Smiley face

অস্কারের অভাগা

ShawshankRedempt_184Pyxurz
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন আদনান আলোচনা করেছেন বিখ্যাত কিছু সিনেমা নিয়ে, যেগুলো সর্বকালের সেরা সিনেমার তালিকায় বেশ ভালোভাবে জায়গা করে নিয়েছে, কিন্তু সিনেমায় সর্বোচ্চ পুরষ্কার অস্কারের বেলায় অবহেলিত হয়েছে সে সময়ের বক্স-অফিস হিট অন্য কোনো সিনেমার তুলনায়।
হাতের মুঠোর কাছেই থাকা সোনার হরিণ – সে ধরা দেয় দেয় করেও যখন বারবার ফসকে যায়, কেমন অসহায় লাগে বলুনতো? আর কেউ বুঝুক না বুঝুক – ব্যাপারটা লিও বোধহয় ভালোই বুঝে। বলছিলাম লিওনার্দো ডিকাপ্রিওর কথা, টাইটানিকের সেই নজরকাড়া রোমান্টিক হিরো’র সু অথবা কুখ্যাতি থেকে নিজেকে বের করে এনে কখনো হয়েছেন হাওয়ার্ড হ্যুজের মতন পাগলা বিলিয়নিয়ার এয়ারক্রাফট ডিজাইনার (The Aviator), কখনোবা গ্যাংস্টার (Gangs of New York), স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন হিরো(The Quick & The Dead), সিআইএ-এফবিআইয়ের চোখ ফাঁকি দেয়া দুর্ধর্ষ জালিয়াত (Catch Me If You Can), এমনকি সেই এফবিআই-এরই প্রধান (J. Edgar) বা আন্ডারকভারএজেন্ট (The Departed)। Blood Diamond, Inception, Django Unchained, Great Gatsby, The Wolf of Wall street – এই সিনেমার নামগুলো দেখেই যারা এগুলো দেখেছেন, তারা অনায়াসেই আমার মত প্রশ্ন করবেন – “অস্কার দেয় তাহলে কাকে?!!”। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যর্থতা নিয়ে কতশত মেমেই না বানানো হয়েছে লিওর এই অস্কার না পাওয়াকে সামিল করে, কিংবা ব্যর্থতা ভুলে বারবার চেষ্টা করতে উদ্বুদ্ধ করে কত উৎসাহব্যঞ্জক উদ্ধৃতিও। অভিনেতা হিসেবে নমিনেশন পেয়েছেন ৪ বার (The Wolf of Wall Street, Blood Diamond, The Aviator, What’s Eating Gilbert Grape), প্রযোজক হিসেবে ১ বার (The Wolf of Wall Street) – এর কোনোবারই পারেননি অস্কার ছুঁতে। শেষমেশ ভালুকের আক্রমণের মুখে জীবন বাজি রেখেছিলেন যেমন করেই হোক অস্কার পাবেন বলে!
কিন্তু কেউ যদি ভেবে বসেন হলিউডে লিওই বুঝি সবচেয়ে অভাগা, সিনেজগতের সবচেয়ে বড় পুরষ্কারটা অর্জনের বেলায় – তাহলে বেশ বড়সড় ধাক্কাই খাবেন বাকিদের কথা শুনলে।
The Shawshank Redemption(1994)
জীবন থেকে ধোঁকা খেয়েছেন? প্রতারিত বোধ করছেন? এমন ঘোর দুর্দশাবস্থায় কি করবেন? আত্মহত্যা করবেন? কাউকে খুন করবেন? নাহ! এমন কিছুই করেননি এই সিনেমার প্রধাণ চরিত্র এন্ডি। বরং নিজের জ্ঞানবুদ্ধি কাজে লাগিয়ে নিজের মত করে প্রতিশোধও নেন, আবার সাহায্য করেন অন্যেদেরও।
এই সিনেমা দেখেছেন এমন দর্শক যে কারোরই পছন্দের শীর্ষে থাকবে এই মাস্টারপিস এতে কোনো সন্দেহই নেই। অথচ অস্কারের ১৯৯৫-এর আসরে সাতটি মনোনয়ন পেয়েও কোনো বিভাগেই জিততে পারেনি এই সিনেমা। যদিও এই একই বছরেই আরো কিছু সিনেমাটিক মাস্টারপিসের জন্ম হয় –Forret Gump, Pulp Fiction, Three Colors trilogy কিংবা Legeds of the Fall । অস্কার জিতে Forret Gump
It's a Wonderful Life(1946)
Best Year of Our Lives – বলুনতো কয়জনে শুনেছেন এই সিনেমার নাম? কিংবা দেখেছেন? দেখেছেন কিন্তু মনে রেখেছেনই বা কয়জন? নিশ্চিতভাবেই হাতেগোণা কয়েকজনও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। সদ্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ আর স্নায়ুযুদ্ধ তুমুলভাবে প্রবল – ঠিক সে সময় একটা সময়োযোগী সিনেমাই হয়তো Best Years of Our Lives, কিন্তু সে বছরের পরপরই এই সিনেমা আর গ্রহণযোগ্য নয় খুব একটা। তাই হয়তো অস্কারে এই সিনেমাই বিবেচিত হয়েছে।
অথচ It’s A Wonderful Life –যে কোনো সময়েই সর্বকালের সেরা। একটা মানুষ, অনেক যোগ্যতা থাকা সত্তেও ভাগ্যদোষে বিসর্জন দেয় একে একে নিজের সব আনন্দ-বিলাসের উপলক্ষ। নিয়তির কাছে বারবার ধাক্কা খায় সে। এমনাবস্থায় কি করবেন? – জর্জ বেইলীও ভাবেন আত্মহত্যা করবেন। কিন্তু এমন কিছু ঘটে – যার কারণে ভাবতে বাধ্য হন – যাই হোক জীবনে, জীবনটা আসলে অনেক সুন্দরই। তাই আগের চেয়ে জীবনকে আরো বেশি উপভোগ করতে শুরু করেন – যতকিছুই আসুক, জীবনকে উপভোগ করার প্রতিজ্ঞা করেন। আপনি নিজে ঘোরতর হতাশায় আছেন? – যদি না দেখেন এই সিনেমা তাহলে দেখুন দয়া করে। যদি দেখে থাকেন – তাহলে নিশ্চিত একবার-দুবার নয়, কয়েকবার দেখেছেন এই সিনেমা।
Taxi Driver(1976)
দ্বিমত করতে পারেন অনেকেই – তারপরেও একই বছরে Rocky সিনেমার অস্কার পাওয়াটা অনেক বেশি অস্বাভাবিক মার্টিন স্করসেইসের এই সিনেমাটিক মাস্টারপিসের তুলনা আছে খুব কমই ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে ফিরা আসা ট্রাভিস, কাজ নেয় নিউইয়র্কের ট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবে। যুদ্ধ আর যুদ্ধকালীন বিভীষিকার কারণে তার মধ্যে দেখা দেয় তীব্র এক মানসিক সংকট – চলমান সমাজ ব্যবসস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে প্রচন্ড অসুবিধায় পড়ে। বিবেক আর বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে নিতেও কষ্ট হয় তার। সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে হতাশায় পড়ে যান মাঝেমাঝে? দেখেন তাহলে ট্রাভিস কেমন করে সেই বাধা উৎরাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে এবং সফলও হয় শেষমেশ।
Psycho(1960), Rear Window(1954), Rope(1948), Vertigo(1958), The Birds(1963)
আলফ্রেড হিচকককে অস্কার দেয়ার মতন যোগ্যতা নাকি অস্কার কমিটির কারোরই ছিলোনা – সিনেমা নিয়ে লেখালেখি করা অনেকেই এমন মন্তব্য করেন। মন্তব্যটা যে অমূলক কিছু না তাঁর সবচেয়ে বড় প্রমাণ উপরে যত সিনেমার নাম লিখেছি সেগুলোর দিকে তাকালে যে কেউই বুঝবেন। বর্তমানে হরর সিনেমা বলতে যা বুঝেন, কিংবা সাসপেন্স – রক্তারক্তিতে ভরা থাকবে এইটাই যেনো স্বাভাবিক। অথচ কোনোরকম রোমহর্ষক দৃশ্য ছাড়াও খুব সহজ স্বাভাবিক দৃশ্য দিয়েই নাটকীয়ভাবে হিচকক আতঙ্কে ফেলতে পারেন সবাইকে । এই সিনেমাগুলো দেখলে এইটা মানতে বাধ্য হবেন যে কেউই। প্রত্যেকটা সিনেমাই একেকটা মাইলস্টোন পুরো দুনিয়ার সিনেমার জন্যে – অথচ হিচকক বা তাঁর সিনেমাগুলোকে অবহেলা করা যেনো অনেক বেশিই অন্যায়!
2001: A Space Odyssey(1968), A Clockwork Orange(1971),Dr. Strangelove or: How I Learned to Stop Worrying and Love the Bomb(1964), The Shining(1980)
“হিচকককে অস্কার দেয়ার মতন যোগ্যতা নাকি অস্কার কমিটির কারোরই ছিলোনা” – ঠিক একই কথা প্রযোজ্য স্ট্যনলি কুবরিকের বেলায়ও। হিচকক যদি সাসপেন্স-থ্রিলার জনরার সিনেমায় অবদানের জন্যে অবিস্মরণীয় থাকেন – একই রকমভাবে সমাজ, সভ্যতা, সামরিক আগ্রাসন নীতির কড়া সমালোচনায় কুবরিকও জন্ম দিয়েছেন একেকটা মাস্টারপিসের।
কুবরিক, অস্কার – এই কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করে দেখুন, ইন্টারনেটে হাজারো লেখা পাবেন যেখানে প্রত্যেকেই দাবি করে অস্কার তাহলে ফালতু একটা বিষয়ই! ২০০১: এ স্পেস অডিসি দিয়ে তিনি সিনেমায় সে আমলেই যে টেকনিক্যাল কারিকুরি দেখিয়েছেন – ওইসময়ই শুধু না, আজও অনেকের কল্পনায় আসতে কষ্ট হবেই। একি সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন,  ক্ষমতা পেলে বানর থেকে মানুষ, কিংবা কম্পিউটার – কতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। একই কাজ করেছেন ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জের বেলায়ও। একটা মানুষ খারাপ হলে তাঁর প্রতি ক্রোধ বা ঘৃণা জন্মাবে, কিন্তু কুবরিক ভাবতে বাধ্য করেন – সেই খারাপ মানুষটাকে সমাজ যেভাবে নোংরাভাবে অপদস্থ করে, তখন দর্শক হিসেবে সবাই ঐ খারাপ মানুষটাকেই তখন অসহায় ভাবতে বাধ্য হয়। আর ঘৃণা প্রতিস্থাপিত হয় ঘুণে ধরা এই সমাজ ব্যবস্থার প্রতি। দর্শকের উপর এমন জোর স্থাপন করতে পারেন কেবল কুবরিক, কিন্তু পারেননি তিনি অস্কার কমিটির মন জয় করতে!
Magnolia(1999)
কতশত কারণে আমরা বন্ধু, পরিবার কিংবা কাছের মানুষদের দূরে ঠেলে দিতে বাধ্য হই। ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের কারণেই হয়তো এমনটা করি। অথচ এই সিনেমায় পরিচালক পল থমাস এন্ডারসন বলেন – “লেট ইট গো”। এই সিনেমার চিত্রনাট্যকে যে সুন্দর নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন – এমনটা গত ১০ বছরে সম্ভবত কোন হলিউডি সিনেমা পারেনি। সিনেমার শুরুটা হয় এমন কিছু অবাক করা কোইন্সিডেন্সের উল্লেখ করে  যেমনটা হয়তো কেউ ভাবতেও পারবেন্না অথচ এমনটা সত্যিই ঘটেছে। এ ছবির প্রতিটা ছোট ছোট গল্প নিয়েই আলাদা আলাদা সিনেমা বানানো যায়। দুর্দান্ত একটি সিনেমা। যদিও একই বছর অস্কার পায় আরেকটি মাস্টারপীস ‘এ বিউটিফুল মাইন্ড’ ।
The Dark Knight(2008)
সাউন্ড আর জোকার ভূমিকায় হিথ লেজারের চিরস্মরণীয় অভিনয়ের জন্য এই চলচ্চিত্রের কপালে অস্কার জুটে ঠিকই, কিন্তু অন্য যে কোনো বিভাগে এই সিনেমা নিঃসন্দেহে দারুনভাবে অবহেলিত। একই বছরে মিল্ক, কিউরিয়াস কেস অব বেঞ্জামিন বাটন বা দা রিডারের মতন সিনেমাগুলা রিলিজ হয়, অথচ স্লামডগ মিল্যনিয়ারের মতন খুব প্রেডিকটেবল একটা সিনেমার ভাগ্যের জুটে বড় বড় সব অস্কার পুরষ্কারগুলো।
12 Angry Men(1957)
বারোজন জুরিকে মাত্র একটা রুমের মধ্যে পুরো সিনেমায় বকবক করিয়েছেন পরিচালক সাহেব । অথচ সেই সিনেমাই কিনা রিমেক হয়েছে সারা পৃথিবীজুড়ে ৫০ বারের চেয়েও বেশি! ভাবা যায় এমন সিনেমা কিনা অস্কার জেতেনা? আসলে এই বছরের সিনেমাগুলো একেকটা আসলেই খুব বড়সড়। তাই অস্কার কমিটির দোষ দেয়া যায়না কিছুতেই। এতটা প্রোডাক্টিভ ছিলো হলিঊড সেই সময়টাতে ! বর্তমানের হলিউডের সিনেমার দিকে তাকালে মারাত্মক হতাশাই গ্রাস করে মাঝেমধ্যে। ব্রিজ অন দা রিভার কাওয়াই, সায়োনারা, উইটনেস ফর দা প্রসিকিউশন এই মুভিগুলোর প্রত্যেকটাকে অস্কার দিতে যদি “যৌথ পুরষ্কার”এর কোনো ব্যবস্থা করা যেত – মন্দ হতোনা।
Once Upon a Time in America(1984), Singin' in the Rain(1952) ইত্যাদি এরকম আরো অনেক মুভির নাম চলে আসে অস্কারের প্রতি বিষোদাগার করতে গেলে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু এটুকুই বলা যায় সব ভালো মুভির অস্কার পেতে বয়েই গেছে!
 
লেখক পরিচিতিঃ
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন আদনান। সিনেমা দেখতে ভালোবাসি, তার চেয়ে বেশি ভালবাসি সেটা নিয়ে চা হাতে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ জমাতে, আইডিয়া-থিম-ডিপ মিনিং শেয়ার করতে - প্রথমে একা একা দেখি, তারপরে সবাই মিলে দেখতে পছন্দ করি। যখন হাতের কাছে কাউকে পাইনা - ছটফট করতে থাকি, নিরুপায় হয়ে তখন সেটা লিখে রাখি। একেকটা লেখা হয়তো ৬ মাস ধরেও লিখি, লিখতে লিখতে নিজের কাছে বিরক্ত লাগলে ফেলে দিই; আর নিজের কাছে ভালো লাগলে চেষ্টা করি অন্যদের সাথেও শেয়ার করতে। ভাল লাগে প্রায় সব রকম মুভি - মুডের উপর ডিপেন্ড করে। সবচেয়ে প্রিয় চলচ্চিত্রকার - কুবরিক, কিয়েসলোস্কি আর সত্যজিত।
অস্কার ট্রিভিয়াঃ
১৯৭২ সালে Cabaret মুভিতে অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেন Liza Minnelli. Liza Minnelli এর বাবা-মাও অস্কারজয়ী। বাবা Vincente Minnelli, Gigi (1958) ছবির জন্য সেরা পরিচালকের অস্কার পান। আর তার মা Judy Garland পান অনারারি অস্কার।  পুরো পরিবারের অস্কার জয়ের এটাই এক মাত্র ঘটনা।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com