Smiley face

অতঃপর অস্কার প্রত্যাখান

brando-no-oscar
একটা অস্কারের জন্য কত নামীদামী তারকাই না সারাজীবন হাপিত্যেশ করে। আর এই অস্কারই কিনা পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছেন কিছু আধপাগল মানুষ! কারণ খুঁজেছেন আশিকুর রহমান তানিম
অক্টোবর মাস আসলেই নাকি বিশ্বের বিভিন্ন নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা বহু গবেষকদের মাথা আউলিয়ে যায়! কারণ কি বলুন তো? কারণ, অক্টোবর মাসে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক সম্মাননা ‘নোবেল’ দেয়া হয় আর সেটা না পেয়ে বিগড়ে যায় এমনিতে সাদাসিধে আমুদে এইসব গবেষকেরা! (রেফারেন্সঃ দেশের বাইরে দেশ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল)
সিনেমা জগতেও আছে এরকম সম্মাননা পুরস্কার যার কেতাবী নাম ‘অ্যাকাডেমী অ্যাওয়ার্ড অফ মেরিট’; আর প্রচলিত নাম ‘অস্কার’। ফিল্মের রোলের উপর তরবারী হাতে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই সোনায় মোড়ানো বীরের মূর্তিকে তালুবন্দী করা বোধহয় তাবৎ দুনিয়ার সকল সিনেমা কলা-কুশলীদের স্বপ্ন। শুধু কি সিনেমার কুশীলবরাই? ভক্ত হিসেবে আমরাও কি চাইনা আমাদের প্রিয় তারকা ছুঁয়ে দেখুক এটিকে? আপনিই বলুন, গত কয়েক বছরে লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর অস্কার জয় নিয়ে আমি-আপনিও কি কম হাপিত্যেশ করেছি? কিংবা আল পাচিনোর দিনের পর দিন বঞ্চিত হওয়া নিয়েও কি সিনেমাপ্রেমীদের কম আক্ষেপ ছিলো? বুঝতেই পারছেন, এই পুরস্কারের মূল্য কিংবা সম্মান কতটা! কিন্তু, মজার ব্যাপার কি জানেন? এর মধ্যেও অনেকে আছেন, যারা এই সম্মানের থোড়াই কেয়ার করে গেছেন! নানাবিধ কারণেই তারা হৃদয় ভেঙেছেন এই স্বর্ণবেষ্টিত মূর্তিটির। চলুন, আজকে জেনে আসি এরকমই কিছু ঘটনাবলী আর সেইসব ঘটনাবলীর নেপথ্যের মানুষদের কাহিনী!
১। ডাডলি নিকোলস, (সেরা চিত্রনাট্যকার, দ্যা ইনফর্মার, ১৯৩৬)
তখন হলিউড নির্বাক যুগ পেরিয়ে ঢুকে গেছে সবাক চলচ্চিত্রে। স্বাভাবিকভাবেই, সিনেমার স্ক্রিপ্টের গুরুত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণ, কেননা সংলাপ যুক্ত হয়েছে চরিত্রগুলোর মুখে। কিন্তু, সংলাপ গুলো রচনার পেছনে যাদের অক্লান্ত অবদান, তাদের গুরুত্ব কি বেড়েছে হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে? না, তখনো তারা নির্বাক যুগের মতই থেকে গেছেন অবহেলিত। লেখকদের পার্টিতে দাওয়াত দেয়া হত না, ভাবা হত তারা একটু ‘মাথা-খারাপ’ গোছের যারা সিনেমার ভিজ্যুয়ালাইজেশনের ব্যাপারটা ঠিক বুঝবেন না। আর বিজ্ঞাপনে তো তাদের নাম খুঁজেই পাওয়া যেত না।
আর লেখকদের প্রতি হলিউডের এহেন বিমাতাসুলভ আচরণের জন্যই ডাডলি নিকোলস তার রচিত চিত্রনাট্যের উপর নির্মিত ‘দ্যা ইনফর্মার’ সেরা চিত্রনাট্য সহ ৪ টি ক্যাটাগরিতে অস্কার পেলেও, অস্কার অনুষ্ঠানেই আসেননি, পুরস্কার গ্রহণ তো দূরের কথা।
২। জর্জ সি স্কট, (সেরা অভিনেতা, প্যাটন, ১৯৭১)

scott

আচ্ছা, অস্কার পুরস্কার নাহয় কেউ না গ্রহণ করলেন, তাই বলে কি মনোনয়নও অগ্রাহ্য করবেন? হুম, ঠিক তাই করেছিলেন জর্জ সি স্কট। কুব্রিকের ডার্ক স্যাটায়ার ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ’ এর সেই পাগল কিসিমের জেনারেল টারজিডসন-এর চরিত্রে অভিনয় করা এই বিখ্যাত অভিনেতা প্রথমবার নমিনেশন পেয়েছিলেন ‘দ্যা হাসলার’ এর জন্য। কিন্তু, নমিনেশনের পরপরই অ্যাকাডেমি কমিটিকে তিনি টেলিগ্রাম করেন যেন তাকে এসব পুরস্কারের জন্য বিবেচনা না করা হয়। সেবার ভাগ্যে শিঁকে না ছিড়লেও ১৯৭০ সালে ‘প্যাটন’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় অনবদ্য ভূমিকায় অভিনয় করে ঠিকই জিতে নেন অস্কার। এইবারও সেই একই প্রতিক্রিয়া। স্কটের একই কথা যে, অভিনেতা আর কলা-কুশলীরা রেসের ঘোড়া না যে তাদেরকে প্রতিযোগিতায় জিততে হবে। তিনি বলেছিলেনঃ
“এইসব অনুষ্ঠানগুলো দুই ঘন্টার মাংস উৎসব ছাড়া আর কিছুই না যেখানে কৃত্তিম উত্তেজনার একটা প্রদর্শনী করা হয় অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে!”
৩। মার্লন ব্রান্ডো, (সেরা অভিনেতা, দ্যা গডফাদার, ১৯৭৩)
মার্লন ব্রান্ডোকে চেনে না এমন সিনেমাপ্রেমী কে আছে? ‘দ্যা গডফাদার’ সিনেমায় ‘ডন ভিটো কর্লিয়নি’ চরিত্রে অভিনয়কারী এই অভিনেতা সমগ্র সিনেমা ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাই ভিটো কর্লিয়নির ভূমিকায় অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ অস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় সেটা আলোড়ন তুলেছিলো সমগ্র বিশ্বে!
গডফাদার এর জন্য সেরা অভিনেতার নাম ‘মার্লন ব্রান্ডো’ ঘোষণা করতেই সবাই অবাক হয়ে দেখলেন, মঞ্চে রেড ইন্ডিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত এক তরুণী এসে দাঁড়ালেন; নিজের পরিচয় দিলেন ‘শাচীন লিটলফিদার’ নামে। হাতের ছোট্ট কাগজ থেকে মার্লন ব্রান্ডোর লেখা ছোট্ট ভাষণ পড়ে শোনালেন যার সারমর্ম এরকম যে, “বিগত ২০০ বছর ধরেই নেটিভ আমেরিকানদের প্রতি অবিচার আর অত্যাচার করে আসছি আমরা। নেটিভ আমেরিকানরা যেখানে তাদের জায়গা-জমি, ভাষা, সংস্কৃতির জন্য লড়াই করছে, সেখানে আমরা তাদের হত্যা করেছি, তাদের সাথে প্রতারণা করেছি, তাদেরকে নিগৃহীত করেছি। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা ইন্ডিয়ানদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করেছে, তাদেরকে শত্রুরূপে উপস্থাপন করেছে। তাই আমার পক্ষে আজকে রাতে প্রদেয় এই পুরস্কার গ্রহণ করা সম্ভব না।”

https://www.youtube.com/watch?v=2QUacU0I4yU

 

৪। উডি অ্যালেন
রেকর্ড সংখ্যকবার মনোনয়ন পাওয়া ও ৪ বার অস্কার জেতা এই নির্মাতা ও অভিনেতা তার কোন মনোনয়নের বেলায়ই অস্কার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেননি। তিনি কেবল একবারই এসেছিলেন অস্কারে, ২০০২ সালে টুইন টাওয়ার হামলা পরবর্তী অনুষ্ঠানে; তাও নিউইয়র্কে নির্মিত তার একটি ‘মন্তাজ’ ( বিভিন্ন দৃশ্যের ফুটেজ) প্রদর্শন করাতে যেন সবাই বুঝতে পারে, নিউইয়র্ক এখনো সিনেমা বানানোর জন্য ঠিকঠাক আছে। তিনি কেন তার সিনেমা অস্কারে মনোনয়ন পেলেও অনুষ্ঠানে আসেন না জিজ্ঞেস করলে বলেন, “আমার এসব অনুষ্ঠানের প্রতি আসলে কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই। আমার মনে হয়না অস্কার কর্তৃপক্ষ আসলে জানে তারা কি করছে। যখন আপনি দেখবেন কারা এসব পুরস্কার জিতছে- অথবা কারা জিতছে না- আপনি তখনই বুঝবেন এইসব অস্কার ফস্কার কতটা অর্থহীন!”
যাই হোক, ২০০২ সালেঅস্কার মঞ্চে তার স্বভাবসুলভ উইটি কথা আর স্ট্যান্ড আপ কমেডির হাস্যরসে ভরপুর ‘লাভ লেটার টু নিউ ইয়র্ক’ নামের এই ছোট্ট ভিডিওটি দেখতে পারেন এখানেঃ

https://www.youtube.com/watch?v=rpwF6fbLFw4

 
৫। জ্যাঁ লুক গঁদার
২০১০ সালে অ্যাকাডেমি কমিটি ঘোষণা করে যে, তারা ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ সিনেমার পথিকৃৎ জ্যাঁ লুক গঁদার কে সম্মাননা অস্কার দিবে। কিন্তু, এরপরই তারা আবিস্কার করে যে, গঁদারের সাথে যোগাযোগ করা নিতান্তই অসম্ভব। টেলিফোন, টেলিগ্রাম, চিঠি, ফেডেক্স কিছুতেই তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না! তারা অনেক চেষ্টা করলেও তখন ৮০ বছর বয়েসী এই নির্মাতার কাছ থেকে কোন উত্তরই পাননি। যদিও হলিউডের সাথে গঁদারের সম্পর্ক কখনোই উষ্ণ ছিলো না, কিন্তু শোনা যায় যে, বিমানে ধূমপান করতে পারবেন না বলে তিনি ফ্রান্স থেকে আমেরিকা আসার নামই নেন না। আবার তার দীর্ঘ সময়ের সহযোগীর মতে, গঁদার এই বুড়ো বয়েসে আমেরিকা যাবেন না। এতদূর শুধু একটা ধাতব মূর্তির জন্য যাওয়ার মত মানুষ গঁদার নন।
বুঝুন অবস্থা!
৬। ‘ব্যাংক্সি’
২০১০ সালেরই অস্কারের ঘটনা। ব্রিটিশ প্রামাণ্যচিত্র ‘এক্সিট থ্রু দ্যা গিফট-শপ’ এর জন্য মনোনয়ন পান এই অজ্ঞাতনামা শিল্পী। কিন্তু, তিনি তার প্রকৃত পরিচয় না প্রকাশের শর্তে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবেন জানিয়ে দেন অ্যাকাডেমি কমিটিকে। কিন্তু, কমিটি এই শর্ত মেনে না নিলে অস্কারে আর উপস্থিত হন না ‘ব্যাংক্সি’ ছদ্মনামে পরিচিত এই শিল্পী। কিন্তু, মজার ব্যাপার হল যে, অস্কার অনুষ্ঠানের কিছুদিন আগে লস অ্যাঞ্জেলেসে এই ম্যুরালটি দেখা যায়, যাকে ব্যাংক্সির কীর্তিকলাপ হিসেবেই দাবী করেন সবাই। ‘মিঃ ব্রেইনওয়াশ’ নামের এই ম্যুরালটিতে হলিউডকে গ্যালাকটিক জগতের সাথে তুলনা করে চূড়ান্ত বিদ্রুপ করা হয়।

banksy

যাই হোক, শেষমেশ সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার পায় আরেকটি প্রামাণ্যচিত্র ‘ইনসাইড জব’।
এই ছিলো অস্কারসংক্রান্ত অবজ্ঞার কিচ্ছাকাহিনী। এছাড়াও, টেরেন্স মালিক, ক্যাথেরিন হেপবার্নও অস্কার অনুষ্ঠানকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। এই গুণীজনদের অস্কার ফিরিয়ে দেয়ায় তাদের মাহাত্ম্য আসলে কমেনি কোন অংশেই, বরং মহৎ বলেই হয়তো তারা এমনটা ভাবতে পেরেছিলেন যে, এসব পুরস্কার-প্রণোদনায় কি এসে যায়?
“আমার শুধু একটি মুঠি ভরি,
দিতেছ দান দিবস-বিভাবরী।
হল না সারা, কতনা যুগ ধরি
কেবলই আমি লব!”
 
 
লেখক পরিচিতি :
আশিকুর রহমান তানিম পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে। পড়ার বিষয় ব্যবস্থাপনা হলেও মাথায় অবিন্যস্ত সব চিন্তা খেলা করে। সিনেমা দেখতে আর সিনেমা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন বই পড়তে, ঘুরে বেড়াতে। একটা রুম (টুয়েলভ অ্যাংরি মেন) কিংবা ট্রেইনে (নায়ক) আস্ত একটা সিনেমা শেষ হতে দেখে এতোটাই মুগ্ধ হন যে, এখনও প্রিয় পরিচালক বলতে সিডনি আর সত্যজিতের নামটাই সবার আগে মনে পড়ে। প্রিয় অভিনেতা পাচিনো, প্রিয় ক্লাব রিয়েল মাদ্রিদ আর ফ্রান্স। স্বপ্ন দেখেন চলচ্চিত্র নির্মাণের।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ
মরণোত্তর অস্কার জয়ের উদাহরণ কেবল দুইটি। Peter Finch, Network (1977)  ছবির জন্য সেরা অভিনেতা আর Heath Ledger, The Dark Knight (2008) ছবির জন্য সেরা সহ-অভিনেতা বিভাগে অস্কার জেতেন নিজেদের মৃত্যুর পর।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com