fb_img_1480558063484
সি এফ জামান
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের কথা উঠলেই সবার মনে প্রথম যে কয়টি নাম আসে আবার তোরা মানুষ হ তার মধ্যে অন্যতম। ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পরিচালক হিসেবে খান আতাউর রহমানের প্রথম ছবি। এ ছবিতে অভিনয় করেন ফারুক, আসাদ, আমির হোসেন বাবু, আল মনসুর, দুলাল, মারুফ, কাজী এহসান, খান আতা, সরকার ফিরোজ, ববিতা, রওশন জামিল, ওবায়েদুল হক সরকার, খলিল সহ আরো অনেকে। আমাজাদ হোসেনের কাহিনী নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য, সংলাপ, গীত ও সঙ্গীত রচয়িতা খান আতা নিজেই।
যুদ্ধপরবর্তী বিশৃঙ্খলা নিয়েই এই চলচ্চিত্রের মূল কাহিনী কেন্দ্রীভূত হয়। এখানে দেখা যায় একদল সৎ মুক্তিযোদ্ধা নিজেদের চোখের সামনে দেখে ‘16 Division’ খ্যাত কিছু নামধারী মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যায় লুটতরাজ, সহ্য করতে না পেরে ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা নিজেরাও শুরু করে দেয় একই কাজ! কিন্তু তাঁদের কলেজের অধ্যক্ষ এটা মেনে নিতে পারেননা, তিনি তাঁদের জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করে তাঁদের অস্ত্র জমা দিয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু তারা সে কথা মানেনা। এদিকে অধ্যক্ষর এক ছেলে এক মুক্তিযোদ্ধার বোনের সাথে ভালবাসার নামে প্রতারণা করে। ফলশ্রুতিতে বিয়ের আসরে মুক্তিযোদ্ধার গুলিতে সে প্রাণ হারায়, অপরদিকে অপমানের হাত থেকে বাঁচার জন্য মেয়েটিও আত্মহত্যা করে। অধ্যক্ষ নিজেকে পুত্রের হত্যাকারী বলে ঘোষণা করে সমস্ত অপরাধের ভার আপন কাঁধে তুলে নেন এবং পুলিশের কাছে ধরা দেন। পুলিশের সঙ্গে জেলে যাওয়ার সময় অধ্যক্ষ তাঁর স্ত্রীকে বলেন, ‘তুমি এক ছেলে হারিয়েছ কিন্তু তোমার সাত ছেলে (মুক্তিযোদ্ধাদের দেখিয়ে) রেখে গেলাম।
আজ থেকে ৪৩ বছর আগে মুক্তি পাওয়া এই অসামান্য চলচ্চিত্রটির অভিনয় এবং নির্মাণশৈলী নিয়ে নতুন করে বলার কিছুই নেই। খুব কম চলচ্চিত্র থাকে যেগুলোর প্রায় সমস্ত দিক সমানভাবে পরিষ্ফুটিত হয় আর এটি তেমনই এক চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের জন্য একাধারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ পরিচালক এবং শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের বাচসাস পুরষ্কার জিতে নেন খান আতাউর রহমান। তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার মনোনয়নও পান যদিওবা তা অবশেষে সিবি জামানের ‘ঝড়ের পাখি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য রাজ্জাকের ঝুলিতে যায়।
শুধু অভিনয় বা নির্মাণশৈলীই নয়, এই চলচ্চিত্রটি অনেকের মনে গেঁথে আছে এর অনবদ্য সঙ্গীতের জন্য। আবিদা সুলতানা’র কন্ঠে ‘তুমি চেয়েছিলে ওগো জানতে’ তৎকালীন তুমুল শ্রুতিপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। বিশেষ করে শাহনাজ রহমতউল্লাহ’র কন্ঠে গাওয়া ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’ আজও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শোনা যায়। বলা প্রযোজ্য যে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’ গানটিতে খান আতা যা বলেছিলেন (হয়তোবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লিখা রবে না, বড় বড় লোকেদের ভীড়ে, জ্ঞানী আর গুনীদের আসরে, তোমাদের কথা কেউ কবে না / তোমাদের কথা রবে সাধারণ মানুষের ভীড়ে, মাঠে মাঠে কিষাণের মুখে, ঘরে ঘরে কিষাণী বুকে) তা আজ ৪০ বছ পরে এক বিমূর্ত সত্য হয়ে গিয়েছে।
‘আবার তোরা মানুষ হ’ মুক্তিলাভের পর বিভিন্ন মহল থেকে যেমন প্রশংসা পেয়েছে তেমনই সমালোচনারও শিকার হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আর কোন চলচ্চিত্র নিয়ে এতটা আলোচনা/সমালোচনা হয়েছে কিনা তা সন্দেহ। ছবিটি মুক্তির আগেই অনেকে এর বিরোধিতা করা শুরু করেন, এমনকি এ ছবিকে সেন্সর সার্টিফিকেট প্রশ্নে শুরুতে সেন্সরবোর্ডও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। অনেকেই খান আতা’র বিরুদ্ধে বলা শুরু করেন যে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করার জন্য এ ছবি বানিয়েছেন; মুক্তিযোদ্ধারা কি অমানুষ ছিল, যে তারা নতুন করে মানুষ হবে! অবশেষে খান আতা এফডিসিতে শো করে বড় বড় মুক্তিযোদ্ধাদের ডেকে ছবিটি দেখিয়েছিলেন। তাঁরা সবাই ছবিটি দেখে চোখের পানি মুছতে মুছতে হল থেকে বেরিয়েছিলেন, কেউই খান আতা’র বিরুদ্ধে কোন কথা বলেননি।
১৯৭১ এ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে মির্মিত এই চলচ্চিত্রটি এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম। অনেকের মতেই এটি খান আতা’র জীবনের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। হয়তোবা খান আতা নিজেও এটাই চেয়েছিলেন, তা না হলে ‘সাত ভাই চম্পা’ কিংবা ‘অরুণ বরুণ কিরণ মালা’র মত বিষয়বস্তু বাদ দিয়ে তিনি ‘আবার তোরা মানুষ হ’ এর মত একটি দূরদর্শী চলচ্চিত্র নির্মান করতেন না।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *