Smiley face

চলচ্চিত্র ভাবনাঃ পিকে দর্শন ও এলিয়েনের ধর্মাভাব

p-k-2014
স্নিগ্ধ রহমান
পিকে নিয়ে প্রথম দর্শনে আমার অভিমত ছিল, ধর্মের ভেতরে বসে যারা অধর্ম করছে তাদের দারুণ একহাত নেওয়া হয়েছে এই ছবিতে। আর সেই একই বছর প্রায় একই থিমের আরো একটি ভারতীয় মুভি মুক্তি পেয়েছিল, ওহ মাই গড! কিন্তু পিকে ছবির লেখকদ্বয় (রাজকুমার হিরানি ও আভিজাত জোশি)-এর একটা সাক্ষাৎকার দেখে, নীচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে বাধ্য হলাম। দুটো ছবি দৃশ্যত একই ছাঁচের মনে হতে পারে, কিন্তু তাদের পরিসীমা ভিন্ন। পিকে ছবির মাধ্যমে তারা আসলে কিছু মেসেজ দিয়েছেন। আর সেই মেসেজ দেবার জন্য তারা অত্যন্ত চতুর কিছু কৌশল অবলম্বন করেছেন।
প্রথমে আসি ধর্ম বিশ্বাসের কথায়। এখান থেকেই পিকে ইউনিক এক অবস্থান নিয়ে নেয়। “ওহ মাই গড!” বলছে ঈশ্বর আছে (স্বরূপে কৃষ্ণের উপস্থিতি যার প্রমাণ)। সেখানে পিকে বলছে ঈশ্বর নেই। অন্তত মানুষ প্রচলিত যে সকল রূপে জেনে আসছে, সেভাবে নেই। কিন্তু পুরো কথাটা পিকে বলেছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। পিকে এসেছে অন্য গ্রহ থেকে। সেখানে মানুষ পোশাক পড়ে না, চোখের পলক ফেলে না। আর মুখ দিয়ে কথাও বলে না। সবাই মাইন্ড রিডিঙের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। যেহেতু একজন অন্যজনের মনের কথা জানতে পারছে, তাই সেখানে মিথ্যা বলারও সুযোগ নেই। পরে আমরা জানতে পারি, পিকে ধর্মের কনসেপ্টের সঙ্গে পরিচিত নয়। তার গ্রহে মিথ্যা আর ধর্ম দুটোই নেই। মুখে কখনো না বললেও বুঝিয়ে দেয়, এই গ্রহে ধর্ম আর মিথ্যা দুটোই আছে।
এখন মনে হতে পারে, পুরো বিষয়টিকে প্রয়োজন ছাড়াই জটিল বা ওভার-এক্সপ্লেইন করা হচ্ছে কিনা। এখানেই লেখকদ্বয়ের ধর্মবিশ্বাসের কথাটি চলে আসে। রাজকুমার হিরানি আর আভিজাত জোশি দুজনেই agnostic বা অজ্ঞেয়বাদী (এখানে উল্লেখ্য যে, নাস্তিক আর অজ্ঞেয়বাদী কিন্তু এক না)। এছাড়া তারা দুজনেই আব্রাহাম কুভুর (Abraham Kovoor)-এর লেখার প্রতি অনুরক্ত। সেই সঙ্গে কমেডিয়ান জেরি সাইনফেল্ড ও রিকি জারভেইসের ভক্ত, যারা দুজনেই নাস্তিক। তাছাড়া এমন থিম নিয়ে রিকি জারভেইসের নিজেরও একটি মুভি আছে, The Invention of Lying (না, দুটো মুভির মাঝে কোন মিল নেই)। মুভিতে তারা এই দ্বন্দ্বটাকে নিয়ে এলেন। সেই সঙ্গে নীৎশেয়ান একটা ফ্লেভারও রাখলেন। যেমন : ক্লাইম্যাক্সের এক অংশে তপস্বী মহারাজ বলে , “পিকে দুইদিন পর এসে বলবে, গড ইজ ডেড।” যেটা কিনা ফ্রেডরিক নীৎশের খুব বিখ্যাত একটা উক্তি (God is dead. God remains dead. And we have killed him)।

 

pk1

এখানে পিকে চরিত্রটিকে এলিয়েন করে দেওয়া একটা মাস্টারস্ট্রোক হয়েছে। কারণ তারা এই মুভির মাধ্যমে যা বলতে চেয়েছেন, পিকে এলিয়েন হওয়ায় সব কয়টা পারপাজই সার্ভ করা সম্ভব হয়েছে। এই পৃথিবীর কেউ ধর্ম নিয়ে এত প্রশ্ন করলে, গল্পটা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতো। কিন্তু পিকে অন্য গ্রহ থেকে আসায়, তার মাঝে একটা শিশুসুলভ সারল্য রাখা সম্ভব হয়েছে। এমনকি এই পৃথিবীতেও পিকের আগমন হয়েছে অন্য সব সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর মতোই- নগ্নভাবে। এলিয়েন পিকের একটা ক্ষমতাও আছে। পিকে কারো হাত ধরে, তার স্মৃতিতে প্রবেশ করতে পারে। প্রাথমিক স্ক্রীপ্টে পিকে’র আরো একটি ক্ষমতা ছিল। সে মানুষের মনের ভেতরে ঢুকে কোন স্মৃতি পাল্টে দিতে পারতো। ইনিশিয়াল ড্রাফটে আভিজাত আর রাজু হিরানি একটু ভিন্নভাবে এন্ডিং টেনেছিলেন। সাতচল্লিশের দেশভাগ দুই দেশের (বা আরো স্পষ্ট করে বললে দুই ধর্মের) মানুষের মনে যে তিক্ততা জন্ম দিয়েছে, পিকে ক্লাইম্যাক্সে সেটা পাল্টে ফেলবে। তার বদলে সেখানে একটা সুন্দর স্মৃতি দিবে। কিন্তু ইতোমধ্যে ইনসেপশন দেখে তাদের মনে হলো, প্লট মিলে যাচ্ছে। সুতরাং তারা ঠিক করলেন সেকেন্ড হাফে কোর্টরুম ড্রামা হবে, যেখানে পিকে গডের বিরুদ্ধে মামলা করবে। কিন্তু তারা জানতে পারলেন গল্পটা একটা গুজরাটি নাটক Kanji Virudh Kanji (যেটা থেকে পরবর্তীতে ওহ মাই গড মুভিটা হয়েছে) আর অস্ট্রেলিয়ান মুভি The Man Who Sued God-এর সঙ্গে মিলে যায়। পরবর্তীতে তারা আরো সময় নিয়ে বর্তমান ক্লাইম্যাক্সটা টানেন।
এবার আসি দ্বিতীয় বিষয়ে। প্রথম দর্শনে ক্লাইম্যাক্সটাকেও আমার ততটা যুৎসই মনে হয়নি। আর আমি সেটা মেনেও নিয়েছিলাম। কারণ রাজকুমার হিরানি আর আভিজাত জোশি বরাবরই একটু অ্যান্টি ক্লাইম্যাটিক ঘরানার লোক। মুন্না ভাই এমবিবিএস থেকে শুরু করে থ্রি ইডিয়টস প্রতিটা মুভিতেই আমরা কিছুটা নন-সিনেম্যাটিক ক্লাইম্যাক্স পেয়েছি (আমি ক্লাইম্যাক্সের কথা বলছি। এন্ডিং আর ক্লাইম্যাক্সকে গুলিয়ে ফেলবেন না যেন)।
পিকে’র ক্লাইম্যাক্সে দেখা যায় আনুশকা (জাগ্গু) যে চিঠিটা পেয়েছিল সেটা আসলে সারফারাজ (সুশান্ত সিং রাজপুত) লেখেনি। প্রথমবার ভেবেছিলাম, তপস্বী মহারাজের উপর পুরো দোষটা চাপিয়ে দিলেই ভালো হতো। যেমন: তার কোন অনুসারী হয়তো মিথ্যা চিঠিটা পাঠিয়েছে। কিন্তু সেটা না করে তারা এমন একটা সিচুয়েশন দেখালেন, যেটা নেহায়েতই কাকতালীয়। একজনের চিঠি আরেকজনের কাছে চলে গিয়েছে। আর সেটা থেকেই বিয়ে করতে যাচ্ছে এমন এক কাপল মুহূর্তের মাঝে আলাদা হয়ে গেল। এটাকে কাকতাল ছাড়া আর কি বলবো! আভিজাত জোশি এখানে চিঠিটাকে ম্যাকগাফিন হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। চার্লস ডিকেন্সের টেল অফ টু সিটিজের এক চেহারার দুইজন যেমন রূপক হিসেবে ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে আরো দুটো বিষয় এখানে এসেছে। দেশভাগের পর থেকে এই উপমহাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা যেন দানবের আকার ধারণ করেছে। সেটা পার্শ্ববর্তী দেশের প্রতি বিরূপ মনোভাব কিংবা নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রেও সত্য। আমাদের প্রিকনসিভড নোশন (পিকে’র ভাষায় “রং নাম্বার”) যেমন এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি আরেকটি বিষয়ও আছে। জাগ্গু আর সারফারাজ আসলে রূপক অর্থে দুই ধর্মের সকল মানুষ, যাদের বিভক্তির মূল কারণ হলো মিস কমিউনিকেশন ও কমিউনিকেশন গ্যাপ।

446044-pk-trans

গল্পে সরাসরি  এত ভারী মেসেজ দিলে দর্শক তো নিবে না। এজন্য হিরানি-জোশি দুটো কাজ করলেন। তপস্বী মহারাজ ক্যারেক্টারটাকে প্রধান ভিলেন বানিয়ে দিলেন। একটা কমন এনিমির উপস্থিতি এবং ক্লাইম্যাক্সে তার পরাজয় দর্শককে আনন্দ দেয়। সর্বোপরি গল্পটাকে শুগারকোটেড করে ফেলে। আর সেই সঙ্গে রাখলেন একটা ডিস্ট্র‌াকশন- পিকে আর জাগ্গুর লাভ ইন্টারেস্ট।
তবে এই লেখার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাসের কোন সংযোগ নেই। সার্বিক চিন্তা করে যা মনে হয়েছে সেটাই তুলে ধরলাম। ছবির ঘটনা প্রবাহকে হয়ত অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনো একবার বলেছিলেন, “I always hope that if one million people see my movie, they see one million different movies”। অন্য কেউ সেই অন্য ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করলে তাকে অভিবাদন। আলোচনার দরজাটা খোলাই থাকলো।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com