Smiley face

ফারুকীর ডুব, প্রত্যাশা পূরণ নাকি হতাশা?

xfull_2076935788_1487789701.jpg.pagespeed.ic.klGJk-GQyp
তুহিন তালুকদার
বহু প্রতীক্ষার পর ২৭ অক্টোবর, ২০১৭ তারিখে মুক্তি পেল মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর চলচ্চিত্র ‘ডুব’। চলচ্চিত্রটি নিয়ে নানা কারণে সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। একটি বড় কারণ, এটি কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত বলে বাজারে কথা চাউর হয়েছে, নির্মাতারা বারবার যদিও তা অস্বীকার করে এসেছেন। হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের তরফ থেকে আপত্তি এবং বাধাও এসেছে। তাতে যদিও চলচ্চিত্রটির মুক্তি পেতে দেরি হয়েছে, কিন্তু ‘A bad publicity is a good publicity’ ফর্মুলায় পড়ে গিয়ে ছবিটির ব্যাপারে জনগণের মধ্যে একটা হাইপ তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় বড় কারণ, হুমায়ূন আহমেদের প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্রটি রূপায়ন করেছেন, বলিউড-হলিউড দুই রাজ্যে বিচরণশীল শক্তিমান অভিনেতা ইরফান খান। এই ছবির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হলেন। ফলে ‘ডুব’ দেশীয় গণ্ডী পেরিয়ে আন্তর্জাতিক একটা পরিচিতি পেল। এক বিশিষ্ট সাহিত্যিকের চরিত্র আরেক বিশিষ্ট অভিনেতা কিভাবে রূপায়ন করেন, তা দেখার জন্য দর্শকেরা উদগ্রীব হতেই পারেন। আবার চলচ্চিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের জীবনের যে কোন দিক নয়, তার লেখক হিসেবে গড়ে ওঠা নয়, তার জীবনের সংগ্রাম নয়, বরং এমন একটা অধ্যায়কে ফোকাস করে নির্মিত যেটাকে সমাজ কেলেঙ্কারীমূলক বলে গ্রহণ করে এসেছে। ফলে স্ক্যাণ্ডাল, কনট্রোভার্সি, বিগ ফেইস বিভিন্ন কিছুর মিশ্রণে ‘ডুব’ একটা অপ্রতিরোধ্য আগ্রহ সৃষ্টি করে ফেলেছে। দুঃখের বিষয়, নির্মাণ বহির্ভূত এই ব্যাপারগুলোই ‘ডুব’ ছবিটির মূল পূঁজি হয়ে উঠতে পারে। কারণ, চলচ্চিত্রটি অনেকাংশেই টেইল অফ আ কনট্রোভার্সির ঊর্ধ্বে গিয়ে উঠতে পারেনি। এর চিত্রনাট্য ও পরিচালনা ফারুকীর নিজের করা। প্রযোজনা করেছেন বাংলাদেশের আব্দুল আজিজ, ভারতের ইরফান খান, অশোক ধানুকা ও হিমাংশু ধানুকা। পরিবেশনায় বাংলাদেশের জাজ মাল্টিমিডিয়া ও ভারতের এস কে মুভিজ।
1ছবির শুরুতেই ঘটা করে ডিসক্লেইমার দিয়ে জানানো হয়, সকল চরিত্রই কাল্পনিক এবং কারও সাথে মিল পাওয়া গেলে তা কাকতাল মাত্র। এটা আসলে প্রহসনমূলক। কেবল এই অংশটাকে বাদ দিতে পারলে, ‘ডুব’কে নিয়ে অন্য যে কোন অভিযোগ করা গেলেও প্রহসন বলার সুযোগ থাকতো না। দুটি মেয়ের স্কুল জীবন থেকে বন্ধুত্ব, একজনের বাবার পরিচালিত সিনেমায় তাদের দুজনের অভিনয়, পরে মেয়ের বান্ধবীর সাথে পরিচালকের প্রেম, তা নিয়ে পরিবারে মনোমালিন্য ও ছাড়াছাড়ি, দেশব্যাপী আলোচনা, পরে পরিচালকের মৃত্যুর পরে লাশ কোথায় দাফন করা হবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব – এতসব কাকতালীয় মিল কাকতাল শব্দের গুরুত্বকেই খাটো করে দেয়। নির্মাতাদের ‘কারও বায়োপিক নয়’ কথাটাকে উপেক্ষা করে আমরা যদি ‘কাকতালীয় মিল’গুলো খুঁজতে শুরু করি, তাহলে দেখবো, হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে ইরফান খান, তার প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন আহমেদের চরিত্রে রোকেয়া প্রাচী, কন্যা শিলার চরিত্রে তিশা, দ্বিতীয় স্ত্রী শাওনের চরিত্রে ভারতের পার্ণো মিত্র অভিনয় করেছেন। যারা হুমায়ূন আহমেদের জীবনের গল্পের সাথে পরিচিত নন, তারা গল্পটির প্রবাহ ধরতে বেগ পেতে পারেন।
ফারুকীর নির্মাণে কেমন যেন একটা ইনফরমাল ব্যাপার থাকে, যার জন্য কাহিনীর পরম্পরা ধরা সবসময় একটা শক্ত কাজ। এখানেও তাই হয়েছে। কাহিনীতে বিভিন্ন সময় অতীত বর্তমানের মধ্যে সুইচিং স্পষ্ট হয় নি। সংলাপ খুবই কম ছিল। কোন কোন দৃশ্য একটিমাত্র সংলাপে শেষ হয়েছে, যেখানে দৃশ্যের উদ্দেশ্যটিই বোঝা যায় নি। কেন্দ্রীয় চরিত্র জাভেদ হাসান প্রথম যৌবনে যখন প্রথম স্ত্রীকে পালিয়ে বিয়ে করেন, তখন স্ত্রীর পরিবারের প্রতিক্রিয়ার দৃশ্যায়ন ও সংলাপ সম্পূর্ণ হুমায়ুন আহমেদের স্টাইলে হয়েছে। কেন্দ্রীয় চরিত্রের দ্বিতীয় বিয়ে এবং মৃত্যুর মত দৃশ্য দেখানো হয়েছে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সংলাপের মাধ্যমে। জাভেদ হাসান কেন ধীরে ধীরে অন্য একটি মেয়ের ব্যাপারে দুর্বল হয়ে পড়লেন, তার কোন বর্ণনা নেই। কেবল লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমের কিছু দৃশ্য ছিল। পুরো গল্পটিই যেন জাভেদ হাসানের প্রথম স্ত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে। কোন দৃশ্যই ডিটেইল নয়, অল্প সংলাপে এবং অল্প বর্ণনায় শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু দৃশ্য সংলাপহীন ও আবহ সঙ্গীতহীন, তাতে একঘেয়েমী সৃষ্টি হয়েছে। একটি সংলাপ শুধু বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। মৃত্যুর পর প্রথম স্ত্রীর কল্পনায় এসে জাভেদ হাসান বলে গেছেন, ‘মৃত্যু ভালোবাসা, মমতা, সম্মান সব ফিরিয়ে দেয়’।
ইরফান খানের বাংলা অভিনয় এই চলচ্চিত্রের অন্যতম আগ্রহের বিষয়। তার চরিত্রের নাম জাভেদ হাসান, যিনি একজন আলোড়ন সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র পরিচালক। তবে এতবড় একজন পরিচালকের2 জীবনযাত্রায় কেন চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কোন সংলাপ নেই, কেন নির্মাণ জীবন দৃশ্যায়নে ঠাঁই পায়নি তা বোধগম্য হয় নি। এখানে যেহেতু জাভেদ হাসানের জীবনের একটি নির্দিষ্ট অধ্যায় দেখানো হয়েছে, যেখানে তিনি দীর্ঘদিনের সংসার ত্যাগ করে অসম এক সম্পর্কের পথে অগ্রসর হয়েছেন, তাই প্রায় পুরো কাহিনীতে তার চরিত্রটিকে দেখা যায় বিষণ্ন মানুষ হিসেবে। চরিত্রটি একজন দূর্বল মানুষের বলেও মনে হয়। নিতু নামের তরুণী যখন তার জীবনে অনুপ্রবেশ করে সবকিছু তছনছ করে দেয়, জাভেদ হাসান তখন কেবলই সে ফাঁদে ধরা দেয়। পরবর্তী জীবনেও নিজের মেয়ের সাথে দেখা করতে হয় দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছ থেকে লুকিয়ে। চরিত্রটিকে হয়তো আরেকটু বিবিধ মাত্রায় চিত্রিত করা যেত, কিন্তু সেটা ইরফান খানের সীমাবদ্ধতা নয়। চিত্রনাট্যের বাইরে যাওয়ার তার সুযোগ ছিল না। চিত্রনাট্যের সীমাবদ্ধতা ইরফানের অভিনয় দক্ষতার সেই মাত্রাগুলোকে বিকশিত হতে দেয়নি। তবে চিত্রনাট্যে চরিত্রকে যতটা পাওয়া গেছে, ইরফান সেটাকে ভালোভাবেই রূপায়ন করেছেন। ইরফান খান বাংলা বলেন কলকাতার এ্যাকসেন্টে, কিছু কিছু জায়গায় ঢাকার এ্যাকসেন্ট ব্যবহার করায় একটা গুরুচণ্ডালি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পরিচালক এই পরিস্থিতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু এ ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টিকে ফারুকী ট্রেডমার্ক বানিয়েছেন অনেক আগেই। ইরফান খানকে অনেক ইংরেজি সংলাপ ব্যবহার করতে দিয়ে পরিচালক কিছুটা বিপত্তি এড়িয়ে গেছেন।
জাভেদ হাসানের প্রথম স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রোকেয়া প্রাচী। এখানে মূল দ্বন্দ্বের জায়গাটি ছিল তার  এবং দ্বিতীয় স্ত্রী নিতুর। কিন্তু গল্পে জাভেদ হাসানের মেয়ে সাবেরির চরিত্রটির প্রাধান্য ছিল অনেক বেশি। তিশা অভিনীত সাবেরি চরিত্রটি অনেক শক্তিশালীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে এবং এতে তিশা অভিনয়ও ভালো করেছেন। বাবা মায়ের ভাঙনের কালে সাবেরি চেষ্টা করেছিল ভাঙন বাঁচাতে। সেটা সম্ভব না হওয়ায় নিজের মায়ের শক্তি হয়ে ছিল সে। ‘ডুব’এর বিভিন্ন পোস্টারে রোকেয়া প্রাচীর চেয়েও তিশার উপস্থিতি বেশি পরিলক্ষিত। একটি পোস্টারে তিশা এবং পার্ণো মিত্রকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে, কিন্তু রোকেয়া প্রাচীকে সেই গুরুত্বটি দেওয়া হয় নি। ‘ডুব’ সিনেমার সবচেয়ে ভালো লাগা একটি দৃশ্য ছিল মায়ের জন্মদিন পালনের জন্য আশুলিয়ায় সাবেরির পারিবারিক আয়োজন। সেখানে ভাঙনের পর জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য মাকে অভিনন্দিত করার বিষয়টি অভাবনীয় মনে হয়েছে। সাবেরি মাকে বলেছিল, যখন তিনি ভেঙে না পড়ে জীবনের হাল ধরলেন, তখন তিনি most  beautiful women in the world. নারী ক্ষমতায়নকে এই দৃশ্যটি উদ্বুদ্ধ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
a4dd7af54fef24a6e2dd36d3a70618a1-59f0143213c41জাভেদ হাসানের দ্বিতীয় স্ত্রী নিতুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভারতের পার্ণো মিত্র। চরিত্রটি বেশ জেদি। যা চায় তার জন্য যে কিছু করতে পারে, যে কোন নীচতায় নামতেও পারে। চরিত্রটির মধ্যে একাগ্রতা ছাড়া ভালো কিছুই দেখানো হয় নি। সেই একাগ্রতাও কেবলই জাভেদ হাসানকে ছিনিয়ে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিয়ের পর প্রথম পক্ষের পরিবারের সাথে জাভেদ হাসানের দূরত্ব সৃষ্টি করায় তার অপরিসীম অবদান ছিল। চরিত্রটিকে খুব হীন দেখানো হয়েছে।
কাহিনীর বেশিরভাগ অংশই চিত্রায়িত হয়েছে দুটি বাড়িতে। একটি কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রথম স্ত্রীর সাথে বসবাসকালীন, আরেকটি দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে বসবাসকালীন। এছাড়াও ‘নয়নতারা ফিল্ম সিটি’ নামে গ্রাম্য এলাকায় রিসোর্টের মত দেখানো হয়েছে। ‘কাকতালীয়’ মিলটা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। ক্যামেরার কাজ আহামরি কিছু হয়নি। বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কিছু দৃশ্য খুব চমৎকারভাবে ধারণ হয়েছে। গাড়ির ছাদে বৃষ্টি পড়ার একটি দৃশ্যেও ক্যামেরার কাজ ভালো হয়েছে।
সর্বোপরি মনে হয়েছে, ডুব যে হাইপ তৈরি করেছে, সে হিসেবে প্রত্যাশা পূরণে দারুনভাবে ব্যর্থ হয়েছে। একটি সম্ভাবনাময় গল্প নির্মাণের অসম্পূর্ণতায় একঘেয়ে কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। গল্পটিকে সংলাপ ও ঘটনার মারপ্যাঁচ দিয়ে অনেক সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত। সেখানে চলচ্চিত্রটির অল্প কিছু বিষয়ই ভালো লাগা তৈরি করতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আরও ভালো মানের চলচ্চিত্র আমরা প্রত্যাশা করি।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com