dhaka-attack-20170619141500
আশিকুর রহমান তানিম
সম্ভবত আয়নাবাজি ব্যতীত এত শোরগোল আর কোন বাংলা সিনেমা ফেলতে পারেনি নিকট অতীতে। পুলিশেরই একজন (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এডিসি সানি সানোয়ার) ছবির গল্প লিখেছেন, বাংলাদেশের প্রথম ‘কপ থ্রিলার’, আরিফিন শুভ, মাহি, এবিএম সুমন, শতাব্দী ওয়াদুদ, আফজাল হোসেন, আলমগীর প্রমুখের পর্দায় উপস্থিতি, আগ্রহোদ্দীপক ট্রেইলার, দুই বছর ধরে চলা শ্যুটিং এবং আরো নানা গুজব- শোরগোল ফেলাটা অবশ্যম্ভাবীই ছিলো।
বলাকায় ছবি মুক্তির চার দিন পর মঙ্গলবার সিনেমা শুরু হওয়ার দু’ ঘন্টা আগে (তখনও টিকিট বিক্রি শুরু হয়নি) গিয়েও দেখি বেশ দর্শকসমাগম। বিরক্ত হওয়ার বদলে মন ভালো হয়ে গেলো; এত দর্শক বাংলা সিনেমা হলে এসে দেখছে!
শুরুতেই বলে রাখা দরকার, বাংলা সিনেমার এতদিনকার ‘ছবির সমাপ্তির পূর্বে হাড্ডিসার একদল পুলিশ কাঁধে থ্রি নট থ্রি রাইফেল ঝুলিয়ে আসছে’ কিংবা ‘মায়ের গর্ব, ন্যায়পরায়ণ ও সততার প্রতিমূর্তি পুলিশ অফিসার নায়ক’ এরকম ইমেজ ভাঙ্গার উদ্যোগ নেয়ার জন্য পুরো ঢাকা অ্যাটাক টিমকে টুপি খোলা কুর্নিশ!
ছবির শুরুতেই দুর্দান্ত ফিজিকের শুভ কিংবা সুমনের পরিচয় সিনেমার প্রতি পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে- এবং এই দু’জন পুরো ছবিতেই তা ধরে রেখেছেন বলাই বাহুল্য। তবে, মাহির অভিনয় নিয়ে তো সবাই কথা বলছেনই, আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, মাহির করা সাংবাদিক চরিত্রটিতেই আসলে ঘাপলা আছে। সাংবাদিক মাহি তরতর করে পুলিশের আগেই গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেল পেয়ে যাচ্ছে; দুর্গম অঞ্চলে যেখানে সোয়াট টিমের সদস্যদেরই গলদঘর্ম হতে হচ্ছে, সেখানে সে দিব্যি সাবলীল- এসব বেশ চোখে লেগেছে। এত দুর্দান্ত কাহিনীর সিনেমায় এসব অযাচিত রোমান্সের কি খুব দরকার ছিলো?
আর, শতাব্দী ওয়াদুদের অভিনয় তো বরাবরই টপ-নচ! তবে, আমি বেশি মুগ্ধ এবিএম সুমন এর প্রতি। তার অভিনয়ে পরিমিতবোধ অসাধারণ। কোন দৃশ্যেই আবেগের আতিশায্য নেই, সোয়াট টিমের সদস্যদের মতই লাগছিলো।
ছবির একটা বেশ ইন্টারেস্টিং অংশ হচ্ছে এর অ্যান্টাগোনিস্ট কিংবা ভিলেন চরিত্র। যিনি চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তিনি লেটার মার্ক্স সহই পাশ করেছেন। সেইসাথে এরকম ভিলেন চরিত্র চিন্তা করার জন্যেও কাহিনীকারকে ধন্যবাদ- এতদিন বাইরের দেশের ছবিতেই এরকম সাইকোলজিক্যালি ডিস্টার্বড ম্যানিয়াকদের দেখতাম। বাংলাদেশেও এরকম চরিত্র নিয়ে আসা বেশ সাহসী কাজই বলা যেতে পারে যে ভিলেন সরাসরি পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় ক্লু দিয়ে দিয়ে একের পর এক মার্ডার করে। এবং সবচেয়ে ভালো লেগেছে যেটা, তার চরিত্রটিকে খামাখা জাস্টিফাইড করা হয়নি যেটা সব বাংলা সিনেমাই করে- যেমন, মা কে খুন হতে দেখে ছেলে বড় হয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে খুনী হয়েছে আরো কত কি! দ্যা ডার্ক নাইট সিনেমায় ব্রুস ওয়েনের বাটলার আলফ্রেড বলেছিলো, “Some men just want to watch the world burn”- আমাদের ঢাকা অ্যাটাকের ভিলেনও তাইই।
তবে, সেইসাথে এটাও বলতে হয়, মালয়েশিয়ার ডন, থাইল্যান্ডের আন্ডারগ্রাউন্ড এই শব্দগুলো টিপিক্যাল বাংলা সিনেমায় শুনতে শুনতে এখন খুব ক্লিশে শোনায়। ভিলেন আসলে মালয়েশিয়ার কোন দলে যোগ দিতে চায়, কাদের কাছে নিজেকে প্রুভ করতে চায়- এগুলো নিয়ে আরো বিশদ হওয়া যেতো চাইলেই। আবার, আইটেম সং দেখানো লাগবে দেখে চিটাগাং এর ‘মেজবানে’ নাচ-গান দেখানোটা দৃষ্টিকটু ঠেকেছে; পরিচালকের জানা উচিত ছিলো মেজবানে এসব হয় না। এসব ছোটখাটো প্লট-হোল বাদ দিলে ছবিটি বেশ উপভোগ্যই!
থ্রিলার সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।  মিউজিক কম্পোজিশন ভালো লেগেছে। মিউজিকের জন্য চেজিং দৃশ্যগুলো, মিশনের দৃশ্যগুলো বেস্ট ফাস্ট ও থ্রিলিং মনে হয়েছে।
শেষে এসে একটা কথা বলা উচিত আসলে- হলিউডে কপ থ্রিলার তৈরি হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। কেভিন কস্টনার এর দ্যা আনটাচেবলস, রাসেল ক্রো ও গাই পিয়ার্সের এল এ কনফিডেনশিয়াল, ম্যাট ড্যামন ও লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর দ্যা ডিপার্টেড, ডেনজেল ওয়াশিংটনের ট্রেইনিং ডে- আরো কত কি! এসব ছবি দেখার দর্শক তৈরি হয়েছে বলেই এরকম মাপের ছবি হচ্ছে। আমাদের দেশে এরকম দর্শক শ্রেণী তৈরি হলে নিশ্চয়ই আমরাও এরকম ছবি বানাবো একদিন- স্করসেজির মত পরিচালক যেমন হংকং এর কপ থ্রিলার ইনফার্নাল এফেয়ার্স রিমেক করেছে, আমাদের ছবিও এরকম নিশ্চয়ই করবে অন্য কেউ। সেই পথের গোঁড়াপত্তন করে দেয়ার জন্য ঢাকা অ্যাটাক টিমের সাধুবাদটা প্রাপ্যই।
ঢাকা অ্যাটাক এক্সট্রিম নিয়ে আশাবাদী হয়ে রইলাম। পরিচালক, কাহিনীকারের কাছে চাওয়া, খামাখা ভিএফেক্সের দিকে মনযোগ না দিয়ে কাহিনীর গভীরতার দিকে আরো জোর দিন। আমাদের হলিউডি প্রযুক্তি না থাকুক, বলার মত পুলিশি বীরত্বের গল্পের তো আর অভাব নেই!

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *