Smiley face

গহীন বালুচর: এমন সুনির্মিত কাজ দর্শক খরায় ভুগবে কেন?!

photo-1514534455
বছরের শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত দেশীয় চলচ্চিত্র বদরুল আনাম সৌদের ‘গহীন বালুচর’ নিয়ে লিখেছেন রিফাত কবির স্বর্ণা
বাবাকে নিয়ে বলাকা সিনেমা হলে পৌঁছে দ্বিধার মাঝে পড়ে গেলাম। কী ব্যাপার-শো শুরু হয়ে গেলো নাকি আজ আর শো হবে না? মুক্তির দ্বিতীয় দিন মাত্র, বন্ধের দিনও বটে। “ঢাকা অ্যাটাক” মুক্তির দ্বিতীয় দিন সকালে এখানেই কত ভিড় আর বিশাল লাইন দেখেছিলাম, আর আজ কেমন সুনসান নীরবতা! টিকেট কাউন্টার থেকে জানা গেল, বেলা একটার সময় শো শুরু হবে (বলাকায় সাধারন শো শুরু হয় ১২টায়) আর চারদিকে হাতেগোনা মাত্র দু’তিনজন দর্শককে দেখা যাচ্ছে! এ ছবিতে সুবর্ণা মুস্তাফা, রাইসুল ইসলাম আসাদের মত শক্তিমান অভিনেতারা আছেন, আছেন আমার বাবার ছোটবেলার বন্ধু আরেক শক্তিমান অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবুও। এ ছবিতো ভালো কিছুই হওয়ার কথা। আর নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদের কোন কাজ সম্পূর্ণ না দেখা হলেও তার সুনামের ব্যাপারে ধারণা আছে। তিনি শক্তিশালী অভিনেতা আর নবাগতদের যুগলবন্দী নিয়ে, ক্যামেরার চোখ দিয়ে শিল্পের সমাবেশ ঘটাবেন নিশ্চয়ই। এখন দর্শক মনে তা কতটা হজম হয় সেটাই দেখবার বিষয়!
gohin-baluchar1সিনেমা শুরু হলো মাছ ধরার একটি দৃশ্য দিয়ে, এক পায়ে দাঁড়ানো বককে দেখে এক হাঁটু পানির তলায় এক চরের সন্ধান লাভ করল সুজন, শামিম আর শামিমের বাবা। কিন্তু তাদের এই আনন্দের মাঝে বাজে বিষাদ আর কলহের সুর। কারণ এই ডুবে থাকা কালার চর নিয়ে এক যুগ আগে পাশের গ্রামের সঙ্গে যে দাঙ্গা-লড়াই হয়েছিল তাতে এই গ্রামের অনেক পুরুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। সেই হিংস্রতার প্রতিশোধ নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে সুবর্ণা মুস্তাফার চরিত্রটি সবাইকে যেমন উদ্বুদ্ধ করেন, অন্যদিকে সুজন স্বপ্ন দেখে তার নায়িকা পারুলকে নিয়ে সেই চরে ঘর বাঁধার! তারপরের গল্প খানিকটা অনুমেয় হলেও, কিছুটা সাসপেন্সও রয়েছে। পাঠক হয়তো ভাবছেন গ্রামের চর দখল নিয়ে ‘কাইজ্জা’ আর তার মাঝে নায়ক-নায়িকার প্রেম-ভালোবাসা মার্কা কাহিনী নিয়ে ঘুমঘুম চোখে ঢুলুঢুলু ভাব নিয়ে দেখার সিনেমা ‘গহীন বালুচর’। কিন্তু ভাগ্য ভালো নির্মাতার মুন্সিয়ানায় তা একদমই হয়নি।
ত্রিভুজ প্রেমের গল্প আছে এই সিনেমায়, কিন্তু চিরায়ত ভঙ্গিতে আসে নি। আর নায়ক-নায়িকার প্রেমকাহিনীও মূল উপজীব্য ছিল না। পার্শ্ব চরিত্রে শক্তিশালী অভিনেতারা ছিলেন এবং তাদের চরিত্রগুলো কাহিনীতে বেশ গুরুত্ব নিয়েই এসেছে যা এ সিনেমার অন্যতম ইতিবাচক দিক। আর রাইসুল ইসলাম আসাদের ছেলের চরিত্রে জিতু আহসান দুর্দান্ত রকমের খলনায়কগিরি দেখালেন আর তার ছায়াসঙ্গী-দ্বৈতচারী ফজলুর রহমান বাবুও কম গেলেন না! জিতু আহসানের সঙ্গে শাহাদাৎ হোসেনের দ্বন্দ্ব এ সিনেমার সেরা সাসপেন্স ও থ্রিলিং পার্ট হয়ে থাকবে! তাছাড়া নায়ক ও দুই নায়িকার কর্মকাণ্ডের দিকে চোখ তো রাখতেই হয়! সঙ্গে সুবর্ণা মুস্তাফা, আসাদ থেকে রুনা খান সবার অভিনয় পারদর্শিতার সম্মিলন তো রয়েছেই!
তিন নবাগতের ব্যাপারে বলতে গেলে দর্শক মনকে পুরোপুরি তুষ্ট করেছেন তারা, একেবারে ন্যাচারাল অভিনয় দিয়ে! আবু হুরায়রা তানভীর বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনে কবি ভাবের তরুণ চরিত্রে যেমন মানিয়েছিলেন, ‘গহীন বালুচর’ এর প্রেমিক যুবক চরিত্রে তেমনি চমৎকারভাবে মানানসই ছিলেন। খুব ভালো অভিনয় করেছেন তিনি। আর একটু শক্ত গোছের নায়িকা পারুল চরিত্রে জান্নাতুন নূর মুনও সাবলীল অভিনয় করেছেন বেশ সাদামাটা বেশভূষায় । আরেক নায়িকা নীলাঞ্জনা নীলা- তার চরিত্র গঠন বিচারে কৃত্রিমতা ও ন্যাকামি দুই-ই আসি আসি করার সমূহ সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু শেষমেশ এল শুধুই সৌন্দর্য। তার চরিত্রের পরিণতি দেখতেই সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতীক্ষা; তারপর বাসায় ফিরে নেট ঘেটে দেখলাম, এর মাঝে অনেক নাটক-বিজ্ঞাপনে নাকি অভিনয় করেছেন, কিন্তু এতদিন চোখে পড়েনিতো! এখানেও পরিচালক-কলাকুশলীদের (পোশাক পরিকল্পনায় ওয়াহিদা মল্লিক জলি, শিল্প নির্দেশনায় উত্তম গুহ ছিলেন) কৃতিত্ব, গানের মত করেই কাঞ্চাবরণ কন্যাকে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন তারা করতে পেরেছেন। সঙ্গে নবাগত শিল্পীরা শক্তিমান অভিনেতাদের সাহচর্য পেয়েও ধন্য হয়েছেন নিশ্চয়। ভবিষ্যতে কুশলী নির্মাতাদের সঙ্গে তারা আরো ভালো ভালো কাজ উপহার দিবেন সেই আশাই করি।
মাঝে মাঝে একটু কৃত্রিমতা, বেশি ছিমছাম ভাব লেগেছে হয়তো; সঙ্গে সুবর্ণা মুস্তাফার নাটুকেপনা দিয়ে শুরু চরিত্রটিও কেমন অবোধ্য থেকে যায়। যে কাটা gohin-baluchar-2মস্তক দেখতে চায়, সেই বাড়ির বউ শর্মীমালার এক কথাতেই নরম ভাব দেখায় কেন ঠিক বোঝা গেল না! আর বাপ্পা মজুমদার-মুন্নীর কণ্ঠ দেয়া “ভালোবাসায় বুক ভাসাইলা” গানটি ঠিক আছে, বাকি কয়েকটি হলের সাউন্ড সিস্টেমের জন্য নাকি অন্য কারণে আগেরকার কলকাতা সিনেমার গানের মত মনে হল! ব্যবসায়িক বিচারেই হয়তো কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দিয়ে গান আমদানি করে মিউজিক্যাল ড্রামা আবহ আনতে হয়েছে, কাহিনীর দু’ একটা অনুমেয় বাঁকও সে বিচার থেকেই হতে পারে অথবা এরকমটা হলে দর্শকের মনে দাগ কাটবে সে ভাবনা থেকে হয়েছে!
কোথায় ছবির শুটিং হয়েছে জানেন? ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায়! হায়-হায়, ঝালকাঠিতে আমার নানা বাড়ি, কিন্তু নদী আর নদীপাড়ের এত সৌন্দর্য কখনো চোখে ধরা পড়েনি!
সব কিছু ছাপিয়ে বেশ গতিশীল আর শেষ অবধি দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখার মত কাহিনীপ্রবাহই ছিল বলা চলে। ক্যামেরার কাজ আর গ্রামের নান্দনিক চিত্রায়নের প্রশংসাও করতেই হয়। ভালোবাসা আর কলহের শুভ বা অশুভ পরিণতি দর্শক মনকে এতটুকু হলেও স্পর্শ করবেই।
“গহীন বালুচর” নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদের প্রথম চলচ্চিত্র (এর আগে তার “খণ্ডগল্প’৭১” টেলিফিল্ম হিসেবে নির্মিত হয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য ফিল্ম হিসেবে নাকি প্রচারিত হয়েছিল!) যে মুন্সিয়ানা তিনি দেখিয়েছেন এ চলচ্চিত্রে, তার আরও আরও কাজ দেখার প্রত্যাশা রইলো। যদি এ ছবিটি ব্যবসাসফল না হয়, তারপরও! মোটে ২৮ টি হলে মুক্তি পেয়েছে চলচ্চিত্রটি (নির্মাতা বলেছেন, কৌশল হিসেবে!)।, আর মুক্তির পরদিনের শো-তেই এমন দর্শকখরা দেখলাম! তারপরও চূড়ান্ত আশাবাদী হয়ে প্রত্যাশা করবো, দিনের বাদবাকি শো’গুলো হয়তো ভালো গেছে, বাদ বাকি হলগুলোতেও নিশ্চয়ই ভালো ব্যবসা করছে! এমন সুনির্মিত চলচ্চিত্রটি এতটুকু সাফল্য ডিজার্ভ করে! ভবিষ্যতের ফিল্ম আর্কাইভে আমাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে “গহীন বালুচর”এর মত চলচ্চিত্র আর সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরাই! “ঢাকা অ্যাটাক” দেখতে যদি ছুটতে পারি, “গহীন বালুচর” দেখতে কেন নয়? জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা আর মালয়েশিয়ায় নাচ-গান দেখানোর অভাবে? পর্যাপ্ত থ্রিল আর সাস্পেন্সতো এ ছবিতেও রয়েছে। দীপঙ্কর দীপনের মত সৌদও নবাগত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আশার আলো দেখাচ্ছেন। জি বাংলা বা হিন্দি সিরিয়াল প্রিয় নারী থেকে দেশের চলচ্চিত্রশিল্প সম্পর্কে হতাশ মানুষজন এবং অবশ্যই গল্প-কাহিনী-নির্মাণ বাছবিচার করা আপামর সাধারণ দর্শক- আপনার নিকটস্থ প্রেক্ষাগৃহে “গহীন বালুচর” চলে থাকলে একবার ঢুঁ মেরে আসতে পারেন। কষ্টার্জিত পয়সার অনর্থ হবে না বরং এ ধরনের জীবনঘনিষ্ঠ নির্মাণকেই প্রণোদিত করা হবে। বছরের শেষ দেশীয় চলচ্চিত্র হিসেবে দেশ আর গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতিনিধিত্বই তো করেছে এই ছবিটি। আর এভাবেই পর্যাপ্ত দর্শক সমাগমের মধ্য দিয়ে সিনেমা হলগুলো কারো কারো চোখে শয়তানের আস্তানা না হয়ে পারিবারিক বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারবে।

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com