স্বপ্নময় নতুন জীবনের প্রারম্ভে পৌঁছে দেন।
একজন কম্যুনিস্ট হিসেবে ঋত্বিক তার সিনেমার মাধ্যমে সমাজের অরাজকতা আর অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন প্রতিনিয়ত। তাঁর কোন ছবিতেই আমরা উচ্চবিত্তের গল্প দেখতে পাই না। তিনি চিরকাল বঞ্চিতজনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, শোষিত মানুষের সমর্থনে উচ্চকন্ঠ থেকেছেন। ক্রমাগত অসুস্থতা আর অতিরিক্ত মদ্যপানে শরীর ভেঙ্গে পড়ার পরও তাই ঋত্বিক হাল ছাড়েন না। তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলোর মতই নতুন দিনের স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, ‘আমি আজও মরে যাইনি। আমি আজও হার স্বীকার করিনি। আমি নীরবে সে সুযোগের অপেক্ষায় আছি। আজ না পারি কাল, কাল না পারি পরশু প্রমাণ করে দেব। আজ আমি সংগ্রামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখি। তাদের আমি ভুলে যাইনি। অভাব, অনটন, অপবাদ কিছুই আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না তার জন্য যে মূল্যই দিতে হয় আমি প্রস্তুত’।
ঋত্বিকের এই জীবন দর্শনের প্রতিফলন তাঁর শেষ ছবি যুক্তি তক্কো আর গপ্পো। ১৯৭৪ সালে নির্মিত এই সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র। মূল চরিত্র একজন মাতাল বুদ্ধিজীবী নীলকণ্ঠ বাগচী, যে তাঁর বন্ধুদের মত সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে নিজেকে বিক্রি করে দেয়নি। তাকে মদের নেশা থেকে ফেরাতে না পেরে তাঁর স্ত্রী দূর্গা ছেলে সত্যকে নিয়ে কাঞ্চনপুর নামের একটা জায়গায় শিক্ষিকার চাকরি নিয়ে চলে যায়। নীলকণ্ঠের সাথে পরিচয় হয় যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা বঙ্গবালার। ঘর-বাড়িহীন নীলকণ্ঠ আর তাঁর ছাত্র নচিকেতা’র সঙ্গী হয় বঙ্গবালা। তাঁরা তিনজন কলকাতা শহরের স্টেশনে, রাস্তায় ইতস্তঃত উদ্দেশ্যহীন সময় কাটাতে থাকে। পরিচয় হয় চাকরিসন্ধানী বৃদ্ধ জগন্নাথ ভট্টাচার্য এবং ছৌ নৃত্যের নামকরা পঞ্চানন ওস্তাদের সাথে, কিন্তু তাদের জীবনেও শুধু হাহাকার। অবশেষে নীলকণ্ঠ কাঞ্চনপুরে তার স্ত্রীর কাছে যাওয়ার জন্য পদব্রজে রওনা হয়, জীবনের নকশাটাকে পাল্টাতে চায়। কাঞ্চনপুর পৌঁছাবার পরে নীলকণ্ঠ তাঁর স্ত্রীকে এই সিদ্ধান্ত জানায় এবং পরদিন সকালে প্রথম সূর্যের আলোয় তাঁর ছেলে সত্যের মুখ দেখে সেই যাত্রা শুরু করার আশা ব্যক্ত করে। কাছের শালবনে কিছু নকশাল ছেলেদের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। পরদিন সকালে তাদের উপরে পুলিশ আক্রমণ করলে অতর্কিত গুলি লেগে মারা যায় নীলকণ্ঠ। মৃত্যুর পূর্বে স্ত্রীকে মনে করিয়ে দিয়ে যায় মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মদন তাঁতির কথা, নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে তাঁতি সমাজের সাথে বেঈমানী করেনি, ভূবন মহাজনের টাকায় যে তাঁত চালায়নি। শেষ দৃশ্যে নীলকণ্ঠের বয়ে নিয়ে যাওয়া লাশের পেছনে সবার হেঁটে চলার মাধ্যমে ঋত্বিক যেন নীলকণ্ঠের সেই কাঙ্খিত যাত্রারই সূচনা করেন।
নীলকণ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন ঋত্বিক স্বয়ং। সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক হলেও এটা ১৯৪৭ এর দেশভাগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আর নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সময়ের একটি নির্মোহ-নির্মম সমালোচনাও বটে। এই ছবির ব্যাপারে ঋত্বিক বলেন, ‘১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমি যেমনটি দেখেছি, যুক্তি তক্কো আর গপ্পোতে আমি ঠিক সেটাই দেখাতে চেয়েছি। এটাতে কোন ভাবাদর্শের বর্ণনা নেই। আমি কোন রাজনীতিকের দৃষ্টিতে এটাকে দেখিনি। কোন রাজনৈতিক ভাবাদর্শকে তুষ্ট করা আমার কাজ নয়’। ঋত্বিকের জন্মস্থান পূর্ববাংলার প্রতি তাঁর ভালবাসা প্রকাশিত হয় যখন নীলকণ্ঠ বঙ্গবালাকে বলে, ‘তুমি কি আমার বাংলাদেশের আত্মা?’। নীলকণ্ঠের বন্ধুদের দিয়ে একটা প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখা যায়। ক্ষয়ে যাওয়া দর্শনে তাই নীলকণ্ঠকেই মনে হয় ভাঙ্গা বুদ্ধিজীবি। শেষ দৃশ্যে মদন তাঁতির উপমা দিয়ে ঋত্বিক বুঝিয়ে দেন যে নীলকণ্ঠও তাঁর মত মানবিকতার প্রশ্নে আমৃত্যু আপোষহীন। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সম্ভাবনার যে মৃত্যু ঘটছে প্রতিনিয়ত সেটা আমরা বুঝতে পারি নকশাল নেতার সাথে নীলকণ্ঠের আলাপচারিতার মাধ্যমে। এ ছবিতে ব্যবহৃত সঙ্গীত দুই বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছে। তাই আমরা রবীন্দ্রনাথের গান যেমন পাই তেমনি দেখি বাউল গানের ব্যবহার। এছাড়া পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্যের অসাধারণ চিত্রায়ন সংস্কৃতির একটা দিককে তুলে ধরে। সুবর্ণরেখাতে যেমন বাড়িতে ফেরার তাগিদ দেখা যায়, এই সিনেমাতেও তেমন রাজনৈতিক অশান্তি ও সাংস্কৃতিক বিভাজন পার হয়ে একটি স্থিতিবস্থায় ফেরার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বর্তমান অস্থিতিশীল অবস্থায় তাই ঋত্বিক বারবার নীলকণ্ঠের মুখ দিয়ে বলিয়ে নেন উইলিয়াম ব্লেকের ‘দ্যা টাইগার’ কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত কিন্তু কিঞ্চিত পরিবর্তিত সংলাপ, ‘আমি পুড়ছি, ব্রক্ষ্মাণ্ড পুড়ছে, সব পুড়ছে’।
তিতাস একটি নদীর নাম ফিল্মের শূটিং করার সময় যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানে তাঁর জীবনীশক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসে। ঋত্বিক ঘটক মারা যান ১৯৭৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি, কলকাতায়। তাঁর মৃত্যু সংবাদে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘হৃদয়ে ও আত্মায় ঋত্বিক ছিলেন একজন আপাদমস্তক বাঙ্গালী পরিচালক, তিনি ছিলেন আমার থেকেও বৃহত্তর বাঙ্গালী’।
চল্লিশ দশকের শেষভাগ থেকে সত্তর দশকের শুরু পর্যন্ত বাংলার উত্তাল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঋত্বিকের সিনেমাগুলোতে প্রতিনিয়ত ফুটে ওঠে। ঋত্বিকের জীবদ্দশায় তিনি দুইবার বাংলাকে ভাগ হতে দেখেছিলেন— ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ সরকারের চাপিয়ে দেওয়া দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। নিজের সিনেমাগুলোতে তিনি সমালোচনার দৃষ্টিতে ব্যক্তি পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত দেশভাগ পরবর্তী বাংলার পরিচয়কে বারংবার প্রশ্নবিদ্ধ করেন। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এতসব রাজনৈতিক বিভক্তি ও সীমানা ভাগাভাগির মধ্যেও তাঁর সিনেমাগুলোর মাধ্যমে আজীবন বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সন্ধান করে গেছেন।
ঋত্বিক ছিলেন সিনেমার বিপ্লবী। সিনেমা বানানো তাঁর কাছে শুধু শিল্প ছিল না, ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এবং দুঃখী মানুষের প্রতি তাঁর সমর্থন প্রকাশের মাধ্যম। রঙিন কোন অবাস্তব চমক তিনি দেখাতে চাননি, বরং নিজের চোখে যা প্রত্যক্ষ করেছেন সেটাই দর্শককে দেখাতে চেয়েছেন। নিজে ভেবেছেন, আমাদেরও ভাবাতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অভাব-অনটন, ঝড়-ঝঞ্ঝা ছিল, কিন্তু তিনি নিজের দর্শনের সাথে আমৃত্যু আপোষ করেননি। কাজের স্বীকৃতি সীমিত হলেও তিনি তাঁর সৃষ্টির তাড়না থেকে বিচ্যুত হননি কখনও। স্ত্রী সুরমা ঘটককে তিনি বলতেন, ‘লক্ষ্মী, টাকাটা তো থাকবে না, কাজটা থাকবে। তুমি দেখে নিও আমি মারা যাওয়ার পর সব্বাই আমাকে বুঝবে’। আজ আমরা জানি, ঋত্বিক ঘটক ভুল বলেননি।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com