Smiley face

তীরে ফিরলোনা ভুবন মাঝি

film-home
গত ৩ মার্চ সারা দেশে মুক্তি পেয়েছে সরকারি অনুদানে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ‌‘ভুবন মাঝি’। ফাখরুল আরেফিন খান পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে লিখেছেন ফরহাদ হোসাইন
ভুবন মাঝি চলচ্চিত্রে তিনটি টাইমলাইন ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৭০-৭১, ২০০৪ আর ২০১৩। ছবির শুরুটা হয় ২০১৩ সালে কুষ্টিয়াতে আনন্দ সাঁই নামক এক বাউলের মৃত্যু সংবাদের মধ্য দিয়ে। এরপরেই আমরা চলে যাই সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে কুষ্টিয়া শহরে; যেখানে ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মূল কাহিনীর সূচনা। নহির রাজনীতি বিমুখ নিরীহ এক থিয়েটারকর্মী। ফরিদা সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত রাজনীতি সচেতন এক নারী, যে মনে করে দেশের এই ক্রান্তিকালে সাংস্কৃতিক কর্মীদের রাজনৈতিক পথেই হাঁটা উচিৎ। সময়ের দাবি অনুযায়ী নহিরের থিয়েটারের চিত্রনাট্য হওয়া উচিত ‘ছয় দফা’; রবি ঠাকুর বা শেক্সপীয়ারের লেখা কোন নাটক নয়।
৭০ এর নির্বাচন, নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নিরুঙ্কুশ বিজয় লাভ ও পরবর্তীতে ভয়াল ২৫ মার্চ কালো রাত হয়ে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠন ও নয় মাসের যুদ্ধ বিজয় ও একটি সোনালী ভোরের অভ্যুদয় সবই স্থান পেয়েছে ভুবন মাঝি চলচ্চিত্রে। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে কুষ্টিয়া শহরের উপরে পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণ, প্রতিরোধ, বিজয়কে কেন্দ্র করেই মুভির অগ্রযাত্রা। পরবর্তীতে ২০০৪ ও ২০১৩ এর প্রেক্ষাপটে কুষ্টিয়া এবং আনন্দ সাঁই (ছবির প্রতিটি টাইমলাইন জুড়েই যার অবস্থান); ২০০৪ এর কুষ্টিয়ায় বাউল সাধকদের জোর করে চুল কেটে দেয়ার মত অবমাননাকর ঘটনা এবং পরোক্ষভাবে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন। হিস্টোরিক্যাল ইভেন্টের আর্কাইভ ফুটেজগুলো এমন ভাবে ছবির বিভিন্ন টাইমলাইনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে এই ঘটনাগুলোই চলচ্চিত্রটির একেকটি গুরুত্ত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই তিনটি টাইমলাইনকে এক সঙ্গে ধরতে গিয়েই কিনা, যোগসূত্র স্থাপনটি যুতসই হয়নি। বরং অনেকটা খাপছাড়াই লেগেছে।
ভুবন মাঝি’র অন্যতম শক্তিশালী দিক চলচ্চিত্রটির সঙ্গীত। কথায় আর সুরে চলচ্চিত্রটি দর্শককে পুরো ছবি জুড়েই মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। ছবিটির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন কলকাতার লোকসঙ্গীত ঘরানার জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘দোহার’ এর মূল কারিগর কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। এই চলচ্চিত্র দিয়েই তাঁর সঙ্গীত পরিচালনায় অভিষেক হয়। কিন্তু চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর গত ৭ মার্চ মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেলে, এটিই হয়ে থাকলো চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম ও শেষ কাজ। ছবিটিতে ছয়টি গান রয়েছে, যার গীত রচনা করেছেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ও আকাশ চক্রবর্তী। এছাড়া দ্বিজেন্দ্রনাথ রায় এর “ধনধান্যে পুস্পভরা” গানটিও এই ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সপ্তর্ষি, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, শিমুল ইউসুফ, বাপ্পা মজুমদার, পার্থ বড়ুয়া, বুশরা শাহরিয়ার, কোনাল, সালমা, ও সাব্বির। ছবির মাঝে মাঝে দেশাত্মবোধক গানের ব্যবহার বাড়তি ভালোলাগার পরশ বুলিয়েছে, সেই সময়গুলোই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছিলো আর কেমন একটা অদ্ভুত ভালোলাগার আবেশ ছিল যা শুধুমাত্র দেশমাতৃকার জন্যই অনুভূত হয়। ছবির জনপ্রিয় দু’টি গান ‘আমি তোমারই নাম গাই’ আর ‘পদ্মা নদীর নৌকা ভিড়লো’ তে যথাক্রমে কন্ঠ দিয়েছেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।

66c6956adc49f229d87fd030d8a6000e-Bhubon-Majhi

চলচ্চিত্রটিতে কুষ্টিয়া শহরের উপস্থাপন দুর্দান্ত লেগেছে। সিনেমাটোগ্র্যাফির প্রশংসা তাই আলাদাভাবে করতেই হয়। বিশেষ করে গানগুলোর দৃশ্যায়ন খুবই চমৎকার। ‘আমি তোমারই গান গাই’ এর একটি দৃশ্যে ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের শর্টটি চোখে লেগে থাকার মত ।
চলচ্চিত্রটির সার্বিক অভিনয় বেশ ভালো। অপর্ণা ঘোষ এর কথা না বললেই নয়। তার সহজাত সৌন্দর্য ও সাবলীল অভিনয় প্রতিভা দু’টোর সম্মিলিত প্রদর্শন ছিলো মুগ্ধ করার মত। ‘বাঙালি নারীকে লাগে ভালো শাড়িতে’ তা আবারো প্রমাণিত। পরমব্রত ও অপর্ণার জুটির রসায়নও ভালো ছিলো। পরমব্রতকে নিয়ে বাড়তি কিছু বলার নেই, তার অভিনয় প্রতিভার কথা সবাই জানে। তবে নহির চরিত্রটি পরমব্রতের বিকল্প কেউ ছিলো কিনা তা নিয়ে তর্ক হতেই পারে। মাজনুন মিজান ভালো করেছেন। তবে সাপোর্টিং কাস্ট আহামরি লাগেনি। মামুনুর রশীদ কে আরো স্পেস দেয়া উচিত ছিলো। সুষমা সরকার ও নওশাবাকেও আরো সুযোগ দেয়া উচিত ছিলো । ছবির সংলাপ বেশ ভালো লেগেছে।
বেশ কিছু বিষয় ছবিটর মূল গন্তব্য থেকে পথচ্যুত করেছে। একাত্তরের সময়ের সঙ্গে সমন্বয়হীন সেট ডিজাইন খুব দৃষ্টিকটু লেগেছে। ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্প ও মেডিকেল ক্যাম্পগুলোর চিত্রায়ন খুবই কাঁচা কাজ ছিলো। ২০০৪ সালে বাউলদের উপরে হামলা নিয়ে যে প্রামাণ্যচিত্রটি বানানো হয়েছিল সেখানে দু-একটা আর্কাইভ ফুটেজ কিংবা নিউজপেপার কাটিং দেখানোটা ছিলো যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ । ২০১৩  ঘটনাপ্রবাহে পুরনো ডিজাইনের জাতীয় পতাকার ব্যবহার দেখানো যুক্তিসঙ্গত নয়। আর ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলনে সাধারন জনতাকে বাদ দিয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটকে নেতৃত্বে দেখানোর বিষয়টাও অনেকটা ইতিহাসকে এড়িয়ে চলার চেষ্টাই মনে হয়েছে। একাত্তরের নহিরের সঙ্গে ২০০৪ কিংবা ২০১৩ সালের আনন্দ সাঁইয়ের লজিকাল কোন কানেকশান দেখানো হয়নি। তাই ছবির শেষভাগটা পুরো ছবির সঙ্গে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেগেছে। ভুবন মাঝি মুক্তিযুদ্ধের  কিছু খন্ড খন্ড চিত্র আঁকতে পারলেও সর্বোপরি গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। তাই পুরোটা পথ একরকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই হেঁটেছে।
মুক্তিযুদ্ধ মানেই আমাদের কাছে বিশেষ কিছু, এক সমুদ্র আবেগের জায়গা বললেও বোধকরি কম বলা হবে। আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র হলে আমরা মুখিয়ে থাকি আবেগে ভাসবো বলে। তাই অনেক সময় শিল্পের উৎকর্ষকে অগ্রাহ্য করে আমরা চলি আমাদের এই আবেগকে পুঁজি করেই। কিন্তু দুর্ভাগা জাতি আমরা। আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনাটি নিয়ে ভালো চলচ্চিত্রের সংখ্যা খুবই কম। সব কিছু দেখে শুনে মনে হয়েছিলো ভুবন মাঝি এই খরার মাঝে আমাদের জন্য সুখবার্তা বয়ে আনবে। কিন্তু আশার আলো দেখালেও শেষ পর্যন্ত তা হয়ে উঠেনি। সব মাঝি কি আর সঠিক পথে যায়! কিছু মাঝি মাঝ নদীতে ঝড়ে নৌকা সমেত তলিয়েও যায়। ভুবন মাঝি সেই হারিয়ে যাওয়া মাঝির দলে যে সাধ্যের বাইরে যাত্রী উঠায়, কিন্তু তীরে আর তরী ভেড়াতে পারেনা।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com