Smiley face

ডিসটোপিয়ান মহাকাব্য

Roy-Batty
জাহিদ হোসেন নিয়ে যাচ্ছেন ব্লেড রানারের মহাকাব্যিক জগতে।
“All those moments will be lost in time… like tears in rain… Time to die.”
বৃষ্টি পড়ছে।
রেপ্লিক্যান্টদের নেতা রয় ব্যাটি তার চার বছরের ছোট্ট জীবনের শেষপ্রান্তে উপনীত। ফ্ল্যাশব্যাকে কী তার পুরো জীবনের কথা মনে পড়ছে? বুক ঠেলে কী বেরিয়ে আসতে চাইছে নিরর্থক এ জীবনের প্রতি খেদ ও আক্ষেপ? জীবনের ছোটবড় মুহূর্তগুলো কী আসলেই কালের অতল গহ্বরে বিলীন হয়ে যায় না, যেভাবে বৃষ্টিতে মুছে যায় অশ্রুধারা?  
রিডলি স্কট যখন ব্লেড রানার বানাবার পরিকল্পনা করছেন ততদিনে তিনি দুদু’টো ফিল্ম বানিয়ে হাত পাকিয়ে ফেলেছেন। তার দ্বিতীয় ছবি সাই-ফাই হরর এলিয়েন তো শুধু ব্যবসাই করেনি, হররের খোলনলচে পাল্টে ফেলেছিল। পাল্টে দিয়েছিল সাই-ফাই ফিল্মের সংজ্ঞাও। এলিয়েন-এর আসন আজ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফিল্মদের কাতারে। এই ফিল্মের মাধ্যমে স্কট পায়ের নিচে শক্ত জমিন খুঁজে পেয়েছিলেন।
এলিয়েন মুক্তি পায় ১৯৭৯ সালে। মাঝে তিন বছরের বিরতি। স্কট সিদ্ধান্ত নেন ফিলিপ কে. ডিকের উপন্যাস ‘ডু অ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অভ ইলেকট্রিক শিপ?’ অবলম্বনে একটা ফিল্ম বানাবেন। তিনি ডু অ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অভ ইলেকট্রিক শিপকে কেঁটেছেঁটে বানিয়ে দেন ব্লেড রানারে। এর প্রধান চরিত্রে নেন স্টার ওয়ারস ও ইন্ডিয়ানা জোনস করে প্রভূত নাম, যশ ও খ্যাতি কুড়ানো হ্যারিসন ফোর্ডকে, আরও নেন ফ্যাকাশে চুলো ডাচ রুটগার হাওয়ারকে। তারপর বাকিটা ইতি…নাহ্, ব্লেড রানারের ইতিহাস হতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল।
ব্লেড রানার ১৯৮২ সালের ২৫ জুন মুক্তি পায়। প্রযোজক অ্যালান লাডের ধারণা ছিল ২৫ সংখ্যাটি তার জন্য লাকি। তার আগের ব্যবসাসফল ছবি স্টার ওয়ারস, এলিয়েন ২৫ তারিখে মুক্তি পায় এবং ইতিহাস গড়ে।
কিন্তু বিধি বাম! ব্লেড রানার তার জন্য লাকি ছিল না। ব্লেড রানার বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ক্রিটিকরাও এর প্রতি ছিলেন নির্দয়। লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসের শিলা বেনসন ধীর গতির ব্লেড রানারকে উপহাস করে উপাধি দেন ‘ব্লেড ক্রলার’। আরেক সমালোচক প্যাট বার্মান তো আরো নিষ্ঠুর। তার মতে ব্লেড রানার সায়েন্স ফিকশন পর্নোগ্রাফি ছাড়া আর কিছু না!
কিন্তু কিছু কিছু ফিল্ম সময়ের চেয়ে এতো এগিয়ে থাকে যে সঠিক মূল্যায়ন না পাওয়া এর ললাট লিখন হয়ে পড়ে। মুক্তি পাওয়ার পর আরেক কালজয়ী ছবি ‘২০০১: এ স্পেস ওডিসিও খুব বেশি সুনাম কুড়োতে পারেনি। মাস্টারপিসের তকমা লাগতে এর আরো সময় লেগেছিল। ব্লেড রানারের ক্ষেত্রে বছর দশেকের মত সময় লেগেছিল। নব্বইয়ে রিডলি স্কট ব্লেড রানারের একটা ডিরেক্টরস কাট রিলিজ দেন। এরপরই টনক নড়ে ফিল্ম বোদ্ধাদের। ব্লেড রানার পুনরুজ্জীবিত হয়। এই তো কদিন আগে ব্লেড রানারের সেকেন্ড পার্টও মুক্তি পেল। এবার ডিরেক্টরের চেয়ারে নতুন সেনসেশন ডেনিস ভিলেনিয়্যুব। চলুন এক নজরে দেখে নেই দুটা ফিল্মের হালহকিকত।
 
ব্লেড রানার (১৯৮২):

movie-blade-runner2

প্রথমেই সতর্ক করে দেই। ব্লেড রানার সহজ ফিল্ম না। ধুপধাপ অ্যাকশনে বিশ্বাসী, সুপারভিলেনের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা সুপারহিরোদের ক্যারিশমা দেখে অভ্যস্ত দর্শকদের জন্য এ ফিল্ম নয়। ব্লেড রানারে রিডলি স্কট যে ভবিষ্যতের দুনিয়া আমাদের দেখান তা বড়ই বিষণ্ণ, বিমর্ষ। এখানে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয় সারাদিন, সূর্যের দেখা মিলে না। রাস্তাঘাট নোংরা, ময়লা, ঘিঞ্জি। মানুষজন উদ্ভট পোষাক পরে থাকে। উল্লেখযোগ্য সিজিআই নেই। যে ভবিষ্যতের আবহ ডিরেক্টর স্কট পুরো ফিল্ম জুড়ে তৈরি করেন তা ভীতিকর, মোটেও আশাজাগানিয়া কিছু না।

 

বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে টাইরেল কর্পোরেশন রেপ্লিক্যান্ট নামে এক কৃত্রিম মানব সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছে। তারা দেখতে মানুষদের মতো, কাজকর্মও মানুষদের মতো। কিন্তু আসলে মানুষ না। রেপ্লিক্যান্ট হলো আধুনিক ক্রীতদাস। তাদের বানানোর উদ্দেশ্য ইউনিভার্সের অন্যান্য কলোনীতে দাস হিসেবে ব্যবহার করা। কিন্তু গোল বাঁধে তখন যখন রয় ব্যাটির (রুটগার হাওয়ার) নেতৃত্বে একটা দল পালিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে। তখনই দৃশ্যপটে আগমন ঘটে ফিল্মের প্রধান চরিত্র রিক ডেকার্ডের (হ্যারিসন ফোর্ড)। ডেকার্ড পেশায় পুলিশ অফিসার। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও টাইরেল কর্পোরেশনের প্রস্তাবে রাজি হয়। তার কাজ হবে পলাতক ঐ রেপ্লিক্যান্টদের খুঁজে বের করে নিষ্ক্রিয় (পড়ুন হত্যা) করা। নির্দেশমতো কাজে নেমে যায় ডেকার্ড, লস অ্যাঞ্জেলসের বিষণ্ণ রাস্তার অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায় সে। দেখা হয় র‌্যাচেল নামের এক রেপ্লিক্যান্টের সঙ্গে যার দৃঢ় বিশ্বাস সে আসলে রক্তমাংসের মানুষ।
ডেকার্ড কী সব রেপ্লিক্যান্টদের নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়? নাকি নিজের অস্তিত্ব নাড়িয়ে দেয়া কোন অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হয়ে পড়ে সে? দর্শকরাও কী ফিল্মটি দেখতে দেখতে অপ্রিয় এক সত্যের মুখোমুখি হয়ে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন না?
আগেই বলেছি, ব্লেড রানার সহজ ফিল্ম না। এটি একসঙ্গে অনেক কিছুর সমন্বয়। এর প্রভাব বিভিন্ন লেভেলে। ফিল্ম নয়্যারের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য এর মাঝে বিদ্যমান। এর সিনেমাটোগ্রাফিকে তুলনা করা যেতে পারে কোন মাস্টার পেইন্টারের অয়েল পেইন্টিংয়ের সঙ্গে। আর ভ্যানজেলিসের করা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর? অসাধারণ বললেও কম বলা হয়।
কাহিনীতে ধর্মীয় বিভিন্ন রেফারেন্স খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। টাইরেল কর্পোরেশনের সঙ্গে রেপ্লিক্যান্টদের বিদ্রোহ কী ঈশ্বরের সঙ্গে ডেভিলের বিদ্রোহকে মনে করিয়ে দেয় না?
আর ফিল্মের অন্তে রয় ব্যাটির করা সেই টিয়ারস ইন রেইনমনোলোগ কী মনে করিয়ে দেয় না নীৎসের ফিলোসফি-যে জীবন নিরর্থক, এর কোন মানে নেই?  
ব্লেড রানার ২০৪৯ (২০১৭):

budapest-meets-blade-runner

ব্লেড রানার ২০৪৯-এর কাহিনী শুরু হয় প্রথমটির ত্রিশ বছর পর। ছবিতে দেখানো হয়, কে (রায়ান গসলিং) একজন এলএপিডি এজেন্ট ও রেপ্লিক্যান্ট। সে তার গার্লফ্রেন্ড জোয়ির সঙ্গে থাকে। জোয়ি আবার রক্তমাংসের কোন মানুষ না, কিংবা রেপ্লিক্যান্টও না। সে ওয়ালেস কর্পোরেশনের দ্বারা নির্মিত এক হলোগ্রাফিক ইমেজ।
কের কাজ অনেকটা ডেকার্ডের মতই। দুর্বৃত্ত রেপ্লিক্যান্টদের খুঁজে বের করে নিষ্ক্রিয় করা, সিনেমাতে এটাকে বলা হয় রিটায়ার করা।
ব্লেড রানার ২০৪৯ শুরুই হয় এরকমই এক রিটায়ার করানোর মধ্য দিয়ে। রেপ্লিক্যান্ট স্যাপার মর্টনকে (ডেভ বাতিস্তা) রিটায়ার করার পর, মর্টনের বাড়িতে একটা বক্স খুঁজে পায় কে। বক্সে কারো দেহাবশেষ। ডিএনএ আর্কাইভ ঘাঁটলে তার পরিচয় বেরিয়ে আসে। র‌্যাচেল। ডেকার্ডের প্রেমিকা।
র‌্যাচেলের পরিচয় বেরিয়ে আসতেই অনুমিতভাবে ডেকার্ডের পরিচয়ও বেরিয়ে আসে। কে আরো জানতে পারে র‌্যাচেল ও ডেকার্ডের এক সন্তানও আছে, যা আরেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
রেপ্লিক্যান্টরা কী তবে মানুষের মতো প্রজনন করতে পারে?
দৃশ্যপটে যোগ হয় আরো কিছু চরিত্র। ওয়ালেস কর্পোরেশনের কর্ণধার নিয়ান্ডার ওয়ালেস (জেরার্ড লেটো) এরকমই একজন। টাইরেল কর্পোরেশন কিভাবে প্রজননক্ষম রেপ্লিক্যান্টদের সৃষ্টি করতে সক্ষম হলো, সেটা বের করতে যে বদ্ধপরিকর। তথ্যটা জানার জন্য সে লেলিয়ে দেয় তার একান্ত অনুগত লাভকে (স্যালি হোয়েকস)।
ব্লেড রানার ২০৪৯ যেহেতু সিক্যুয়েল তাই প্রত্যাশিতভাবেই তুলনার ব্যাপারটা এসে যাবে। মাস্টারপিসের সিক্যুয়েল সাধারণত বেশ সাদামাটা হয়। ম্যাট্রিক্সের সিক্যুয়েলের কথাই ধরুন। প্রথমটার ধারে কাছেও যা যেতে পারে নি। এর বিপরীত যে হয়না তা না। দ্য গডফাদার ২ এর উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।       একিভাবে ব্লেড রানার ২০৪৯-এর স্থান হবে গডফাদার-২ এর ক্যাটাগরিতে, যে সিক্যুয়েলও মাস্টারপিস হতে পারে।
ডেনিস ভিলেনিয়্যুবের অসাধারণ ডিরেকশন, রজার ডিকিন্সের কাব্যিক সিনেমাটোগ্রাফি, হ্যাম্পটন ফ্যাঞ্চারের অনন্য কাহিনী ও হ্যান্স জিমারের হন্টিং ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ফিল্মটাকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেছে। সর্বোপরি ফিল্মে সবার অভিনয়ও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে, কে চরিত্রে রায়ান গসলিংয়ের চোখ ধাঁধানো অভিনয় অনেক দিন সবার মনে থাকবে।
১৯৮২ এর ব্লেড রানার কিংবা ২০১৭ এর ব্লেড রানার-২০৪৯ দু’টোর কোনটাই সহজ ফিল্ম নয়। আসলে মাঝে মাঝে এমন কিছু ফিল্ম আসে যা জীবন সম্পর্কে সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে দিতে সাহায্য করে। ব্লেড রানার এরকমই একটা ফিল্ম। এ ফিল্ম দেখে যখন দর্শক থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসবে তখন সে ভিন্ন এক মানুষ, জীবন সম্পর্কে পুরাতন দৃষ্টিভঙ্গি ততক্ষণে একদম পাল্টে গেছে। আর মহৎ সৃষ্টিকর্মের তো এখানেই সার্থকতা। এটা আপনাকে বদলে দেয়।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com