Smiley face

কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী: ভয়ংকর অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন

Growing-up-600x300
জাপানি মাস্টার ফিল্মমেকার আকিরা কুরোসাওয়া (২৩ মার্চ ১৯১০-৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮) বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম স্বতন্ত্র ও প্রভাববিস্তারী নির্মাতা। ৫৭ বছরের ক্যারিয়ারে নির্মাণ করেছেন ‘রশোমন’, ‘সেভেন সামুরাই’, ‘ইয়োজিম্বো’, ‘দি হিডেন ফরট্রেস’, ‘ড্রিমস’সহ ত্রিশটি কালজয়ী ফিল্ম। ১৯৮১ সালে জাপানি ভাষায় প্রকাশিত হয় কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী, যার ইংরেজি অনুবাদ করেন অডি ই. বক ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ নামে। সেই গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ বাংলা তরজমা করেছেন রুদ্র আরিফ। সমগ্র আত্মজীবনীটি, আগামী ২০১৮-এর অমর একুশে বইমেলায়, “ঐতিহ্য” প্রকাশনী থেকে, “কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী” নামে প্রকাশিত হবে। সেই বইয়ের ছোট একটি অংশ তুলে ধরা হলো মুখ ও মুখোশ এর পাঠকদের জন্য।
আমার জীবনে এ ছিল এক কালোদিন; কেননা, গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পরের দিন ছিল এটি। বেশির ভাগ ছাত্রের জন্যই এ ছিল স্কুলে আবারও ক্লাস শুরু হওয়ার উচ্ছ্বাসে ভরা একটি দিন। কিন্তু আমার জন্য নয়। কেননা, এটি ছিল দ্বিতীয় সাময়িকী শুরুর অনুষ্ঠানেরও দিন—যে অনুষ্ঠানটি সবসময়ই আমার কাছে বিরক্তিকর লাগত।
সমাবর্তন সভা শেষ হয়ে গেলে, স্কুল থেকে বের হয়ে, কিয়োবাশি অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জাপানের সর্ববৃহৎ বিদেশি বইয়ের দোকান—মারুজেনের উদ্দেশে পা বাড়ালাম আমি। বড় আপু বলে দিয়েছিলেন, তার জন্য যেন একটা ওয়েস্টার্ন-ল্যাঙ্গুয়েজ বই নিয়ে যাই। কিন্তু পৌঁছে দেখলাম, বইয়ের দোকানটি তখনো খোলেনি। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে, বাড়ির পথে পা বাড়ালাম আমি; ভাবলাম, বিকেলে একবার এসে ঢুঁ মেরে যাব।
কে জানত—মাত্র দুই ঘণ্টা পরেই মারুজেন বিল্ডিংটি এত ভয়ানকভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে, আর এটির ধ্বংসের ছবি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে মহাপ্রলয়ঙ্কারী কান্তো ভূমিকম্পের নৃশংসতার একটি জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে। আমি ভেবে পাই না, সকালে বইয়ের দোকানটি খোলা থাকলে আমার কী ভাগ্যে কী ঘটত। আপুর বইটি খোঁজার জন্য নিশ্চয়ই দুই ঘণ্টা ব্যয় করতাম না আমি; ফলে মারুজেন বিল্ডিংয়ের ধ্বংসস্তূপের নিচে আমার চাপা পড়ার আশঙ্কা নিশ্চয়ই ছিল না। কিন্তু ভূমিকম্পটির শুরুতে টোকিওর কেন্দ্রভাগ গ্রাস ও ধ্বংস করে ফেলা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডটি থেকে কী করে পালিয়ে বাঁচলাম আমি?
মহাপ্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পটির দিন সকালে আকাশ ছিল মেঘশূন্য। গ্রীষ্মের ঘর্মাক্তময় তাপমাত্রা তখনো প্রত্যেকের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলতে শুরু করেনি; তবে পরিষ্কার নীলাকাশ নির্ভুলভাবে জানান দিচ্ছিল শরতের আগমনীবার্তা। ঘড়িতে তখন ১১টার মতো বাজে; কোনো রকম পূর্ব-সংকেত না দিয়েই, ভয়ঙ্কর এক ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে শুরু করে। আমার হস্তনির্মিত পুচকে, পাখি-আকৃতির বায়ুনির্দেশক-যন্ত্রটিকে মুহূর্তেই ছাদের ওপর উড়িয়ে নিয়ে গেল সে হাওয়া ভূমিকম্পের সঙ্গে এই ঝড়ো বাতাসের সম্পর্ক ঠিক কী—জানি না; তবে মনে পড়ে, বায়ুনির্দেশক-যন্ত্রটিকে নামিয়ে আনার জন্য আমি ছাদের ওপর উঠেছিলাম, আর আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, ‘কী আজব!’

Great-Kanto-Earthquake-600x341

ঐতিহাসিক সেই ভূকম্পনটি শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা—কিয়োবাশিতে আমার প্রতিবেশী এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মেরে, মাত্রই বাড়ি ফিরছিলাম আমি। চলতি পথে ছিল একটি বন্ধকী দোকান। দোকানটির ছায়ায় দাঁড়িয়েই আড্ডা চলছিল আমাদের এবং আমার বাড়ির গেটে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটি লালরঙা কোরিয়ান গাভীর দিকে ছুড়ে মারছিলাম নুড়ি পাথর। এই গাভীটি আমাদের প্রতিবেশীর; এটিকে তিনি টোকিওর তৎকালীন প্রান্তিক শহরতলি— হিগাশি নাকানো থেকে শূকরের খামারের জন্য খাবার আনার কাজে, মালবাহী গরুর গাড়িতে ব্যবহার করতেন। আগের রাতে কী এক কারণে তিনি গাভীটি আমাদের আর তাদের—দুই বাড়ির মাঝখানের সরু গলিতে বেঁধে রেখে গেছেন এবং সারাটা রাত এটি অনুচ্চ স্বরে গোঙানোর শব্দ করেছে। এ কারণে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি আমি; আর তাই নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে এই জন্তুটিকে শায়েস্তা করার জন্য ঢিল ছুড়ছিলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে মাটির নিচ থেকে গর্জনের এক ভয়াবহ শব্দ কানে এলো। আমার পায়ে ছিল কাঠের উঁচু খড়ম এবং গাভীটিকে মারার জন্য আমি শরীর নাড়িয়েছিলাম; ফলে বুঝতে পারিনি—মাটি নড়ছে। শুধু চোখে পড়ল—আমার পাশে যে বন্ধুটি দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল, সে আচমকাই উঠে দৌঁড়াচ্ছে। তার দিকে তাকিয়ে থেকে দেখলাম, তার পেছনে দোকানটির দেয়াল টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে আমাদের বরাবর। আমিও ঝটপট উঠে দাঁড়ালাম।
আমার পায়ে উঁচু খড়ম পরা ছিল বলে কম্পমান মাটিতে ভারসাম্য রাখতে পারলাম না; ফলে পা থেকে খুলে, দুই হাতে দুটি খড়ম তুলে নিলাম। গভীর সমুদ্রে নৌকায় থাকা মানুষের মতো, জীবনের মায়ায় একটি টেলিফোনের পুল সজোরে আকড়ে ধরে রাখা আমার বন্ধুটির কাছে ছুটে গেলাম আমি। ওর মতো করে আঁকড়ে ধরলাম পুলটি। পুলটিও তখন পাগলের মতো দুলছিল। বস্তুতপক্ষে সেটির তারগুলো হাজার-হাজার টুকরোয় যাচ্ছিল খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে।
এরপর আমাদের চোখের সামনেই, বন্ধকী দোকানটির পাশে থাকা দুটি গুদামঘর টুকরো-টুকরো হয়ে যেতে লাগল। সেগুলোর ছাদের টাইলস কাঁপতে কাঁপতে, মোটা দেয়ালগুলোর উপর আছড়ে পড়ল। মুহূর্তেই সেগুলোকে মনে হলো কাঠের ফ্রেমের কঙ্কালের মতো। শুধু গুদামঘরগুলোরই এ অবস্থা হলো না। সব বাড়ির ছাদের টাইলস, যেন সেগুলোকে কোনো চালনি দিয়ে চালা হচ্ছে—এমনভাবে, আচমকা নাচতে নাচতে, কাঁপতে কাঁপতে ভেঙে পড়ল। ছাদের মোটা কড়িকাঠগুলো হয়ে পড়ল খোলা।
জাপানি ঘরবাড়িগুলো কতটা ভালোভাবে নির্মাণ করা হয়, এটিই কি তার প্রমাণ নয়? এমন পরিস্থিতিতে ছাদ হয়ে পড়ে হালকা, ফলে বাড়িটি ভেঙে পড়ে না। ভয়ানকভাবে কাঁপতে থাকা টেলিফোন পুলটি আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই এ ভাবনাগুলো খেলে যাচ্ছিল আমার মাথায়। তার মানে এই নয়, আমি শান্ত কিংবা নিশ্চল ছিলাম। মানুষমাত্রই তো মজার প্রাণী; তারা যখন ভীষণ চমকে যায়, তখনও তাদের মস্তিষ্কের একটি অংশ সম্পূর্ণই আজব রকমের শান্ত হয়ে রয় এবং ভাবতে থাকে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক কোনো কিছু। কিন্তু আমার বেচারা মস্তিষ্ক, যেটি কি না এই মুহূর্তে জাপানি গৃহস্থ স্থাপত্যশৈলী এবং ভূমিকম্পের হাত থেকে সেগুলোর নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে ভাবছিল, তো পরমুহূর্তেই নিজের পরিবারের দুশ্চিন্তায় হয়ে পড়ল উদ্বিগ্ন। ফলে বিপজ্জনক এক দৌঁড় দিলাম আমি— বাড়ির উদ্দেশে।
গেটটির ছাদের অর্ধেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে ঠিকই, তবু এটি কোনোদিকে না সরে নিখাদ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু গেট থেকে আমাদের বাড়ির দরজা পর্যন্ত সর্বত্রই, আরেকদিকের বিল্ডিংগুলো থেকে পড়া ছাদের টাইলসের ধ্বংসস্তূপের একটি পাহাড় যেন আটকে দিয়েছে পথ। ঘরে ঢোকার সদর দরজাটি আমি দেখতেই পাচ্ছিলাম না। বাড়ির সবাই নিশ্চয়ই মারা গেছে!
4আজব ব্যাপার হলো, এই অনুভূতিটি মুহূর্তেই আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল শুধু শোকেই নয়, বরং গভীরতর এক সমর্পণবোধে। পরমুহূর্তেই মনে হলো, এই পৃথিবীতে শুধু আমিই একা টিকে আছি। কী করা যায়—উদ্ভ্রান্তের মতো ভাবতে ভাবতে, আর চারপাশে তাকাতে তাকাতে দেখলাম, টেলিফোন পুলে যে বন্ধুকে ফেলে এসেছিলাম, সে তার পরিবারের সবার সঙ্গে, নিজেদের বাড়ির বাইরে এসে চিৎকার করে কাঁদছে। রাস্তার একেবারেই মাঝখানে এসে, দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে তারা। এ অবস্থায় আমার আর করার তেমন কিছুই নেই—এমনটা ভাবতে ভাবতে, ঠিক করলাম, আমি আমার বন্ধুটির সঙ্গেই থাকব, তাই ওদের দিকে হাঁটা ধরলাম।
আমাকে দেখামাত্রই, আমার বন্ধুর বাবা আমাকে কিছু একটা বলতে চাইলেন, কিন্তু তারপর আচমকাই চুপ মেরে গেলেন। আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে, আমাদের বাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তার চাহনি ধরে তাকিয়ে, আমি ঘুরে গেলাম এবং পেছনে তাকালাম। সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসছে আমার পরিবারের সবাই। এক দৌড়ে ছুটে গেলাম আমি। যাদের এতক্ষণ মৃত ভেবেছিলাম, তারা শুধু নিরাপদেই নয়, বরং আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল বলেই মনে হলো। তাদের দিকে ছুটে যেতে যেতে খেয়াল করলাম, প্রত্যেকের চোখে-মুখেই স্বস্তির আভা।
পাঠক, আপনি হয়তো ভাবছেন, তাদের দিকে ছুটে যেতে যেতে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম আমি? না, কাঁদিনি। সত্যিকার অর্থে এক ফোঁটাও কাঁদিনি। কাঁদা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না; কেন না, ভাইয়া আমার ওপর চিল্লাতে শুরু করে দিয়েছিলেন : ‘আকিরা! এ কি অবস্থা করে রেখেছ তোমার? খালি পায়ে হাঁটছ– কী নোংরা তুমি!’ তাদের দিকে তাকাতেই দেখলাম, বাবা, মা, আপু ও ভাইয়া—সবার পায়ে খড়ম। মুহূর্তেই নিজের পায়ে খড়ম গলিয়ে নিলাম, আর লজ্জা পেয়ে গেলাম খুব। আমার পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে, একমাত্র আমাকেই ভীষণ বেঢপ লাগছিল তখন। বাবা, মা ও বোন—কাউকেই এতটুকু বিচলিত মনে হলো না আমার। আর ভাইয়াকে দেখে মনে হলো, মহাপ্রলয়ঙ্কারী কান্তো ভূমিকম্পের মুখে পড়ে তিনি শুধু শান্তই নন, বরং যেন ব্যাপারটি বেশ উপভোগ করছেন!
প্রলয়ংকরী কান্তো ভূমিকম্প আমার কাছে ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবং গুরুত্বপূর্ণ। এর ভেতর দিয়ে আমি কেবল প্রকৃতির অনন্যসাধারণ ক্ষমতাকেই প্রত্যক্ষ করিনি, বরং দেখেছি মানুষের আত্মায় বসত করা অসাধারণ বিষয়-আশয়কেও। এককথায়, ভূমিকম্পটি আমার চারপাশের জগতের আচমকা রূপান্তরের মাধ্যমে আমাকে একেবারেই বিস্মিত করে ফেলেছিল।
এদোগাওয়া নদীর অপর পাড়ের যে সড়কটি দিয়ে স্ট্রিটকার চলত, ফাটল ধরে সেটির অবস্থা হয়ে পড়েছিল খুবই বাজে। এমনকি নদীটিও তলানি থেকে ভীষণ ফুলে-ফেঁপে ওঠায় তার বুকে দেখা মিলেছিল কাদাময় নতুন চরের। কাছাকাছি অঞ্চলে ভেঙে পড়া কোনো বাড়ি যদিও আমার চোখে পড়েনি, তবে সবগুলো ছড়িয়ে ছিল এখানে-ওখানে। এদোগাওয়া নদীকূলের পুরো অঞ্চলটি একটি নাচুনে ও ঘূর্ণি ধুলোয় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল; ফলে ধূলি-ধূসরতায় সূর্যের আলো হয়ে পড়েছিল গোধূলিলগ্নের পাণ্ডুবর্ণের। এই দৃশ্যে আমার ডানে-বামে যাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন, সবাইকে লাগছিল নারকীয়, এ জগৎ থেকে পলায়নপর যেন। পুরো ল্যান্ডস্কেপ ধারণ করেছিল এক অনাসৃষ্টি ও ভুতুড়ে চেহারা। নদীতীরের একটি কচি চেরিগাছ আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। আর এ দৃশ্যটি দেখে শিউরে উঠতে উঠতে ভাবছিলাম, ‘নিশ্চয়ই এটাই রোজ-কেয়ামত।’
সেভাবে দেখলে, সেদিনটির কথা আমার তেমন বেশি মনে নেই। তবে এ কথা আমার ঠিকই মনে আছে, পুরো ভূখণ্ড দুলছিল, অবিরাম দুলছিল। আরো মনে আছে, পরমুহূর্তেই পুবের আকাশে একটি মহাতরঙ্গায়িত মাশরুম-আকৃতির মেঘ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল, আর টোকিওর কেন্দ্রস্থলের অগ্নিশিখার ধোঁয়ায় তা ধীরে ধীরে অতিকায় হয়ে উঠে, ছড়িয়ে পড়ে দখল করে নিয়েছিল আকাশের অর্ধেকটা।
সে রাতে ইয়ামা-নো-তে পার্বত্যাঞ্চল—যেখানে আমরা ছিলাম, এবং যে অঞ্চলটি আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছিল—সে অঞ্চলটিও টোকিওর বাদবাকি এলাকার মতো ছিল বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। কোনো বাতি জ্বলেনি ঠিকই, তবে শহরতলির নিম্নাঞ্চলে জ্বলতে থাকা আগুনের শিখা এই পার্বত্যাঞ্চলের পুরো এলাকা এক অপ্রত্যাশিত আলোয় একাকার করে দিয়েছিল। সে রাতে প্রত্যেক গৃহস্থের কাছে মোমবাতি থাকলেও, আঁধার কাটাতে সেগুলো কেউই ব্যবহার করেনি। তবে সবাইকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছিল অস্ত্রাগারটির শব্দ।
অস্ত্রাগারটির চারপাশ, যেমনটাই আগেই বলেছি, লালরঙা ইটের দীর্ঘ এক দেয়ালে ছিল ঘেরা—যার ভেতরে ছিল লালরঙা ইটের বিশাল বিশাল দালানের মধ্যে AKIRA KUROSAWA'S DREAMSকারখানাগুলো দাঁড়িয়ে। এই দেয়ালগুলো শহরতলি থেকে ধেয়ে আসা আগুন রুখে দেওয়ার পথে এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এবং পুরো ইয়ামা-নো-তে অঞ্চলকে দিয়েছিল বাঁচিয়ে। বাঁচিয়ে দিয়েছিল অস্ত্রাগারের হাত থেকেও; কেননা, বিস্ফোরকের এক সংগ্রহশালা ছিল এটি; ফলে এখানে আগুনের ছোঁয়া পৌঁছুলে, কান্দা থেকে সুইদোবাশি পর্যন্ত—বিস্তৃত এলাকা বিস্ফোরিত হয়ে যেত। ক্ষণে ক্ষণে মনে হয়েছে, কোনো ধরনের কার্তুজ যেন জ্বলে উঠেছে; অস্ত্রাগারটি থেকে আগুনের রেখা ফুটে উঠে, এক আতঙ্কজনক গর্জন ভেসে বেড়াচ্ছিল। এই শব্দটিই সব মানুষকে করে ফেলছিল বিচলিত।
আমার প্রতিবেশীদের মধ্যে আসলে এমন একজন ছিলেন, যিনি সত্যিকার অর্থেই আস্থার সঙ্গে বর্ণনা করছিলেন, বিস্ফোরণের এই শব্দটি আসলে টোকিওর একশো মাইল দক্ষিণের, ইজু পেনিনসুলা উপদ্বীপটি থেকেই ভেসে আসছে। তিনি বলেছিলেন, সেখানে একের পর এক অগ্ন্যুৎপাত ঘটছে—যা কিনা উত্তরে, আমাদের দিকে আসছে ধেয়ে। লোকটি বলতে থাকলেন, ‘এটি যদি আমাদের কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে ভয়ানক কাণ্ড ঘটে যাবে। আমি এখনো সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছি; এক্ষণই যা কিছু সঙ্গী করে এ এলাকা থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে।’ তারপর তিনি এখানেই কোথাও খুঁজে পাওয়া একটি দুধবাহী ঠেলাগাড়ি বেশ গর্বের সঙ্গে সবাইকে দেখালেন।
এই পুঁচকে গল্পটি বেশ প্রাণবন্ত ছিল, এবং এটি শুনে সত্যিকার অর্থে কেউই মনে কষ্ট পায়নি। মনুষ্য স্বভাবের মধ্যে, আতঙ্ক থেকে মানুষের বেরিয়ে আসার বিষয়টিই আসলে আতঙ্কজনক ব্যাপার। শহরতলির আগুনের তেজ যখন কমে এলো, সবাই তখন নিজেদের বাড়িতে থাকা মোমগুলো জ্বালিয়ে নিলেন এবং পৃথিবী তখন রাতের অন্ধকারের প্রকৃত রূপের দেখা পেল। এই অন্ধকার সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, এবং সবচেয়ে অবিশ্বাস্য রকমের উন্মত্ততা ও অনাচারের ভেতর ঠেলে দেবে জীবনকে—এমন আতঙ্কে ভুগতে থাকলেন অনেকেই। এমন অন্ধকারের মুখোমুখি এর আগে কোনোদিন না হওয়া এই মানুষগুলোর মনে যে পরিমাণ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তা কল্পনা করাও অসম্ভব ব্যাপার; এ এমনই এক আতঙ্ক—যা সব যুক্তি ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। কোনো মানুষ যখন তার ডানে-বামে আর কোনোকিছুই দেখতে না পায়, সে তখন একেবারেই মনোবলহীন ও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ওঠে। ঠিক যেন মুরুব্বিরা যেমনটা বলে থাকেন, ‘আতঙ্কগ্রস্ত মানুষমাত্রই অন্ধকারের দানবদের সমতুল্য।’
মহাপ্রলয়ংকরী কান্তো ভূমিকম্পের উৎপত্তি ঘটেছিল যে অঞ্চলের পাদদেশে, টোকিওর সেই কোরিয়ান আবাসিক এলাকাটির গণমৃত্যু—মানুষের চোখে-মুখে এমন অন্ধকারভীতির জন্ম দিয়েছিল। আমি নিজের চোখে তরুণ এক গুণ্ডাকে দেখেছি, বিকৃত চোখ-মুখ করে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে চিৎকার করে দ্রুতবেগে ছুটে যেতে—‘এ পথে!’ ‘না, অই পথে!’ তারা একজন দাঁড়িঅলা লোককে তাড়া করছিল; নিশ্চয়ই জাপানে তখন দাঁড়িঅলা মানুষের সংখ্যা খুব একটা ছিল না।
আগুনের গ্রাসে সর্বস্ব খোয়ানো আত্মীয়দের দেখতে, উয়েনো অঞ্চলে গিয়েছিলাম আমরা। আমার বাবার মুখে দাঁড়ি ছিল—শুধু এ কারণেই একদল গুণ্ডা তাকে ঘিরে রেখেছিল নিজেদের ক্লাবে। বাবার সঙ্গে ভাইয়াও ছিলেন, তার দিকে তাকাতেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠল আমার। ব্যঙ্গাত্মক এক মুচকি হাসি দিয়েছিলেন ভাইয়া। বাবা যখনই রেগে গর্জে ওঠলেন, ‘গর্দভের দল!’, তক্ষুণি লোকগুলো চুপিসারে সটকে গেল।
রাতের বেলা এলাকায় পাহারা দেওয়ার জন্য আমাদের প্রতিবেশীদের প্রত্যেকের বাড়ি থেকে একজনকে করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ভাইয়ার যেহেতু এই বুদ্ধিটি একেবারেই পছন্দ হয়নি, ফলে তাকে সে দায়িত্ব দেননি কেউই। বিকল্প কোনো সমাধান না থাকায়, আমিই বরং দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম নিজের কাঠের তলোয়ারটি সঙ্গে নিয়ে, এবং পানি নিষ্কাশনের এমন একটি পাইপের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম, যেটির ভেতর দিয়ে কোনো বিড়ালের পক্ষেও হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢোকা সম্ভব নয়। তারা আমাকে এখানে দাঁড় করানোর কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘কোরিয়ানরা নিশ্চয়ই এখান দিয়ে ছিঁচকে চোরের মতো ঢোকার চেষ্টা করবে।’
তবে আরো হাস্যকর একটি ঘটনাও ঘটেছিল তখন। তারা আমাদের বলে দিয়েছিলেন, আমাদের বাড়ির কাছের নির্দিষ্ট একটি কূপ থেকে যেন পানি না খাই। এর কারণ, সেই কূপটির দেয়ালে সাদা চক দিয়ে আজব ধরনের কথা লেখা ছিল। তাদের ধারণা, এ কথাগুলো নিশ্চয়ই কোনো কোরিয়ান কোড—যার মাধ্যমে এই কূপের পানিতে বিষ মেশানোর ইঙ্গিত লেখা আছে। এ কথা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। সত্য হলো এই যে, এই আজব ধরনের কথাগুলো ছিল আসলে আমারই নিজের লেখা হিজিবিজি। বড়দের এমনতর আচরণ দেখে, তখন কিছুই বলতে পারিনি আমি; অবাক হয়ে ভেবেছি, কী করে এমন হয় মানুষ!
এই প্রলয়কাণ্ড যখন প্রশমিত হয়ে এলো, ভাইয়া ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, ‘আকিরা, চলো ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাই।’ স্কুলের পিকনিকের মতো এক ধরনের স্ফূর্তিবাজ মনোভাব নিয়ে, ভাইয়ার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম আমি। যতক্ষণে বুঝে উঠতে পারলাম, এই ভ্রমণ কতটা ভয়ানক হবে, এবং তা আমাকে কতটা নাড়া দেবে—ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমার অস্বস্তিকে পাত্তা না দিয়ে, ভাইয়া আমাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলেন। অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বিস্তৃত এক এলাকায় সারাটা দিন তার সঙ্গে কাটাতে হলো আমাকে এবং আতঙ্কে আমি যখন কেঁপে-কেঁপে উঠছিলাম, তখন তিনি আমাকে দেখালেন থরেথরে পড়ে থাকা অগুনতি লাশ।

Akira-Kurosawa-smiling

প্রথমে আমাদের চোখে কেবল খানিকটা পুড়ে যাওয়া একটি মৃতদেহ ভেসে উঠল, কিন্তু যতই কাছে যেতে থাকলাম সেই শহরতলি অঞ্চলটির, হাজারও মৃতদেহের পেলাম দেখা। কিন্তু ভাইয়া আমাকে হাত ধরে, এগিয়ে নিতে থাকলেন লক্ষ্যবস্তুর দিকে। পুড়ে যাওয়া ল্যান্ডস্কেপটি আমাদের চোখের সামনে এক ধরনের বাদামি লালরং নিয়ে ধরা দিল।
এই অগ্নিদাহে কাঠের তৈরি সবকিছুই পরিণত হয়েছিল ছাই-ভস্মে; এখন সেগুলো মৃদু-বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে কেবল। দেখে মনে হলো, এ যেন কোনো লাল মরুভূমি।
গা গুলিয়ে আসা এই বিস্তৃত লালরঙের ভেতর, সম্ভবপর সব ধরনের মৃতদেহই মিলেমিশে আছে। পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া লাশ, অর্ধদগ্ধ লাশ, নর্দমায় পড়ে থাকা লাশ, নদীতে ভেসে যাওয়া লাশ, ব্রিজের ওপর স্তূপ হয়ে থাকা লাশ, পুরো রাস্তার একটা সংযোগস্থলের পথরোধ করে দেওয়া লাশ এবং মানুষের পক্ষে যতভাবে মরা সম্ভব—তত রকমেরই ভঙ্গিমার অগুনতি লাশের দেখা পেলাম আমি। যখন আনমনে চোখ ফিরিয়ে নিতে গেলাম, ভাইয়া আমাকে তাড়া দিয়ে বললেন, ‘আকিরা, খুব খেয়াল করে দেখো এখন।’
ভাইয়ার উদ্দেশ্য কী—বুঝতে পারলাম না; এসব বীভৎস দৃশ্য দেখতে তিনি যে আমাকে বাধ্য করছেন—এ ব্যাপারটি তার ওপর আমাকে কেবলই ক্ষেপিয়ে তুলছিল। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার ছিল, লাল-স্রোতের সুমিদাগাওয়া নদীটির তীরে আমাদের দাঁড়িয়ে থেকে, স্রোতে ভেসে যাওয়া লাশের স্তূপগুলো দেখতে থাকা। যখন মনে হলো, পা কাঁপছে আমার, মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাব এক্ষুনি; ঠিক তক্ষুনি ভাইয়া আমার কলারে দিয়ে আমাকে ধরে ফেললেন এবং আবারও নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন আমাকে। আর আরো একবার বললেন, ‘খুব খেয়াল করে দেখো, আকিরা।’
দেখতে দেখতে, দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছিল আমার। চোখ বন্ধ করে রাখার চেষ্টাও করেছি; কিন্তু এই দৃশ্যগুলো আমার চোখ পেরিয়ে, মগজে গেঁথে গিয়েছিল একেবারে। এ থেকে কোনো রেহাই নেই—এমন সান্ত্বনা নিজেকে দিতে দিতে, খানিকটা স্বস্তিবোধ করলাম। কিন্তু সেখানে যে নারকীয় ছবি আমি দেখেছি, সেটি বাক্যে লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয় কোনোভাবেই। যতদূর মনে পড়ে, রক্তের যে স্রোত আমি দেখেছিলাম, আমার ধারণা, বুদ্ধধর্মমতে নরকের যে বর্ণনা—তাও বোধ করি এতটা ভয়ংকর নয়।
সুমিদাগাওয়া নদীটি লালরঙা হয়ে গিয়েছিল—এ কথা একটু আগেই লিখেছি; কিন্তু তার রং রক্ত-লাল ছিল না; বরং তা ছিল সেই ল্যান্ডস্কেপটির বাকি অংশের মতোই উজ্জ্বল বাদামি-লাল; মরা মাছের চোখের মতো সাদার সঙ্গে লালের একটা ঘোলাটে মিশ্রণ। নদীতে ভাসমান লাশগুলো হয়ে গিয়েছিল ফুলে ঢোল আর তাদের পায়ুপথগুলো ছিল বড় মাছের মুখের মতো খুলে হাঁ হয়ে। এমনকি যে শিশুগুলো ছিল নিজেদের মায়ের পিঠে বাঁধা, তাদের অবস্থাও ছিল একই রকম। আর লাশ সব সেই নদীটির স্রোতে মৃদু এক ছন্দময়তায় যাচ্ছিল ভেসে।
যতদূর চোখ যায়, কোনো জীবিত আত্মার অস্তিত্ব সেখানে দেখতে পাইনি। সেই ল্যান্ডস্কেপে জীবিত বলতে একমাত্র ছিলাম আমি ও আমার ভাইয়া। আমাদের দুজনকে আমার কাছে লাগছিল যেন এই অসীম প্রান্তরের ভেতর দুটি মটরদানার মতোই পুঁচকে। কিংবা আমরা দুজনেই যেন মৃত এবং দাঁড়িয়ে রয়েছি নরকের দরজার সামনে।
ভাইয়া এরপর আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন গার্মেন্টস অঞ্চলের ব্রড মার্কেট গ্রাউন্ডে। মহাপ্রলয়ংকরী কান্তো ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছিল এখানেই। এই ল্যান্ডস্কেপটির কোনো প্রান্তই ছিল না লাশবিহীন। কোনো কোনো জায়গায় লাশের ওপর লাশ জমে ছোট ছোট পাহাড়ের মতো হয়ে গিয়েছিল। এ রকম এক পাহাড়ের চূড়োয় পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া একটি মৃতদেহ বসে ছিল জেন মেডিটেশনের লোটাস পজিশনে। সেই লাশটিকে দেখতে একদম বুদ্ধের ভাস্কর্যের মতো লাগছিল। আমি আর ভাইয়া সেই লাশটির দিকে, একেবারেই পাথরের মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। তারপর ভাইয়া, যেন স্বগতোক্তির মতো, নরমস্বরে বললেন, ‘চমৎকার, তাই না?’ তেমনটাই মনে হয়েছিল আমারও।
সে সময়ে আমি এত বেশি লাশ দেখেছি যে মাটিতে পড়ে থাকা লাশ আর পুড়ে যাওয়া ছাদের টাইলসের টুকরো ও পাথরের মধ্যে কোনো পার্থক্য তৈরি করতে পারিনি। এ ছিল অরুচির এক উদ্ভট অনুভূতি। ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার মনে হয়, এখন আমাদের বাড়ি ফেরাই ভালো।’ আমরা আবারও সুমিদাগাওয়া নদী পেরিয়ে, উয়েনো হিরোকোজি অঞ্চলের দিকে এগিয়ে গেলাম।

Capture1

হিরোকোজি স্ট্রিটের কাছে পৌঁছাতেই আমরা পুড়ে যাওয়া এমন এক বিশাল এলাকায় দেখা পেলাম—যেখানে অসংখ্য মানুষ ছিল জড়ো হয়ে। পুরো এলাকার ধ্বংসস্তূপের ভেতর অবিশ্রান্তভাবে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিল তারা। ভাইয়া তির্যক হেসে বললেন, ‘স্বর্ণ-ভাণ্ডারের এটুকু অংশই টিকে আছে। আকিরা, স্মারক হিসেবে আমরা একটা স্বর্ণের আংটির খোঁজ করব নাকি?’
কিন্তু সেই মুহূর্তটিতে আমার চোখ একদৃষ্টিতে নিবদ্ধ ছিল উয়েনো পর্বতের সবুজ চূড়ায়। আমি স্থির হয়ে গিয়েছিলাম। কতশত বছর পর কোনো সবুজ গাছের দেখা পেলাম আমি? এমনটাই মনে হলো আমার, যেন অগুনতি দিন পেরিয়ে অবশেষে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো একটা জায়গা পাওয়া গেল। গভীর বড় করে একটা দম নিলাম আমি। আগুনের এই ধ্বংসযজ্ঞে সবুজের কোনো চিহ্নই তো খুঁজে পাইনি এতক্ষণ। সবুজ বৃক্ষের জন্য তাড়না এর আগে কখনোই এতটা অনুভব করিনি।
সেই ভয়ংকর ভ্রমণের শেষে রাতের বেলা আমরা যখন বাড়ি ফিরলাম, আমি পুরোপুরিই প্রস্তুত ছিলাম—হয় রাতে ঘুমোতে পারব না, কিংবা ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকব।কিন্তু বালিশে মাথা রাখার পরপর, কখন যে সকাল হয়ে গেল টেরই পেলাম না। বেহুঁশের মতো ঘুমিয়েছি আমি এবং কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছি কি না—মনে পড়ল না। ব্যাপারটা আমার কাছে এতই আজব লাগল যে ভাইয়ার কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাইলাম। ‘তুমি যদি আতঙ্ক-জাগানিয়া কোনো কিছু দেখে চোখ বন্ধ করো, তাহলে ঘুমের মধ্যেও আতঙ্কে ভুগবে। যদি তুমি সবকিছু সোজা চোখে দেখো, তাহলে তাতে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই।’  সেই ভ্রমণটির দিকে ফিরে তাকালে এখন আমি ঠিকই টের পাই, সেটি নিশ্চয়ই আমার ভাইয়ার কাছেও ভয়ংকরই ছিল। ভয়ের মোকাবিলা করার দুর্দান্ত এক অভিযান ছিল সেটি।
About

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com