Smiley face

Bonds Are Forever

james_bond_will_return____by_arkadeburt-d5iaupj
জেমস বন্ডের জন্মদিন উপলক্ষ্যে বন্ডের পূর্বাপর নিয়ে লিখেছেন  ইমতিয়াজ আজাদ
১.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ের কথা।
ব্রিটিশ এক ভদ্রলোক সিদ্ধান্ত নিলেন বই লিখবেন। যে সে বই নয়, রীতিমত স্পাই থ্রিলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি কাজ করতেন ব্রিটেনের ন্যাভাল ইন্টেলিজেন্স ডিভিশনের হয়ে। তিনি চিন্তা করলেন সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এক স্পাই চরিত্র সৃষ্টি করার। প্লট রেডি, আইডিয়াও মাথায় ঘুরছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়। স্পাইয়ের জন্য তিনি যুতসই কোন নাম খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি চাচ্ছিলেন তাঁর সৃষ্ট স্পাইয়ের নামটা হবে এমন, যাতে তাকে একদমই নীরস আর কাঠখোট্টা একজন লোক বলে মনে হয়। নাম শুনেই যেন আগ্রহ হারিয়ে ফেলে অনেকে।
এর কিছুদিন পরের কথা। খোঁজ তখনও জারি আছে। নামের খোঁজে সেই ভদ্রলোক হাতড়ে চলেছেন দুনিয়ার বই। এরই মধ্যে ক্যারিবিয়ান পাখিদের নিয়ে 44987931-cachedলেখা একটি বই চোখে পড়ল তাঁর। সেই বইয়ের লেখকের নাম দেখে তাঁর মনে হল, “আরে! এই নামই তো খুঁজছিলাম এতদিন!!”
সেই স্পাই থ্রিলার গল্পের লেখকের নাম ইয়ান ফ্লেমিং। আর তাঁর সৃষ্ট স্পাই চরিত্রের নাম “বন্ড, জেমস বন্ড”।
১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হল বন্ড সিরিজের প্রথম বই ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’। এই ধরণের স্পাই থ্রিলার আগে লেখা হয়নি, তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশক কিছুটা গাঁইগুঁই করছিলেন। তবে প্রকাশ হওয়ার পরে কাটতি দেখে নিশ্চয়ই আর কোন সন্দেহ ছিল না প্রকাশক মশাইয়ের। পরের বছরই বেরোল সিরিজের দ্বিতীয় বই ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’। এরপর থেকে ফ্লেমিঙের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতি বছরই বেরিয়েছে একটা করে বন্ড নভেল। এমনকি মারা যাওয়ার পরের দু’বছরেও বেরিয়েছে দুটি বই। যাকে ফ্লেমিং সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন একজন আনইন্টারেস্টিং মানুষ হিসেবে; সেই মানুষটা গোটা দুনিয়া জুড়ে হয়ে উঠেছেন দুর্দমনীয় পৌরুষের প্রতীক।
২.
জেমস বন্ডকে নিয়ে নতুন করে লেখার কি কিছু আছে? তবুও বলা যাক কিছু কথা। জেমস বন্ড একজন ব্রিটিশ স্পাই। প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র বানচাল করে দিতে সে একমেবাদ্বিতীয়ম। নেভির এক্স কমান্ডার। পরে তাঁকে নিয়ে আসা হয় অন হার ম্যাজেস্টি’জ সিক্রেট সার্ভিস সংক্ষেপে MI6-এ। কোডনেম ০০৭। প্রিয় অস্ত্র ওয়ালথার পিপিকে। চরম দুঃসাহসী এবং রমণীমোহন পুরুষ। বিবাহিত। স্ত্রী মারা গেছেন; নাম টেরেসা বন্ড। জেমস বেশীরভাগ সময় ডিনার জ্যাকেট পরে থাকেন। হাতে থাকে রোলেক্স ঘড়ি। প্রিয় পানীয় ভদকা মার্টিনি — শেকেন, নট স্টিয়ারড।
ইয়ান ফ্লেমিং রচিত সকল জেমস বন্ড নভেলঃ
১। ক্যাসিনো রয়্যাল (১৯৫৩)
২। লিভ অ্যান্ড লেট ডাই (১৯৫৪)
৩। মুনরেকার (১৯৫৫)
৪। ডায়মন্ডস আর ফরএভার (১৯৫৬)
৫। ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ (১৯৫৭)
৬। ডঃ নো (১৯৫৮)
৭। গোল্ডফিঙ্গার (১৯৫৯)
৮। ফর ইয়োর আইজ অনলি (১৯৬০) (ছোটগল্প)
৯। থান্ডারবল (১৯৬১)
১০। দ্য স্পাই হু লাভড মি (১৯৬২)
১১। অন হার ম্যাজেস্টি’স সিক্রেট সার্ভিস (১৯৬৩)
১২। ইউ অনলি লিভ টোয়াইস (১৯৬৪)
১৩। দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান (১৯৬৫)
১৪। অক্টোপুসি এবং দ্য লিভিং ডেলাইটস (১৯৬৬) (ছোটগল্প)
ফ্লেমিং মারা যান ১৯৬৪ তে। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশ পায় “দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান” ও “অক্টোপুসি অ্যান্ড দ্য লিভিং ডেলাইটস”।
৩.
১৯৫৮ সালে ক্যাসিনো রয়্যাল উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করা হয় টিভি সিরিজ। সে সিরিজে নায়কের নাম অবশ্য জেমস বন্ড ছিল না, ছিল জিমি বন্ড। জিমি বন্ডের চরিত্রে অভিনয় করেন ব্যারি নেলসন নামের এক অভিনেতা। মুখ থুবড়ে পড়ে সিরিজটি। এ কারণে এমজিএম যখন বন্ডকে নিয়ে সিনেমা বানাতে চাইলো, নায়কের ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেন ইয়ান ফ্লেমিং। ফ্লেমিঙের ভাষায় জেমস বন্ডের চরিত্রে যে অভিনয় করবে তাকে লম্বায় হতে হবে ছয় ফুটের উপরে, থাকতে হবে পুরুষালি কণ্ঠস্বর, পেশী হবে পাকানো দড়ির মতো, চুলগুলো হবে কোঁকড়ানো কিন্তু মসৃণ, গতি হবে চিতা বাঘের মতো। উপস্থিত বুদ্ধিতে সে হবে সকলের সেরা, খেলনার মতো অস্ত্র চালাতে জানতে হবে, ebcce22e38ebd77c069e86df2d9a0506মেয়েদের কাবু করতে যার চোখের একটি পলকই যথেষ্ট। কিন্তু দয়া-মায়া-মমতা বলতে তার মধ্যে কিছু থাকতে পারবে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেল এক স্কটিশ অভিনেতাকে। নাম তাঁর শন কনারি। দুর্দান্ত সব অ্যাকশনের পাশাপাশি তার অনবদ্য রসিকতা সবার মনে ধরেছিল। দু’ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট গুঁজে শন কনারির তীব্র পুরুষালি কণ্ঠে সেই পরিচয় প্রদান ‘মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড’ আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা সংলাপ।
প্রথম বন্ড ছিলেন শন কনারি। বন্ড সিরিজের ৬টি মুভিতে অভিনয় করেন তিনি। টানা ৫টা ছবি করার পরে শিডিউল ব্যস্ততার কারণে আসেন জর্জ ল্যাজেনবি; অন হার ম্যাজেস্টি’জ সিক্রেট সার্ভিসে। এই মুভিতেই বিয়ে করে বন্ড। কিন্তু বিয়ে করে ফেরার পথে আততায়ীর গুলিতে মারা যায় টেরেসা। ল্যাজেনবি ছিলেন অতিরিক্ত লাজুক। বন্ড চরিত্রের জন্য যা একেবারেই বেমানান। ফলে আবারও ফিরে আসেন শন কনারি ডায়মন্ডস আর ফরএভার ছবিতে; শেষবারের মতো। কারণ বয়স হয়ে যাচ্ছিল কনারির।
শন কনারির দুটো মজার ঘটনা উল্লেখ করছি।
১। বন্ড ছবির স্বত্ব এমজিএম মানে মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ারের (হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওই যে একটা সিংহ হাঁউ মাঁউ খাঁউ করে)। ডায়মন্ডস আর ফরএভার মুভির পরে কনারিকে জিজ্ঞেস করা হয়, আবার ডাকা হলে তিনি বন্ড চরিত্রে ফিরবেন কিনা? কনারি জবাব দিলেন ‘নেভার এগেইন।’
এর প্রায় ১০ বছর পরে একটা আনঅফিশিয়াল বন্ড মুভিতে অভিনয় করেন তিনি। আনঅফিশিয়াল বলছি এই কারণে যে এই ছবি মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ারের ছিল না। ছিল ওয়ারনার ব্রাদার্সের। সেই ছবির নাম কী ছিল চিন্তা করুন তো!!
‘নেভার সে নেভার এগেইন।’
২। কনারি একবার জোরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্পীড লিমিট ক্রস করার জন্য তাঁকে আটকাল এক সার্জেন্ট।
সার্জেন্টের নাম?
জেমস বন্ড!
কী বন্ডতালীয় ব্যাপারস্যাপার!!
৪.
কনারি না করে দেবার পরে খোঁজ শুরু হলো নতুন বন্ডের জন্য। দুই প্রযোজক ব্রকোলি আর সল্টজম্যান গিয়ে ধরলেন ক্লিন্ট ইস্টউডকে। ইস্টউড সরাসরি না করে দিলেন। বললেন, এই চরিত্রটা কোন ইংরেজ অভিনেতা করলেই ভালো হবে। এরপর পল নিউম্যান আর রবার্ট রেডফোর্ডেকেও বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষমেষ এলেন রজার মুর। বন্ড হিসেবে একদম পারফেক্ট ছিলেন। চরিত্রটাকে তিনি নিজের মতো করে পোর্ট্রে করেছেন। একটু মজাদার আর রোম্যান্টিকভাবে। a_40_year_james_bond_timeline_640_16জেমস বন্ড সিরিজের সর্বাধিক (৭) মুভিতে বন্ড হিসেবে অভিনয় করেছেন মুর।
কিন্তু সবাইকেই যেতে হয় একসময়।
নতুন নায়কের প্রয়োজন হল আবার। এলেন টিমোথি ডাল্টন। নায়ক হিসেবে খারাপ ছিলেন না। তবে শ্যুটিঙে সময়মতো না আসায় ২টা মুভির পরে বাদ যান তিনিও। আসলেন পিয়ারস ব্রসনান। নিঃসন্দেহে এখন পর্যন্ত সবচে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া বন্ড তিনি। তবে ব্রসনানই একমাত্র বন্ড, যিনি কিনা ইয়ান ফ্লেমিঙের লেখা কোন গল্পে অভিনয় করেননি।
২০০৩ সালে ডাই অ্যানাদার ডে’র পরে বন্ড ছেড়ে দেন ব্রসনান। পরের বন্ডের আগে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়ে যায় কে হচ্ছে পরবর্তী বন্ড? তালিকায় ছিল কলিন ফ্যারেল, ক্লাইভ ওয়েন, ইউয়ান ম্যাকগ্রেগরের মতো তারকারা। কিন্তু সবাইকে অবাক করে বন্ড হিসেবে নির্বাচিত হন উঠতি তারকা ড্যানিয়েল ক্রেইগ। বন্ডভক্তরা মেনে নিতে পারেনি তাঁকে। ক্রেইগনটবন্ড.কম নামে ওয়েবসাইটও খুলে ফেলা হয়। কিন্তু ক্যাসিনো রয়্যালে তার অ্যাকশন, অ্যাটিচ্যুড দেখে মুখ বন্ধ হয়ে যায় সবার।
শোনা যাচ্ছে, ক্রেইগও নাকি চলে যাবেন বন্ড সিরিজ থেকে। তাহলে কে হবেন নতুন বন্ড? বাতাসে নাম ভাসছে অনেকেরই। তবে দৌড়ে এগিয়ে আছেন দুই ‘টম’- হার্ডি আর হিডলস্টোন। আরও শোনা যাচ্ছে বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচের নাম। মাইকেল ফেসবেন্ডার (যদিও তিনি এর মাঝে না করে দিয়েছেন) আর হিউ জ্যাকম্যানের নামও এসেছে। বন্ড হতে পারেন এদ্রিস এলবাও। ব্লন্ড বন্ডের পরে ব্ল্যাক বন্ডের দেখা পেলে অবাক হবেন না একেবারেই।
৫.
বই থেকে শুরু করেছিলাম, আবার সেখানেই ফিরে যাই। ১৯৬৬ সালে ফ্লেমিঙের শেষ বই প্রকাশ হয়। সেখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৮১ সালে জন গার্ডনার নামক একজন লেখক আবার শুরু করেন বন্ড সিরিজ। তাঁর প্রথম বইয়ের নাম ছিল ‘লাইসেন্স রিনিউড’। ১৯৯৬ পর্যন্ত টানা ১৬ বছরে ১৬টি বন্ড উপন্যাস লেখেন তিনি যার ২টি অবলম্বনে তৈরী হয় সিনেমা। ১৯৯৭ সালে বন্ড লেখা শুরু করেন রেমন্ড বেনসন। ৬ উপন্যাস, ৩ ছোটগল্প আর ৩ নভেলাইজেশনের পরে ছেড়ে দেন ২০০২ সালে। বন্ড সিরিজ বন্ধ থাকে ৬ বছর।
২০০৮ সালে ইয়ান ফ্লেমিঙের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত হয় সেবাস্টিয়ান ফক্সের বন্ড নভেল ‘ডেভিল মে কেয়ার’। জেফরি ডিভারের লেখা ‘কার্টে ব্লানশে’ বের হয় ২০১১’তে। ২০১৩’তে প্রকাশিত হয় উইলিয়াম বয়েডের ‘সলো’। আর এখন পর্যন্ত শেষ বন্ড নভেল ‘ট্রিগার মর্টিস’ বেরিয়েছে ২০১৫’তে। লিখেছেন অ্যান্থনি হরোউইৎজ।
ইয়াং বন্ড নামেও একটা সিরিজ আছে। সিরিজটা লেখেন চার্লি হিগসন। সিরিজের প্রথম বই ‘সিলভারফিন’। এই বই অবলম্বনেই লেখা হয়েছে মাসুদ রানার ‘দুরন্ত কৈশোর।’ বন্ডের পাশাপাশি মানিপেনিকে (বন্ডের বস M-এর সেক্রেটারি হলো মানিপেনি) নিয়েও তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে দ্য মানিপেনি ডায়েরিজ নামে। কেট ওয়েইস্টব্রুক ছদ্মনামে বইগুলো লিখেছেন স্যমান্থা ওয়াইনবার্গ।
৬.
ইয়ান ফ্লেমিং তাঁর কোন বইয়ে জেমস বন্ডের কোন জন্মতারিখ বা সাল দিয়ে যাননি। কিন্তু জন পিয়ারসনের ‘জেমস বন্ডঃ দ্য অথোরাইজড বায়োগ্রাফি অফ ০০৭’ বইয়ে লেখা আছে জেমস বন্ডের জন্ম ১১ নভেম্বর, ১৯২০ সালে। আরেকটি সূত্র বলছে, ১১ নভেম্বর ঠিক আছে, কিন্তু সালটা ১৯২১। বয়স হোক ৯৫ অথবা ৯৬; তবুও অ্যাকশন, সাথে দুষ্টের দমন, আর তার সাথে একটু-আধটু লেডিকিলিং-চলতে থাকুক অবিরত।
শুভ জন্মদিন, মিঃ জেমস বন্ড!

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com