film-iner-2_4
গত ৬ অক্টোবর, ২০১৭ দেশব্যাপি মুক্তি পেল‘ঢাকা অ্যাটাক’। চলচ্চিত্রটিকে এ বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সিনেমা বললেও অত্যুক্তি হবে না। মুক্তির আগে থেকেই এ নিয়ে সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। শুরুতেই এর তুলনা করা হয়েছে গত বছরের ব্লকবাস্টার আয়নাবাজির সঙ্গে। আয়নাবাজি গত বছর দেশীয় চলচ্চিত্রে যে অবস্থানটি পেয়েছিল, সম্ভবত এ বছর সে অবস্থানটি দখল করতে যাচ্ছে ঢাকা অ্যাটাক। ছবিটি দেখে এসে চুলচেরা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন তুহিন তালুকদার
আয়নাবাজি এবং ঢাকা অ্যাটাক দুটোই সাইকোথ্রিলার। তবে আয়নাবাজি দেখানো হয়েছে অপরাধীর দৃষ্টিকোণ থেকে, আর ঢাকা অ্যাটাক দেখানো হয়েছে পুলিশের দৃষ্টিকোণ থেকে। আয়নাবাজিতে সাইকিক অপরাধীর গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত জীবন গল্পের অনেকটা জুড়ে ছিল। তার প্রতি নির্মাতার সহানুভূতিও ছিল। আর ঢাকা অ্যাটাকে অপরাধীর গড়ে ওঠা দেখানো হলেও তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কোন প্রচেষ্টা নির্মাতার ছিল না। বরং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করছে, তার দৃশ্যায়নই মুখ্য ছিল। অপরাধ জগত নিয়ে এমন থ্রিলার সিনেমা বাংলাদেশে এর আগে হয় নি।
ঢাকা অ্যাটাকের একদম শুরুর দৃশ্যটি ধারণ করা হয়, মাকড়সার জালের মধ্য দিয়ে। হয়তো রূপক হিসেবে অপরাধীদের চক্রকে জালের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা ছিল। প্রথমেই অপরাধকর্মের দৃশ্যায়ন দেখিয়ে এক নিমিষে কাহিনীর মধ্যে দর্শককে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছে। গল্পের মূল অপরাধী ইচ্ছাকৃতভাবে নানা সূত্র রেখে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। বিভিন্ন পর্যায় পার করে পুলিশ শেষ পর্যন্ত তার কাছে পৌঁছায়। এই পৌঁছানোর যাত্রাটিই ঢাকা অ্যাটাকের কাহিনী।
dhaka-attack-20170619141500
চলচ্চিত্রটির কাহিনী লিখেছেন পুলিশ কর্মকর্তা সানি সানোয়ার। তাই পুলিশের কাজের ধরণের একটি পরিষ্কার চিত্র এতে পাওয়া গেছে। পুলিশ বাহিনীর স্ট্রাকচার, এ্যাকশন, অপরাধীকে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া সবগুলোতে পেশাদারী মনোভাব দেখা গেছে। সিনেমায় পুলিশ এবং সোয়াত বাহিনীর আক্রমণের সময়কার মুভমেন্ট ছিল রিয়েল লাইফ মুভমেন্টের মতই। পুলিশ বাহিনী এই মুভমেন্টগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। অভিনেতারাও পেশাদারী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ভালোভাবে রপ্ত করে নিয়েছেন। ফলে অভিনেতার পারফর্মেন্স বলে মনেই হয় নি।
চলচ্চিত্রটির কাহিনীতে বোমা নিস্ক্রিয়করণের ব্যাপারটি অনেকবার এসেছে। পেশাদার পুলিশ অফিসাররা কীভাবে এই কাজটি করেন তার একটি ভালো দৃশ্যায়ন এখানে হয়েছে। বোমার সার্কিট ইত্যাদি ব্যাপারগুলো বেশ বিশ্বাসযোগ্যভাবেই উপস্থাপিত হয়েছে। আর পুলিশেরা যখন বোমা নিস্ক্রিয় করতে যান তখন যে মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যান, তার চিত্রায়নও সুন্দর ছিল। ফিল্মে একটা দৃশ্যে রিমোট ডিএক্টিভ্যাটর ব্যবহার করে কীভাবে রিমোট সিগন্যালকে অকেজো করা হয় তা দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশে অতীতের কোন সিনেমায় এতটা টেকনিক্যাল ডিটেইল দেখা যায় নি। আমাদের দেশে পুলিশেরা বোমা নিস্ক্রিয় করার মত গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে গেল আগ্রহী দর্শক এবং খবর লোলুপ সাংবাদিকরা প্রচণ্ড বিরক্ত করতে থাকেন। এতে পুলিশের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। গল্পে এ ধরণের বিষয়ের দৃশ্যায়নও ছিল, যেটা গণসচেতনতা এবং সাংবাদিকতায় পেশাদারীত্বকে উদ্বুদ্ধ করবে ।
ঢাকা অ্যাটাকে অনেক চরিত্রের সমাবেশ ছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন আরেফিন শুভ, এবিএম সুমন, শতাব্দী ওয়াদুদ, তাসকিন রহমান, মাহিয়া মাহি প্রমুখ। কেন্দ্রীয় চরিত্রে শুভ’র অভিনয় মানানসই হয়েছে। তাকে দেখতে সত্যি সত্যি পুলিশ বলেই মনে হয়েছে। এই চরিত্রে কাজ করার আগে তাকে দীর্ঘ হোমওয়ার্কের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটা তার ডেলিভারিতেই বোঝা গেছে। বডি মুভমেন্ট পেশাদারী ছিল, দৃশ্যায়নের প্রয়োজনে একটু হিরোইজম যোগ হয়েছে। বাংলাদেশের সিনেমায় চরিত্র নির্মাণে এতটা শ্রম বিনিয়োগ করতে সচরাচর দেখা যায় না। শুভর আগের ফিল্মগুলোর চেয়ে এটাতে অনেক ভালো কাজ করেছেন তিনি।
সিনিয়র পুলিশের চরিত্রে শতাব্দী ওয়াদুদের অভিনয় বরাবরের মতই অনবদ্য হয়েছে। তার জিজ্ঞাসাবাদের ধরণ অপরাধীদের মনোবল ভেঙে অপরাধ স্বীকারে বাধ্য করেছে। সত্যিকার অর্থে, অভিনয় হিসেবে ঢাকা অ্যাটাকে সবচেয়ে ভালো কাজ হয়েছে শতাব্দী ওয়াদুদের।
সোয়াট বাহিনীর আশফাকের চরিত্রে এবিএম সুমনকেও ভালো লেগেছে। পেশার জন্য তার আত্মত্যাগের চিত্রায়ণ বাস্তব জীবনের সোয়াত সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়েছে। স্ত্রীর সঙ্গে রোমান্টিক দৃশ্যগুলোর চেয়েও অ্যাকশনের দৃশ্যে এবিএম সুমনকে বেশি সাবলীল দেখা গেছে। সিনেমার শেষ দৃশ্যে অপারেশন শেষে তিনি যখন জানতে পারেন, তিনি কন্যা সন্তানের পিতা হয়েছেন, তখন দর্শকও সে আনন্দে সামিল হয়েছে। তিনি দর্শকের মনে স্থান করতে পেরেছেন, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ।
মাহিয়া মাহির চরিত্রটি নির্মাতাদের যথেষ্ট মনোযোগ পায়নি। যেটুকু সুযোগ তবু ছিল, সেটাতেও ভালো করতে পারেন নিতিনি। সাংবাদিকের পেশায় উচ্চাকাঙ্খী কোন নারী ন্যাকা ন্যাকা ভাবে কেন কথা বলবে তা আমার বোধগম্য হয় নি। রোমান্টিক সংলাপ বিনিমিয় যখনই হচ্ছিল, তখন হলের দর্শক হাসিতে ফেটে পড়ছিলেন। অতিথি চরিত্রে নায়ক আলমগীর এবং আফজাল হোসেন ছিলেন। কিন্তু আফজাল হোসেনের ভয়েস অন্য কাউকে দিয়ে কেন করানো হল তা বোঝা যায়নি।
Arifin-Shuvoo-Mahiya-Mahi
এবার আসি ভিলেইনের কথায়। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী তাসকিন রহমান। তিনি নামে তাসকিন, আর চেহারায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের আরেক খেলোয়ার সাব্বির রহমানের মত। চিরাচরিত বাংলা সিনেমায় ভিলেইন বলতে আমরা যে স্থুলবুদ্ধির লোভী মানুষগুলোকে দেখি, তার বিপরীতে ঢাকা অ্যাটাকে আমরা দেখেছি বুদ্ধিমান কিন্তু বিপথগামী চ্যালেঞ্জিং ভিলেইন। ইঞ্জিনিয়ারিং জিনিয়াস এই মানুষটি নিজের মেধাকে ত্রাস সৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন। তার কষ্টকর শৈশব তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তার সাইকোপ্যাথিক আচরণ ও জ্বলন্ত চোখ দর্শকের মনে যথেষ্ট ভীতি সঞ্চার করতে পেরেছে।  তার বোমা বানানোর ওয়ার্কশপের সেটটিও বেশ যত্ন করে নির্মাণ করা হয়েছে। ইণ্টারভেলেরও অনেক পরে তিনি দৃশ্যে আসেন। সে হিসেবে ক্যামেরার সামনে তিনি খুব কম সময়ই ছিলেন। কিন্তু যতক্ষণই ছিলেন, তিনি নিজের করে রেখেছিলেন। চরিত্রটি দ্য ডার্ক নাইটের জোকারকে কিছু কিছু জায়গায় অনুসরণ করেছে। তিনি একজন সম্ভাবনাময় অভিনেতা, তবে আরও প্রচেষ্টার দরকার আছে।
ফিল্মে বেশ কিছু দৃশ্যে এনিমেশনের ব্যবহার দেখা গেছে। শুরুতে কলাকুশলীদের নাম দেখানোর সময় কম্পিউটার গেমের মত এনিমেশন ব্যবহার করা হয়েছে। বিস্ফোরণের দৃশ্যগুলোতে সরাসরি এনিমেশন দেখানো হয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই তা ঠিক বাস্তব বিস্ফোরণের মত মনে হয় নি, তবে এতটাও এর আগে কোন বাংলাদেশী সিনেমায় দেখা যায় নি। এছাড়া ভিলেইনের দেওয়া কিছু সূত্র যখন পুলিশ অফিসার শুভ মনে মনে মিলিয়ে দেখছিলেন, তখনও সেই সূত্রগুলো দৃশ্যায়নের সুবিধার্থে এনিমেশন ব্যবহার করা হয়েছে। খুনের দৃশ্যগুলো অনেকটা সরাসরিই ধারণ করা হয়েছে। এতে খুনীর ক্রুরতা ধরা পড়লেও কিছু কিছু জায়গায় দৃশ্যটিই বীভৎস হয়ে পড়েছে।
ক্যামেরার কাজ বেশ ভালো হয়েছে। বিশেষত পুলিশের এ্যাকশনের দৃশ্য ধারণের জন্য নতুন ধরণের শট টেকিং দেখা গেছে। গুলি করার সময় খুব ক্লোজ শটে সোয়াত সদস্যদের মুখভঙ্গি ধরা হয়েছে। কোন ভবনে সোয়াতের হানা দেওয়ার দৃশ্যগুলো ধরা হয়েছে অনেকটা ফার্স্ট শ্যুটার গেমের মত করে, এতে সোয়াত সদস্যদের পয়েন্ট অফ ভিউটা পাওয়া গেছে। পাহাড়ী এলাকায় পুলিশের এ্যাকশনের দৃশ্য ধারণে লং শট, ক্লোজ শট খুব চমৎকারভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘চুপচাপ’ গানের শ্যুটিংয়ে সেন্টমার্টিনকে নতুনভাবে দেখানো হয়েছে।
dhaka-attack-song
কার রেসিংয়ের একটা দৃশ্য ছিল, যেটা ফাস্ট এ্যাণ্ড ফিউরিয়াসকে মনে করিয়ে দেয়। রাতের বেলা গতিশীল কারকে ধারণ করতে যে ধরণের ক্যামেরা কারিগরী লাগে, তা বাংলা সিনেমায় আগে দেখা যায়নি। পরে কার রেসাররা ক্যামোফ্লেজ ব্যবহার করে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে যেভাবে পালায় তার দৃশ্যায়নও অসাধারণ। পুলিশও গাড়িতে ট্রেকার ছুঁড়ে মেরে মনিটর করে যেভাবে তাদের ধরে ফেলে সেটাও পেশাদারী লেগেছে। একটা দৃশ্যে ভিলেইন বাইক অ্যাটাক করে, সেই দৃশ্যটাও স্কিলড অপরাধীর মতই মনে হয়েছে।
আবহ সঙ্গীত করেছেন বব এস সেন। আবহ সঙ্গীতের ধরণ একটু হলিউড ঘরানার হয়েছে। তবে থ্রিলার ফিল্ম হিসেবে সাসপেন্স ও ক্লাইম্যাক্সের অংশগুলোতে বেশ মানানসই মিউজিক তিনি দিতে পেরেছেন।
নির্মাণের কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়েছে। তবে সেটা সিনেমাটি দেখতে কখনোই নিরুৎসাহিত করে নি। কাহিনীর লয় সবসময় সমান তালে চলে নি। ইন্টারভেলের পর কাহিনী কিছুটা সময়ের জন্য ঝুলে পড়েছিল। কুয়ালালামপুরে কাহিনীর কিছুটা অংশ ধারণ করা হয়েছে। এ অংশে এ্যাকশন দৃশ্য ভালো হলেও অভিনয় সাবলীল হয় নি। কিছু কিছু জায়গায় কাহিনীর পরম্পরা ধরা যায় নি। গোয়েন্দা কাহিনীতে কাহিনীর পরম্পরা রক্ষা এবং দর্শককে কাহিনীর গতির সঙ্গে ধরে রাখা কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজে অনেকাংশে দর্শককে সঙ্গে নিয়ে এগোতে পারেননি নির্মাতারা। গল্পের মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই বিনা পূর্বাভাসে গান শুরু হয়ে গেছে, যেটা আগের দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। গল্পে অনেক চরিত্রের সন্নিবেশ আছে। কিন্তু অনেক অপেশাদার অভিনেতা ব্যবহার করায় অনেক দৃশ্যে চরিত্রগুলোকে সাবলীল লাগে নি। পেশাদার অভিনেতা ব্যবহার করলে ভালো হত। চলচ্চিত্রটির সংলাপও হয়তো আরও শক্তিশালী হতে পারত, বিশেষ করে রোমান্টিক সংলাপগুলো।
সার্বিক বিচারে, ঢাকা অ্যাটাক বাংলাদেশের একটা মাইলফলক ফিল্ম। ইতোমধ্যেই এটি বাণিজ্যিক সাফল্যের একটি মাত্রা ছোঁয়ার পূর্বাভাস তৈরি করেছে। পরিচালক দীপঙ্কর দীপন প্রতিশ্রুতিশীল নির্মাতা। তিনি প্রতিকূল বাজারে সবসময় ভালো নাটক নির্মাণ করার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশে বড় বড় ইণ্ডাস্ট্রির মত বাজেট নেই, নেই বড় দর্শকের বাজার। তাই অনেক সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে সিনেমাটি বানাতে হয়েছে। তবু চলচ্চিত্রটিকে পরিচালকের প্রথম কাজ বলে মনেই হয় নি। প্রথম চলচ্চিত্রেই পরিচালক দীপন একটি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছেন। ঢাকা অ্যাটাক নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত সবাই অশেষ প্রশংসার দাবীদার।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *