Smiley face

সমপ্রেম ও তৎসংলগ্ন যাপিত জীবন : মৈনাক ভৌমিকের চিত্রভাষা

maxresdefault
সুমন সাহা
ক)
সম্প্রতি, দিনক্ষণ হিসেবের আওতায় আনবার প্রয়োজন হলে, গত বছর পৌষের ঠাণ্ডা মরসুমে, ‘কালি ও কলম’এর পাতায় দেবেশ রায় সিনেমা সংক্রান্ত কিছু বক্তব্য পেশ করেছিলেন। তাতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় প্রতিভা এবং সিনেমা ও থিয়েটার এই দুই মাধ্যমের ভেতরকার আলোচনা সংক্রান্ত সৌমিত্রেরই লেখালেখি নিয়ে কচকচানির আবহ ছিল। অথচ দেবেশ রায় তো দেবেশ রায়ই। বঙ্কিম ইউরোপিয়ান ঘরানা স্ব-লেখনীতে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। ক্রমশ রবীন্দ্রনাথ হয়ে শরৎচন্দ্র, তারপর এই এখনও যে ধাঁচা মান্য করে উপন্যাস লিখিত হচ্ছে। ভারতীয় মধ্যযুগ বা তার আগে বা তার পরে প্রচলিত দেশীয় স্টাইল বর্জিত হয়েছিল বা এখনও হচ্ছে। হচ্ছে তার কারণ রচয়িতা-অভিপ্রায়ে কিছুটা, কিছুটা বাজারে টিকে থাকার লোভে। দেবেশ রায় এসব সমূলে বাতিল করে নিজস্ব নব্য এক ভাষার নির্মাণ করেছিলেন। ‘যযাতি’ ছুঁয়ে ‘মানুষ খুন করে কেন’র পথ পার করে, ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’-এ এই ভাষা আপন স্বকীয়তার জোরে একটা ঠিকঠাক বেঁচে থাকার মত জায়গা করে নিতে পেরেছে। চলতি বছরের ‘লেফটেনান্ট কর্নেল মজিদ আলির জীবনের দু-তিনটি বেজোড় আখ্যান’এও সেই ভাষা থেকে কক্ষচ্যুত হয়নি, হয়নি পুরষ্কার-পিঠ চাপড়ানো তাঁবেদারির অভিমুখী।
‘কালি ও কলম’এর ঐ লেখা থেকে জানা গেল, বাংলা ছবির জন্মলগ্নের সময়কালে প্রমথেশ বড়ুয়া সহ সমসাময়িক নির্মাতাদের একপ্রকার বিভ্রান্ত চেতনা- ছবির চলাফেরা, ফ্রেম, আলো, টেক্সট, চরিত্রদের সাহেবী ধাঁচেই তৈরি করতে হবে। ‘সিনেমাটা হতে হবে সাহেবরা যাকে সিনেমা বলেন তেমন’। বাংলা সিনেমার পাইওনিয়ররা এরকম একটা চেতনার দ্বারা গ্রস্ত ছিলেন। যার ফসল ‘দেবদাস’, ‘মুক্তি’ বা তার আগে আগের বা পরে পরের ছবিগুলো। তাদের অভীপ্সা ছিল, শিল্পচর্চা গ্রান্টেড হবে তখনই, যখন তাতে ইংরেজিয়ানার চমৎকার চটক যুক্ত হবে। ফলত ক্যামেরার কৃত্রিম চলন বা নট নড়নচড়ন, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের শারীরিক ভাষা, কৃত্রিমভাবে স্বরের উদ্দামতা, শটসমূহের বেঠিক বৈচিত্র্য ইত্যাদি প্রাক-স্বাধীনতা যুগের ছবিগুলোর গায়ে লেগে গিয়েছিল। চলতি শতকেও ছবি তৈরিতে এরকম মনোভাব ও আড়ষ্টতা দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এক্সেপ্টেড হওয়ার বাসনায় ছবির কলকব্জা গুড়িয়ে ফেলে, চটুল পদ্ধতির আমদানী। আর এখানেই, মৈনাক ভৌমিকের সপ্তম ফিচার “ফ্যামিলি অ্যালবাম” তৈরি করার পেছনে ঘাপটি মেরে থাকা মেজাজের সন্ধান পাওয়া যায়।
(খ/অ)
ক্যামেরার ছ্যাবলামো (তাও আবার প্রবলমাত্রায়। যেগুলোকে হ্যান্ডহেল্ড দাবী করলে আগুনে ঘি ঢালা হবে। চূড়ান্ত নন-সিনেমাটিক কাঁচা প্রক্রিয়ায় দৃশ্যগুলো গ্রহণ করা হয়েছে), আলোর বেমক্কা অমনোযোগী হাঁটাচলা, দৈর্ঘ্য, ডায়ালগ গঠন ইত্যাদি একটা ছবির অর্থহীনতাকে জাস্টিফাই করতে কাজে আসে বেশি বেশি। এবং এই ছবিতে এসবের বাইরে দর্শকগণ কিছুই পাবেন না। তদুপরি সমকামিতাকে এত দুর্বল ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে এবং তা নিয়ে, মিনিটগুলোকে গুছিয়ে, ছেলেখেলা করা হয়েছে। এতে করে (কলকাতা, ঢাকা কিংবা দুদেশের শহরতলী, প্রায় গ্রাম বা গ্রাম কিংবা এদের বাইরেও ভারতের, বাংলাদেশের অগুনতি) সমপ্রেমের অংশী যারা, যারা কেবলই আপাত-ভিন্ন ইচ্ছে মনের মধ্যে লালন করে বলে প্রথিতযশা সমাজের কাছে হাইড্রেনের কালশিটে ময়লা স্বরূপ, কেবল মেনস্ট্রীম যা যা বলছে তা তা না মানতে চাওয়া ছেলে-মেয়েগুলোদের (কিংবা হতে চাওয়া ছেলে-মেয়েগুলোদের) রোজকার দুর্ভোগ ভয় আতঙ্ক সংগ্রামের বিরুদ্ধে গিয়ে, মৈনাক ভৌমিক বক্তব্য পেশ করেছেন। দুই নায়িকার মুহুর্মুহু চুমু খাওয়া দেখিয়ে এত বড় কমিউনিটির প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করা যায় না। তাহলে ‘আবার যদি ইচ্ছে করো’ ছবিটি কিংবা ‘এবং বেওয়ারিশ’ তথ্যচিত্রটিকে সরাসরি অস্বীকৃতি জানানো হয়। নন্দীগ্রামের স্বপ্না-সুচেতাদের এই দয়ামায়াহীন দুনিয়াকে লাথি মেরে, দর্পিত আত্মহত্যা করাটাকেও তাহলে কটাক্ষ করা হয়। মারাঠী শিক্ষক সিরাসের অব্যক্ত কষ্টগুলো যাতনাগুলোকে ধর্তব্যেই আনা হয়না বলা চলে।

35437902.cms

মৈনাকের আগের ছবিগুলোয় চোখ বোলালে একটা গতানুগতিক মেথড চোখে পড়বে। সেক্সিস্ট কমেন্ট করার জন্য একজন/দুজন বন্ধুগোছের কেউ থাকবে, প্রোটাগনিস্ট ছেলেটি বা মেয়েটি বা দুজনেই অনেকটা ইংরেজি সাতানব্বই শতাংশ ও বাংলা বাকি শতাংশের মত মিশিয়ে কথা বলবে, ফ্যামিলি হিস্ট্রি কারোর না কারোর থাকতেই হবে, এক্সট্রা ম্যারিটাল কিছুটা আর ভরপুর যৌনতার সুড়সুড়ি। এই সুড়সুড়ি আবার ঠিক ততটাই, যতটা এই আমরা, দুর্বল চিত্রের আর্বান উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত বা ওল্ড বাঙালিয়ানার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলা, রেড ওয়াইনে চুমুক দেওয়া পাবলিকেরা নিতে পারব। ‘আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ড’এর মোটো কিন্তু যথেষ্টই ছিল। মোটোতে সৎ উদ্দেশ্য থাকলেও থাকতে পারে অথচ দুর্বলস্য দুর্বল স্ক্রিপ্ট ও অন্যান্য কারণে এই ছবিটা ছবিই নয়।
‘টেক ওয়ান’এর মত ভয়ঙ্করতম একঘেয়ে বিরক্তিকর ছবির সাথে, ভান্ডারকরের ‘হিরোইন’এর তুলনা চলতে পারে। তবুও ‘হিরোইন’কে কমার্শিয়াল ধারায় ফেলে আনন্দ লাভ করা যায়। ‘টেক ওয়ান’এ যে সেই স্ট্রাটেজিও খাটে না। ইচ্ছাকৃত দু’রকম ভিন্ন বিপন্নতাকে মেলানোর আপ্রাণ চেষ্টা এবং এই এখানেও স্বস্তিকা অভিনীত চরিত্রটির মধ্যে, চরিত্রটির মেয়ের মধ্যে ‘একটু বেশি ফেস্টিভালে খাবে’-সুলভ কথোপকথন দেখতে পাওয়া যায়। ‘কলকাতা কলিং’ কিংবা ‘বেডরুম’এর মত খাজা ছবির উল্লেখ করে শব্দগুচ্ছের সম্মান নষ্ট করতে আগ্রহী হচ্ছি না। এই এতটা লেখারও দরকার হত না, যদি না চিরাচরিত ভাবে মৈনাকের বাকি ছবিগুলোও যেভাবে কষ্টে সৃষ্টে সবটুকু দেখে বাতিল করে দিতে হয়, ‘ফ্যামিলি অ্যালবাম’এর ক্ষেত্রেও তাই করা হত। কিন্তু মৈনাক নারী সমকামিতাকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, দুটো চরিত্রকে স্বপ্ন দেখতে দিয়েছেন। কলকাতার মত প্রতিক্রিয়াশীল উলঙ্গ শহরের বুকে ওরা হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাচ্ছে, খুনসুটি করছে, চুমু খাচ্ছে এমন সব দৃশ্য রেখেছেন। একজনকে পুরুষ পুরুষ টাইপের আর আরেকজনকে টিপিক্যাল মহিলা গুণাগুণ মণ্ডিত ধবধবে নারী হিসেবে খাড়া করেছেন। ধবধবে নারী ভেবলু টাইপের; জীবনে প্রেম করেনি, লেসবিয়ান তো নয়ই। আর ওদিকে পুরুষ টাইপ মেয়েটা খাটি পুরুষের প্রেমে লেঙ্গি খাওয়া মানবী। বার কয়েক সুইসাইড করতে হয় বলেই করেছে। বোধহয় ছবিতে গল্প একটা ঢোকাতে হয় বলেই করেছে। তার হঠাৎ মর্জি উঠল, “নাহ্ একটা মেয়ের সাথেই এবার প্রেম করে দেখি! কি হয় কি হয়!” তারপর? জোড়াতালি।
(খ/আ)
অথচ এর সাথে আরও কয়েকটা এলিমেন্ট এই ছবিতে ছিল। ধবধবে নারীর মায়ের ও বাবার ভঙ্গুর তথৈবচ যাপন ছিল। যেগুলো সিনেমাকে সিনেমা হতে সাহায্য করে সাধারণত, এখানে করেনি। ভাইয়ের প্রেমহীনতা, সারল্য নিয়েই তো একখান ছবি তৈরি করা যায়! রেয়ার একটা ব্যাপার সরলতা। অথচ ভাইকে ভাইয়ের বন্ধু, সদ্য গজানো গার্লফ্রেন্ডকে চুমু খাওয়ার পরামর্শ দিলে, ভাই ‘চিল’ বলে ক্ষ্যান্ত দেয়। “দাড়ি-গোঁফের আড়ালে দুগ্ধপোষ্য বালক মাফিক” এই ব্যাপারটা সব্বাই ভীষণ খায়। কমার্শিয়ালে না হয় খাওয়ানোর প্রয়োজন থাকে, তাই খাওয়ানো হয়। অথচ ‘ফ্যামিলি অ্যালবাম’ তো আর্ট ফিল্ম(!)-এর জনারেই পড়ে। মৈনাক চাইলে, গুছিয়ে ঠিকঠাক ছবি তৈরি করে দেশের বাইরে পাঠাতে পারতেন।
অথচ না! আমাদের রিয়া সেনকে চাই। ঘনঘন ওর সিগারেট ফোঁকা দেখতে চাই। চকোলেট ঠোঁট বারংবার দেখে বিরক্ত হতে চাই। পাওলি আর স্বস্তিকার কমফোর্ট জোন তৈরি করার হাস্যকর দৃশ্য দেখে আরো আরো বিরক্ত হতে চাই। কৌশিক সেনের একপেশে অভিব্যক্তি দেখে তারচেয়েও বেশি বিরক্ত হতে চাই। তবে প্রথমদিকে, আর্ট এক্সিবিশনে থাকাকালীন; ডিপ্রেসড পাওলি গোপন কক্ষে একটা ছেলেকে সোফায় ফেলে জামা খুলে ফেলতে চায়। কিন্তু মাঝপথেই সিন থামিয়ে দিতে হয়। কেননা মৈনাক সম্ভবত চেয়েছিলেন সেক্স-সেক্স সুলভ মাদক গন্ধটা ফ্রেমে রাখবেন। অথচ পাওলির মুখমণ্ডলে হিংস্র বাঘিনী-সুলভ অভিব্যক্তি দেখেই, হয়ত কাট বলে উঠেছিলেন। কেননা পাওলি ফোর-প্লে দেখাতে গিয়ে, ভুলে হিংস্রতা দেখিয়ে ফেলতে যাচ্ছিলেন! বেশি স্বাধীন অভিনেত্রী হলে যা হয় আরকি!!
(গ)
আশফাক নিপুণ ছোটপর্দার কারিগরি জানা হয়েও, ছোটপর্দায় ‘রেইনবো’ পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন। সহানুভূতি – যেটা গে, লেসবিয়ান, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার, ট্রান্সভেস্টাইট, ট্রান্সম্যান, ট্রান্সওম্যান ব্লা ব্লা’দের প্রতি আমরা চলতি সবজান্তা সমাজ ব্যবহার করি না; ক্রমশ কোণঠাসা করি ধর্ম দিয়ে আর সংবিধান কিংবা আজব যুক্তি দিয়ে, সেই পিছলে মরে যাওয়া সহানুভূতিটুকু নিপুণভাবে নিজের ছবিতে ঢোকাতে পেরেছিলেন। উনি বাস্তব ভোলেননি। মলয়লম ছবি ‘কা বডিস্কেপস’ তো ভারতীয় সেন্সর বোর্ড কেবলই আছাড় মেরে যাচ্ছে বছর দেড়েক ধরে! দুইহাজার পনেরোর ‘আনফ্রিডম’ ভারত থেকে পুরোপুরি উধাও! আর বাজার কিংবা উৎসব কবজা করে নিচ্ছে আলোচ্য ছবিটার মত ছবিগুলো, যেগুলোতে অবাস্তব এক কাল্পনিক পটভূমি তৈরি করা হয়। হয় সত্য গোপন করা আর নয়ত অস্বীকার। এবং ছবি তৈরি করার পারদর্শিতার অভাবও এসবের পেছনে সুপ্ত অবস্থায় থাকে।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com