Smiley face

শত নামের ভীড় আর অজ্ঞাতনামা

3
সুদীপ মজুমদার
বাবার চোখে জল, অস্থির প্রিয়তমা……সিনেমার শুরুতেই গানের কথা আর সুরস্রোতে কেমন যেনো একটা বিষাদ ভর করে। গোটা সময়টুকু এই বিষাদময়তাই সিনেমাটিকে টেনে তুলে নিয়ে যাবে অন্য উচ্চতায়। এই বিষণ্ণতার গল্প ভীষণরকম জাদুমাখা, মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে, চোখে জলছবি আঁকবে। বলছি, তৌকির আহমেদের চিত্রনাট্য আর পরিচালনায় অজ্ঞাতনামা সিনেমার কথা।
বাংলাদেশের প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ দেশের বাইরে বসবাস করছে। সস্তা শ্রম বিক্রি করে টাকা উপার্জন করছে, আর বুকভরা আশা নিয়ে অবিরাম জীবন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে। একদিন রাজবাড়ি জেলার কালুখালী থানায় খবর আসে, ওমান প্রবাসী শ্রমিক শেখ আবদুল ওয়াহাব সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন, লাশ নিতে নিকট আত্মীয়দের ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেতে হবে। সেদিন বৃষ্টির রাতে থানার ওসি কুদ্দুস (শতাব্দী ওয়াদুদ), ডিউটি অফিসার ফরহাদ (মোশাররফ করিম) সহ আরও দুজন পুলিশ কর্মকর্তা মৃত্যুর খবর দিতে মৃত ওয়াহাবের গ্রামে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন সেই শেখ আবদুল ওয়াহাব জীবিত এবং তিনি ওমান ছেড়ে এখন ইতালিতে আছেন। ওয়াহাবের সঙ্গে ফোনে কথা বললে উঠে আসে রমজান দালালের (শহীদুজ্জামান সেলিম) নাম। রমজানকে ডেকে আনার পর তার কাছ থেকে জানা যায় ওয়াহাবের পাসপোর্ট রমজান কেফায়েত উদ্দিনের (ফজলুর রহমান বাবু) ছেলে আসির উদ্দিনের প্রামাণিকের কাছে ত্রিশ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। অর্থাৎ সেই আসির উদ্দিন মারা গেছে। আর এভাবেই গল্প মোচড় দেয় নতুন বাঁকে। সময়ের আবর্তে সিনেমাটি চলতে থাকে আপন গতিতে, হৃদয়স্পর্শী রঙয়ে। প্রচন্ড বাস্তবিক আর গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট ম্যাটার হওয়ায়, এই সিনেমার আবেদন অবশ্যই আর দশটা সিনেমা থেকে আলাদা।
1সিনেমার চিত্রনাট্য দুর্দান্ত। সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী। এই গল্প যতটা মানবিক, ঠিক ততোটাই যেন স্যাটিরিক্যাল ইমিটেশান প্যারোডি। যেমন ওসি কুদ্দুসের একটি কথাই ধরা যাক, সে বলছে, “কি যে কও না, পুলিশের জীবনে কি আবার রেস্ট আছে নাকি? ঘোড়া চিনেন ঘোড়া? আমরা হইছি ঘোড়ার মতন, ডিউটির সময় দাঁড়ায় দাঁড়ায় ঘুমাই”। কিংবা মরা বাড়িতে “পুলিশদের চাইরটা ডাইল ভাত সঙ্গে রাতাও দুইটা আছে” বলে নিমন্ত্রণের ঢং, এ যেনো সোশ্যাল ট্রাভেস্টি! আর সবশেষে লাশ নিয়ে এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয় ঘুরে বেড়ানো, এ যেন বাংলাদেশের সামাজিক আর রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনার এক সার্বিক চিত্র তুলে ধরে আমাদের সামনে। সিনেমায় সস্তা সংলাপ যেমন ছিলো, তেমনি এর বৈপরীত্যও ছিলো। আবুল হায়াত শতাব্দী ওয়াদুদকে বলে, ‘সব আল্লাহরই খেলা, আপনার কোনদিন সন্তান হারানোর ভয় নাই’, কিংবা সিনেমার শেষের দিকে ফজলুর রহমান বাবুর সেই মর্মস্পর্শী সংলাপ, ‘হিন্দু মুসলমান খ্রিষ্টান কি যায় আসে। একটা মানুষের বড় পরিচয় হল সে মানুষ। একটা সৎকারের অধিকারতো তার আছে’।
সিনেমার বিষয়বস্তু যেমন ভারী, তৌকিরের পরিচালনা আর এক্সিকিউশানও তার সঙ্গে সমান সামঞ্জস্য রেখে চলেছে। এই স্বল্প বাজেটে এরকম আউটপুট নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। তাছাড়া প্রচুর সিনেমাটিক সিম্বোলিজম ছিলো। যেমন, একদম শুরুতেই, ফজলুর রহমান বাবু তার নাতিকে নিয়ে যখন মরা পাখিকে কবর দেয়, সিনেমার শেষে এসে এই সিকোয়েন্সটি যেনো নতুন করে পূর্ণতা পেলো, ‘একটা সৎকারের অধিকারতো সবার আছে’। কিংবা লাশবাহী ট্রাক ঠেলার দৃশ্য দেখে আচমকাই মনে পড়বে, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ এই বাক্যটির কথা। কিংবা সিনেমার শেষের দিকে সেই লাশ নিয়ে যখন তারা বাড়ি ফিরছে, তখন দেখা যায়, ফজলুর রহমান বাবুর পাশাপাশি মোশাররফ করিম, শহীদুজ্জামান সেলিম সহ সবাই লাশের পাশে ট্রাকের পিছনে বসে আছে। কারণ একটা মানুষের বড় পরিচয় হল সে মানুষ। ‘একটা সৎকারের অধিকারতো তার আছে’। এই অজ্ঞাতনামা, লাশকে ঘিরে এই যাত্রা যেন জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায় ফরহাদ কে, রমজান দালালকে।
রমজানদের মতোন অসংখ্য দালালরা নানান প্রলোভনে ফাঁসিয়ে সহজ সরল মানুষকে দেশের বাইরে পাচার করছে। সর্বস্ব খুইয়ে নিজের দেশ ছেড়ে অন্যদেশে 2পাড়ি দিচ্ছে তারা। সেখানে গিয়ে সামান্য মানবিক অধিকারটুকুও জোটে না। কখনো বা কাউকে নিজের নাম, নিজের আত্মপরিচয়টাও লুকাতে হয়। অন্য নাম অন্য পরিচয়ের আড়ালে লুকোতে গিয়ে সে হয়ে উঠে অজ্ঞাতনামা, দ্যা আননউন। সিনেমার এই ম্যাসেজটা বেশ পরিষ্কার।
সিনেমার পর্দায় সবার উপস্থিতি ছিলো মনোমুগ্ধকর। এটা এই সিনেমার আরেকটি ইতিবাচক দিক। শ্রেষ্ঠাংশে যারা ছিলেন তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ আসনে শক্তিমান অভিনেতা। আর সেই শক্তির পরীক্ষাতেই যেনো সবাই নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুজ্জামান সেলিম, মোশাররফ করিম পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। শহীদুজ্জামান সেলিমের বাংলা মদ খাওয়ার প্রত্যেকটি অভিব্যক্তিই প্রমাণ করে কতটা জাত অভিনেতা তিনি। আর বাবুর অভিনয় ছিলো আউট অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড, অনন্য, অসাধারণ, অতুলনীয়।
এই সিনেমার বানিজ্যিক সাফল্য না আসাটা প্রচন্ডরকম দুর্ভাগ্যজনক। কারণ এই গল্পটির প্রপোজিশান আমাদের অতিচেনা, এর মজবুত গাঁথুনি আর ভ্যালিডেশানের সঙ্গে দর্শকরাও সমন্বিত হতে পারতো একযোগে। তবে ব্যবসায়িক সাফল্য না আসলেও পরবর্তীতে এটি দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে বেশ ইতিবাচক সাড়া লাভ করে। এছাড়া ৬৯ তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাণিজ্যিক শাখায় এটি প্রদর্শিত হয়েছিলো। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্রকার হিসাবে তৌকির আহমেদের চলচ্চিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়, এটা অবশ্যই একটা বিশেষ অর্জন। এছাড়া চলচ্চিত্রটি ইতালির গালফ অফ ন্যাপলস ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রদর্শিত হয় এবং জুরি স্পেশাল মেনশন পুরস্কার অর্জন করে।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com