devi-by-satyajit-roy-aaj-bi
প্রখ্যাত লেখক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রচিত গল্প ‘দেবী’ অবলম্বনে একই নামে নন্দিত নির্মাতা সত্যজিৎ রায় ১৯৬০ সালে নির্মাণ করেন ছবিটি । এই ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এ সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাংলা ছায়াছবির জন্য রাষ্ট্রপতি রৌপ্য পদক পেয়েছে ১৯৬০ সালে এবং ১৯৬২ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব এ সর্বোচ্চ পদকপাম দি’অর এর জন্য মনোনিত হয়েছিল। জীবনবিমুখ ভক্তি তত্ত্বের দ্বারা আচ্ছন্ন মন যে কী নিদারুণ ট্রাজেডির কারণ হতে পারে সেই কথাটাই মূলত এই কাহিনীচিত্রে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশ্লেষণ করেছে সাকিব মাহমুদ
উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে বাংলার এক গ্রামের জমিদার পরিবারের গৃহবধূ দয়াময়ী। বিয়ের পরস্বামী উমাপ্রসাদের সংসারেই তার বসবাস । তাদের পরিবারে রয়েছে উমাপ্রসাদের বাবা কালীকিঙ্কর, বড় ভাই তারাপ্রসাদ ও তার স্ত্রী হরসুন্দরী আর তাদের ছেলে খোকা। কালীকিঙ্কর গ্রামের জমিদার এবং বংশের কর্তা । তিনিকালী দেবীর বিশেষ ভক্ত, ধর্মকর্ম করেই মূলত দিন পার করেন তিনি। পুত্রবধূ দয়াময়ীকে বেশ স্নেহও করেন তিনি। উমাপ্রসাদ ইংরেজি পড়তে কলকাতা গেলে শ্বশুর কালীকিঙ্করকে দেখভাল করার দায়িত্ব পড়ে কিশোরী বধূ দয়াময়ীর উপরে।
এক রাতে কালীকিঙ্কর স্বপ্নে দেখেন দয়াময়ীকে দেবী কালীর রূপে। এই স্বপ্নকে ঐশ্বরিক ইঙ্গিত ভেবে তিনি দয়াময়ীকে দেবী হিসেবে পূজা শুরু করেন। হতবিহ্বল দয়াময়ীর মাধ্যমে এক মৃত্যুপথযাত্রী বালক কাকতালীয়ভাবে সুস্থ হয়ে উঠলে সবাই তার দেবীত্বের ক্ষমতা স্বীকার করতে শুরু করে। এক সময় দয়াময়ী নিজেও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে নিজ ক্ষমতা নিয়ে। ফলশ্রুতিতে উমাপ্রসাদ তাকে নিয়ে যেতে চাইলেও সে যেতে রাজি হয়না। অবশেষে এই অন্ধ বিশ্বাসের উপর আঘাত আসে যখন সে তার আদরের খোকাকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়। যার পরিণতিতে জনমুখে দেবী হয়ে ওঠা দয়াময়ী পাগলপ্রায় হয়ে বিলীন হয়ে যায় অজানা ধূসর প্রান্তরে।
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ‘দেবী’ গল্পটি রচনা করেন আনুমানিক ১৯০০ সালের দিকে এবং দেবী গল্পের শুরুতেই তিনি উল্লেখ করেন, “সে আজ কিঞ্চিদধিক একশত বছরের কথা।” অর্থাৎ গল্পের পটভূমি ১৭৯০ থেকে ১৮০০ এর সময়কার । যার ফলে দেবী গল্পটিতে উমাপ্রসাদ চরিত্রটিকে দেখা যায় ফারসি ভাষা শিখতে, ইংরেজি তখনো এতোটা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেনি বলে । অথচ সত্যজিতের দেবী সিনেমাটির উমাপ্রসাদকে দেখা যায় ইংরেজি শিখতে এবং বন্ধুর সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে । তাছাড়া রাজা রামমোহন রায় বিষয়ক কথোপকথন এবং বিধবা বিবাহ নিয়ে কথাবার্তার মাধ্যমে সত্যজিত প্রতিষ্ঠা করেন যে তাঁর চলচ্চিত্রে সময়কাল সুনির্দিষ্টভাবেই ভিন্ন এবং সেটি ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কাল নিয়েই আবর্তিত ।
অতএব চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপট ধারণা করা যায় ১৮৬০ সালে বাংলাদেশের চাঁদপুরের একটি জমিদার পরিবারকে ঘিরে । এই সময়কালটি তখন যখন কিনা ব্রিটিশ শাসন চলছিল ভারতীয় উপমহাদেশে। সে সময় একদিকে ইংরেজ বিরোধী চেতনাও ছিল অপরদিকে ইংরেজী শিক্ষা সংস্কৃতি গ্রহণের উদ্যোগও ছিল লক্ষনীয়। এখানে ইংরেজদের ক্ষমতার ব্যবহারটির পরোক্ষ উপস্থাপন ছিল শ্বশুর কালীকিঙ্করের অচল পায়ে দয়াময়ীর মালিশ করা এবং কালীকিঙ্করের ভাবনায় দেবীর মত ক্ষমতাবান হওয়ার পর দয়াময়ীর পায়ে কালীকিঙ্করের লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যর মাধ্যমে যখন যার কাছে ক্ষমতা, তারই পূজারী হওয়ার প্রবণতাটাই যেন ফুটে উঠে ।
ইংরেজ শাসনামলে বাংলার গ্রাম্য সমাজে সংস্কার কুসংস্কারের বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল সামাজিক সম্পর্কগুলি। যার ফলে আমরা দেখতে পাই বৃদ্ধ কালীকিঙ্করের স্বপ্নে দেখা পুত্রবধূর মাঝে দেবীর অধিষ্ঠান লাভের পর স্বীয় পুত্রবধূ দয়াময়ীকে কালী দেবী হিসেবে পূজা শুরু করে দেওয়া । আবার যখন নিবারনের নাতি কাকতালীয়ভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন সমগ্র গ্রামবাসীও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে দয়াময়ীকে কালী দেবী হিসেবে পূজা শুরু করে ।
এছাড়াও পুরুষতান্ত্রিক বাংলার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে এই সিনেমায় । আমরা দেখতে পাই কালীকিঙ্কর যখন দয়াময়ীর পায়ে লুটিয়ে পড়ে তখন তার বড় ছেলে সেটি নিয়ে তেমন কোনো প্রতিবাদ না করে বাবার মত করে গড় হয়ে প্রণাম শুরু করে দেয় । পরবর্তীতে মাতাল অবস্থার সংলাপে জানা যায় বাবার কথার উপরে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই তার । এছাড়া দয়াময়ীর যখন নিচতলার ঘরে থাকার বন্দোবস্ত হয় হয় তখন দয়াময়ীর প্রশ্নের উত্তরে হরসুন্দরী বলে, “ঠাকুর বলেছেন তাই ।” অর্থাৎ সেই পরিবারের কর্তাব্যক্তি কালীকিঙ্কর যা-ই বলবেন, তাই আদেশ হিসেবে মান্য করা হয় আর ঘরের বৌদেরও তা-ই মানতে বাধ্য ।

‘দেবী’তে আমরা দেখতে পাই বাবা কালীকিঙ্কর এবং ছেলে উমাপ্রসাদের চিন্তাভাবনার বৈপরীত্যও । যেখানে উমাপ্রসাদকে দেখা যায় ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ, বিধবা বিবাহে সমর্থনসহ পুরনো সংস্কারের বিরোধিতা করা, ঠিক সেখানেই কালীকিঙ্কর চরিত্রটি বিদ্বান কিন্তু ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন। তাই তো উমাপ্রসাদের উক্তিতে উঠে আসে তার বাবা বিদ্বান হলেও সেকেলে কেননা তাদের মাঝে এক যুগের তফাৎ। আবার দয়াময়ী যখন কালীকিঙ্করের সেবা করছিল তখন এক পর্যায়ে ঠাট্টাচ্ছলে উমাপ্রসাদকে ‘তোমার কেরেস্টান (খৃস্টান) স্বামী’ হিসেবে উচ্চারণ করে দয়াময়ীর কাছে । কেননা সেসময়ে ইংরেজি চর্চা প্রাচীন পন্থীদের কাছে খৃস্টান হয়ে যাওয়ারই সামিল মনে করা হত । সব মিলিয়ে বলতে হয় সেসময়টি ছিল প্রাচীন আর অধুনার এক মিলনকাল । প্রাচীন কুসংস্কারগুলোকে সরিয়ে সমাজ তখন সবে আধুনিকতার পথে ধাবিত হওয়া শুরু করছিল । সমাজের সামগ্রিক প্রাচীনতার সেই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে সেই সমাজের কুসংস্কারগুলোকে ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন পরিচালক ।

দেবী চলচ্চিত্রটির ঘটনা প্রবাহ শুরু হয় দুর্গা পূজা উদযাপনের মধ্য দিয়ে। এরপর উমাপ্রসাদের লেখাপড়া শেখার জন্য কলকাতা যাত্রা, কালীকিঙ্কর স্বপ্ন দর্শনের মাধ্যমে এর কাহিনী বিস্তার লাভ করতে থাকে। চলচ্চিত্রটিতে মূল বাঁক সৃষ্টি হয় যখন একটি শিশু বেঁচে উঠে দয়াময়ীর কাছে এবং তার হাতেই তাদের পরিবারের একমাত্র শিশু ‘খোকা’র মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই ট্র্যাজেডি পরিণাম পায়। এক দেবীর বিসর্জনে যেখানে গল্প শুরু হয় অন্য দেবীর অন্তর্ধানে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।
দেবী চলচ্চিত্রটি নিয়ে আলোচনা করতে হলে এখানে শুধুমাত্র ধর্মান্ধতা বা ধর্মের সমালোচনা উঠে আসবে না; সেই সঙ্গে একটি সমাজ, সমাজের মানুষ, তাদের ধ্যান ধারণা, তাদের সংস্কার তথা পুরো ঐতিহাসিক পটভূমি বিস্তৃত হবে। এই চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় একটি পরিবারের মাধ্যমে প্রদর্শিত সময়কালের ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যপারগুলিও তুলে ধরেছেন।
দেবী চলচ্চিত্রের দুই নারী চরিত্র হরসুন্দরী ও দয়াময়ী এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। এখানে একই বাড়িতে হরসুন্দরীর মত প্রতিবাদী নারী আবার দয়াময়ীর মত ভীরু নারী চরিত্র দেখা যায়। তৎকালীন সমাজে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া, ফলে সপ্তদশী দয়াময়ী অত অল্প বয়সে তেমন জোর রেখে কথা বলতে পারে না । শ্বশুরের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত বয়ে চলা দয়াময়ীকে তাই দোষারোপ করা যায় না । কিন্তু দয়াময়ীর চেয়ে বয়সে সামান্য বেশী হরসুন্দরী এরকম সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন তুলতে পারে । তাই সে দয়াময়ীর সঙ্গে কথোপকথনে তার আচমকা অবতার বনে যাওয়া নিয়ে বিদ্রুপ করতে পারে আবার মাতাল স্বামীর সঙ্গে তর্ক করার সময়ে শ্বশুরের কর্মকাণ্ডকে ‘ভীমরতি’ হিসেবে উচ্চারণ করে তার স্বামী কেন শ্বশুরের কথায় না মজে প্রতিবাদ করলো না সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে । কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই ছবির সময়কালে নারীর অবস্থান কতটা নিচে সেটা প্রমাণ করার জন্যে পরিচালক এক বিশেষ দৃশ্যের আশ্রয় নিয়েছেন । হরসুন্দরী তার মাতাল স্বামী তারাপ্রসাদের সঙ্গে তর্কের এক পর্যায়ে তারাপ্রসাদ বলে,”তোমার কী হিংসে হচ্ছে? এই দেখ আমিও তোমায় গড় হয়ে প্রণাম করছি ।” এই দৃশ্যটির মাধ্যমে তুলে ধরা হয় যে সেই সমাজে নারীর অবতার বনে গিয়ে শ্বশুরের কাছ থেকে প্রণাম গ্রহণ করা, স্ত্রীর মাতাল স্বামীর কাছ থেকে প্রণাম গ্রহণেরই সামিল । অর্থাৎ সুস্থ মস্তিষ্কে কোনো পুরুষ কোনো নারীকে অতটা সম্মান প্রদান করে না হিসেবেই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ।

সত্যজিত রায়ের চলচ্চিত্র পরিচালনার জাদুকরি ক্ষমতা প্রয়োগের এক অনন্য উদাহরণ ‘দেবী’ চলচ্চিত্রে দয়াময়ীকে দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠার সিকোয়েন্সটি। আমরা দেখি যে কালীকিঙ্করের স্বপ্নে দয়াময়ীর দেবী রূপ দেখার আগের দিন সকালের দৃশ্যে বাড়ির সামনে নিবারণের গান যেখানে প্রায় ৪৬ বার ‘মা’ শব্দটির ব্যবহার হয়েছে । এরপরও সামান্য টিয়া পাখির মুখ থেকেও দয়াকে ‘মা’ হিসেবে ডাকা এবং স্বপ্ন দেখে কালীকিঙ্করের দয়াময়ীর পায়ে লুটিয়ে পড়ার আগ পর্যন্তও আরো বহুবার ‘মা’ শব্দটির ব্যবহার পরিচালক করেছেন অতি সুনিপুণভাবে । চলচ্চিত্রের ‘ক্যারেক্টার ফোরগ্রাউণ্ড’ নামক থিওরিটির প্রয়োগ এতে প্রতিষ্ঠা পায় যাতে দর্শকদের মনে দেবীর আবির্ভাব বা দয়াময়ীর দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা হতে যাওয়া সম্পর্কে একই সঙ্গে ধারণা করা যায় এবং কালীকিঙ্করের ভক্তিগত মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে দর্শকরাও পরিভ্রমণ করতে পারে।
মানুষ কেন স্বপ্ন দেখে বা স্বপ্নে যা দেখে তার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল আছে কিনা সেটা নিয়ে বহু মনস্তাত্ত্বিকের নানারকম তত্ত্ব রয়েছে । আমরা যদি সিগমুন্ড ফ্রয়েডের স্বপ্ন নিয়ে ‘Wishful Desire’ তত্ত্বটির দিকে খেয়াল করি তাহলে দেখতে পাবো যে তিনি বলেছেন, “Dreams are the fulfillment of wishes, and sometimes that dreams represent the fulfillment of wishes.”
দেবী চলচ্চিত্রে কালী কিঙ্করের দয়াময়ীকে স্বপ্নে দেবী হিসেবে দেখার আগের দিনের ঘটনাবলীর দিকে যদি লক্ষ্য করি তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে, উমাপ্রসাদ দয়াময়ীকে নিয়ে শহরে যেতে চায় আবার কালীকিঙ্করের ভাষ্যে উঠে আসে দয়াময়ীকে তিনি পূত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করলে দয়া যেন তার মায়ের মত। যার ফলে তীর্থে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও দয়ার সেবা-শুশ্রুষায় তিনি ঘরেই থেকে যেতে চান।এতে করে টের পাওয়া যায় যে দয়া যদি তার স্বামীর সঙ্গে দূরে চলে যায় তাহলে কালীকিঙ্করের সেবাযত্নে ঘাটতি দেখা যাবে, যেহেতু হরসুন্দরীর সঙ্গে কালীকিঙ্করের তেমন হৃদ্যতা দেখা যায়না। আবার কালীকিঙ্কর ছিলেন কালীদেবীর বিশেষ ভক্তও, যে দেবী তার ঘরে অধিষ্ঠিত। অতএব সব মিলিয়ে যদি আমরা কালীকিঙ্করের অবচেতন মন নিয়ে আলোচনা করি তাহলে বুঝতে পারবো যে, কালীকিঙ্কর চান দয়াময়ী ঘরেই থাকুক সেটা যেভাবেই হোক। আর এই প্রবল ইচ্ছাটারই প্রতিফলন ঘটে তার দেখা স্বপ্নে যেখানে তিনি দয়াময়ীকে কালীদেবী হিসেবে আবিষ্কার করেন। ফলে দয়াময়ীকে দেবীকালী হিসেবে ঘরে অধিষ্ঠিত করে রাখা হয়। কালীকিঙ্করের স্বপ্নটিকে এভাবেই ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা যায়।
দয়াময়ী চরিত্রটিকে সিনেমা শুরু থেকেই অনেক প্রাণচঞ্চলে ভরপুর হিসেবে দেখা যায় । স্বামীর কাছে যে প্রিয়তমা, শ্বশুরের কাছে পরম স্নেহের, বৌদির আড্ডার সঙ্গী, ঠাকুর্পোর ছেলে যাকে ছাড়া খেতেই পারে না এমনকি ঘরে পোষা টিয়া পাখিটির মুখেও বারবার দয়াকে ‘মা’ বলে ডাকা । সবমিলিয়ে দয়া যেন ‘ঘরের লক্ষ্মী’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । কিন্তু তারপরই কালীকিঙ্করের স্বপ্ন অভিশাপ হয়ে আসে দয়াময়ীর জীবনে । দয়াময়ীর কাছ থেকে সবাইকে ভীতিজনক দূরত্বে সরে যেতে দেখি আমরা । এমনকি ঠাকুর্পোর ছেলে খোকা যাকে দয়া নিজের ছেলের মত করেই ভালোবাসে সেও দূরে সরে যায় । আমরা দেখি ঘরে শুয়ে দয়া যখন খোকাকে কাছে আসতে ডাকে, খোকা তখন দৌড়ে পালিয়ে যায় । এরপর নিজের বিয়ের সময়কার ফুলের মালা দেখে দয়া সেইসব সুখময় দিনগুলোর কথা কল্পনা করে, সে যে প্রচণ্ডভাবে তার স্বামীর অভাব অনুভব করছে এবং যে একমাত্র তাকে অন্য সবার মত দূরে সরিয়ে রাখবে না এরকম বিশ্বাস ছিল আর তার অভাবের অনুভূতিতে কাতর ছিল দয়া ।

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধরণের পরীক্ষামূলক গবেষণা হয়, যেখানে ১২ জনকে ব্যবহার করা হয় একটি জেলখানার কয়েদী হিসেবে এবং অন্য ১২ জনকে সেই জেলখানার নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হয় । এই সবগুলো লোকই হচ্ছে মূলত স্বেচ্ছায় গবেষণাকাজে অংশগ্রহণকারী কিছু ছাত্রের দল ।
এই অবস্থায় মাত্র ৩৬ ঘন্টা থাকার পর উভয় পক্ষীয় লোকজনই ভয়াবহ আবেগের অভিব্যক্তি দেখানো শুরু হয় । কয়েদী হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে অবস্থান করার পরও কয়েদী হিসেবে যারা বন্দী ছিল তারা নিজেদের সত্যিকারের কয়েদী ভাবতে শুরু করে আবার জেলখানার নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে যারা ছিল তারাও নিজেদের সত্যিকারের নিরাপত্তারক্ষী ভাবা শুরু করে দিয়ে কয়েদী হিসেবে যারা ছিল তাদের সঙ্গে ধ্বংসাত্মক ব্যবহার শুরু করে ।

এই ঘটনাটি দিয়ে ‘দেবী’ সিনেমায় দয়ার চরিত্রটিকে বিশ্লেষণ করা যায় । দেবীকে যখন জোর করে দেবীর অবস্থানে অধিষ্ঠিত করা হয় এবং কাকতালীয়ভাবে তার চরণামৃতের মাধ্যমে এক মৃতপ্রায় শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে সেই ঘটনায় সে নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে হয়তো সত্যিই দেবীর অবতার রূপ লাভ করেছে । যার ফলে সে তার স্বামীর সঙ্গে পালিয়ে যেতে গিয়েও পারে না । যে দ্বিধা ওর মধ্যে কাজ করে তার ফলস্বরূপ সে ফিরে আসে বাড়িতে । তার সামনে সুযোগ থাকলেও সে পালিয়ে যায় না সেই দেবীরূপের মানসিক অত্যাচার থেকে ।
উমাপ্রসাদ চরিত্রটি যে একেবারেই প্রতিবাদ করে না তা নয় । সে বাড়ি ফিরে দয়াকে দেবী হিসেবে দেখে, তার বাবার দয়াকে দেবী হিসেবে অধিষ্ঠিত করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে । কিন্তু সেই কথোপকথনের এক পর্যায়ে এসে যখন দেখে যে দয়ার চরণামৃতের কল্যাণে একটি শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন তার বিশ্বাসে সন্দেহ ধরা পড়ে । সে দ্বিধান্বিত হয়ে দূরে নদীর পাড়ে বসে থাকে এবং দয়াকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । ছবির শেষ দিকে দয়ার সঙ্গে একজন বৃদ্ধের যে কথোপকথনের দৃশ্য দেখা যায় সেখানে সেই বৃদ্ধও উমাপ্রসাদের প্রতিবাদের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন করেন ।
উমাপ্রসাদ তার কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাবার ছত্রছায়ায় বড় হয়ে পরবর্তীতে সংস্কারপন্থী চিন্তাধারা গ্রহণ করলেও তার মনের গভীরে তার বাবার চিন্তাভাবনার একটা বীজ ঠিকই থেকে যায়, যার ফলে তার প্রতিবাদ থাকলেও তাতে জোরটা তেমন ছিল না । কিন্তু শেষদিকে বৃদ্ধের সঙ্গে কথোপকথনের দৃশ্যের পর টের পাওয়া যায় যে আধুনিক চিন্তাভাবনার উমাপ্রসাদ অবশেষে তার কুসংস্কারমুক্ত চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে যায় এবং এবার যে সে ঠিকই তার বাবার কুসংস্কার ঘেরা পরিস্থিতি থেকে নিজের স্ত্রীকে উদ্ধার করবেই, সে বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় ।
দয়াময়ী হচ্ছে তার কুসংস্কারাচ্ছন্ন শ্বশুরের হাতের পুতুলের মত । শ্বশুরের ইচ্ছায় সে দেবীর অবতার হিসেবে সম্মানিত হয় আবার শ্বশুরের অন্ধ বিশ্বাসের বলি হয়ে দয়া হারায় খোকাকে আবার লোকমুখে রাক্ষুসী হিসেবেও প্রচার পায় । ছবির শেষ সিকোয়েন্সটিতে আমরা দেখি উমাপ্রসাদ যখন তার স্ত্রীর কাছে আসে, তখন সে ঘরটি আলোয় পরিপূর্ণ । এক আলোর সমুদ্রের মাঝ থেকে যেন দয়ার উদয় হয় উমাপ্রসাদের সামনে । দয়া যে আর উমাপ্রসাদের স্ত্রী রূপে নেই, তাদের মাঝে যে এখন বিশাল ব্যবধান সেটিই তখন স্পষ্ট ।
দয়া তখন দেবীর সাজ নিতে ব্যস্ত, তার মানসিক অস্থিরতার মধ্যে তখন দেবীর পূর্ণতা লাভ করেছে তথা সে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে দেবী ভাবা শুরু করেছে । তার এই মানসিক অবস্থা প্রকাশের জন্যেই তখন সে আলোর ব্যবহার ।
দয়াকে যে শেষে এসে সবার কাছে রাক্ষুসী হিসেবে উপস্থাপিত হতে হবে, এই বিষয়টি চলচ্চিত্রের শুরুর দিকেই খোকাকে গল্প শোনানোর এক পর্যায়ে টের পাওয়া যায় । খোকাকে রাক্ষুসীর গল্প শোনানোর পর খোকা দুষ্টুমি করে দয়াকে রাক্ষুসী বলে ডাকে । পরবর্তীতে সেই খোকাকেই বাঁচাতে অসমর্থ হওয়ায় দয়া সবার কাছে রাক্ষুসী বনে যায় ।
মূলত দয়া দেবী বা রাক্ষুসী কেউই নয়, সে সপ্তদশী এক সাধারণ গৃহবধূ কেবল । তাকে তার শ্বশুরের ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইচ্ছার বলি হিসেবে কখনো দেবী হিসেবে আবার শেষে রাক্ষুসী রূপে উপস্থাপিত করে শেষ পর্যন্ত তার অন্তর্ধানই হয় তার শেষ পরিণতি । সবমিলিয়ে যেন সমাজের সকল নারীরই যে দেবীর মত বিসর্জনই হয় তার শেষ পরিণতি সেটিই তুলে ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে ।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *