Mandatory Credit: Photo by Nacho Lopez/DYDPPA/REX/Shutterstock (5152242b)
Hirokazu Koreeda
San Sebastian Film Festival, San Sebastian, Spain - 21 Sep 2015
ফাহিম বিন সেলিম
জাপানী নির্মাতা হিরোকাযু কোরে-এদার সঙ্গে পরিচয় Like Father, Like Son(২০১৩) দিয়ে। গল্পের শুরুটাই তো আগ্রহ জাগানিয়া। রিইয়োতা যে একজন বেশ সফল ব্যবসায়ী এবং এক সন্তানের পিতা, হঠাৎ জানতে পারলো যে যাকে এতদিন সে নিজের সন্তান হিসেবে বড় করে তুলেছে সে প্রকৃতপক্ষে তার নিজের রক্তের সন্তান নয়। বরং জন্মের দিন থেকেই অদল-বদল হয়ে যাওয়া তার আপন সন্তান বড় হয়েছে, যাকে বলা যায় তুলনামূলক কম অভিজাত এক পরিবারে। রিইয়োতা পড়ে গেলো অদ্ভূত এক দোটানায়। নিজ পরিবার, সন্তানের সংজ্ঞাটা কি কেবল রক্তের সম্পর্কেই আটকে থাকা তবে? পথে পথে বাঁক আর চমক থাকা গল্পের শুরু হিসেবে দারুণ? হুম, হুম। কিন্তু কোরে-এদা সেদিকে পা-ও মাড়ান না। তার চলার পথটা বরং বাড়ির পাশের রাস্তাটা দিয়ে পায়চারির মত। ধীরস্থির। পরিচিত!
আর পরিচিত জীবনের শুরুটা হয় যেখানে – সেই পরিবার নিয়েই কোরে-এদার আগ্রহ। তার মুভিগুলোতে বারবার তো সেটাই ঘুরেফিরে এসেছে। “ফ্যামিলিয়ার ওভার দ্য ফ্যান্টাস্টিক”! কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ কি সেই ফ্যান্টাসীর জন্যই সিনেমাহলে যাননা? সাধারণ জীবন থেকে “পালিয়ে” যেতে। সিনেমাহলে আমরা সেইসব গল্প দেখতে কেন যাবো যা আমরা কাটাই দিনভরই?
1aকোরে-এদা তার মুভিতে শুধু বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাই নামিয়ে আনেন না, সঙ্গে বাস্তবতার বাঁধাগুলোও যোগ করে দেন। সেই প্রথম বাঁধাটা – আবারও সেই পরিবারই! Nobody Knows(২০০৪)-এ যখন এক মা তার চার সন্তানকে(১২, ১০, ৭ এবং ৪ বছর বয়সী এবং যাদের চারজনেরই আলাদা আলাদা জনক) এপার্টমেন্টে ফেলে রেখে যায় কিছুদিন পরপরই। আমরা সময় কাটাই বাচ্চাগুলোর সঙ্গেই, কীভাবে বাবা-মা বা কোন অভিভাবকের উপস্থিতি ছাড়া তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবার তৈরি করে নেয়। এই চার ছোট ভাই-বোন এক এপার্টমেন্টে ঘরে আটকে থাকে দিনের পর দিন, আবার যখন মায়ের রেখে যাওয়া টাকা শেষ হয়ে যায় তখন বাধ্য হয় মল থেকে খাবার চুরি করার কৌশল রপ্ত করতে যেখানে তাদের যাওয়ার কথা স্কুলে! এই অভিজ্ঞতাটা একই সঙ্গে হৃদয়গ্রাহী আবার রাগিয়ে দেওয়ার মতও। অবশেষে কোন একবার তাদের মা ফিরে আসার পর যখন চার সন্তানের সবচেয়ে বড়জন আকিরা প্রশ্ন করে, “Are you going to leave us again?” আর তখন সে পাল্টা প্রশ্ন করে, “Am I not allowed to be happy?” আসলেই তো। বেকার এই যুবতী যদি এই চার সন্তানকে বড় করার দায়িত্ব নেয়, তাহলে অবশ্যই তার নিজের সুখ অনেকটাই বিসর্জন দিতে হবে। যদিও এটা তার দায়িত্বের মধ্যেই পরে এবং এই বাস্তবতা তার নিজেরই তৈরি করা। কিন্তু সে তা থেকে ”পালিয়ে” যাওয়ার একটা উপায় ঠিকই খুঁজে পেয়েছে। আমরা এই ‘মা’-কে তার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারি, কিন্তু কোরে-এদা তার গল্পে কোন বিচারক হিসেবে বসে যাননা।

3a

পরিবার আর ব্যক্তির সংঘাতটা তো এদিকেই। কোরে-এদার নিজের কথাই চিন্তা করা যাক। ছোটবেলায় চলচ্চিত্রপ্রেমী মায়ের কাছ থেকেই তো এ মাধ্যমের জন্য তার ভালোবাসা জন্মানো। কিন্তু বড় হয়ে যখন সিদ্ধান্ত নিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা হবেন, তখন তার মাও সেটা মেনে নিতে পারেননি। তাকে পরামর্শ দিলেন আরো  সিকিউরড কোন পেশায় যোগ দিতে। মাঞ্চুরিয়াতে যুদ্ধ করা তার সৈনিক পিতা সাইবেরিয়ায় যুদ্ধবন্দী হিসেবে কাটিয়ে জাপানে ফিরে আসার পর তো তাদের পরিবার খুব একটা স্বচ্ছলতার মুখ দেখেনি। কোরে-এদা বাস্তবতা থেকে পালানোর চেষ্টা করেননি, তবে পালাননি তার স্বপ্ন থেকেও। কলেজে সাহিত্যে পড়া শেষ করার পর পরই নিজের হাত পাকিয়েছেন টিভির জন্য নির্মিত বিভিন্ন ডকুমেন্টারিতে। এই দুইয়ের সংযোগেই কি কোরে-এদার গল্পগুলো এতটা বাস্তবঘেষা আবার একই সঙ্গে কাব্যিকতায় ঘেরা?
শুরুটা Maborosi দিয়ে, ১৯৯৫ সালে। Maborosi-তে আমরা পরিচিত হই ইউকিমোর সঙ্গে, এক যুবতী মা, যার স্বামী সদ্য আত্নহত্যা করেছে। ভালোবাসা 3aআর সম্পর্কের সুন্দর মুহূর্তগুলোর সঙ্গেই তো হাতে হাত ধরে আসে বিচ্ছেদের অনিবার্যতা। আমরা ইউকিমোকে অনুসরণ করি তার এই বিষাদে। অপরিচিত, না টিকতে পারা এক বাস্তবতার সম্মুখীন যখন সে হয় হঠাৎ করেই। সব তো ঠিকমতই চলছিলো! তার মাথায়ও ঘুরে ফিরে আসে এই পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা; ঠিক Nobody Knows এর মায়ের মত। তবে বিদ্যুৎ বিল বা সন্তানকে বড় করার চিন্তা না, তার স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্নে মাঝে মাঝে হানা দেয় বরং তার মৃত স্বামী । তার পালিয়ে যাওয়ার ধারণাটাও তো কিছুটা ভিন্ন। এখানে আমরা পাই কোরে-এদার চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় প্রধান উপাদান – মৃত্যু। বাস্তবতা থেকে পালানোর একমাত্র স্থায়ী পথ এবং তার উপজাত শোক। আচ্ছা, এটা তো সেই পরিবার থেকেই আসা!   “Leaving and filling gaps is families are all about” – কোরে-এদার ভাবনাটা তো এত জীবন্তভাবে আর ফুটে উঠেনি কোথাও! Maborosi-তে ইউকিমো একা হলেও, Still Walking (২০০৮) এ পুরো একটা পরিবার হাজির হয় তাদের পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যুর শোক বহন করার অথবা ভাগ করার দায়িত্ব নিয়ে। মৃত্যু তো সবাইকে কাছেও আনে। Maborosi-র চেয়ে এর টোনটাও তো তাই অনেক লাইট-হার্টেড।
বিচ্ছেদের ভাঙ্গনে দুপাড়ে আটকে যাওয়া দুই ভাইয়ের কাহিনী নিয়ে Wish(২০১১) আর নিজের বাবা-মাকে আলাদা হতে দেখা তাইয়োর কাহিনী নিয়ে After the Storm(২০১৬)-ও তো। কিংবা তিন বড়বোন আর তাদের বাবার মৃত্যুর পর সঙ্গে জুটে যাওয়া ছোট সৎবোনকে নিয়ে Our Little Sister(২০১৫)। কোন বড় টুইস্ট বা ড্রামা ছাড়া অথবা জীবন নিয়ে গভীর কোন তত্ত্বও না। তারপরও কেন বারবার কোরে-এদায় ফিরে আসার তীব্র ইচ্ছা জাগে? কারণ মুভিতে এস্কেপিজমের চেয়েও আরো শক্তিশালী জিনিস সম্ভবত ফ্যামিলিয়ারিটি। কোরে-এদার চলচ্চিত্রগুলো চিরাচরিত দৈনন্দিন জীবনের গল্প নিয়েই। সাধারণ মানুষ আর তাদের সাধারণ জীবন। এগুলো তো আমাদের গল্পই। আমরাই তো জন্ম আর মৃত্যুর চক্রে আটকে যাই পরিবারের বাঁধনে; সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরে, আবার জোড়া লাগে; স্বপ্ন দেখি, ভুল করি আর দিনশেষে Wish-এর কোহিচির মত বলে উঠি, “What is the world? I don’t get it.”

5a

কোরে-এদার সবচেয়ে ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র সম্ভবত After Life (১৯৯৮)। অন্তত বাইরের থেকে দেখলে। কারণ অবশ্যই নাম থেকেই বোঝা যায় এর কাহিনী বাস্তব জীবন না, বরং তার পরের সময়টা নিয়ে। কিন্তু কোরে-এদার চলচ্চিত্রগুলোকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এই কাজটা দিয়েই। পরকালে যাওয়ার আগে ওয়েটিং স্টেশনে যখন মানুষ উপস্থিত হয় তখন তাদের জানানো হয় নিজের গত হওয়া জীবন থেকে যেকোন একটা সুখের স্মৃতি বাছাই করার জন্য। যা নিয়ে বানানো হবে একটি চলচ্চিত্র আর সেই চলচ্চিত্রেই এই মৃতেরা বাস করবে অনন্তকাল। এক বালিকায় সঙ্গে সঙ্গেই ডিজনীল্যান্ডে ঘুরতে যাওয়ার এক স্মৃতির কথা চিন্তা করে, কিন্তু মুভির পরে আমরা এসে দেখতে পাই সে বাছাই করে মাত্র তিন বছর বয়সের সময়ের এক স্মৃতি –  গ্রীষ্মের এক দুপুরে যখন সে শুয়ে ছিলো তার মায়ের কোলের উপর, আর তার মা তার কান পরিষ্কার করে দিচ্ছিলো, আর বাতাস বইছিলো, আর তাতে দেয়ালের কাচা রঙ শুকোচ্ছিলো – “It felt so familiar,” সে বলে। কোরে-এদার চলচ্চিত্রগুলোও তো তাই, আমাদের দিনশেষে মনের কোনে লুকিয়ে থাকা সব সেরা স্মৃতিগুলোর মতই – ফ্যামিলিয়ার আর ফ্যামিলিয়াল।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *