IMG_4306
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অস্ত্র ছাড়াই লড়াই চালিয়ে যাওয়া ডেসমন্ড ডসের বীরত্বগাঁথা শোনাচ্ছেন আব্বাস আলী
অভিনেতা মেল গিবসন নাকি পরিচালক মেল গিবসন! গিবসনের কোন সত্ত্বাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া যায়? দুই ক্ষেত্রেই তার সফলতা এত বেশি যে একটি ক্ষেত্রকে আলাদা প্রাধান্য দেয়া বেশ কঠিনই। তবে পরিচালক মেল গিবসনই মনে হয় কিছুটা এগিয়ে রাখব। ব্রেভহার্ট, দ্যা প্যাশন অফ দ্যা ক্রাইস্ট, এপোক্যালিপ্টো এর মত মাস্টারপিস মুভি পরিচালককে আলাদা করে সম্মান করতেই হয়। ২০০৬ সালে এপোক্যালিপ্টো’র পর মাঝে দশ বছরের বিরতি। দীর্ঘ দশ বছর পর পরিচালনায় ফিরলেন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের একটি সত্য ঘটনা নিয়ে। স্বভাবতই প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী এবং বরাবরের মতই প্রত্যাশা পূরণে শত ভাগ সফল মেল গিবসন। পরিচালনায় প্রত্যাবর্তনের জন্য বেছে নিলেন ব্যাটেল অফ ওকিনাওয়া ( Battle of Okinawa ) এর বীরত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। বীরের নাম ডেসমন্ড ডস। মরনাস্ত্র স্পর্শ না করেই যিনি হয়েছিলেন যুদ্ধের মহাবীর। ডেসমন্ড ডস যিনি "conscientious objector" হিসেবে আমেরিকার সর্বোচ্চ পুরুস্কার মেডেল অফ অনার লাভ করেন।
অ্যামেরিকান পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে নির্মিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে মুভিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই  বায়াজড আর বিরক্তির উদ্বেগ ঘটায়। কিন্তু ডেসমন্ড ডসের বীরত্ব গাঁথা জানা থাকায় অ্যামেরিকান পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে নির্মিত হ্যাকস’ রিজ আগ্রহে কোন ভাটা ফেলতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত শিল্ডলার্স লিস্ট, সেভিং প্রাইভেট রায়ান, দ্যা পিয়ানিস্ট, দ্যা ইংলিশ পেসেন্ট, দ্যা বুক থিফ, দ্যা ফ্লাওয়ারস অফ ওয়ার ইত্যাদির মত মাস্টার পিস সিনেমার কাছাকছি কি যেতে পারবে? হ্যাকস’ রিজ দেখার পরে অবশ্য নির্দ্বিধায় এই মাস্টারপিস মুভি তালিকায় নামটা উঠিয়েই দেয়া যায়।
যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, নৃশংসতা, নির্মমতা! এই নৃশংসতার মাঝে একটু খানি মানবতাই অনেক কিছু। কিন্তু এই মানবতা যদি যুদ্ধের ধ্বংসলীলার চেয়েও বড় হয়ে যায়, তখন তাকে কি বলা যায়? যুদ্ধের নৃশংসতার মাঝে ভালোবাসা আর মানবতার জয়গানেরই জয়জয়কার হ্যাকস’ রিজ মুভিতে।
সম্মুখ সমরের মূল মন্ত্র কি? হয় মারো নয়ত মরো! এর মাঝে মনে হয় না আর কোন পথ খোলা থাকে যুদ্ধ জয়ের। সম্মুখ সমরে দলের একজনের ভুলের কারণে পুরো ইউনিট এর সদস্যদের উপর বিপদ নেমে আসতে পারে। এমন কঠিন বাস্তবতার মাঝে যদি কেউ বলেন আমি যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত থাকব কিন্তু মরনাস্ত্র স্পর্শ করব না, তাহলে কিরকম হবে? হ্যাকস’ রিজ মুভির মূল চরিত্র ডেসমন্ড ডসের ইচ্ছাটাই ছিল এরকম। ' পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট পাপ হচ্ছে মানুষ হত্যা করা' ছোট বেলায় মায়ের কাছ থেকে পাওয়া এই শিক্ষাকে নিজের বিশ্বাসে পরিণত করেছিলেন ডস। আমৃত্যু সেই বিশ্বাসে অটল ছিলেন ডস। এই বিশ্বাসের মূল্য রাখার জন্য তাকে লড়াই করতে হয়েছে পৃথিবীর সঙ্গেই। যার মধ্যে বাদ ছিল না তার নিজের সৈন্যদলও! ডেসমন্ড ডসের চাওয়াটা ছিল সামান্যই - "With the world so set on tearing itself apart, it don't seem like such a bad thing to me to want to put a little bit of it back together."

নিজের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে শত্রু পক্ষের চেয়েও কঠিন ছিল নিজ পক্ষের মানুষদের সঙ্গে লড়াই করা। রাতের আধারে নিজ সৈন্য দলের আঘাতে আহত হওয়া। কাপুরুষ বিশেষণে বিশেষায়িত হওয়া। এতটুকুতেই শেষ নয়! কোর্ট মার্শালের সম্মুখীনও হতে হয় তাকে! সুযোগ অবশ্য ছিল স্বেচ্ছায় সেনা বাহিনী ত্যাগ করার কিংবা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার। দেশমাতৃকার প্রয়োজনে নিজেকে নিয়োজিত করায় দৃঢ় প্রত্যয়ী ডস সেনা বাহিনী ত্যাগ কিংবা অস্ত্র হাতে নেয়া দু’টিকেই অস্বীকার করেন। "I've done everything they asked me, except this one thing, and I'm being treated like a criminal just 'cause I won't kill." কোর্ট মার্শাল এর ভয় এমনকি প্রেয়সীর অনুরোধেও নিজের বিশ্বাস থেকে বিন্দু মাত্র সরে আসেননি তিনি। প্রেয়সীর অনুরোধের উত্তরে ডস বলেন, "I don't know how I'm going to live with myself if I don't stay true to what I believe."
অবশেষে কোর্ট মার্শাল থেকে মুক্তি পেলেন তিনি। কিন্তু মূল যুদ্ধটা শুরু এখান থেকেই। গিবসন মুভির এই অংশটা এমন ভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন দর্শক আর পর্দার বাইরে থেকে উপভোগ করছে না! প্রতিটি দর্শক তখন সরাসরি উপস্থিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ময়দানে। জাপানিজ সৈন্যদের প্রতিরোধের মুখে যখন একের পর এক আমেরিকান সৈন্য আহত কিংবা নিহত হচ্ছিল তখন পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা। কিন্তু একজন যুদ্ধের ময়দানে রয়ে গেলেন! যাকে কাপুরুষ হিসাবে গণ্য করা হয়েছিল। সেই কাপুরুষ ডস পিছু হটলেন না। রয়ে গেলেন যুদ্ধাহত সৈন্যদের পাশে। আহতদের সেবা করছেন শত্রু পক্ষের দখলকৃত এলাকাতেই।
চলচ্চিত্র হিসেবে হ্যাকস’ রিজ মুভির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ যুদ্ধের অংশটুকুই। এতটা বিশ্বাসযোগ্য ভাবে রূপালী পর্দায় উপস্থাপন করেছেন গিবসন, যার কারণেই দর্শক এতটা একাত্ম হতে পেরেছে মুভিটার সঙ্গে। আর মুভির বার্তাটা চিরাচরিত ওয়ার মুভির মতই সহজ সরল। ছবির কিছু কিছু দৃশ্য এবং নাম ভূমিকায় অভিনয় করা অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের চোখ ধাঁধানো অভিনয় মনে থাকবে অনেকদিন।  চারিদিকে মৃত্যুর রঙ্গ নৃত্য দেখে ঈশ্বরের নিকট ডস এর আকুতি,  "What is it you want of me? I don't understand. I can't hear you." তখনই আহত এক সৈনিকের মেডিক এর সাহজ্য প্রার্থনা! মৃত্যুকে পরোয়া না করে আহত সৈনিকদের দড়ি দিয়ে বেঁধে এক এক করে নিরাপদে নামিয়ে আনা! আর ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা - গড আর একটা প্রাণ বাঁচাতে দাও! ডস যখন বলছিল - "Please Lord Help me Get One More! Help Me Get One More!" আমার মতো অনেকেই হয়ত তখন ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করছিলেন আর একটি প্রাণ বাঁচানোর! ডেসমন্ড ডসের সেবা কি শুধুমাত্র নিজ সৈন্যদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল? না, এই মহান মানুষটার সেবার কোন সীমাবদ্ধতা ছিল না। জাপানিজ আহত সৈনিকদেরও সেবা করেছিলেন ডস।
হ্যাকস’ রিজ মুভির অন্যতম শক্তিশালী একটি দিক এর সংলাপ। কিছু কিছু সংলাপ হৃদয়ে গেঁথে থাকবে অনেক অনেক দিন। যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝাতে ব্যবহৃত সংলাপ, "In peace, sons bury their fathers. In war, fathers bury their sons." অথবা "Imagine how painful it is to have a dad leave, and a flag come back." ডেসমন্ড ডসের সঙ্গে ক্যাপ্টেন এর সংলাপ - "Most of these men don't believe the same way you do, but they believe so much in how much you believe."
যুদ্ধে হয়ত কেউ জয়ী হয় না, একদল শুধু পরাজিত হয়। কিন্তু ডেসমন্ড ডস জয়ী হয়েছিলেন! সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় ৭৫ জনকে বাঁচিয়েছিলেন মৃত্যুর হাত থেকে। যুদ্ধ শুধুই নিতে পারে, দেয়ার ক্ষমতা হয়ত যুদ্ধের নেই। “War leaves memories that even victory cannot erase.”
 

 

লেখক পরিচিতিঃ
আব্বাস আলী, জীবিকার সন্ধানে স্বদেশ ছেড়ে প্রবাসে জীবন যাপন করছেন। প্রতিদিন স্বপ্ন দেখেন প্রিয় স্বদেশে ফেরার! ভালোবাসেন মুভি দেখতে, ভালো লাগে টুকটাক লিখতে।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ
১৯৭৩ সালে Paper Moon (1973) ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার জিতে নেন Tatum O'Neal. তখন তার বয়স ছিলো ১০ বছর। সবচেয়ে কম বয়সে অস্কার জয়ের রেকর্ড এটাই। অস্কার জয়ের পর তার বক্তব্য ছিলো, ‘মা আমি কী এখন বাসায় যেতে পারবো?’
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *