Smiley face

ওন্ডেড নী ক্রিক ম্যাসাকার ও মারলন ব্রান্ডোর অস্কার বর্জন

brando-no-oscar
অস্কারের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা হচ্ছে মারলন ব্রান্ডোর অস্কার প্রত্যাখান। ব্রান্ডোর অস্কার রিজেকশানের কারন খুঁজেছেন আরাফাত নোমান
১।
সময়টা ১৮৯০ সালের ডিসেম্বর মাস। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের ওন্ডেড নী ক্রিক নামক জায়গায় ন্যাটিভ আমেরিকানদের সিউক্স নামক এক গোত্র জড়ো হয় বিশেষ একটা কারণে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বহু বছরের অবিচার ও শোষণের শিকার হয়ে আসছিলো তারা। তাদেরই জায়গা পাইন রীজ ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন যুক্তরাষ্ট্র সরকার অধিগ্রহণ করে ফেলার ফলে সিউক্স গোত্রের চলাফেরার উপর নেমে আসে বাধ্যবাধকতা। ওটা ছিল তাদের আদি নিবাস। সিউক্স গোত্রের গোত্র প্রধান বিগ ফুট (Big Foot) ও অন্যান্যরা ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না। ঠিক সেই সময়টাতে পাইউট (Paiute) গোত্রের শামান ওভোকা (Wovoka)  ঘোষণা দিলেন যে সিউক্সসহ অন্য যে সব গোত্রের নিবাস যুক্তরাষ্ট্র সরকার অধিগ্রহণ করেছে সেটা ফিরে পাওয়া সম্ভব যদি তারা একটা বিশেষ ধর্মীয় আচার পালন করে। মজার ব্যাপার হলো ওভোকা দাবি করেছে যে এই বিশেষ ধর্মীয় রীতিটি সে ঈশ্বরের কাছ থেকে স্বপ্নে পেয়েছে। তার সেই বিশ্বাসের উপর আস্থা রেখে প্রায় ৩৫০জন সিউক্স অধিবাসী পাইন রীজ ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন অঞ্চলে এক বিশেষ পোশাকে হাজির হয়। সেই বিশেষ পোশাকগুলো ছিলো ঈগল এবং মহিষের প্রতীক বেষ্টিত লম্বা ঢোলা উজ্জ্বল রঙয়ের আলখাল্লা। এতজন মানুষকে এভাবে এক সঙ্গে আসতে দেখে সে জায়গায় নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের  ফেডারেল সৈন্যরা হঠাৎ ধাতস্থ হতে পারেনি। তারা নিরাপত্তার অজুহাতে সেই মানুষগুলোর দিকে গুলি ছোঁড়ে। সেই গোলাগুলি যখন শেষ হয় তখন সেখানে কিছুই থাকেনা; পড়ে থাকে পায় ৩০০টি সিউক্স গোত্রের নিথর দেহ। ইতিহাসে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ওন্ডেড নী ম্যাসাকার নামে পরিচিত।
২।
 ১৯৭৩ সালের ৪৫তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস। মার্চের সেই সন্ধ্যায় অস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নরওয়েজিয়ান অভিনেত্রী লিভ উলম্যান এবং ইংরেজ অভিনেতা জেমস বন্ড খ্যাত রজার মুর। তারা সেই বছরের অস্কারের সেরা অভিনেতার নাম ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। দ্য গডফাদার  এর মত কাল্ট সিনেমা দিয়ে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার বাগিয়ে নেন সুদর্শন মারলন ব্র্যান্ডো। কিন্তু বেশ অবাক হয়ে লিভ উলম্যান এবং রজার মুর লক্ষ্য করেন মঞ্চের দিকে উঠে আসছেন অ্যাপাচিদের পোশাক পরিহিত পাট করে দুদিক থেকে আচড়ে রাখা ঘন চুলের অধিকারী এক তরুণী। মঞ্চে উঠেই তরুণীটি সোজা মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে গেলেন। রজার মুর অস্কার স্ট্যাটুটি মেয়েটিকে দিতে গেলে আলতো হাতের ইশারায় রজার মুরকে থামিয়ে দিলেন। মাইক্রোফোনের সামনে যেয়েই মেয়েটির মুখে ভর করলো একরাশ মলিনতা। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে সৃষ্টি হল একটি ইতিহাস। মেয়েটির নাম সাচিন লিটলফিদার; মেয়েটি এপাচি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একজন রেডইন্ডিয়ান এবং ন্যাটিভ আমেরিকান সিভিল রাইট আন্দোলনের একজন কর্মী। মেয়েটি বলল, “আজকে আমি এখানে এসেছি মারলন ব্র্যান্ডোর হয়ে কিছু বলতে। আমি অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে জানাচ্ছি যে মারলন ব্র্যান্ডো অস্কারের সেরা অভিনেতার পুরস্কারটি বর্জন করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি আমার হাতে থাকা তার বক্তব্যটি পড়ে শোনাতে বলেছেন কিন্তু সময়ের অভাবে আমি সেটা পড়তে পারছিনা তবে সাংবাদিক ভাইয়েরা জানতে চাইলে আমি জানাবো অনুষ্ঠান পরবর্তী সময়ে। আপাতত ছোট করে বলতে চাই মারলন ব্র্যান্ডো এই অস্কার বর্জনের মাধ্যমে একটি প্রতিবাদের স্বাক্ষর রেখেছেন। তার এই প্রতিবাদ হল আমেরিকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিরুদ্ধে যারা কিনা হরহামেশাই ন্যাটিভ আমেরিকান বা রেডইন্ডিয়ানদেরকে তাদের সিনেমায় পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হয়ে সর্বদা উপস্থাপন করেছেন। মুহুর্মুহু করতালির মাধ্যমে সাচিন লিটলফিদারের বক্তব্যকে অস্কার অনুষ্ঠানে অভিবাদন জানানো হয়। কিন্তু সাচিন ছলছল চোখে বিদায় নেন অস্কার মঞ্চ থেকে।

oscars-70s-marlon-brando-native-american-1

৩।
মারলন ব্র্যান্ডো ওন্ডেড নী ক্রিকের একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাচিন কে সারা বিশ্বের কাছে রেডইন্ডিয়ানদের প্রতি আমেরিকা সরকারের আচরণ তুলে ধরার একটা প্রয়াস চালান। এই ওন্ডেড নী ক্রিকের ঘটনাটি কিন্তু প্রথমেই আলোচনা করা ১৮৯০ সালের ঘটনাটি নয়! তবে ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এই ঘটনাটিতে সেই ১৮৯০ সালের ঘটনার বীজ নিহিত ছিলো। ওগলালা লাকোতা বা ওগলালা সিউক্স গোত্রের প্রায় ২০০ মানুষ ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ ডকোটার সেই জায়গাটিতে মিলিত হয় যেখানে শায়িত রয়েছে তাদেরই পূর্বপুরুষেরা। রেড ইন্ডিয়ানদের প্রতি তৎকালীন আমেরিকা সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে ওগলালার ২০০ মানুষ জড়ো হয় ওন্ডেড নী ক্রিকে। তারা প্রায় ৭১ দিন জায়গাটা দখল করে রাখে। পরবর্তীতে ইউনাইটেড স্টেটস মার্শাল সার্ভিস যেয়ে জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। অথচ এটা কিন্ত রেডইন্ডিয়ানদের পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি। এটা ছিলো যুগে যুগে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারের আরেকটি কদাকার রূপ।
মারলন ব্র্যান্ডো শুধু ওন্ডেড নী ক্রিকের ঘটনাকেই কেন্দ্র করে অস্কার বর্জন করেননি। এর পেছনে ছিল হলিউডের বর্ণবাদী মনোভাব। ওয়েস্টার্ন জনরার সিনেমাগুলোর প্রায় সবকটিতেই রেডইন্ডিয়ানদের উপস্থাপন করা হত বর্বর, হিংস্র, অক্ষরজ্ঞানহীন হিসেবে। তাছাড়া হলিউডের সিনেমায় ন্যাটিভ আমেরিকানদের দেওয়া হত কম গুরুত্বপূর্ণ রোল। কোন ভায়োলেন্ট দৃশ্যে ন্যাটিভ আমেরিকানদের দেখানো হত বেশ আক্রমণাত্মক হিসেবে। এই যে মিডিয়ার এই বৈষম্যমূলক আচরণ এটা কিন্তু একদিনে হয় নি। এই ব্যাপারগুলো বেশ সুক্ষভাবে আমাদের মন ও মননে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং হচ্ছে। কালোদের কে বর্বর হিসেবে দেখানো, মুসলমানদেরকে টেরোরিস্ট হিসেবে দেখানো কিংবা মেয়েদেরকে অবলা হিসেবে দেখানো- মিডিয়া যখন যেভাবে পেরেছে নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সবাইকে নিজের মত করে উপস্থাপন করেছে। মিডিয়া কিন্তু কোন জড় বস্তু নয় কারণ মিডিয়ার পেছনে বসে কলকাঠি নাড়ছে কিছু মানুষ, কিছু সিস্টেম, কিছু নীল রক্তের আভিজাত্য! অস্কারের মত একটা জায়গায় মারলন ব্র্যান্ডোর এই পুরস্কার বর্জন এই পক্ষপাত সিস্টেমের মুখে একটি চপেটাঘাত বৈকি।
 
লেখক পরিচিতি:
আরাফাত নোমান,  সিনেমার প্রতি ঝোঁক সেই কৈশোর থেকে। ভালবাসেন বই পড়তে, চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কালচার ও মিডিয়া স্টাডিজ।  প্রিয় দল ব্রাজিল। প্রিয় পরিচালক ফ্রাঙ্কো জেফিরেল্লি,  কুয়েন্টিন তারান্তিনো, আকিরা কুরোসাওয়া, কেনেথ ব্রানাহ, সত্যজিৎ রায়, অনুরাগ কাশ্যপ, ভিশাল ভারদ্বাজ ও রাজকুমার হিরানি।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ

অকালপ্রয়াত John Cazale মৃত্যুর আগে মাত্র ৫টি সিনেমাতে অভিনয় করে গিয়েছিলেন। The Godfather (1972), The Conversation (1974), The Godfather: Part II (1974), Dog Day Afternoon (1975), The Deer Hunter (1978). এই ৫টি সিনেমাই সেরা চলচ্চিত্রের অস্কার নমিনেশন পেয়েছিলো।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com