Smiley face

অস্কার সম্রাজ্ঞী ক্যাথেরিন হেপবার্ন

214751
সবচেয়ে বেশি অস্কারজয়ী কিংবদন্তী অভিনেত্রী ক্যাথেরিন হেপবার্নকে নিয়ে লিখেছেন অন্তরদ্বীপ
বাংলাদেশের অনেক চলচ্চিত্রপ্রেমীই রোম্যান হলিডে ছবির নায়িকা  অড্রে হেপবার্ন আ রক্যাথেরিন হেপবার্ন এই দুজনকে গুলিয়ে ফেলেন। দু’জনের নামের শেষ অংশ ছাড়া কিন্তু তাদের মধ্যে কোন মিলই নেই । অড্রে হেপবার্ন যেন পাশের বাড়ির মিষ্টি মেয়েটি আর ক্যাথেরিনকে চুল ছোট অবস্থায় পুরুষ বলেও ভ্রম হতে পারে । শক্ত, কঠিন, লড়াকু নারী চরিত্রে তিনি অদ্বিতীয়া। এই হেপবার্নকে এ কালের তথাকথিত সিনেমাবোদ্ধারা দাম না দিলে কি হবে!  অস্কারের ইতিহাসে তিনি আজ পর্যন্ত নমস্য; সর্বসেরার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত । সবচেয়ে বেশি অস্কার  জেতা অভিনয়শিল্পী যে তিনি!  তাই আমরা তাকেভবলতেই পারি “অস্কার সম্রাজ্ঞী । মেরিল স্ট্রিপই বলুন অথবা জ্যাক নিকলসন বা ড্যানিয়েল ডে লুইস কেউই তাকে অস্কার জেতায় ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। সর্বোচ্চ চার বার অস্কার জিতে গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এ জায়গা করে নিয়েছেন ।  সবচেয়ে বেশি অস্কার মনোনয়ন পাওয়ার রেকর্ডও একটা সময় পর্যন্ত তাঁরই ছিল।  ২০০৩ সালে   মেরিল স্ট্রিপ ‘অ্যাডাপ্টেশান’ চলচ্চিত্রের জন্য ত্রয়োদশ বারের মত অস্কার মনোনয়ন পেয়ে রেকর্ডটি ভঙ্গ করেন । মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্যাথেরিন কিন্তু মেরিলের অভিনয় মোটেই পছন্দ করতেন না, স্ট্রিপের অভিনয়কে তিনি একটু বেশি  যান্ত্রিক, অতিরিক্ত কৌশলী ভাবতেন । ক্যাথেরিন এর প্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন এক সময়কার প্রতিদ্বন্দ্বী বেইটি ড্যাভিস ও ভ্যানেসা রেডগ্রেভ ।
ক2ক্যাথেরিন এর জন্ম ১৯০৭ সালের ১২ মে।  বাবা ছিলেন চিকিৎসক আর মা মেয়েদের ভোটাধিকার অর্জনের জন্য সংগঠিত আন্দোলনের এক কর্মী । শিশুকালেই একটি অত্যন্ত অপ্রীতিকর ঘটনার সাক্ষী হন তিনি। তার বাবা তাদের ভাইবোন কে ফাঁসিতে ঝুলেও বেঁচে ফেরার একটি কৌশল শিখিয়েছিলেন। সেটি একা একা আয়ত্ত করতে গিয়ে মারা যান তাঁর ভাই। লাশ আবিষ্কার করেন ক্যাথেরিন নিজে । এই ঘটনায় তাঁর কোমল মনে মারাত্মক প্রভাব পড়ে ।
হেপবার্নের অভিনয়ের হাতেখড়ি মঞ্চে । বহুদিন মঞ্চে কাজ করে ১৯৩২ সালে ‘আ বিল অফ ডিভোর্সমেন্ট’ সিনেমার মাধ্যমে হলিউডে অভিষেক ঘটে তাঁর । তার পরের বছর মুক্তি পাওয়া “মর্নিং গ্লরি “ এবং “লিটল ওমেন” তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয় ।“মর্নিং গ্লরি “ এর জন্য হেপবার্ন প্রথমবারের মত অস্কার মনোনয়ন পান এবং বাজিমাৎ করেন। তারপর  ১৯৩৩ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত  প্রায় ৬ যুগ ধরে আরও ১১ টি অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। জিতেন আরো তিনটি অস্কার “গেস হু ইজ কমিং টু ডিনার”(১৯৬৭), “দ্যা লায়ন ইন উইন্টার “ (১৯৬৮) ও “অন গোল্ডেন পণ্ড” (১৯৮১) এর জন্য । অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এই চার বারের মধ্যে এক বারও তিনি সরাসরি উপস্থিত থেকে অস্কার গ্রহণ করেননি।
তাই বলে এমনটি ভাববার কারণ নেই হেপবার্ন এর হলিউড ক্যারিয়ারে কেবল উত্থানই ছিল । প্রথমদিকে খুব তাড়াতাড়ি সাফল্যের স্বাদ পেলেও ক্যাথেরিনকেও সহ্য করতে হয়েছে নিদারুণ ব্যর্থতা। ১৯৩৩ সালের পর থেকেই ক্যাথেরিনের ক্যারিয়ার সঙ্কটের মুখে পড়ে।  হলিউডের সাফল্যে নিজের স্বকীয়তা হারাননি ক্যাথেরিন, আর  ক্যাথেরিনের স্বকীয়তাকে সহজে মেনে নেয়নি হলিউড । খুব দ্রুতই চারদিকে চাউর হয়ে গেল-নতুন এই অভিনেত্রী বেশ দাম্ভিক। কাজ করে যান, কিন্তু সহকর্মী বা স্টুডিও প্রধানদের সাথে প্রমোদ তরীতে ঘুরে বেড়ান না, সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ দেন না। দিলেও সব প্রশ্নের কাটাকাটা জবাব দেন। ছবি তুলতে দেন না, বেফাঁস কথা বলেন। বলতে গেলে তখনকার হলিউড নায়িকাদের সঙ্গে কোনভাবেই মেলানো যায়না তাঁকে। এই নিয়মের ব্যত্যয় তখনকার দর্শক -সমালোচক কেউই সহজভাবে মেনে নেননি । ফলস্বরূপ অতি দ্রুত ক্যারিয়ারে ধ্বস! এতটাই যে তাঁকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল “বক্স অফিস পয়জন” হিসেবে। কিন্তু পরাজয়ে ডরে নাকো কেট। ১৯৩৮ সালে মঞ্চে -“দ্য ফিলাডেলফিয়া স্টোরি” এর মাধ্যমে সফল প্রত্যাবর্তন ঘটে তাঁর । ১৯৪০ সালে একই নাটক অবলম্ননে  ক্যাথেরিন নিজেই চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। “দ্য ফিলাডেলফিয়া স্টোরি” তে ক্যাথেরিনের চরিত্র যেন তাঁর আসল চরিত্রেরই প্রতিচ্ছবি। হলিউড সেটাই সোৎসাহে গ্রহণ করে হার মানলো তাঁর কাছে । হেপবার্ন বজায় রাখলেন তাঁর  স্বকীয়তা।
১৯২৮ সালে ক্যাথেরিন বিয়ে করেন শিল্পপতি লুডলো অজডেন স্মিথকে । ব্যাক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে ক্যারিয়ারকে ক্যাথেরিন সর্বদাই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ! তের বছরের মাথায় এই দম্পতির ডিভোর্স হয়ে যায়। অবশ্য আজীবন তারা বন্ধু ছিলেন । দ্বিতীয়বার আর বিয়ে করেননি ক্যাথেরিন । পরবর্তীতে ধনকুবের হাওয়ার্ড হিউজ  এর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ক্যাথেরিন হেপবার্ন । তাদের প্রেমকাহিনী পরবর্তীতে তুলে ধরা হয়েছে “হাওয়ার্ড হিউজ” এর জীবন নিয়ে তৈরি ছবি ‘দ্যা অ্যাভিয়্যাটর’ । এতে ক্যাথেরিন হেপবার্ন চরিত্রে রূপায়ণ করেন অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী কেট ব্ল্যানচেট । কাকতাল হচ্ছে ,অস্কার সম্রাজ্ঞীর চরিত্রে অভিনয় করে এ কালের  কেট এর ভাগ্যও খুলে যায়- তিনিও হাতে পান বহুল আকাঙ্খিত অস্কার । অস্কারজয়ী কারোর চরিত্রে রূপদান করে অস্কার পাওয়ার এই ঘটনাটিও একটি রেকর্ড ।
হাওয়ার্ড হিউজ এর পর  হেপবার্নের জীবনে আসেন হলিউড এর আরেক কিংবদন্তি অভিনেতা স্পেন্সার ট্রেইসি । সম্রাজ্ঞী যেন এবার সত্যি সত্যি পেলেন তাঁর সম্রাটকে । এত গভীরভাবে আর 1392412234739_katharine-hepburn-spencer-tracy-loveকাউকেই ভালবাসেননি কেট । অথচ তাদের সম্পর্কের কোন আইনগত বা সামাজিক ভিত্তিই ছিল না। ট্রেইসি বিবাহিত ছিলেন । ক্যাথেরিনকে এমনকি তাঁর প্রেমিকা হিসেবেও সরাসরি স্বীকৃতি দিতে চাননি তিনি।  কোন প্রতিবাদ করেননি হেপবার্ন । ট্রেইসি গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরই তিনি কেবল ট্রেইসির সাথে থাকা শুরু করেন । মৃত্যুর রাতেও তিনি ট্রেইসির কাছেই ছিলেন । ট্রেইসির স্ত্রী ও পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্য ভালবাসার মানুষটির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পর্যন্ত অংশগ্রহণ করেননি হেপবার্ন । ট্রেইসির স্ত্রী মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ট্রেইসির সাথে নিজের সম্পর্ক  নিয়ে প্রকাশ্যে কোন মন্তব্যও  করেননি । হলিউডের ইতিহাসে এমন নিঃস্বার্থ প্রেম বিরল।
বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে বেশ কিছু স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন হেপবার্ন । “দ্যা ফিলাডেলফিয়া স্টোরি” এর প্রচন্ড দৃঢ় ও স্বাধীনচেতা ট্রেইসি এবং “ব্রিংগিং আপ বেবি” এর সুজান “দ্যা লায়ন ইন উইন্টার” চলচ্চিত্রের এলেনর অব অ্যাকুইটাইন ইত্যাদি উল্ললেখযোগ্য চরিত্রে তিনি কাজ করেছেন। মজার ব্যাপার  হেপবার্ন নিজেই ছিলেন এলেনর অব অ্যাকুইটাইন এর বংশধর । তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য  কাজ হচ্ছে-“লিটল  ওমেন” এর টম বয় জো, “মর্নিং গ্লরি “ এর অভিনেত্রী ইভা, “দ্যা আফ্রিকান কুইন” এর মাঝবয়সী দেশপ্রেমিক মিশনারি রোজ,“সামারটাইম” এর একাকীত্বে ভোগা জেন, ‘দ্যা রেইনমেকার” তে অনূঢ়া লিজি, “সাডেনলি লাস্ট সামার” এর দাম্ভিক ভায়োলেট,”গেস হু ইজ কমিং টু ডিনার” এ প্রগতিশীল ক্রিস্টিনা, “দ্যা ট্রোজান ওমেন”এ ট্রয় এর রানী হেকুবা ও “অন গোল্ডেন পণ্ড” এ পতিব্রতা এথেল। এছাড়া “ অ্যালিস অ্যাডামস” চলচ্চিত্রের লাজুক অ্যালিস  এবং “লং ডে’জ জার্নি ইনটু নাইট” এ মাদকাসক্ত মা মেরী চরিত্রে ভিন্নধর্মী কাজ দেখিয়েছেন তিনি। দু’টি ছবিতেই তাঁর ইমেজের বাইরে গিয়ে লাজুক,  দুর্বল চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্যাথেরিন।
ক1১৯৭৩ সাল থেকে টিভিতে নিয়মিত হন হেপবার্ন । একে একে অভিনয় করেন দ্যা গ্লাস মিনাজেরি, লাভ এমং দ্যা রুইনস,  গ্রেস কুইগলে, দ্যা ম্যান  আপস্টেয়ারস, মিসেস ডেলাফিল্ড ওয়ান্টস টু ম্যারি ইত্যাদি টিভি ছবিতে । প্রথম ও শেষোক্ত ছবির জন্য তিনি এমি মনোনয়ন পান। আর লাভ এমং দ্যা রুইনস এর জন্য এমি জিতেন ।
হেপবার্নের অভিনয় একালের দর্শকের কাছে অতি নাটকীয় মনে হতে পারে। বিশেষ করে তাঁর  সংলাপ পঠন । বেশ জোরে একটু চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলতেন তিনি। মেথড অ্যাকটিং তখনো জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি । প্রত্যেক শিল্পীর নিজস্ব একটা স্টাইল থাকতো তখন ।  চিবিয়ে চিবিয়ে থিয়েটারি ঢঙ্গে কথা বলাই ছিল হেপবার্নের স্টাইল । তাঁর বিখ্যাত উক্তি-‘আমি শুধু একজন অভিনেত্রীই না, একজন বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব ও। আমায় এমন একজন অভিনেত্রী দেখান যার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব নেই। আমায় কেবল একজন নারী দেখাবেন-তারকা নয়।“
“আমার মৃত্যু ভয় নেই। মৃত্যু নিশ্চয়ই খুব চমকপ্রদ হবে গভীর  নিদ্রার মত”- স্বগতোক্তি করেন হেপবার্ন।  ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন ক্যাথেরিন হেপবার্ন। তাঁর নশ্বর দেহের বিলোপ ঘটেছে, কিন্তু এক চুলও  টলেনি তাঁর রাজসিংহাসন। অস্কার নিয়ে কথা হবে, অথচ তাঁকে নিয়ে নয় এমনটা হতেই পারেনা ।
 
 
লেখক পরিচিতিঃ
অন্তরদ্বীপ, বাংলাদেশের অনেক সিনেমাপ্রেমীর মধ্যে একজন ।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ

The Lost Weekend (1945) আর Marty (1955) চলচ্চিত্র দুইটি সেরা চলচ্চিত্রের অস্কার এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পাম ডি’অর লাভ করে।  

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com