Smiley face

অন গোল্ডেন পন্ডঃ বেলাশেষের যে গল্পের কথা অস্কারের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে

maxresdefault
হেনরি ফন্ডা এবং ক্যাথেরিন হেপবার্ন...হলিউডের ইতিহাসে দুই কিংবদন্তির নাম। প্রায় ছয় দশক ধরে ক্যারিয়ারের স্বর্ণশিখরে থাকা হেনরি অস্কারের ইতিহাসে সবথেকে বয়োজ্যোষ্ঠ বিজেতার নাম। অপরদিকে সর্বোচ্চবার অস্কারজয়ের ইতিহাস গড়েছেন ক্যাথেরিন হেপবার্ন। এই দুই কিংবদন্তি অস্কারের ইতিহাসে এক জায়গাতেই সমাপতিত হয়েছিলেন এবং সেই সমাপতিত হওয়া অংশের নাম অন গোল্ডেন পন্ড। হ্যাঁ...১৯৮১ সালের এই সিনেমা একইসাথে দুটো রেকর্ড গড়ে দিয়েছিল। এই সেই সিনেমা যার মাধ্যমে হেনরি ফন্ডা তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারে সব থেকে বয়োজ্যোষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে প্রথম অস্কার এবং ক্যাথেরিন হেপবার্ন তাঁর জীবনের চতুর্থ অস্কার লাভ করেছিলেন । অন গোল্ডেন পন্ড অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের সর্বমোট দশটি নমিনেশন পেয়েছিল যার মধ্যে সেরা অভিনেতা, সেরা অভিনেত্রী এবং সেরা অ্যাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লের পুরষ্কার জিতে নিয়েছিল। কী আছে সেই সোনালি পুকুরের সোনালি গাঁথায়...জানাচ্ছেন সান্তা রিকি
অন গোল্ডেন পন্ড: চলচ্চিত্র

on-golden-pond-55b2211b5d6e4

“For age is opportunity no less
Than youth itself, though in another dress,
And as the evening twilight fades away
The sky is filled with stars, invisible by day.”
মানব জীবনের সময়কালকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়...শৈশব, যৌবন এবং বার্ধক্য। এদের মধ্যে শৈশবের সাথে বার্ধক্যের এক অদ্ভুত মিল রয়েছে, কারণ এই উভয় স্তরেই মানুষের কাউকে না কাউকে অবলম্বন করে বাঁচার প্রয়োজনীয়তাটা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। বেলাশেষের দিনগুলোতে মানুষের মধ্যে কাউকে কেন্দ্র করে জীবনকালের শেষ সময়টুকু পার করে দেবার প্রবৃত্তি দেখা যায়। জীবনের সায়াহ্নকালে সঙ্গের চাহিদাটা যেন মানবজীবনের এক ক্রুর সত্য হয়ে দাঁড়ায়।এমনই এক গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে অন গোল্ডেন পন্ড। বয়স্ক দম্পতি নরম্যান এবং এথেল থেয়ার প্রতি গ্রীষ্মে নর্দান নিউ ইংল্যান্ডের গোল্ডেন পন্ডে ছুটি কাটাতে যায়। নরম্যান যেখানে বয়সের ভারে ন্যুব্জ, সেখানে এথেলের মধ্যে বয়স হয়ে যাবার পরেও প্রাণবন্ত ভাবের কোন কমতি নেই। জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তকে যেন সে স্মরণীয় করে রাখতে চায় সামান্য থেকে সামান্যতম উপায়ে। নরম্যানের মধ্যে স্মৃতিভ্রষ্ট হবার লক্ষণ বিদ্যমান থাকলেও এথেল সযত্নে তার সেই সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে যায়। নরম্যান ভয় পায় মৃত্যুর আলিঙ্গনকে, কিন্তু এথেল তাকে প্রত্যেক মুহূর্তে নতুনভাবে বাঁচার জন্যউজ্জীবিত করে। অজানা ভবিষ্যতের আবডালেবার্ধক্যের সময়টুকু গোল্ডেন পন্ডে কাটানোর সময় একদিন তাদের কাছে একমাত্র মেয়ে চেলসির চিঠি আসে। এর এক দুয়েক দিনের মাথায় চেলসি তার বয়ফ্রেন্ড বিল এবং বিলের ১৩ বছর বয়সী ছেলে বিলি, নরম্যানের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাদের সাথে গোল্ডেন পন্ডে দেখা করতে আসে। চেলসির সাথে তার বাবার সম্পর্ক খুব একটা ভালো না থাকায় তার মধ্যে নরম্যানকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা যায়। দুই একদিন এভাবে কাটানোর পর ইউরোপ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবার আগে বিল এবং চেলসি ছোট্ট বিলিকে নরম্যান এবং এথেলের দায়িত্বে রেখে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এই বিপরীত মেরুর দুই বাসিন্দার মধ্যে প্রথমদিকে সম্পর্ক ভালোভাবে তৈরি না হলেও কালক্রমে তারা বন্ধু হয়ে উঠে; বিলির জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে পড়ে নরম্যান। সাদামাটা গল্পের অন গোল্ডেন পন্ড অনেকটাই এমন...ভিন্ন ভিন্ন বেশ কয়েকটা সম্পর্কের উপাখ্যান। এখানে একদিকে যেমন নরম্যান এবং এথেলের দাম্পত্য জীবনের গল্প আছে, ঠিক তেমনভাবে মেয়ে চেলসির সাথে বাবা নরম্যানের বৈরি একটা সম্পর্ক এবং রক্তের সম্পর্কের বাইরে বিলির সাথে বন্ধুত্বের একটা আখ্যানও আছে। নরম্যান থেয়ারের ভূমিকাতে একদিকে হেনরি ফন্ডা যেমন তাঁর জীবনের সেরা কাজের একটি উপহার দিয়েছেন, ঠিক তেমনভাবে ক্যাথেরিন হেপবার্ন এথেল থেয়ারের ভূমিকাতে অনবদ্য অভিনয় করেছেন। ক্যাথেরিন হেপবার্নের সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, তিনি নাকি অভিজাত পরিবার কিংবা নাক উঁচু স্বভাবের মেয়ের ভূমিকা বাদে অন্য জাতীয় কোন চরিত্রে বিশেষ অভিনয় করেননি...এখানে সেই চিরাচরিত স্টাইলের বাইরের কিছুর দেখা মিলবে। হেনরি ফন্ডা এক্ষেত্রে বদমেজাজি বুড়ো এবং ক্যাথেরিন তাঁর আদর্শ সহধর্মিণীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। হেনরি ফন্ডার সুক্ষ্ম রসবোধ যেমন রয়েছে, অন্যদিকে তেমন ক্যাথেরিনের প্রাণবন্তভাব সিনেমাতে সত্যিই এক বাড়তি পাওনা। আর কিছু না হলেও একসাথে এই দুই কিংবদন্তির জুটি বাঁধার ব্যাপারটা সম্পদতুল্য।অন গোল্ডেন পন্ড কাহিনীর দিক দিয়ে সরল গোছের সিনেমা হলেও চরিত্রায়ন হৃদয়স্পর্শি। তবে সিনেমাটা যেহেতু প্লে থেকে তৈরি সেহেতু এটা সংলাপনির্ভর। খুব ছোট ছোট সংলাপ, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ।
“Sometimes you have to look hard at a person and remember he’s doing the best he can. He’s just trying to find his way, that’s all. Just like you.”
অন গোল্ডেন পন্ড: চালচিত্র

on-golden-pond-2

মার্ক রাইডেলের পরিচালনায় অন গোল্ডেন পন্ড সিনেমাটি মূলত একটি প্লে অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল যা লিখেছিলেন আর্নেস্ট থম্পসন। ১৯৭৯ সালে এই নাটকটির সর্বস্বত্ব কিনে নিয়েছিলেন হেনরি ফন্ডার মেয়ে এবং সিনেমাতে চেলসির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া জেন ফন্ডা। জেন ফন্ডা বিশেষত তার বাবা হেনরি ফন্ডার জন্য এই নাটকের সত্ত্ব কিনে নিয়েছিলেন।অনেকে বলেন, অনস্ক্রিনের অন গোল্ডেন পন্ডে নরম্যান থেয়ারের সাথে তার মেয়ে চেলসির যে একটা দুরত্বের সম্পর্ক ছিল, হেনরি ফন্ডা এবং তার মেয়ে জেন ফন্ডার মধ্যে এই একই ধরনের সম্পর্ক বাস্তব জীবনে ছিল বলেই হয়ত অন গোল্ডেন পন্ড এতটা হৃদয়স্পর্শি একটা আবহ তৈরি করতে পেরেছিল। এই সিনেমার পরে বাবা মেয়ের মধ্যে কিছু কিছু ইস্যু সমাধান হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে জেন ফন্ডা অন গোল্ডেন পন্ডের ব্যাপারে বলেছিলেন, “আমার বাবাকে দেয়া উপহার...অবিশ্বাস্যভাবে যা ভীষণ ভীষণভাবে সফল হয়েছিল।”
এছাড়াও আরও বেশ কিছু ব্যাপার আছে, যা অন গোল্ডেন পন্ডকে বিশেষত্ব দান করেছে। শোবিজ বিজনেসে দীর্ঘসময় থাকার পরেও হেনরি ফন্ডা এবং ক্যাথেরিন হেপবার্ন এই সিনেমার আগ পর্যন্ত কখনও একসাথে অভিনয় করেননি। এমনকি তাদের এর আগে কখনও দেখা হয়েছিল না। শুটিং এর প্রথম দিনে ক্যাথেরিন হেপবার্ন হেনরি ফন্ডাকে তার দীর্ঘসময়ের সঙ্গি স্পেন্সার ট্রেসির ‘লাকি হ্যাট’ উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন এবং পুরো সিনেমাতে হেনরি ফন্ডাকে এই হ্যাটটি পরে থাকা অবস্থাতেই দেখা যায়। ৭৪ বছর বয়সী ক্যাথেরিন হেপবার্ন তার সকল স্ট্যান্ট নিজেই করেছিলেন, এমনকি নরম্যান থেয়ার এবং বিলি একটি কোভে আটকে পড়লে সেখানে গিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেবার দৃশ্যও।
চিত্রনাট্যকার থম্পসন মেইনের বেলগ্রেডে গ্রেট পন্ডের পাড়ে গ্রীষ্মকালের সময়টুকু কাটাতেন। কিন্তু সিনেমাটি নিউ হ্যাম্পশায়ারের হোল্ডারনেসের স্কোয়াম লেকে শুট করা হয়েছিল। সিনেমাটিতে যে বাড়ি দেখা যায় তা নিউইয়র্কের একজনের ডাক্তারের ছিল এবং সিনেমার প্রয়োজনে এটাকে কিছুটা রুপান্তরিত করা হয়েছিল। প্রোডাকশন ডিজাইনারের অনুরোধে মূল লিভিং এরিয়ার উপরেব্যালকনি হিসেবে দোতলা অংশ যোগ করা হয়েছিল। শুটের পরে বাড়িটির মালিকের কাছে বাড়িটিকে পূর্বের অবস্থায় ফেরত দেবার কথা থাকলেও তার সংস্করণের কাজ এতটাই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল যে সে বাড়িটিকে দোতলা অবস্থাতেই রেখে দিয়েছিল। এ বাদে সিনেমার প্রয়োজনে সেখানে গ্যাজেবো এবং একটি ছোট বোটহাউজও যোগ করা হয়েছিল।
স্কোয়াম লেকের পানি গ্রীষ্মকালে শুকিয়ে যাবার দরুণ হেনরি ফন্ডা এবং ডো ম্যাককিওন নৌকা ভাঙ্গার পরে পাথর জড়িয়ে ধরার দৃশ্যে আদৌতে দাঁড়িয়ে ছিল। সেপ্টেম্বরের পানি অগভির হবার পরেও ঠান্ডা থাকায় হেনরি এবং ডো উভয়েই তাদের পোশাকের নিচে ওয়েটস্যুট পড়েছিল। কিন্তু অপরদিকে দৃশ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার প্রয়োজনে ক্যাথেরিন হেপবার্ন পানিতে ঝাঁপ দেবার দৃশ্যে কোন ওয়েটস্যুট ব্যবহার করেছিলেন না।
হেনরি ফন্ডা অসুস্থ থাকার কারণে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে অন গোল্ডেন পন্ডের জন্য সেরা অভিনেতার অস্কারটি নিয়েছিলেন তাঁর মেয়ে জেন ফন্ডা। অস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর বাবার অস্কার জয়ের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “বাহ, আমি কী ভাগ্যবতী নই।”
অন গোল্ডেন পন্ড: সমালোচকের চোখে

214751

অন গোল্ডেন পন্ড সম্পর্কে বিখ্যাত সমালোচক রজার এবার্ট বলেছিলেন, বেশ কিছু কারণে অন গোল্ডেন পন্ড সম্পদেরই নামান্তর, কিন্তু আমার মতে সবথেকে শ্রেষ্ঠ হিসেবেযা মনে হয়েছে তা হলো আমি এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে পেরেছি। আমি এর মূল চরিত্রগুলোর সম্পর্ক এবং তারা একে অপরের ব্যাপারেযা অনুভব করে সেসবকিছুর উপরে বিশ্বাস রাখতে পেরেছি।  সিনেমাতে এমনকিছু মুহূর্ত আসে যেখানে মানবজীবনের ক্রমবিকাশ এবং পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকতে হয়। আমি ভালো একটা অনুভূতিকে সাথে নিয়ে থিয়েটার থেকে বের হতে পেরেছি। এই সিনেমা দেখে আমার মনে হয়েছে, আমি বিরল এবং মূল্যবান কিছুর সাক্ষী হয়ে থাকলাম।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিভিউতে ভিন্সেন্ট ক্যানবি বলেছিলেন, সফল ব্রডওয়ে নাটক হিসেবে অন গোল্ডেন পন্ড প্রক্রিয়াজাত আমেরিকান পনিরের মতোই মসৃণ, পরিব্যাপ্ত এবং সহজপাচ্য, যেখানে অভিনেতারা বিষয়টিকে আরও রঙিন করে তুলেছেন। মিস্টার ফন্ডার দীর্ঘ বর্ণিল জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পারফর্মেন্সের মধ্যে এটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মিস হেপবার্নও দারুণ ছিল। অভিনেত্রী হিসেবে তার যে বৈশিষ্ট্যটি সবথেকে বেশি আকর্ষণ করে তা হলো চরিত্রের প্রতি তাঁর নিজেকে উৎসর্গ করার কায়দা।
 
লেখক পরিচিতি:
সান্তা রিকি পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ব ও খনিবিদ্যা বিষয়ে। বই পড়তে আর সিনেমা দেখতে ভালো লাগে। বিশেষ করে ক্রাইম-থ্রিলার, মিস্ট্রি এবং অনুবাদ জগতের প্রতি তার অন্য ধরণের ভালো লাগা কাজ করে। ইতোমধ্যে টেস গেরিটসেনের একটি বই অনুবাদও করেছেন। দ্য সার্জন নামের সেই বইটি প্রকাশিত হয়েছে বাতিঘর থেকে। সান্তা বর্তমানে ত্রৈমাসিক একটি ম্যাগাজিনের চলচ্চিত্র বিভাগে নিয়মিত লেখালেখি করেন।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ
জর্জ বার্নাড শ’ একমাত্র ব্যক্তি যিনি  অস্কার ও নোবেল প্রাইজ দু’টোই পেয়েছেন। ১৯২৫ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পান আর Pygmalion ছবির জন্য ১৯৩৮ সালে সেরা চিত্রনাট্য (অ্যাডাপ্টেড) এর অস্কার লাভ করেন।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com