Smiley face

ক্যাথরিন বিগলোঃ চেনা গল্পের অচেনা মুখ

Katheryn-Bigelow_f_improf_1024x576
অস্কার জয়ী প্রথম নারী নির্মাতা ক্যাথরিন বিগেলোকে নিয়ে লিখেছেন মারজিয়া প্রভা
যখন স্টেজে উঠেছিলেন! আশেপাশেই প্রথম স্বামী ছিলেন।  যৌবনের প্রথম ভালোবাসা। সম্পর্ক অনেক আগেই চুকেবুকে গেছে। কিন্তু এখনো কি ভীষণ ভালো বন্ধু রয়ে গেছে। প্রিয় বন্ধুর “Avatar” আর তার “The Hurt Locker” মুভি একসঙ্গেই মনোনয়ন পেয়েছে অস্কারে। এমনটি কখনো আগে হয়েছে কখনো? পুরানো স্বামী স্ত্রী জুড়ে গিয়েছে এক পুরস্কারের মঞ্চে? জিতে গেলেন তিনি। জিতে গেল এক ইতিহাস। অস্কারের ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে জিতে গেলেন সেরা পরিচালকের পুরস্কারটি। পুরস্কার নিয়ে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এক্স হাজবেন্ড কাছে এসে গলা টিপার ভঙ্গি করল। আর হেসে দিলেন সে। মুক্তা ঝরানো হাসি। ডেইলি মেইল এ নিউজ এলো “He may have won the divorce - but she got the Oscar”।
ক্যাথরিন বিগলো, প্রথম অস্কারজয়ী নারী পরিচালক।
আর  প্রথম স্বামীর নাম? Avatar এর নাম বলেছি, আর না চিনে থাকা যায়? হ্যাঁ জেমস ক্যামেরন।
kathryn-bigelow-female-director-sexy-groundbreaking-film-directorলাইব্রেরিয়ান মা আর পেইন্ট ফ্যাক্টরির একমাত্র সন্তান ক্যাথরিন এর আর্টের প্রতি অনুরাগ হওয়াটা স্বভাবজাত। ক্যালিফোর্নিয়াতে জন্ম নেওয়া মেয়েটি একসময় ভর্তি হয়ে গেল সান্স ফ্রান্সিস্কো আর্ট ইন্সটিটিউটে। ১৯৭০ সালে ফাইন আর্টস থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি নিয়ে ভর্তি হলেন কলাম্বিয়ান ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সের জন্য। এখানেই প্রথম গ্র্যাজুয়েট ফিল্ম প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করলেন। সেইখানেই  আর্ট এবং ল্যাংগুয়েজের কাজের তাগিদে প্রথম ফিল্ম বানানো। নাম “The set up”। ২০ মিনিটের শর্ট ফিল্মের পুরোটা জুড়েই ছিল শুধু মারামারি। প্রথম ফিচার ফিল্ম The loveless, মোটর সাইকেলের গ্যাং নিয়ে গল্প। মন্টি মন্টগোমরির সঙ্গে সহপরিচালক হিসেবে এই ফিল্মে ছিলেন। ক্যাথরিনের ব্রেকিং পয়েন্ট আসলে তিনটি অ্যাকশন ঘরানার মুভি: ব্লু স্টিল, পয়েন্ট ব্রেক এবং স্ট্রেঞ্জ ডেইজ।
অবশ্য কখনোই ক্যাথরিন মেইনস্ট্রিম  মুভি বানানোর পক্ষপাতিত্ব ছিলেন না। একটু অন্য ধাঁচের ফিল্ম বানাতেই বেশি ভালোবাসতেন। ব্লু স্টিলের ছিল এক সাইকোর এক পুলিশকে ধাওয়া করার গল্প নিয়ে। ওদিকে পয়েন্ট ব্রেক ছিল এক এফবিআই এজেন্টকে নিয়ে যে এক্স প্রেসিডেন্টের পেছনে ধাওয়া করছেন। ক্যাথরিনের তখন ভাবটাই ছিলো অ্যাকশন ফিল্ম বানাবেন।
ফিল্মের প্রতি আগ্রহ, ফিল্ম বানানো এইসব নিয়েই পরিচয় হয় জেমস ক্যামেরনের সঙ্গে। তখন “পয়েন্ট ব্রেক” বানিয়ে একটু আধটু  পরিচিত পাচ্ছেন এদিক সেদিক থেকে। ওদিকে ক্যামেরন তখন “টার্মিনেটর” বানিয়ে অলরেডি হিট। অসম জনপ্রিয়তা নিয়েই একসাথে পথচলা শুরু করলেন ১৯৮৯ সালে।
কিন্তু  পুরো ব্যাপারটাই কেটে গেল টার্মিনেটর ২ এর শুটিং সেটে। ক্যামেরন প্রেমে পড়লেন লিন্ডা হ্যামিলটনের সৌন্দর্যে। ক্যাথরিন ফাইল করলেন ডিভোর্সের জন্য। জানিয়ে দিলেন এক অসুখী জীবন যাপন করছেন তারা। আর থাকা সম্ভব নয়। ক্যাথরিন একটি বাড়ি পেলেন, ক্যামেরন তাকে কয়েক মিলিয়ন ডলার দিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি নিলেন আর কোন “খোরপোষ” দিতে তিনি অপারগ। এমনকি টার্মিনেটর ২ এর ৩৪৫ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার থেকে ক্যাথরিন পেল মাত্র ৩৩ মিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয়, লিন্ডার সঙ্গে প্রেমের পরপরই ক্যাথরিনকে বাড়ি ছাড়তে হল। অনেকের মতেই, বিশাল একটা হারা হেরে গিয়েছিলেন সেদিন ক্যাথরিন। তবুও কখনো পুরানো সম্পর্কের বিষ ছড়াননি। বরং হাসিমুখে ফর্মাল রিলেশন চালিয়ে এসেছেন প্রথম স্বামীর সঙ্গে। এর ফাঁকে ১৯৯৬ সালে বের হয় “স্ট্রেঞ্জ ডেইজ” যার প্রডিউসার এবং স্ক্রিপ্টরাইটার ছিল ক্যামেরন নিজে। কিন্তু সাফল্যের মুখ দেখল না সেই ছবি।
১৯৯৭ সালে ভরা জোয়ার ক্যামেরনের। চারদিকে টাইটানিকের জয়জয়কার। ওদিকে ক্যাথরিন তখনো ফিল্মে থিতু হননি। টিভি সিরিজ পরিচালনা শুরু করেছেন। “Homicide: the live on the street”। এই সিরিজও ছিল পুলিশ আর অ্যাকশন কেন্দ্রিক। এরপর আবার ২০০০ সালে ফিল্মে ফিরে আসেন। দুই নারীর দমবদ্ধ রিলেশনের গল্প নিয়ে বানান “The weight of water”  মুভিটি। ২০০২ সালে বানান রাজনৈতিক মুভি, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম নিউক্লিয়ার সাবমেরিন নিয়ে। মুভির নাম “k-19 : The widowmaker”।
এরপর দিন যত যায়, ক্যাথরিন এর কাজ আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠে। ২০০৮ সালে অস্কারজয়ী The Hurt locker মুভিটা বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। ইরাক যুদ্ধের পটভূমি নিয়েই তৈরি হয় মুভিটি। একদল বোমাবাজদের গল্প। মুভিটা তৈরির আগে নাকি ক্যামেরন চিত্রনাট্য দেখেছিলেন। ভালো বলেছিলেন । কিন্তু ভেবে কি ছিলেন, নিজ ফিল্ম Avatar কে পাঙ্গা দিয়ে জিতে যাবে ছবিটি! কেউই ভাবেনি অস্কার জিতবে The hurt locker মুভিটি। অস্কার টাইপো মুভিও সেটা না। তবুও বহুদিন পর যোগ্য সম্মান পেলেন ক্যাথরিন। তাই  ইতিহাস লেখা হলো নতুন করে।

??????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????????

নারীকেন্দ্রিক ফিল্ম অনেক হয়েছে হলিউডে। অভিনয়ে লাস্যময়ী হয়েই কেবল থাকে না হলিউড অভিনেত্রীরা। অনেক ভার্সেটাইল অভিনয় করছেন। তবুও পর্দার পেছনে যেন খোদ হলিউডেই নারীর সংখ্যা খুব কম। তাই ক্যাথরিনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, একজন নারী পরিচালক নিয়ে আসলে কি ভাবেন তিনি? দারুণ উত্তর দিয়েছেন তিনি, “ নারী ফিল্মমেকার না হবার দুটো অপশন ছিল আমার কাছে। হয় জেন্ডার চেঞ্জ করে ফেলা কিংবা সিনেমা বানানো ছেড়ে দেয়া। কিন্তু কোনটাই করিনি আমি। নারী ফিল্ম বানাতে পারে এইটাই প্রমাণ করে দেখিয়েছি। নারীরা যে পারে, এটা প্রমাণের জন্য বেশি বেশি নারীদের ফিল্ম মেকিং এ আসা উচিত”।
২০১০ সালের অস্কার ছিল ইতিহাসের অস্কার। ডেইলি মেইল ব্যাপারটি এভাবে লিখেছে, একদিন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা নারীটির চ্যালেঞ্জ ছিল পরকীয়ায় আসক্ত স্বামীর প্রতিশোধ নেওয়া। ক্রিয়েটিভ মানুষের প্রতিশোধ নেওয়া ক্রিয়েটিভ ভাবেই হয়। কিন্তু  ক্যাথরিন ক্যামেরনকে হারিয়েছে কি না তা নিয়ে আসলে তার কোন মাথা ব্যথাই নেই! পুরানো স্বামীর প্রতি প্রতিশোধ নেবার সময় কোথায়! ক্যামেরনের প্রতিশোধ নিয়ে কেন ক্যাথরিনকে বড় হতে হবে? সে তো নিজেই সম্পুর্ণ! চেনা ৮০ বছর ইতিহাসকে এক নিমিষে পাল্টে ফেলা কোন নারীর জয়কে পুরানো স্বামীর গীতগাঁথা দিয়ে তুচ্ছ করার কোন মানে হয় না। ক্যাথরিন তাই কোন খুচরো গল্পের অনেক উর্ধ্বে
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া, ডেইলি মেইল এবং দি গার্ডিয়ান অবলম্বনে
 

লেখক পরিচিতিঃ
অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশুনা করলেও, মারজিয়া প্রভা লেখালেখিকে ভালোবেসে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতাকে। বর্তমানে ক্রিয়েটিভ রাইটার হিসেবে জড়িত রয়েছেন অনলাইন পোর্টাল Bdyouth.com এর সঙ্গে। এছাড়া প্রতিষ্ঠা করেছেন Feminismbangla.com নামক নিজস্ব ব্লগ। প্রচুর বই পড়া, মুভি দেখা আর নারী উন্নয়ন ও মুক্তি নিয়ে কাজ করা তার প্যাশন। পছন্দের মুভিঃ  নায়ক, হারানো সুর, জীবন থেকে নেয়া, অশনি সংকেত, মেঘে ঢাকা তারা, The Shwshank Redemption, One flew over the cuckoo’s nest। প্রিয় পরিচালকদের মাঝে আছেন জহির রায়হান, ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, অপর্না সেন, কল্পনা লাজমি, অজয় কর, আলমগির কবির ও মোরশেদুল ইসলাম।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ
সেরা অভিনেতা হিসেবে ৩বার অস্কার জয়ের মতন বিরল গৌরবের রেকর্ড একমাত্র একজন মানুষেরই। ডেনিয়েল ডে লুইস। My Left Foot, There Will Be Blood, Lincoln এই ৩টি সিনেমায় অভিনয় করে সেরা অভিনেতার অস্কার জিতে এরকম অসম্ভব রেকর্ড করে বসে আছেন এই জিনিয়াস।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com