Smiley face

একজন যান্ত্রিক কমলালেবু

a_clockwork_orange
আশিকুর রহমান তানিম
হ্যালো মাই ডিয়ার ব্রাদার্স অ্যান্ড অনলি ফ্রেন্ডস,
আমি আলেকজান্দার ডিলার্জ; মহাত্মা স্ট্যানলি কুব্রিকের ‘A Clockwork Orange’ নামের সিনেমার জন্য এবং (আরো কিছু ক্ষেত্রে হয়তো) ঔপন্যাসিক অ্যান্থনি বুরগেস এর একই নামের উপন্যাসের জন্য বেশিরভাগ মানুষের কাছে আমি অ্যালেক্স নামেই পরিচিত। আপনাদের ভাই এবং বন্ধু হিসেবে আপনারা আমাকে এই নামেই ডাকতে পারেন।
অবশ্য, আমি জানিনা আমার কথা আপনাদের কতটুকু মনে আছে! ধরে নিচ্ছি, আপনাদের অনেকের সঙ্গেই আমার আগে দেখা হয়েছে; এবং সেটা কুব্রিকের সিনেমার ফ্রেমেই হয়তো। আপনি নিশ্চয়ই আমাকে এতক্ষণে কল্পনা করতে শুরু করে দিয়েছেন? যেহেতু, ম্যালকম ম্যাকডাওয়েল কে দেখেছেন আমার অবয়বে, আপনি আমাকে তার মতই ভাবছেন, আমি জানি। ভাবুন, সমস্যা নেই। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য এইটুকু তার প্রাপ্যই। আর যারা আমাকে চেনেন না, আমি তাদের সঙ্গে একটু পরিচিত হতে চাই। আমার নাম তো একটু আগেই শুনলেন, অ্যালেক্স। আমি এক হাইস্কুল পড়ুয়া টিন এজার, থাকি বাবা-মা’র সঙ্গে কলোনীর একটা ফ্ল্যাটে। সদ্যই কৈশোরত্তীর্ণ আমার চেহারায় যতটুকু কোমলতা আর মাধুর্য থাকা দরকার, তারচেয়ে বরং কিছুটা বেশিই আছে! কিন্তু, আপনি যদি আমার সঙ্গে পরিচিত হতেন তাহলে বুঝতেন, এই চেহারারূপী মুখোশের ভিতরে আমি ঠিক ততটাই বিপরীত। আমার রাস্তা ঘাটে অকর্মণ্য বুড়ো লোক দেখলে একদমই সহ্য হয় না, আমি তাদের ধরে আচ্ছামত পেটাই। আমি আমার মত আরো যারা আছে দলবল নিয়ে ঘুরে, তাদের সঙ্গে মারামারি করি। এর-ওর গাড়ি চুরি করে রাত বিরাতে বের হয়ে যাই দূরের কোন গ্রাম বা এলাকার উদ্দেশ্যে। তারপর সুযোগ বুঝে মানুষের বাড়িতে হানা দিয়ে টাকা-পয়সা, মূল্যবান ঘড়ি কিংবা অন্য কিছু ছিনিয়ে নেই। বাসায় স্ত্রীলোক থাকলে ধর্ষণও করি। আপনার মনে হতে পারে, কেন করি? আসলে আমি কখনো চিন্তা করে দেখিনি, কেন করি। করতে ভাল্লাগে, তাই করি বোধহয়। কোন উদ্দেশ্য নেই! ওহ, ভালো কথা, আমি কিন্তু ধ্রুপদী সংগীত পছন্দ করি, বিশেষত লুডউইগ ফন বিঠোফেন। পঁচে যাওয়া পৃথিবীর এই একটা জিনিসকেই আমার একটু শান্তির মনে হয়। আমি তো আদতে কল্পকাহিনীর এক চরিত্র, আমার বসবাস আসলে নিকট ভবিষ্যতের একঘেয়ে এক ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীতে। যেই পৃথিবীতে কাজ করতে সক্ষম এরকম সবাই প্রোগ্রাম করা রোবটের ন্যায় এক ইউনিটের মত প্রোডাকশন বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে, যেখানে সব সমস্যার সমাধানই যাত্রিক উপায়ে করা হয়, এমনকি মানবিক সব সমস্যাও। যেখানে মানুষ পৃথিবীর চারপাশে স্যাটেলাইটে ঘুরছে, যেখানে ‘পার্থিব’ শব্দটার আর বিন্দুমাত্র আবেদন নেই; নেই শিল্প-সাহিত্য, গান-বাজনার কোন বালাই। আমিই আমার বাবা-মাকে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছি দম দেয়া পুতুলের মত সকালে বের হয়ে কাজ করে সন্ধ্যায় ফিরতে- প্রত্যেকদিন, একই রুটিন!
afterdarkclockworkorangeএরকম এক পৃথিবীতে আমার দিনকাল কাটছিলো। আমরা ছিলাম চার বন্ধু, আমি, জর্জি, পিট আর ডিম। অঘোষিত দলনেতা আমিই ছিলাম। আমার মন-মর্জির উপরেই সবাই চলতো। আমাদের দিনকাল কেটে যাচ্ছিলো ভালোই। যদিও, আমার চিন্তাভাবনা চাপিয়ে দেয়ার কারণে আমার দলের অন্য তিনজনের একটু চাপা অসন্তোষ আমি টের পাচ্ছিলাম! সেটাও ঠিকঠাকমতই ম্যানেজ করে নিয়েছিলাম। একদিন আমাদের স্বভাববশত এক বাসায় হানা দেই আমরা। বাসায় গৃহকর্ত্রী থাকেন একাই। হায়, আগে যদি জানতাম সেই বাসায় হানা দেয়াই আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে! ঐ গৃহকর্ত্রীর দেয়া ফোনে সাড়া দিয়ে পুলিশ চলে আসলে আমি তড়িঘড়ি করে বের হয়ে আসি, আর তখনই ব্রুটাসের মত আমারই প্রিয় বন্ধুরা আমাকে আঘাত করে প্রায় অন্ধ রেখে চলে যায়। আমি ধরা পড়ি পুলিশের কাছে! প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ, বুঝতেই পারছেন, আমাদের পৃথিবীর অবস্থা, যেখানে বন্ধু-বান্ধবরাও সুযোগ বুঝে পিঠটান দেয়! কি বললেন? আপনাদের পৃথিবীতেও দেয়? আপনাদের পৃথিবীর ডুমসডেও বোধহয় তবে আসন্ন!
যাকগে, অতঃপর আমাকে জেলে পুরে দেয়া হয়। সেখানে দুই বছর মোটামুটি ভদ্র মানুষের মুখোশ পড়ে কাটিয়ে দিই। নিয়ম করে বাইবেল শুনি, পড়িও; হাইম বা কীর্তন গুলো মন দিয়ে গাই- এভাবেই একসময় প্রিজন চ্যাপল্যাইনের সুনজরে চলে আসি। অতঃপর একদিন ইন্টেরিওর মিনিস্টার জেল পরিদর্শনে আসে নতুন এক্সপেরিমেন্টের জন্য কয়েদী বাছাই করতে। আমিই আগ বাড়িয়ে ভলান্টিয়ার হতে চাই, কারণ এই বন্দীজীবন আমার অসহ্য ঠেকছিলো! যদিও জানতাম না এটা কিরকম এক্সপেরিমেন্ট, শুধু জানতাম এই এক্সপেরিমেন্ট একজনকে অপরাধবিমুখ করে দেয়। দিন দুয়েক পরই শুরু হয় সেই এক্সপেরিমেন্ট। আমার চোখের পাতা জোর করে খুলে রেখে দেখানো হয় ভায়োলেন্ট সব অপরাধের ভিডিও! খুন, ধর্ষণ, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প- এসব দেখে দেখে আমার শরীর অবশ হয়ে আসে। অপরাধের কথা মাথায় আসলেই গা গুলাতে থাকে, অসহ্য যন্ত্রণা হয় শরীরে। এক্সপেরিমেন্ট শেষে আমাকে ভালোমানুষ হিসেবে ছেড়ে দেয়া হয় আবার সমাজে। কিন্তু, কর্মফলের মতই আমার পূর্ব সব অপরাধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। নিয়তির পরিহাসেই বোধহয় যেই লেখকের স্ত্রীকে আমি ধর্ষণ করি, উনিই আমাকে মানসিক চাপ প্রয়োগে আত্মহত্যা করাতে বাধ্য করান প্রায়! কোনমতে বেঁচে যাই আমি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সেই মিনিস্টার আমাকে দেখতে আসে। এইভাবেই আমার জীবসত্বাকে মোটামুটি দম দেয়া খেলনা পুতুলের মত যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলেন আর সবাই।
যাই হোক, আমার কাহিনী তো শুনলেনই। সিনেমার একদম শুরুতেই আমার অন্তর্ভেদী দৃষ্টির কথা মনে আছে, আপনার? ঐ যে, করোভা মিল্ক বারে আমার আরো তিন সহচরের মাঝে বসে আমি আপনার চোখ এর দিকেই যে অপলক তাকিয়ে ছিলাম? আমাকে দেখে মনে হয় আপনি একটু ভয়ই পেয়েছিলেন, না? দেখুন, একদমই ভয় পাবেন না। আমি আপনার ভাই এবং প্রিয় বন্ধু, অ্যালেক্স।
আচ্ছা, আপনি কি ভাবছেন, সিনেমার প্লট (কিংবা বইয়ের পাতা) থেকে বের হয়ে আমি কি নিয়ে বকবক করছি? আমি নিজেকে জাস্টিফাই করতে বসেছি? নাalexludovico না, এইসব আমার কম্মো নয়। আমি যেমন, আমি তেমনই। আপনি আমাকে আসলে খারাপ কি ভালো ভাবলেন তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। যদিও, কিছু কথা আপনার মনের অস্বস্তি বা খঁচখঁচানির জন্যই বলে ফেলা দরকার, যেন সেটা একটু কমে। যেমন, সিনেমায় (কিংবা বইয়ে) আমি যখনই নির্বিচারে মানুষ পিটিয়েছি, ধর্ষণ করেছি আপনি নিশ্চয়ই ঘৃণায় আমার উপর একদলা থুথু ছিটিয়ে দিতে চেয়েছেন? আবার যখন, আমার উপর লুডোভিকো ট্রিটমেন্টের (যেই এক্সপেরিমেন্ট আমার উপর চালানো হয়েছিলো, তারই গালভরা নাম ছিল একটা- লুডোভিকো ট্রিটমেন্ট) নামে অমানবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে, তখন আপনার আবার আমার জন্য নিশ্চয়ই খারাপ লেগেছে, তাই না? তাহলে, ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? আমাকে কি এক শব্দে ‘খারাপ/ঋণাত্মক’ ট্যাগের নিচে ফেলে দিতে পারছেন?
আচ্ছা, সে যাই হোক, আমার নিজের কথা বলার আগে আমি একটা জিনিস একটু বলে নেই, আপনি যে আমার কাজকর্ম দেখে আমাকে মাপছেন, তার মানদণ্ড টা আসলে কি? আপনাদের মোরাল ভ্যালু, ইথিকস, আপনাদের সমসাময়িক কালচার এইসব তো? কিন্তু, আমার আর আপনাদের পৃথিবী কি এক? আমাকে যেই কাহিনীর মধ্যে আপনি আবিষ্কার করেছেন, সেটা ভবিষ্যতের ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীর এক কাল্পনিক গল্প, যখন ডুমস্‌ ডে প্রায় আসন্নই। সেই সময়কার পৃথিবী আর আপনাদের এখনকার পৃথিবীর মধ্যে তফাতটুকু কিন্তু অনেক। এইটুক নিশ্চয়ই আপনাদের মাথায় থাকা উচিৎ! এই রে, আমার কথাগুলো আসলেই কেমন জাস্টিফিকেশনের মত শোনাচ্ছে! কিন্তু, দিব্যি দিয়ে বলছি, আমি আমার কাজকর্মকে জাস্টিফিকেশন করতে আসিনি। আগেই যেমন বলেছিলাম, আমার আসলে কে কি ভাবলো তাতে কিচ্ছুই আসে যায় না! তারপরও, কেউ কাউকে নিয়ে কোন উপসংহারে পৌঁছুনর আগে অন্তত তার জুতোয় পা গলিয়ে তো একটু হেঁটে দেখাই যায়, তাই না? আমি আসলে সেটাই বলতে চাচ্ছি।
যাই হোক, আমাকে আপনারা খারাপ ভাবতে পারেন, আমাকে পাগলও ভাবতে পারেন, কিন্তু, একটা জিনিস কিন্তু আসলেই সত্যি যে, পর্দার কাল্পনিক জগতে ইদানীং কালের জোকার কিংবা টাইলার ডার্ডেন অথবা হালের অনেক প্রতিনায়কের কিন্তু আমিই পথিকৃৎ। পার্থক্যটা এইই শুধু যে, আমার একটু ‘ওল্ড আল্ট্রা ভায়োলেন্স’ পছন্দ, যেখানে ওদের ভায়োলেন্স অন্যরকম! আমার এক উত্তরসূরী জোকারের ভাষায়ই বলি, “I’m like a dog chasing cars. I wouldn’t know what to do with one if I caught it. I just do.” আচ্ছা, আরেকটা প্রশ্ন, রাস্তার কুকুরের কাজকর্ম কে কি আপনারা আপনাদের ইথিক্স-ফিথিক্স এর ভিত্তিতে বিচার করতে বসেন না তো?
আপনারা যারা যারা আমাকে চেনেন বা আমার কাহিনী জানেন, তাদের নতুন করে আর আমার দ্বৈতসত্বার কথা বলার কিছু নাই। আপনারা সবাইই জানেন যে, আমাকে লুডোভিকো ট্রিটমেন্টের সাহায্যে শুদ্ধিকরণ করা হয়েছিলো; আমার ভিতরকার মিঃ জেকিল কে মেরে ফেলে ডক্টর হাইডকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য। আদতে লুডোভিকো ট্রিটমেন্ট হচ্ছে সাইকোলজির খুব জনপ্রিয় একটা পরীক্ষা ‘পাভলোভিয়ান এক্সপেরিমেন্ট’ এর ই একটা রূপ। পাভলোভিয়ান এক্সপেরিমেন্ট সম্বন্ধে জানেন তো? ঐ যে এক একসেন্ট্রিক সাইকোলজিস্ট তার ক্ষুধার্ত কুকুরকে বার বার বেল বাজিয়ে তারপর খাবার দিতো। উদ্দেশ্য ছিলো মনের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক বাজিয়ে দেখা। একসময় কুকুরের মাথায় বেলের সঙ্গে খাবারের এই সংযোগ এমন ভাবেই গেঁথে গেলো যে, এরপর যখনই বেল বাজানো হত, তখনই, কুকুরের জিভ বের হয়ে যেত খাবারের জন্য, সামনে খাবার থাকুক আর না থাকুক। আমার এক্সপেরিমেন্টটাও কিন্তু এমনই। মানে, দেখুন, আমার সঙ্গে যেই এক্সপেরিমেন্ট টা করা হয়েছে, সেটা সত্যি সত্যি করা হয়েছিলো একটা কুকুরের উপর। তারপরও আপনারা আমাকে আপনাদের মানুষের মোরালিটির ভিত্তিতেই জাজ করছেন? হাহাহা!
প্রিয় ভাই ও বন্ধুরা, আপনাদের মনে হয় এতক্ষণে বেশ দ্বিধান্বিত করে ফেলেছি, তাই না? আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি আসলে কি বুঝাতে চাচ্ছি? না না, আমি জোর করে আপনাদের উপর কিছুই চাপাচ্ছি না! প্রত্যেকটা মানুষেরই ফ্রি উইল থাকা উচিৎ; নিজস্ব চিন্তাভাবনাও। আপনারা আপনাদের ধ্যানধারণা দিয়েই আমার কথা ভাববেন, আমার গুলো দিয়ে নয়। যাই হোক, আমাকে আপনারা প্রচলিত ধর্ম-কর্মের ছাঁচেও কিন্তু ফেলতে পারবেন না। কারণ, সে চেষ্টা তো জেলে থাকতে আমার উপর করাই হয়েছিলো, তাই না? কিন্তু, আমার উপর সে চেষ্টাও ফলেনি। আমি নিজেও অবশ্য জানিনা কেন এমন হয়েছিলো! কিন্তু, জানেন, আমি যীশুর কথা পড়ার সময় কখনোই সমবেদনা অনুভব করি নি, বরঞ্চ, আমি নিজেকে ঐভাবে কল্পনা করতাম যে, আমিই যীশুর পিঠে শিকল দিয়ে মারতে মারতে ক্রুশের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, যীশুকে পেরেক দিয়ে ক্রুশবিদ্ধও আমিই করছি। আমার ঐসব ধর্মগ্রন্থের মহৎ ও নীরস বাণী কিছুতেই ভালো লাগেনি, শুধু একটা অংশ ছাড়া- ওল্ড টেস্টামেন্টে যত নারী কৃতদাসীর কথা ছিলো সেগুলো। আমি নিজেকে প্রাচীন তামাটে বর্ণের কৃতদাসীদের উদাত্ত বাহুতে কল্পনা করতাম, হিব্রু আঙ্গুর খাইয়ে দিচ্ছে আমাকে, জলপাই পাতা দিয়ে বাতাস করছে- এসব ছাড়া আমার কাছে ধর্মগ্রন্থ অর্থহীনই মনে হয়েছে।

3

সত্যি বলতে কি, আমি চাইও না, কেউ আমার পক্ষে দাঁড়াক। কেউ যদি বলে, না, অ্যালেক্স যা করেছিলো, তা ঠিক- আমি তাহলে বরঞ্চ মেজাজ খারাপই করবো। কারণ, আমি জানি, আমি যা যা করেছি, তা কিছুতেই, মানে কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই ঠিক না। আমি খুন করেছি, আমি ধর্ষক, আমি অকারণেই মানুষ পিটিয়েছি; অবশ্যই এসব ঘৃণ্য কাজ। কিন্তু, এই যে এগুলোর জন্য আমার কোন অনুশোচনা নেই আর এগুলো করে যে আমি বিমলানন্দ পেয়েছি- এই ব্যাপারটাকে কেন যেন কেউ মেনে নিতে পারে না, আমার কাছে এই ব্যাপারটাই বেশি আশ্চর্যজনক ঠেকে! মানে, ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, মানুষের স্বভাবই হচ্ছে, মানুষ তার নিজস্ব প্যারাডাইম দিয়েই সবাইকে আর সবকিছুকে ভাবে। আমি যেসব কাজ করেছি, তার জন্য তো অবশ্যই আমার শাস্তি প্রাপ্য। কিন্তু, আমি এগুলো করে যে অনুতপ্ত নই, তার জন্য কেন আপনারা আমাকে দোষ দিচ্ছেন, ভাই ও বন্ধুগণ? দুনিয়ার কোন আইন তো মানুষের চিন্তা-ভাবনা কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি, বরঞ্চ আইন শুধু ঘটিত কর্মের জন্যই, নয় কি? অথচ, আমাকে নিয়ে যত জায়গায় যত কথা শুনেছি, যত লেখাজোখা পড়েছি, সবজায়গায় রীতিমত আমার চিন্তাভাবনা নিয়ে একদম ডিসেকশন করে সবাই তর্কে লিপ্ত হয়েছে, আমাকে বা আমার চিন্তাভাবনাকে জাস্টিফাই করার জন্য। অথচ, সত্যি কথা বলতে, আমি আপনাদের মত এত ‘কজ অ্যান্ড ইফেক্ট’ চিন্তা করে এসবের কিছুই করিনি। আমি এসব করেছি আমার ভালো লাগতো বলে, কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। আপনারা সবাই কোন না কোন উদ্দেশ্য নিয়েই সব করেন, এমনকি ত্যাগও! আমি আপনাদের মত না- এটা মেনে নিন। আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা, আমার পোস্ট কারেক্টিভ অ্যাডভাইজর কিন্তু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, “Is it some devil that crawls inside of you?” আমার উত্তর ছিলো, না। কারণ, আমার খারাপ কাজের দায় ডেভিল নামের এক বিশ্বাসের উপর চাপিয়ে দেয়ার ধারণাটাই আমার পছন্দ নয়। আমি খারাপ কাজ করি নিছক আমার জন্যই, আমার আনন্দ লাভের জন্য। এমনকি শয়তানও ঈশ্বর নামক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জয়লাভের উদ্দেশ্যেই কিন্তু অন্যায় করে। তাই আমাকে দয়া করে শয়তান বা ডেভিল বা তার সাগরেদ এসব কিছুও ভাববেন না, প্লিজ!
আপনাদের মনে আরেকটা দ্বিধাও আছে বোধহয়, না? যে, আমি সত্যি সত্যি সুস্থ হয়েছিলাম কিনা। এখানে অবশ্য সুস্থতাও দ্ব্যর্থবোধক। কারো কারো কাছে আমার সুস্থতা মানে আবার আগের অ্যালেক্স হয়ে যাওয়া, আবার কারো কারো কাছে আবার সুস্থতা মানে ভালো মানুষের মুখোশ পড়া অ্যালেক্স হয়ে থাকা। এই প্রশ্নের উত্তর আমার নিজের কাছেও নেই। থাকলেও অবশ্য আমি দিতাম না। আপনাদের এই একটা ব্যাপারে দ্বিধান্বিত রেখে দেওয়াই আমার দৃষ্টিতে ঠিক। কারণ, আপনাদের মোরালিটি সম্পন্ন মানুষদের একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করেছি যে, উপসংহারে না পৌঁছে কেউ কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না। আপনি যখনই নিশ্চিত হবেন যে, আমি সুস্থ হয়েছিলাম কিনা, তখনই আবার আমাকে বিচার করতে বসবেন। সুতরাং, এই ব্যাপারটা বরঞ্চ অমীমাংসিতই থাকুক। এর চেয়ে আসুন লুডোভিকো ট্রিটমেন্টের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে কথা বলি। আপনার নিশ্চয়ই জানার ইচ্ছে, তখন আমার কি হয়েছিলো? লুডোভিকো ট্রিটমেন্ট আমাকে জড়বস্তু বানিয়ে দিয়েছিলো। অনেকটা প্রোগ্রাম করা রোবটের মতই। আমার ফ্রি উইল বলতে আসলে কিছু ছিলো না। ধরুন, আমার খারাপ কিছু করতে ইচ্ছে করছে, এই ইচ্ছেটা বাস্তবে রূপদান করার সময়ই আমার নিজের অজান্তেই খুব অসুস্থ লাগতে থাকতো। আমার ট্রিটমেন্টের সময়কার সেই ভিডিও ফিল্মগুলোর কথা মনে পড়তো! তখন, সেই ইচ্ছেটাকে গলা টিপে মেরে ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকতো না আমার। মানুষের মনের সঙ্গে শরীরের যেই নিউরোলজিক সেতুটা আছে, আমার ক্ষেত্রে সেই সেতু ব্যাবহার করেই আমার খারাপ ইচ্ছাকে অবদমিত করে রাখা হয়েছিলো। আপনার যদি মনে হয় এটাই সঠিক, তাহলে আমার কিছুই বলার নেই, বন্ধুগণ।
যেহেতু আমি আগেই বলেছি, আমি আপনাদের মত না, তাই মানুষকে জাজ করাটাও আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই আমি কাউকে জাজ না করে বরং আপনাদের আমার পরিচিত কয়েকজনের কথা একটু মনে করিয়ে দেই, চলুন। আপনাদের ইথিক্স, মোরালিটি উনাদের সম্বন্ধে কি মতামত দেয় আমার খুব জানার ইচ্ছে। যেমন, ইন্টেরিওর মিনিস্টার এর কথাই ধরা যাক। মিনিস্টার ছিলেন ম্যাকিয়াভেলিয়ান টাইপের; ফলাফলই যেকোন পন্থাকে জাস্টিফাই করেন যারা বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ, ফলাফল অনুকূলে আনার জন্য যারা অন্যায় পন্থা অবলম্বন করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। সেই মিনিস্টার সমাজের যেকোন অপরাধ দূরীকরণের জন্য অপরাধ ঘটানোর প্রবৃত্তিই দূর করে দেবেন- এরকম একটা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। যদিও শেষমেশ সেটা বুমেরাং হয়ে ফেরত আসে। অথবা, ডাক্তার ব্রডস্কি? কিংবা, সেই লেখক? যার বাসায় আমি শেষমেশ আশ্রয় পেয়েছিলাম? উনিও কিন্তু নিজের উদ্দেশ্যসাধনের জন্যই আমাকে ব্যাবহার করেছিলেন; তাও, কি উন্মত্ত হিংস্রতায়! বিঠোফেন এর নাইন্থ সিম্ফনি ছেড়ে বাধ্য করেছিলেন আমাকে লাফ দিতে… আমাকে আপনারা খারাপ ভাবতেই পারেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু, একটা কথা বলি, রাগ করবেন না প্লিজ, আমিও আপনাদের মত এসব উদ্দেশ্যচালিত মানুষদের তার চেয়েও বেশি ঘৃণা করি। অন্তত, আমি আপনাদের মত হিপোক্রিট নই!

2

আমাকে সহানুভূতি দেখানোর দরকার নেই, ভালোবাসারও দরকার নেই; আমি কোনদিন ভালোবাসার কাঙ্গাল ছিলাম না। হ্যাঁ, আমার বাবা-মা যখন আমার চেয়ে তাদের আশ্রয় দেয়া সেই লজারকে বেশি আপন ভেবেছিলো শুধু আমি বখে গেছি দেখে, তখন একটু খারাপ লেগেছিলো অবশ্য, কিন্তু, এইজন্য না যে, আমার বাবা-মা আমাকে ভালোবাসে না। বরং, আমার দুনিয়ার শেষ ও খুব প্রিয় আশ্রয়টুকু হারানোর জন্যই খারাপ লেগেছে। আমি যদিও কর্মফলে বিশ্বাস করি না। তবুও, জেল ও সেই অদ্ভুত ট্রিটমেন্ট থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আমাকে কিন্তু বারবারই প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে। আমার বাবা-মা আমাকে বাসায় থাকতে দিতে চায়নি। যেই বুড়োকে আমি পিটিয়েছিলাম, সেও তার দলবল নিয়ে আমার উপর চড়াও হয়েছে। ডিম আর জর্জি- আমার প্রিয় সহচর, তারাও তাদের উপর অত্যাচারের প্রতিশোধ নিয়েছে আমাকে চৌবাচ্চায় প্রায় শ্বাসরোধ করে। এমনকি, সেই লেখকও… আর, সেই বিড়ালমানবী যাকে আমি মেরেছিলাম, সেও কিন্তু একরকম আমার উপর প্রতিশোধ নিয়েই নিয়েছিলো। আমাকে নির্জীব, অথর্ব অ্যালেক্স বানিয়ে দিয়ে। অন্তত আমার ক্ষেত্রে ঈশ্বর কিন্তু যথেষ্ট দয়াপরবশ ছিলো না।
ডিয়ার ব্রাদার্স অ্যান্ড মাই অনলি ফ্রেন্ডস, আমি জানিনা আমি আসলে এতক্ষণ কি আবোল তাবোল বকেছি। কিন্তু, আপনাদের খুব কাছের মানুষ হিসেবে নিশ্চয়ই ক্ষমা ঘেন্না পেয়ে যাবো আশা করি।
যাই হোক, সমাপ্তির আগে শেষ ও সত্যি একটা কথা বলে যাই, ট্রিটমেন্টের সময়কার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ফিল্মটার কথা মনে আছে আপনাদের যেটা আমাকে জোর করে দেখানো হয়েছিলো? ঐটা দেখতে দেখতে কি মনে হয়েছিলো জানেন? মনে হচ্ছিলো, মানুষ নামের যেই প্রজাতির কিছু অংশ এইরকম ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে লুডউইগ ভ্যান বিঠোফেন বাজাতে পারে, তাদের উপর এমন অত্যাচার করে আমি ভুল কিছু করিনি!

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com