Smiley face

শেকড়ের সন্ধানে ‘সীমান্তরেখা’

image-8267
দেশভাগের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তানভীর মোকাম্মেল নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র ‘সীমান্তরেখা’ । কিনো-আই ফিল্মস প্রযোজিত তানভীর মোকাম্মেলের এ প্রামাণ্যচিত্রটি গণ-অর্থায়নের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর পাবলিক লাইব্রেরির শওকত ওসমান মিলনায়তনে প্রামাণ্যচিত্রটির প্রিমিয়ার শো হয়। আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে ‘সীমান্তরেখা’ প্রদর্শিত হবে । আগ্রহীরা  বিকাল ৩টা, সাড়ে ৫টা ও রাত ৮টায় প্রামাণ্যচিত্রটি উপভোগ করতে পারবেন। প্রামাণ্যচিত্রটি সম্পর্কে জানাচ্ছেন আনন্দ কুটুম
১৯৪৭ থেকে ২০১৭। সত্তর বছর স্বাধীনতার তকমা গায়ে জড়িয়ে পথচলা। ঠিক কতটুকু স্বাধীন হওয়া গেলো? কতটুকুইবা অতিক্রম করা গেলো? স্বাধীনতার যে রূপরেখা বা সংজ্ঞার জন্ম হয়েছিলো সেদিন রেডক্লিফ সাহেবের পেন্সিলের খোঁচায় তা ঠিক কতটুকু বাঙ্গালির স্বাধীনতা বয়ে আনতে পেরেছে? এমনও অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে ভারত ভাগের ৭০ বছর পরে হাজির হয়েছে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেলের নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘সীমান্তরেখা’। প্রামাণ্যচিত্রটির বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ছিলো ২৫ অক্টোবর। আর কলকাতায় প্রিমিয়ার হয়েছে ৩০ অক্টোবর। কলকাতার গোর্কী সদন হলে যখন ঢুকি তখন চোখ ছানাবড়া অবস্থা। অনুমানিক প্রায় ৮০০ জনের আসন সম্বলিত হলে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। ঢুকেছি শো শুরুর মিনিট সাতেক পরে। তার আগেই শেষ হয়ে গেছে ডিরেক্টর স্পিচ।
এবার ছবিতে মন দেওয়া যাক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দেশভাগ, একাত্তর থেকে একবিংশ। বাংলা থেকে পাঞ্জাব। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে আন্দামান নিকোবর। বাঙ্গালি জাতির আত্মপরিচয়ের হাহাকার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুরো ভারত জুড়েই। ছবিটি দেখতে দেখতে বেশ কয়েকবার চোখ ভিজে উঠেছে। গলা ফেটে কান্না এসেছে। নিজেকে সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। কত ত্যাগ, কত মৃত্যুর কারণ এই বর্ডার লাইন। তবে দেশভাগের কারণে পুরুষের চেয়ে নারীকে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে । সার্ভাইভাল এই ফাইটে নারীকে টিকে থাকতে যুদ্ধ করতে হয়েছে কখনো কখনো পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। ‘সীমান্তরেখা’তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পূর্ববঙ্গে স্বামী/সন্তান/ভাই হারিয়ে প্রাণটুকু হাতে নিয়ে পালিয়ে এসে সারাজীবন খেয়ে না খেয়ে কিংবা আধপেট খেয়ে জীবন পার করা মহিলাদের গল্প যেমন উঠে এসেছে, তেমনি উঠে এসেছে নারীর আত্মপরিচয়য়ের সংকট। জাত, ধর্ম বা আত্মপরিচয় রক্ষার্থে যে দেশ ভাগকে মেনে নেওয়া হল, দেশ ত্যাগী সেই মানুষগুলো ভিনদেশে এসে ঠিক কতটুকু নিজেদের জাত, ধর্ম রক্ষা করতে পেরেছিলো? মুসলিম দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার ভয়ে যে কুমারী রাতের আধারে পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলো, সে কি সত্যিই তার সম্ভ্রম রক্ষা করতে পেরেছিলো অপরিচিত হিন্দু যুবকের লোলুপ দৃষ্টি থেকে? অথবা যে গৃহবধু তুলসীতলার শুদ্ধতা রক্ষার্থে দেশ ত্যাগ করে এসেছিলো, তার সেই তুলসি/ঠাকুরের শুদ্ধতা কী রক্ষা হয়েছিলো? একই রিফিউজি ক্যাম্পে গাদাগাদি করে বসবাস করেছে নমশূদ্র, ব্রাহ্মণ। একই ঘরের মাঝে খাওয়াদাওয়া, সেখানেই মল-মূত্র ত্যাগ, আবার সেখানেই ঠাকুরের পূজো। কোথায় সেই জাতধর্মের শুদ্ধতা, যার জন্য আস্ত একটি দেশ কেটেছেটে এফোঁড় ওফোড় করে ফেলা হলো! অপর দিকে বাংলা ভাগে পূর্ব বঙ্গের মুসলিমরা কতটুকু আর্থিক ভাবে লাভবান হয়েছেন আর কতটুকুই বাঁ খুইয়েছেন? এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। এই যে দেশ ভাগ, তা ঠিক কতোটা জরুরী ছিলো? আদও কী দেশভাগ ছাড়া অন্য কোন সমাধান বাঙ্গালিদের তথা সমগ্র ভারতবর্ষবাসীর হাতে ছিলো না? এই প্রশ্ন বারবার নাড়া দিয়ে যাবে মনে। ইন্টার্ভিউ নির্ভর প্রায় আড়াই ঘন্টার এই অথ্যবহুল ছবিতে একঘেয়েমি লাগাটা হয়তো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অদ্ভূত ভাবে লক্ষ্য করলাম প্রামাণ্যচিত্রটি এত মজবুত কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে যে বিরক্ত তো লাগেইনি, বরং আরো বেশি দেখার অতৃপ্তি নিয়ে শেষ করতে হয়েছে। তানভীর মোকাম্মেলের কন্ঠে ভয়েজ ওভার এবং চিত্রলেখা গুহর কন্ঠে গান-সব মিলিয়ে এক অনন্য সৃষ্টি এই ‘সীমান্তরেখা’। খুব নিশ্চিত করে বলা যায় যে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী যে কাউকে সিনেমাটি মুগ্ধ করবে। এই ছবির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে শেকড় হারা মানুষের পরিচয়ের সংকট আর সেই সংকট থেকে মুক্তি পেতে চাওয়ার বাসনা। তানভীর মোকাম্মেলকে এমন একটি অনবদ্য সৃষ্টির জন্য সাধুবাদ জানাই।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com