Smiley face

এই দশকের অস্কার নমিনেশন পাওয়া অ্যারাবীয়ান মুভিগুলো

2222
এ পর্যন্ত মোট ৮টি অ্যারাবীয়ান মুভি অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে যার মধ্যে এই দশকের চলচ্চিত্রই ৫টি।  ২০১০ বা এর পরে মুক্তি পাওয়া মুভিগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা।
Outside the Law (2010) - আলজেরিয়া
1
২২টি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে আলজেরিয়াই হচ্ছে একমাত্র রাষ্ট্র, যারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক ফ্রান্সের দখল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য ১৯৫৪ সালে গঠিত হয় জাবহাত আত্‌তাহরির আল-ওয়াতানি তথা National Liberation Front (FLN), যাদের সশস্ত্র গেরিলা আক্রমণ ফ্রান্স রিপাবলিকের ভিত নড়িয়ে দেয়। চার্লস দ্যা গলের সরকার তাদের এবং আলজেরিয়ার জনগণের উপর ক্র্যাকডাউন শুরু করলে তারা থেমে না গিয়ে বরং আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে নতুন করে সংগঠিত হতে থাকে এবং তাদের গেরিলা আক্রমণকে আলজেরিয়া থেকে ফ্রান্সেও ছড়িয়ে দেয়। এফএলএনের সশস্ত্র গেরিলা আক্রমণের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে আলজেরিয়া তার স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়।
আউটসাইট দ্যা ল মুভিটার পটভূমি এই এফএলএন এর আইন বহির্ভুত বিভিন্ন অপারেশন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর আত্মসমর্পনের পর আলজেরিয়ানরা স্বাধীন আলজেরিয়ার দাবিতে নতুন পতাকা নিয়ে মিছিল শুরু করলে সেখানে বাধা দেয় ঔপিনেবিশেক ফ্রেঞ্চ সৈন্যরা। সংঘর্ষে প্রায় শতাধিক ফ্রেঞ্চ নিহত হয়। পরবর্তী ফ্রেঞ্চদের প্রতিশোধমূলক কুখ্যাত "সেতিফ" গণহত্যায় নিহত হয় অন্তত হাজার দশেক আলজেরীয়। মুভির কাহিনী গড়ে ওঠে এক পরিবারের তিন ভাইকে কেন্দ্র করে, যাদের নিরীহ পিতা এই সেতিফ গণহত্যায় নিহত হয়েছিল।
পিতার মৃত্যুর পর দুই ভাই এবং তাদের মা ফ্রান্সে পাড়ি জমায়, যেখানে তাদের আরেক ভাই আগে থেকেই জেল খাটছিল। ধীরে ধীরে তিন ভাইয়ের প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এফএলএনের কর্মকার্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ে। একের পর এক চোরাগুপ্তা হামলা করে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে ফ্রেঞ্চ প্রশাসনকে। তাদের বিভিন্ন অপারেশন, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বিশ্বাসঘাতক সদস্যদের মৃত্যুদন্ড, ফ্রেঞ্চ প্রশাসন কর্তৃক পাল্টা সন্ত্রাসী সংগঠন দিয়ে তাদেরকে মোকাবেলার চেষ্টা - এসব কিছু নিয়েই এগিয়ে গেছে আউটসাইড দ্যা ল মুভিটি। মুভিতে ফ্রান্সের গণহত্যা, অমানবিকতা দেখানোর পাশাপাশি এফএলএনের কঠোরতাও সমানভাবে উঠে এসেছে। বাস্তবেও এফএলএনের হাতে প্রচুর বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিল।
মুভিটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের পক্ষে আলজেরীয় সেনাদের অংশগ্রহণ এবং প্রতারণার শিকারের উপর একই পরিচালকের নির্মিত মুভি "ডে'জ অফ গ্লোরি"র স্ট্যান্ডঅ্যালোন সিকুয়েল বলা হয়। সরাসরি কোন সম্পর্ক না দেখানো হলেও দুই মুভির প্রধান অভিনেতারা একই, চরিত্রগুলোও প্রায় একই, এবং প্রথম মুভি যেই সময়ে শেষ হয়েছে, দ্বিতীয় মুভি সেখান থেকেই শুরু হয়েছে। তবে প্রথম মুভিটা ফ্রেঞ্চ প্রোডাকশন হলেও আউটসাইট দ্যা ল ফ্রেঞ্চ-আলজেরিয়ান যৌথ প্রডাকশন। এবং এটা আলজেরিয়ান মুভি হিসেবেই বেস্ট পিকচার ক্যাটাগরিতে অস্কার নমিনেশন পেয়েছিল।
Omar (2013) - ফিলিস্তিন
2
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের উপর ভিত্তি করে নির্মিত অসাধারণ একটা ড্রামা। হানি আবু আসাদের অস্কার নমিনেশন পাওয়া দ্বিতীয় মুভি এটি। আমরা নিউজে শুধু ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক এবং সামরিক সংকটটাই দেখি, কিন্তু এর বাইরে ওদের সামাজিক সমস্যগুলো কিরকম, সেটা আমরা কখনও জানতে পারি না। দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলী দখলদারিত্ব এবং ইসরায়েলী এজেন্টদের তত্‍পরতার কারণে ফিলিস্তিনের সামাজিক সংকটগুলো যে কিরকম প্রকট রূপ লাভ করেছে, সেটা এই মুভি দেখলে কিছুটা আঁচ করা যায়।
পশ্চিম তীরের দেয়ালের দুই পাশে বাস করা দুই প্রেমিক-প্রেমিকা ওমর এবং নাদিয়াকে নিয়ে মুভির কাহিনী গড়ে উঠেছে। ওমর প্রায়ই দেয়াল টপকে নাদিয়ার সাথে দেখা করতে যায়। একদিন দেয়াল টপকানোর ইসরায়েলী সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে মার খাওয়ার পর সে এবং তার দুই বন্ধু রাতের বেলায় গোপনে একটা ইসরায়েলী চেকপয়েন্টে হামলা করে এবং তাদের একজনের গুলিতে এক ইসরায়েলী সৈন্য মারা যায়। শুরু হয় ইসরায়েলীদের অভিযান। অপারেশনের সংবাদ এবং গোপন আস্তানার খবর কেউ একজন ইসরায়েলীদের বলে দিচ্ছে - এটা নিয়ে তিন বন্ধুর মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব-অবিশ্বাস। একজন আরেকজনকে ধরিয়ে দিতে, এমনকি হত্যা করতেও পিছপা হয় না। সাথে আছে ইসরায়েলী এজেন্টদের হীন চক্রান্ত - বন্দীদেরকে ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের ইনফর্মার হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা। সব মিলিয়ে রোমান্টিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে তৈরি একটা জমজমাট থ্রিলার।
একই পরিচালকের অস্কার নমিনেশন পাওয়া প্রথম মুভি প্যারাডাইস নাউ এর তুলনায় ওমর অনেক বেশি ম্যাচিওর্ড একটা কাজ। সবার অভিনয়ও চমত্‍কার। মুভিতে বাংলাদেশ নিয়েও একটা ডায়লগ আছে, যদিও সেটা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা অবমাননাকর।
The Square (2013) - মিসর
3
দ্যা স্কয়ার তথা আল মাইদান মূলত একটি মিসরী-আমেরিকান ডকুমেন্টারি, যেটাতে আহমেদ হাসান নামের এক বিপ্লবীর দৃষ্টিতে মিসরের তাহরীর স্কয়ারকে (মাইদান আত্‌তাহরীর) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আন্দোলনের সফলতা এবং ব্যর্থতাগুলো উঠে এসেছে। প্রেসিডেন্ট হুসনে মোবারক বিরোধী আরব বসন্তের আন্দোলনের একেবারে শুরু থেকেই সমাজের নিচুশ্রেণী থেকে উঠে আসা এক যুবক কিভাবে জড়িয়ে পড়ে, কিভাবে সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত কিভাবে তার স্বপ্নভঙ্গ হয়, তার বাস্তবচিত্র উঠে এসেছে এই ডকুমেন্টারিতে। ডকুমেন্টারিটা আহমেদ এবং তার কয়েকজন বিপ্লবী বন্ধুকে নিয়ে তৈরি করা হলেও এটা আসলে তাহরীর স্কয়ারে জমায়েত হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষেরই গল্প।
মেইনস্ট্রীম মিডিয়াগুলো শুধু হুসনে মোবারকের পতন পর্যন্তই তাহরীর স্কয়ার এবং সেখানকার মানুষের আন্দোলন কভার করেছিল। কিন্তু ডকুমেন্টারি সেখানে শেষ হয়নি, বরং বলা যায় সেখান থেকেই এটা শুরু হয়েছে। মোবারকের পতনের পর কিভাবে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ, ধীরে ধীরেক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা,গ্রেপ্তার, নির্যাতন সহ্য করেওমানুষের আবারওতাহরীর স্কয়ারে জমায়েত হওয়া, এবং শেষ পর্যন্ত আর্মির নতি স্বীকার করা – সব কিছুই উঠে এসেছে এই ডকুমেন্টারীতে।
ডকুমেন্টারীর একটা বড় অংশ জুড়ে আছে মুসলিম ব্রাদারহুড বিতর্ক। মোবারক বিরোধী আন্দোলনের শুরুতে অংশগ্রহণ না করে নিরাপদ দূরত্বে থাকলেও আন্দোলনের সফলতার পর সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর সাথে নেগোশিয়েট করে চাপ সৃষ্টি করে কিভাবে তারা সংবিধান প্রণয়নের আগেই নির্বাচনের আয়োজন করে ক্ষমতা নিশ্চিত করল, এবং সেটা করতে গিয়ে সেক্যুলার বিপ্লবী, যারা ছিল মোবারকবিরোধী আন্দোলনের মূল নায়ক, তাদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল, সেটা অত্যন্ত চমত্‍কারভাবে উঠে এসেছে এতে। ক্ষমতায় আসার পর ব্রাদারহুডেরও মোবারকের মতোই স্বৈরাচারী আচরণ, বিরোধী মত দমন,মোহাম্মদ মুরসীর হুসনে মোবারকের চেয়েও বেশি ক্ষমতা কুক্ষিগত করা প্রভৃতি কারণে কিভাবে আবারও লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং শেষ পর্যন্ত মুরসীর পতনের পর আবারও সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা যায়, সেটাও বাদ পড়েনি এই ডকুমেন্টারীতে।
এই ডকুমন্টারিতে একটা খুব বড় শিক্ষনীয় উক্তি আছে। সেটা হচ্ছে, বিপ্লব এবং রাজনীতি এক কথা না। আরব বসন্তে মানুষ বিপ্লব করে স্বৈর শাসকদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের রাজনীতি সচেতনতা এবং কোন রাজনৈতিক দর্শন, এবং তাদেরকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ না থাকায় তার সুফল তারা ভোগ করতে পারে নি। ডকুমেন্টারি তাই শেষ হয়েছে আহমেদের হতাশামূলক উক্তি দিয়ে যে, তাদের জীবন সম্ভবত এভাবে তাহরীরের রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলন করেই কেটে যাবে। এটি বিখ্যাত নেটফ্লিক্সের তৈরি প্রথম ডকুমন্টারি।
 Timbuktu (2014) - মৌরিতানিয়া
4
বিভিন্ন এলাকা দখল করে সেখানে জোরপূর্বক কঠোর শরীয়া আইন প্রতিষ্ঠা করাটা আইএসের ট্রেডমার্ক হলেও কিছু কিছু জায়গায় ভিন্ন নামে আল-ক্বায়েদাও বিভিন্ন সময় পরীক্ষামূলকভাবে শরীয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেরকম একটা জায়গা হল মালী। ২০১২ সালের দিকে আনসার দীন নামের একটি চরমপন্থী সংগঠন, যেটা মূলত আল ক্বায়েদা ইন ইসলামিক মাগারেব এর একটা অফশ্যুট, মালীর তিম্বাকতু দখল করে নেয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে কঠোর শরীয়া আইন কার্যকর করতে থাকে।
তিম্বাকতু মুভির কাহিনী গড়ে উঠেছে এই তিম্বাকতুর একটি পরিবারকে ঘিরে, যে পরিবারের প্রধান ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে একজনকে হত্যা করে ফেলে। শরীয়া আইন অনুযায়ী তার বিচার প্রক্রিয়া, তার স্ত্রীর প‌্রতিশোধপরায়ণতা এবং কন্যার ভবিষ্যত - এসব নিয়েই এগিয়ে গেছে মুভির কাহিনী। একটা শহর যখন কোন ইসলামী চরমপন্থী গ্রুপের দখলে যায়, তখন সেখানে আসলে কী ঘটে, সেটার একেবারে বাস্তব চিত্রটিই এই মুভিতে উঠে এসেছে। সিগারেট খাওয়া নিষেধ, মহিলাদের নেকাব ছাড়া চলাচল নিষেধ, গান-বাজনা নিষেধ, এমনকি ফুটবল খেলাও নিষেধ। তবে সব অপরাধের শাস্তি অবশ্যই মৃত্যুদন্ড না, বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি বিভিন্ন মাত্রার।
মুভির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এখানে জোর করে আনসার দীনের কঠোরতম রূপ দেখানোর চেষ্টা করা হয়নি, বাস্তবে যেরকম ঘটেছিল সেরকমই তুলে ধরা হয়েছে। এর সব সদস্য রক্তপিপাসু হায়েনা না, বা সিআইএ-মোসাদের এজেন্ট না; তারা আমাদের মতোই মানুষ, কিন্তু তাদের আদর্শটা ভুল। শরীয়া কোর্টের কাজীকে মোটামুটি নম্র চরিত্রের মানুষ হিসেবেই দেখানো হয়েছে। এর সদস্যদেরকেও দোষগুণে মিশ্রিত হিসেবেই চিত্রায়িত করা হয়েছে। সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ, তাই সবার সামনে খেতে পারে না, কিন্তু নেতা নিজেই লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খায়। ফুটবল খেলা নিষিদ্ধ, কিন্তু ফ্রান্স থেকে আগত এর সদস্যরা অবসরে নিজেদের মধ্যে ক্লাব ফুটবল নিয়ে আলোচনা করে।
মৌরতানীয়ান এই মুভিটা সমালোচকদের দারুণ প্রশংসা অর্জন করেছে। মুভিতে লংশটে ধারন করা বেশ কয়েকটা দৃশ্য আছে, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার মতো। এছাড়াও গোপনে প্রতীকি ফুটবল খেলার একটা দৃশ্য আছে, পুরো সিনেমা বাদ দিলেও শুধু ঐ একটা দৃশ্যের মধ্য দিয়েই পরিচালক জিহাদী শাসণের অধীনে যাপিত জীবনের সারমর্ম সফলভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন।
আইএমডিবির কমেন্ট সেকশনে অনেক দর্শকদের কমেন্ট দেখে মনে হয়েছে তাদের অনেকে হতাশ, এখানে আনসার দীনকে যথেষ্ট কঠোর দেখানো হয় নি। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে পরিচালক যথেষ্ট বাস্তবসম্মত দৃশ্যই দেখিয়েছেন। লিবিয়াতে আল-ক্বায়েদার আরেকটা অফশ্যূট আনসার আল-শারীয়া, যারা বেনগাজীতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হত্যার জন্য দায়ী এবং পরবর্তীতে যাদের একটা অংশ আইএসে যোগ দিয়েছিল, তাদের অধীনে বছর দেড়েক বসবাস করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মুভিটা যেকোন নিউজ এবং আর্টিকেলের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মতভাবে জিহাদীদের চরিত্র তুলে ধরতে পেরেছে। বর্তমান বিশ্বের জঙ্গীবাদের অন্তত একটা দিক সম্পর্কে জানতে হলেও এটা একটা মাস্ট ওয়াচ মুভি।
Theeb (2014) - জর্ডান
5
১৯১৬ সালের কাহিনী। সিরিয়ার আলেপ্পো থেকে ইয়েমেনের এডেন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ আরব ভূমিকে উসমানীয় খিলাফতের হাত থেকে মুক্ত করে স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একদল আরব বিদ্রোহ শুরু করে, ইতিহাসে যা থাওরা আল-আরাবীয়া আল-কোবরা তথা দ্যা গ্রেট আরব রিভোল্ট নামে পরিচিত। সে সময় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক ছিল অক্ষশক্তি, আর ব্রিটেন ছিল মিত্রশক্তি। আরব বিপ্লবীদের তুরস্কের উসমানীয় সাম্রাজ্য বিরোধী এ লড়াইয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় ব্রিটিশরা।
মুভির পটভূমি এই আরব বিদ্রোহকে ঘিরেই। ওয়াদি রুম নামক উপত্যকায় বসবাসরত এক আরব বেদুইন পরিবার, যাদের পেশা হ্জ্জযাত্রীদের পথপ্রদর্শন, তাদের তাঁবুতে এক সন্ধ্যায় এক ব্রিটিশ সৈন্য এবং তার গাইড এসে হাজির হয়। ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে একটি রহস্যময় বাক্স, যেটা সে নির্মানাধীন অটোমান রেলওয়ের কাছাকাছি একটি কূপ পর্যন্ত তার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে দিতে চায়। বেদুইন যুবক হুসেইন এবং তার ভাই বালক দীব আগন্তুকদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে রাজি হয়। তারা জানত, তাদের যাত্রাপথে গাত্তায়ীন আল-ত্বোরক তথা রোড ব্লকার্স বা ডাকাতরা ওঁত্‍ পেতে আছে। কিন্তু তারপরেও ব্রিটিশ সৈন্যের পীড়াপীড়িতে তারা যাত্রা অব্যাহত রাখার সিন্ধান্ত নেয়।
তাদের এই যাত্রাপথের ঘটনাবলি নিয়েই দীব মুভির কাহিনী। মুভির মূল চরিত্র বালক দীব। রুক্ষ মরুর বুকে যাত্রাপথে ডাকাতদের সাথে সংঘর্ষ, আকস্মিক মৃত্যু, মরুর বুকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা আর শুত্রুর সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা, আরব বিপ্লবীদের মুখামুখি হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত অটোমান সেনাপতির সাথে দেখা হওয়া - সব কিছুই দীবকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। দীবের চরিত্রে জাকির ঈদ অসাধারণ অভিনয় করেছে। মুভিতে একমাত্র ব্রিটিশ সৈন্য ছাড়া বাকি সবাই অপেশাদার বেদুইন অভিনেতা, যারা জীবনে প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পরিচালকের দক্ষতায় সেটা বোঝার কোন উপায় নেই।
কিছু কিছু মুভি আছে, যেগুলো দেখলেই চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় এটা অস্কার নমিনেশন পাবেই। জর্ডানীয়ান এই মুভিটি সেরকমই একটি মুভি। শুধু অস্কার না, এই মুভিটি এবং এর পরিচালক নাজী আবু নওয়ার ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস, ভেনিস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সহ অনেকগুলো সম্মানজনক পুরস্কার জিতেছে এবং মনোনীত হয়েছে। অনেক সমালোচক এই মুভিকে "বেদুইন ওয়াস্টার্ণ" নামে অভিহিত করেছেন। এই মুভির মরু উপত্যকার প্রকৃতির দৃশ্যগুলো এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও অসাধারণ।
এছাড়াও অস্কার নমিনেশন পাওয়া অন্য অ্যারাবীয়ান মুভিগুলো হল: Battle for Algiers (1966), Paradise Now (2005), Ajami (2009)। এরমধ্যে Ajami অবশ্য ইজরায়েলি-আরব মুভি।
 
লেখক পরিচিতিঃ
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ত্রিপলী, লিবিয়া।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ
অস্কার ইতিহাসের পুরস্কারের দিক থেকে সবচেয়ে সফল ৩ সিনেমা হলো Ben-Hur (1959), Titanic (1997), The Lord of the Rings: The Return of the King (2003). প্রত্যেকটি নানা ক্যাটাগরীতে মোট ১১টি করে অস্কার জিতে নেয়।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com