Smiley face

ভালোবাসার নাম ক্যাসাব্লাঙ্কা

Casablanca
রোমান্টিক চলচ্চিত্র হিসেব স্বীকৃতি পেলেও ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ জনরা ভেঙ্গে গুনে-মানে কালোত্তীর্ন এক সৃষ্টি। এ বছর পঁচাত্তরে ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’। কিন্তু আজও এর আবেদন প্রশ্নাতীত। একটি অমর প্রেমের গল্পে বলে যাওয়া ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ দর্শকদের কাছেও যুগ যুগ ধরে ভালোবাসার নাম। হীরক জয়ন্তীতে সেই ভালোবাসার কথাই ব্যক্ত করছেন আরাফাত নোমান
১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ধামাঢোলের অস্থির এক সময়ে প্রেমে পড়ে দুই ভুবনের দুই মানব মানবী। এই প্রেমটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই ব্যাখ্যাতীত। প্রেমের শুরুটাই হয়েছিল অতীত নিয়ে কোন প্রশ্ন করা যাবেনা এই চুক্তিতে। ইউরোপের প্রায় সব দেশেই তখন জার্মান সৈন্যরা আস্তানা গেড়েছে। তেমনই এক ক্রান্তিকালে প্রেমের শহর প্যারিসের কোন এক কক্ষে সেই প্রেমিকাটি আবেগে মথিত হয়ে প্রেমিককে জিজ্ঞেস করে বসে “Was that cannon fire or is it my heart pounding?” সেই হৃদয় অপূর্ণ রয়ে যায় বিরহের বিচ্ছেদে। প্রেমিকটি অপেক্ষা করে যায় ট্রেন স্টেশনে। ঝুম বৃষ্টিতে ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে হাতে পায় একটি চিরকুট। সেই দৃশ্য যে দেখেনি সে উপলব্ধি করতে পারবেনা কখনোই। বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে চিরকুটে লেখার কালি গুলো যখন ধুয়ে যায় তখন ক্যামেরার জুম-ইন মনে করিয়ে দেয় বিরহেরও একটা সৌন্দর্য রয়েছে; সেই সৌন্দর্যকে লক্ষগুণ বাড়িয়ে দেয় প্রেমিকের স্বগতোক্তিঃ “Of all the gin joints, in all the towns, in all the world, she walks into mine…” ।
প্রায় এক বছর পর সেই প্রেমিক যুগলের আবার দেখা হয় মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা নামক যুদ্ধ-নিরপেক্ষ একটি শহরে। এবার সেই মেয়েটি সঙ্গে করে নিয়ে আসে তারই স্বামীকে। যে প্রাক্তন প্রেমিকটি স্মৃতির রূঢ়তা ভুলতে কঠোর চারিত্রিক আবরণ নৈশের নেশা দিয়ে ভুলে থাকে, সেই প্রেমিকটি তার লাস্যময়ী প্রেমিকাকে দেখার পর চুরচুর করে ভেঙ্গে যায়। কিন্তু তার কিছুই করার নেই। সেই মেয়েটি এখন অন্যের স্ত্রী। সেই মেয়েটির স্বামীও এক তরুণ বিপ্লবী যার দরকার সাহায্য। যেই সাহায্যের মাধ্যমে সে তার স্ত্রীকে নিয়ে আটকে পড়া মরক্কো থেকে পাড়ি দিতে পারবে আমেরিকাতে। ঘটনাক্রমে তাদের সাহয্য করার একমাত্র উপায় হিসেবে থাকে সেই এক বছর আগের ভগ্ন হৃদয়ের প্রেমিকটি। কাহিনী এগিয়ে যায় এক সুনিপুণ ভাবে সাজানো টানাপোড়েনে।
বলছিলাম মাইকেল কার্টিজ (Michael Curtiz) এর অনবদ্য পরিচালনার ফসল ক্যাসাব্লাঙ্কা (Casablanca) এর কথা! অনেক চলচ্চিত্র বোদ্ধাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক সিনেমা হিসেবে অবহিত করে থাকে ক্যাসাব্লাঙ্কাকে । জনরা হিসেবে এটাকে ওয়ার নয়্যারে ফেলা যায়। যুদ্ধ-বিগ্রহের সাদাকালো জঞ্জালে ত্রিভুজ প্রেমের এ যেন এক ভালবাসা নিংড়ে দেওয়া দৃশ্যপট।
সিনেমাটি একজন দর্শক কেন দেখবেন?? সিনেমাটি দেখবেন ইংগ্রিড বার্গম্যান এর জন্য, আবারো বলছি দেখবেন ইনগ্রিড বার্গম্যান এর জন্য। এই ক্রন্দসী যখন প্রচণ্ড আবেগতাড়িত হয়ে তার প্রেমিকটিকে বলবে “Kiss me. Kiss me as if it were the last time” তখন আপনার হৃদয়ের কোথাও একটা চিনচিনে ব্যাথা অনুভূত হতে বাধ্য!
ষাটের দশকের শেষের দিকে ক্যামব্রিজের ব্রেটেল থিয়েটারে প্রতি সেমিস্টারের ফাইনাল সপ্তাহে অন্তত একবার এই সিনেমাটি দেখানো হত। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই সিনেমার চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে কালোত্তীর্ণ সেই উক্তিগুলো আবৃত্তি করতো নিজেদের মত করে। তারা সুর করে ফ্রান্সের জাতীয় সঙ্গীত “মার্সেই” গাইতো যেন তারা সিনেমার রিকেরই অনুসারী। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে সিনেমাটির প্রথম প্রিমিয়ার হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝেই। প্রায় এক দশক পরে সিনেমাটি নতুন করে এক দর্শক পায় যারা কিনা ভুলতে বসেছিলো যুদ্ধের ঢামাডোলের স্মৃতি কিংবা যুদ্ধের সময়েও যে প্রেম সম্ভব এই ধারণাটি। বর্তমানের এমন একটি যুগে যেখানে বিবাহ বিচ্ছেদ একটা ডালভাত ব্যাপার আর প্রেমে বিচ্ছেদ হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো আড্ডার আলোচনা, সেখানে Casablanca সিনেমার নায়ক নায়িকার সম্মতিপূর্ণ বিচ্ছেদ আজও দর্শকদের কাঁদায়। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ যদি অপূর্ণ প্রেমের ব্যাথাতুর আলেখ্য হয়ে থাকে তাহলে বলা চলে হাম্পফ্রে বোগার্ট আর ইংগ্রিড বার্গম্যানের এই প্রেম উপাখ্যানও কোন অংশেই কম নয়।

 

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com