Smiley face

এরাইভালঃ মানবতায় পূর্ণ এক ফিকশানের গল্পনামা

16838106_1857093167845287_564433672_n
৮৯ তম অস্কার আসরে খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই আটটি মনোনয়ন পেয়ে তাক লাগিয়ে দেয় ডেনিস ভিলনুয়েভের সাইফাই মুভি "এরাইভাল"। আর এই এরাইভালকে নিয়েই লিখেছেন নিশাত সালসাবিল রব

16837845_1857093161178621_1974918432_n

২০১৪ সালে বড় পর্দায় 'ইন্টারস্টেলার' অসাধারণ নৈপুণ্যে দেখিয়ে দেয় কীভাবে আমাদের অস্তিত্ব ভালবাসার উপর নির্ভর করে, ভালবাসার জন্যই টিকে থাকে । অবসাদ কিংবা ব্যথাও কিন্তু ভালবাসার একটি অংশ কিংবা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে জীবনে স্থান করে নেয়, মানবতাকে অনেকাংশে সংজ্ঞায়িত করে। 'ইন্টারস্টেলার' সর্বকালের সেরা সাইফাই মুভিগুলোর একটি হতো, যদি চিরন্তন এই অবসাদ, জীবনের মেলানকোলি, শেষ পর্যন্ত বহন করতে রাজী থাকতো। হয়তো নোলান ব্যক্তিজীবনেও এভাবেই ভালবাসাকে সংজ্ঞায়িত করেন। 'ইন্টারস্টেলার' তাই সমাপ্তিতে অর্থের চেয়েও অসংখ্য থিওরীকে ইন্সপায়ার করে, জনপ্রিয় পথে বাঁক নেয়। 'এরাইভাল' সেদিক দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুভিটি তার বার্তায় আনএপোলোজেটিক এবং সর্বদা এক ধাপ এগিয়ে। পরিচালক আমাদের শুদ্ধতম অনুভূতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, খেলা করেন। যোগাযোগ, সময় এবং দৃশ্যতা কিংবা স্মৃতি, এ সবকিছুকে ঘিরে মানবতায় পূর্ণ এক গল্প বলেন। পৃথিবীর বারোটি স্থানে বারোটি স্পেসক্র্যাফটস নেমে আসে, যার মধ্যে আমেরিকার মন্টানা একটি। মানবজাতির এই বিপদের সহায় কোন সানগ্লাস পরিহিত একশন হিরো নয়, বরং একজন বুদ্ধিমতী ভাষাবিদ - 'লুইস', যার মধ্য দিয়ে আমাদের পৃথিবীর সেরাটা ফুটে উঠে। আগতদের এবং মন্টানায় কর্মরতদের মূল উদ্দেশ্য উগ্রতা প্রদর্শন নয়, বরং একধরণের বোঝাপড়া গড়ে তোলা, যে বোঝাপড়া নির্ধারণ করবে জীবনের গতিপথ। ডেনিস ভিলনুয়েভের কাজ প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে। 'ইনসেন্ডিস'-এ ইতিহাসের পাতায় ধীরে ধীরে ট্র্যাজেডি আনফোল্ড করেছেন, 'সিকারিও'-তে হিংস্রতাকে ঘিরে পরিচালনায় অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছেন আর 'এরাইভাল'-এ আমরা দেখেছি তার ফিল্ম নিয়ে বোঝাপড়াটা কতটা পরিপূর্ণ, তার দক্ষতা কতোটা অনন্য, কতোটা বহূর্মুখী! লুইস চরিত্রে অভিনয় করা এমি এডামস এই নিয়ে পাঁচবার অস্কার-মনোনয়ন পেলেন, কিন্তু তার জীবনের সেরা কাজটার জন্য এবার একটা নমিনেশন পর্যন্ত পেলেন না! পর্দায় তাকে দেখে অভিভূত হয়েছি। তিনি হাঁটছিলেন এমনভাবে মনে হচ্ছিল মানুষটা এবার পড়ে যাবে, হাসছিলেন এমন কায়দায় মনে হচ্ছিল এখনই কেঁদে ফেলবেন! খাপছাড়াভাবের মাঝেও এতো নিয়ন্ত্রণ, কে পারতেন পর্দায় দেখাতে?
 
ভালো সায়েন্স ফিকশন শুধুই ভবিষ্যতের কথা বলে না, বরং কখনো কখনো বর্তমানের প্রতিফলক হিসেবে আমাদের জীবনযাত্রার কথা বলে। 'এরাইভাল' এমন একটা মুভি, যেখানে এলিয়েনদের পৃথিবীতে আগমন - এই সম্পূর্ণ এপিসোডই রূপক অর্থে দেখা যায় এবং তাতেও গল্পের অর্থ বিন্দুমাত্র বদলে যায় না। আমরা সবাই বর্তমানে এমন একটা সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন পৃথিবীতে ভিন্ন রংয়ের, ভিন্ন সংস্কৃতির এবং ভিন্ন দেশের মানুষ পরস্পরকে শত্রু হিসেবে ধরে নিচ্ছে। যোগাযোগের অভাব এবং নিজেদের মধ্যে এমন দূরত্ব আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধ টেনে আনছে, সংঘাত টেনে আনছে। ভাষাবিদেরা মনে করেন, প্রত্যেক সংস্কৃতির জন্য বাস্তবতা আলাদা অর্থাৎ বাস্তব জীবনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। ফলে কোন জাতির সাথে সত্যিকার অর্থে ততক্ষণ সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না, যতক্ষণ পৃথিবীর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের সাপেক্ষে আমরা উপলব্ধি করার চেষ্টা না করি। মুভিটি দেখার সময় হারপার লি-র 'টু কিল অ্যা মকিংবার্ড ' পড়াকালীন অসাধারণ অনুভূতিগুলো যেনো ফিরে আসে বারবার। উপন্যাসের ছোট স্কাউটকে আইনজীবী বাবা যেমন সত্যিকার কোন যোগাযোগ স্থাপন না করে মানুষকে বাইরে থেকে দেখে বিচার করতে মানা করতেন, এরাইভাল এতগুলো দশক পরে যেন সেই একই বার্তা পর্দায় তুলে ধরছে। এরাইভালের এলিয়েনদের ভাষা শব্দকে অনুসরণ করে না, অর্থকে করে - মুভির মতই। তাদের বিস্তৃতি তাই আমাদের তুলনায় অসীম। অক্ষরগুলো তাদের বৃত্তাকার, ঘুরে ফিরে তাই জীবনের সূচনায় ফিরে আসে, ঘুরে ফিরে তাই সমাপ্তিতে ফিরে আসে। 'এরাইভাল' বৃত্তের মত আমাদের অনুভূতি, মানবতাকে কেন্দ্র করে যোগাযোগের এবং কল্পনার সকল মাত্রা অতিক্রম করতে চায়। সময় এবং ভাষার যোগসূত্রে শর্তহীন ভালবাসাকে স্থান করে নেয়।
 
লেখক পরিচিতিঃ নিশাত সালসালবিল রব। দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। অবসরে বই পড়তে এবং মুভি দেখতে পছন্দ করেন।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ
 ১৯৮৭ সালের Children of a Lesser God এ অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেয়া Marlee Matlin এখন পর্যন্ত শ্রবণ প্রতিবন্ধী হিসেবে একমাত্র পুরস্কার জয়ী ।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com