Smiley face

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ব্যবসার সমস্যা ও সমাধান

DhallywoodWorld_Logo
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের পরিবেশনা প্রক্রিয়া নিয়ে এ অঙ্গনের মানুষদের অভিযোগের অন্ত নেই। পরিবেশনার নানান ক্রটির কারণে একজন সাধারণ প্রযোজক ছবির আয় ঠিকভাবে ঘরে তুলে তুলতে পারেন না। এর থেকে উত্তরণের উপায় কম-বেশি সবার জানা থাকলেও কেউ কিছু করেন না। জানা-অজানা এই বিষয়গুলোই সহজ করে বলার চেষ্টা করেছেন আহমেদ জামান শিমুল
পরিবেশনা পদ্ধতি
আমাদের দেশে একটি চলচ্চিত্র বানানোর পর একজন সাধারণ প্রযোজক প্রথমে একজন পরিবেশকের কাছে যান। তারা হল মালিককে তিন পদ্ধতিতে সাধারণত ছবি দেন— ফিফটি-ফিফটি, এমজি ও ফিক্সড।
টিকেটের প্রবেশ মূল্যের (গায়ের মূল্য এরচেয়ে বেশি হতে পারে) অর্ধেক প্রযোজক, বাকিটা হল মালিকের—এটি ফিফটি-ফিফটি পদ্ধতি। এমজি মানে হচ্ছে মিনিমাম গ্যারান্টি— এক্ষেত্রে হল মালিক একটা নূন্যতম টাকা দিয়ে ছবিটি এক-দু সপ্তাহের জন্য ভাড়া নেন। ওই টাকার দ্বিগুণের বেশি আয় করলেই প্রযোজক তার অর্ধেক পাবেন। আর ফিক্সডের ক্ষেত্রে হল মালিক নির্দিষ্ট একটা মূল্য দিয়ে ছবিটি ভাড়া নেন এক-দু সপ্তাহের জন্য। এ সময়ের লাভ-ক্ষতি যা-ই হোক সব হল মালিকের।
পরিবেশনায় ক্রটি ও প্রতিবন্ধকতা
এ পরিবেশকরা আবার অনেক মধ্যসত্ত্বভোগীদের মাধ্যমে ছবিটি হলে পৌঁছান— বুকিং এজেন্ট, ডিজিটাল প্রজেকশন কোম্পানি। আরও অনেক মধ্যসত্ত্বভোগী রয়েছে, তবে এ দুই পক্ষ বর্তমানে বাংলাদেশের পরিবেশনা সিস্টেমের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। বুকিং এজেন্টরা পরিবেশকদের কাছ থেকে হল মালিকের কাছে ছবিটি পৌঁছানো বাবদ প্রযোজক থেকে ছবির প্রতি সপ্তাহের আয়ের দশ শতাংশ হারে কমিশন কেটে নেন। সিস্টেমটাই এমন চাইলেও এমন প্রযোজক এদের এড়াতে পারেন না, যদি তিনি অনেক বেশি হলে ছবি মুক্তি দিতে চান।
অন্য দিকে ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশের হলগুলো ডিজিটাল প্রজেকশন মেশিন বসায় জাজ মাল্টিমিডিয়া। তাদের দেখাদেখি স্বল্প পরিসরে অন্য কিছু কোম্পানিও ডিজিটাল প্রজেকশন মেশিনের ব্যবসায় শুরু করেছে। তারা প্রতি সপ্তাহে সর্বনিম্ন ৩-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এটা হল মালিক না দিয়ে দিতে হচ্ছে প্রযোজককে। ফলে একশ হলে একটি ছবি চালাতে গেলে শুধুমাত্র মেশিন ভাড়াই বাবদ প্রযোজককে গুণতে হচ্ছে ১০-১২ লাখ টাকা।
শুধু বুকিং এজেন্ট কমিশন ও মেশিন ভাড়া নয়। এর বাইরে রয়েছে হল প্রতিনিধি নামক আরেক প্রজাতি। যাদের কাজ হচ্ছে হলে প্রতি শোতে কত টিকেট বিক্রি হল সেটা পরিবেশককে জানানো। তারা প্রতিদিন ২০০-৩০০টাকা করে পান। এ টাকাও প্রযোজক দিতে হয়।
একশ হলের জন্য দেখা যায় একজন প্রযোজককে প্রায় ত্রিশ লাখ টাকা প্রথম সপ্তাহেই গুণতে হচ্ছে। অথচ এই টাকাটা তার দেওয়া না লাগলে, অনেক ছবির ক্ষেত্রে লাভ উঠিয়ে আনা সম্ভব। এর বাইরে তো পরিবেশকের ২-১৫% কমিশন, পোস্টার ছাপানো বাবদ আরও ৭-৮ লাখ টাকা খরচ আছেই।
তবে এসবের বাইরে আরো মজার কিছু সমস্যা আছে— "অমুককে দিয়ে ছবি বানান, তমুককের ছবি চলে না"। নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীকে দিয়ে ছবি না বানালে বুকিং এজেন্টরা ছবি নিতে চান না। নিলেও কম টাকা ভাড়া দেন। এত প্রতিবন্ধকতা উতরে একটা ছবি যদি ভাল ব্যবসা করেও বসে, এরপরও একজন সাধারণ প্রযোজক তার ন্যায্য পাওনা বুঝে পান না। হল মালিকরা হল প্রতিনিধিদের ঘুষ দিয়ে প্রতিদিন বিশ হাজার টাকার টিকেট বিক্রি হলে বিক্রি দেখান ছয়-সাত হাজার টাকা। কিংবা অনেক টাকাই দেন না। আরও ভয়াবহ ঘটনা হচ্ছে হল মালিক টাকা দিলেও পরিবেশকের তা মেরে দেওয়া। সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে, গত ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া ‘রানা পাগলা দ্য মেন্টাল’ ছবির পরিবেশক সুদীপ দে'র বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে প্রায় এক কোটি দশ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার।
তাহলে উপায়?
পৃথিবীর সকল সমস্যার মত এটিরও সমাধান রয়েছে। সবাই জানেন অথচ প্রয়োগ করেছেন না এমন কিছু সমাধানের কথা এখানে বলা যেতে পারে।
ই-টিকেটিং চালুঃ একজন প্রযোজক যাতে পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে তার ছবির সেল দেখতে পারেন তার জন্য এ পদ্ধতি। এতে করে টিকেট থেকে চুরির পরিমাণ শতকরা ৬০-৭০ শতাংশ কমে আসবে। শতভাগ চুরি কমে যাবে যদি হল মালিকরা পুরোপুরি সৎ হন।
মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ: দেশের সব জেলায় সম্ভব না হলে বড় ২০-২৫টি জেলায় ১-২টি করে মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ করলে হলে ছবি পৌঁছাতে বুকিং এজেন্টদের কাছে যেতে হবে না। তবে এক্ষেত্রে মাল্টিপ্লেক্স মালিকদের বেশি লাভের আশায় শেয়ার মানি কম পরিমাণে দেওয়া এবং একই বাংলাদেশী ছবি কম চালানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে ছবি চালানোঃ পার্শ্ববর্তী ভারতে একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে সকল সিনেমা হলে ছবি চালানোর ব্যবস্থা করা হয় পাইরেসি রোধে। আমাদের এখানে তা চালু করলে পাইরেসি অনেকাংশে কমে যাবে।
বিভাগীয় পরিবেশক নিয়োগঃ ভারতে প্রতিটা রাজ্যের জন্য আলাদা আলাদা পরিবেশক থাকে। যারা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে ছবিটি ওই অঞ্চলের জন্য কিনে নেন। আমাদের দেশে তা বিভাগ ভিত্তিক করা যেতে পারে। এতে করে প্রযোজকের আয় বাড় বই কমবে না।
হল মালিকদের মেশিন বসাতে বাধ্য করাঃ যেখানে তারা ৩৫ মি. মি. এর যুগে ২০-২২ লাখ খরচ করে প্রজেকশন মেশিন বসাতে পেরেছে সেখানে এখন নূন্যতম ৩ লাখ টাকা খরচ করতে পারছেন না একটি ভাল ডিজিটাল প্রজেকশন মেশিন বসানোর জন্য। তাদেরকে বাধ্য করা উচিত। বলা উচিত না হলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে। আর যদি তারা বসাতে অপারগতা পোষণ করেন সেক্ষেত্রে যেন ভাড়া তারা নিজেরা বহন করেন তা নিশ্চিত করা।
অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে ছবিঃ নেটফ্লিক্স, ইউটিউবসহ বিশ্বের অনেক জনপ্রিয় ওয়েবসাইটে টাকার বিনিময়ে ছবি দেখা যায়। একজন সাধারণ দর্শক প্রতিবার ছবিটি দেখার সময় তারা মোবাইলে একটি কোড আসবে। ওই কোড এন্ট্রি করার সাথে সাথে তার ব্যালেন্স থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে নিয়ে যাবে। তবে এ চার্জ প্রথম দিকে ১০-২০ টাকার বেশি রাখা উচিত হবে না।
এছাড়া শুধুমাত্র সিনেমার বাজার আমাদের দেশ না ভেবে পুরো বিশ্ব ভেবে ছবি বানাতে হবে। এর জন্য ছবির বাজেট বাড়াতে হবে, মান বাড়াতে হবে। এরপর বিশ্বের বড় বড় পরিবেশকদের কাছে ছবি নিয়ে যেতে হবে। এসকল বিষয় নিশ্চিত করা গেলে আমাদের দেশে চলচ্চিত্র ব্যবসার দুরবস্থা কিছুটা হলেও কেটে যাবে।
 
লেখকঃ
আহমেদ জামান শিমুল, চলচ্চিত্র কর্মী ও সাংবাদিক।

Trivia

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com