MV5BYzRhOGY5NjUtNDVmZi00ZjllLWI2YzQtMjJjNzQ3ZmM0NzUyXkEyXkFqcGdeQXVyNjA5NDgxNTg@._V1_SX1777_CR0,0,1777,999_AL_
হাসান মাহবুব
ধরে নিচ্ছি আপনি ড্যারেন এ্যারোনোফস্কি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাহলে তো এটা জানাতেই হয় যে তিনি একজন নামকরা আমেরিকান পরিচালক, তার ছবি অস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছে। ধরে নিলাম আপনি মাঝেমধ্যে সময় কাটানোর জন্যে মুভি-টুভি দেখেন টুকটাক বেছেবুছে। সেক্ষেত্রে হলিউডের একজন স্বনামধন্য অস্কার মনোনয়নের তালিকায় থাকা পরিচালকের প্রতি আপনার কিছুটা কৌতূহল জাগ্রত হতেই পারে। হয়তো বা উইকেন্ডের রাতে তার সাম্প্রতিক কোনো ছবি দেখেও ফেলতে পারেন। আর সেক্ষেত্রে যদি লেটেস্ট ছবিটার ভালো প্রিন্ট পান, এবং সেটার ক্যাটাগরি যদি ‘হরর’ হয়, তাহলে বেশ জমজমাট, শ্বাসরুদ্ধকর একটা রাত আপনি আশা করতেই পারেন ভদ্রলোকের কাছ থেকে। ড্যারেন এ্যারোনোফস্কির সাম্প্রতিক ছবির নাম হলো ‘মাদার!’। আইএমডিবিতে এটার জনরা দেয়া আছে হরর, ড্রামা, মিস্ট্রি। কাহিনী সংক্ষেপ এরকম লেখা আছে, “A couple’s relationship is tested when uninvited guests arrive at their home, disrupting their tranquil existence”, প্লটটা হয়তো বা আপনার কাছে পরিচিত মনে হতে পারে। স্বামী- স্ত্রী এক সঙ্গে আছে সুখে শান্তিতে, আর কিছু অনাগত অভ্যাগত এসে তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে বিঘ্নিত করলো, এমন গল্প একদম বিরল নয়, তারপরেও ইন্টারেস্টিং তো বটেই! আর এখানে ছবিখানি বানিয়েছেন অস্কারের ট্যাগ লাগানো পরিচালক, প্রযোজনা করেছে প্যারামাউন্ট পিকচার্স, আছেন সাম্প্রতিককালের হার্টথ্রব জেনিফার লরেন্স, আছেন হাভিয়ের বারদেম। মেইনস্ট্রিমের একটা বম্বশেল হতে যাচ্ছে মুভিটা, ভাবতেই পারেন। তবে ছবিটা দেখতে গেলে ভাবনাটা মিলিয়ে যেতে খুব একটু সময় লাগবে না। এ্যারোনোফস্কি হচ্ছেন এমন একজন, যার সাধারণ কাহিনীর মুভিও দেখতে গেলে মনে হবে হরর! রিকুয়েম ফর আ ড্রিমের কথা বলতে হয় এ প্রসঙ্গে। মাদকাসক্তদের নিয়ে কাহিনী। চারজন বিড়ম্বিত মানুষ। তাদের ট্রাজিক পরিণতি। শেষ পনেরো মিনিটের তুমুল শক! চরিত্রগুলোর পরিণতি প্যারালালি দেখানো, সঙ্গে ক্রেইজি ক্যামেরা মুভমেন্ট, মাথা পাগল পাগল লাগে একদম, সহ্য হয় না! একদম পেয়ে বসবে আপনাকে, সিনেমা দেখা শেষ হবার পরে পাক্কা এক ঘন্টা কমপক্ষে ঘোর থেকেই যায়।

2

 

রিকুয়েম ফর আ ড্রিম হলো এ্যারোনফস্কির শক থেরাপির পারফেক্ট উদাহরণ। তবে তার অন্যান্য ছবিগুলোতেও (রেসলার এবং নোয়াহ ছাড়া), একই ধরণের নির্মাণ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। কাহিনী যত এগুবে, ডিস্টার্বিংলি বিউটিফুল ক্যাওস তৈরি হবে, আর শেষ দশ- পনেরো মিনিটে একদম সাইক্লোন বয়ে যাবে। শেকি ক্যামেরা, হিম ধরানো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, শার্প কাট, স্টোর্ব লাইটিং, মিরর শট, স্পিল্ট স্ক্রিন, অল্প সময়ের মধ্যে অনেক শট, অনেক চরিত্র, অনেক ঘটনা, বীভৎসতা, একদম কাঁপিয়ে দিয়ে যাবে, সঙ্গে থাকবে প্রচুর ভাবনার রসদ।
চলচ্চিত্রটির কাহিনী এরকম- প্রায় অসম বয়সী নর-নারী একটি নির্জন এবং সুন্দর বাড়িতে থাকেন। নিরবিলি, ছিমছাম। পুরুষটির বয়স নারীটির চেয়ে অনেক বেশি। তিনি খ্যাতনামা একজন লেখক। হঠাৎ দেখলে স্বামী-স্ত্রী মনে নাও হতে পারে। একদিন রাতে তাদের দরজায় কড়া নাড়লো একজন প্রতিবেশী। তার সঙ্গে ঠিকমত কথা হতে না হতেই বাড়ির পুরুষটি তাকে চা-পানের নিমন্ত্রণ জানালেন। নারী চরিত্রটি (উল্লেখ্য, এই সিনেমায় একটি চরিত্র ছাড়া কারো কোনো নাম দেয়া হয়নি), এতে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেন বোধ হয়। অবশ্য তাতে কী এসে যায়! কর্তার ইচ্ছাই কর্ম! কর্তা অতিথিকে বললেন তার স্ত্রী অতিথিদের সঙ্গ খুব পছন্দ করেন। কিন্তু আসলেই কি তাই? কর্তা কেন এ কথা বললেন? তিনি কেন অতিথিকে তার গৃহে আপ্যায়ন করতে এত আগ্রহী? আর নারী চরিত্রটিই বা কেন শঙ্কা বোধ করছে?
এগুলো নিয়ে আসলে ভাবাই উচিত না। কারণ এমনই তো হবার কথা, তাই না? হুট করে কেউ একজন বাসায় এসে উড়ে এসে জুড়ে বসলে কোন গৃহকর্ত্রীই বা সেটাকে ভালো চোখে দেখবেন? আমরা খামোখাই বিষয়টা ঘোলাটে করছি, তাই না? এরপর অভ্যাগত ধূমপান শুরু করলে গৃহকর্ত্রী মনক্ষুণ্ণ হন। তবে কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা, বা উঁচু গলায় কথা বলা তার ধাঁতে নেই। থাকবেই বা কী করে তিনি তো সর্বংসহা! সব সয়ে নিতে হবে এটাই তার নিয়তি। কেন? অপেক্ষা করুন, বুঝতে পারবেন। অভ্যাগত লোকটির আচরণ মোটেও সুবিধের নয়। মাঝরাতে সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বমি করতে শুরু করলো, তার শরীরে গভীর একটা কাটা দাগ? কীসের? আর গৃহকর্তা কেন তার এত টেক কেয়ার করছেন?
পরদিন কোথা থেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসলো অভ্যাগত লোকটির স্ত্রী। স্ত্রী?! এই লোকের পরিবার পরিজন ছিলো বলে তো শোনা যায় নি!
কাহিনী এগুতে থাকুক, আমরা একটু পেছনে যাই বরং। এই যে বিশাল শান্তিময় এক আবাসে এই দুই নরনারী থাকেন, তাদের অতীতটা কিন্তু খুব শান্তিপূর্ণ ছিলো না। কোনো এক বিশাল অগ্নি বিষয়ক দুর্ঘটনায় কর্তাব্যক্তি তার বাড়িঘর সব হারান। তখন তিনি দেখা পান তার নারীর। সেই নারীর অনুপ্রেরণায় নতুন করে গড়ে তোলেন সবকিছু। তার পুরোনো আগ্নেয় অতীতের স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে এক খন্ড কাঁচসদৃশ রত্ন। যাকে তিনি রেখে দিয়েছেন অতি যতনে। যেখানে রাখা আছে, সেখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই। কাউকে সেখানে যেতে দেন না, ছুঁতে দেন না।
ইতোমধ্যেই আমরা জেনে যাই অভ্যাগত ভদ্রলোক গৃহকর্তা লেখকের একজন “ক্রেইজি ফ্যান”। তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। শেষ সময়টা সে প্রিয় লেখকের সংস্পর্শে কাটাতে চান। এতে গৃহকর্ত্রী খুব একটু সন্তুষ্ট না হলেও গৃহকর্তার আমোদ আর দেখে কে! তিনি বড়ই প্রশংসাপ্রিয়। এ কথাটি বিশেষভাবে মনে রাখবেন। “প্রশংসাপ্রিয়”।
কিছুক্ষণ পর কথা নেই বার্তা নেই, অভ্যাগতদের দুই পুত্র সন্তান এসে উপস্থিত। তাদের মধ্যে কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুব গোল বেঁধে গেছে। কেউ তাদের শান্ত করতে পারছে না। ঘটনা ক্রমশ খারাপ দিকে মোড় নিতে লাগলো। কথা কাটাকাটি, হাতাহাতি থেকে একজন আরেকজনকে খুনই করে ফেললো শেষ পর্যন্ত!
এই পর্যন্ত আমরা কাহিনীকে বলতে পারি মোটামুটি স্বাভাবিক। দুয়েকটা ব্যাপার বেখাপ্পা লাগলেও মেনে নিন, কারণ পরবর্তীতে আপনাকে যা দেখতে হবে, তার তুলনায় এগুলো কিছুই না!

5

পুত্রশোকে মূহ্যমান বাবা-মা তাকে সৎকার করে পুনরায় এই শান্তির আবাসটিতেই ফিরে আসেন তার আত্মার শান্তির জন্যে একটু সামাজিক আচার আচরণ পালন করতে। ধীরে ধীরে তা একটা বেশ রিল্যাক্সিং একটা গেট টুগেদারে পরিণত হয়। একের পর এক মানুষ আসতে থাকে কোথা থেকে যেন খবর পেয়ে। তাদের সবাই লেখকের স্তুতি করতে পছন্দ করেন। সব বর্ণের, সব চেহারার মানুষ। দানা বাঁধতে থাকে বিশৃঙ্খলা। তারা আর কথা শুনছে না। নোংরা করছে ঘর। ইচ্ছেমত চুমু-চিৎকার করছে। বারণ করা স্বত্ত্বেও বেসিনের ওপর বসে তো তা ভেঙেই ফেললো!
অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে তারা আবার নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো। এবার আর সর্বংসহা নারী শান্ত থাকলেন না। ক্ষেপে উঠলেন রীতিমত। তার অভিযোগ জানালেন, তার প্রতি নিস্পৃহতার বেরুদ্ধে খেদ প্রকাশ করলেন, কটাক্ষ করলেন শারীরিক শীতলতা নিয়ে। ব্যাস, মহান পুরুষকে আর পায় কে! তিনি ক্ষেপে গিয়ে সঙ্গম করে ফেললেন এবং পরদিন সকালে নারীটি বুঝতে পারলো যে তিনি গর্ভবতী।
এই অতি সুন্দর সংবাদ শুনে রাইটার্স ব্লকে ভোগা লেখক পুরুষ আনন্দিত এবং অনুপ্রানিত হয়ে একটানা লিখে ফেললেন তার জীবনের সুন্দরতম লেখাটি। সবকিছুই আবার সুন্দরভাবে এগুচ্ছে তাই না?
তা কী করে হবে যদি লেখক তার ‘অনুপ্রেরণা’র চেয়ে স্তাবকদেরই বেশি মূল্যায়ন করেন? প্রশংসা এবং আনুগত্যপ্রিয় লেখক কি মনে রাখবেন তার আগত স্ত্রী এবং সন্তানের কথা? নাকি তিনি নতুন নতুন সৃষ্টি করেই যাবেন, সৃষ্ট প্রাণ বা পদার্থ যাই বলুন না কেন সেগুলো নিয়ে কি তার আদৌ কোনো ভাবনা আছে?
দলে দলে আসতে লাগলো স্তাবকের দল, এলো প্রকাশক, এলো সুযোগসন্ধানীরা, এরপর কী পরিমাণ হাঙ্গামা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো তা বর্ণনাতীত!
খুব সাধারণভাবে শুরু হওয়া সিনেমাটি যে মোটেও কোনো সাধারণ কাহিনীর ছবি নয় এতক্ষণে নিশ্চয়ই ঠাহর করতে পেরেছেন? হ্যাঁ, এই সিনেমাটির ভেতরে অনেক মেটাফর, অনেক গভীর বার্তা আছে। প্রায় প্রতিটা দৃশ্য, বস্তু এবং চরিত্রেরই রূপক অর্থ আছে। দেখার ভঙ্গির কারণে অর্থও বদলে যেতে পারে। এই লেখার একদম শেষে কিছু মেটাফরিকাল হিন্টস দেয়ার প্রয়াস থাকবে। তার আগে ভাবনার একটু সরলীকরণ করে নেয়া যাক ।
‘মাদার’ হলো সম্পর্কের শীতলতা, কৃত্রিমতা এবং এর ফলে সৃষ্ট এ্যাংজাইটির রূপক চিত্রায়ন। এই আধুনিক সমাজেও নারীরা মাতৃদেবী কোমল রূপ নিয়ে সর্বংসহা চরিত্রে অভিনয় করে গিয়ে তার ‘অর্ধাঙ্গী’র মনোরঞ্জনেই নিজেদের জীবনকে সার্থক প্রমাণ করেন। সেই আদিকালে তা ছিলো, এখন তা একটু পোলিশড হয়েছে আর কী। কিন্তু এই কোমল কুসুম নারীর কঠিন রূপ আমরা দেখতে পাই তখনই যখন সে মা হতে চায়, এবং সে ইস্পাতদৃঢ় হয়ে যায় যখন সে মা হয়। তখন তার চারিপাশের ঝড়-ঝঞ্জা, অনাদর, অবহেলা, কোনকিছুকেই সে কেয়ার করে না।
এবার আরেকটু গভীরে যাই। এই যে আমাদের প্রকৃতিমাতা এবং আমাদের শরীর ধারণ করা মায়েরা, তাদের মধ্যে কী অদ্ভুত মিল আছে, তাই না? এই যে আমরা দূষণে দূষণে কলুষিত করে ফেলছি আমাদের প্রিয় ধরণীকে, তবুও তিনি আমাদের আগলে রেখেছেন, যত দূর্বিপাক আসুক না কেন আমাদের রক্ষা করে যাবেন নিজে ক্রমশঃ ক্ষয়ে ক্ষয়ে। আমরা, মানুষেরা প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে জখম করে চলেছি। কিসের অন্বেষায়? আমাদের পরিচালিত করছে কে?
এখন কিছু অত্যন্ত অপ্রিয় কথা চলে আসবে, যা হজম করা অনেকের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। লেখাটির প্রথমদিকে বলা হয়েছিলো প্রশংসাপ্রিয় লেখকের কথা। পরিচালক কি এখানে লেখকের চরিত্রে ঈশ্বরকেই বুঝিয়েছেন? এভাবে ভাবলে দেখা যাবে কঠিন মেটাফরগুলি একদম সরল হয়ে যাচ্ছে!
গৃহকর্তা তথা লেখক হলেন ঈশ্বর। এ্যারোনোফস্কির মতে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন ‘বুদ্ধিমান’ প্রাণীকূলকে তার স্তুতি গাইবার জন্যেই।
গৃহকর্ত্রী এবং তাদের বাসা, এই দুয়ে মিলে হলো পৃথিবী তথা প্রকৃতি। যাদের কাজ, সয়ে যাওয়া আর বিবর্তিত হওয়া।
অভ্যাগত দুজন নর-নারী হলেন প্রথম মানুষ। আদম এবং হাওয়া।
তাদের সন্তান হলো হাবিল এবং কাবিল। যাদের একজনের দ্বারা মানব ইতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
এভাবে ভেবে ভেবে এগুতে থাকলে দেখা যাবে ব্যাপারগুলো প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। উৎকটভাবে মিলে যাচ্ছে। সেগুলো যদি মেনে নিতে কষ্ট হয়, তাহলে স্রেফ ঝেড়ে ফেলুন মাথা থেকে সেসব। এ্যারোনফস্কিকে কষে গালিগালাজ করে একটি ব্যর্থ এবং উদ্ভট হরর মুভি বানানোর দায়ে অভিযুক্ত করে পপকর্নের প্যাকেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে দিতে পারেন, রাবিশ! হ্যাঁ, এইভাবেও মুভিটাকে দেখতে পারেন, সেই স্বাধীনতা আপনার আছে বৈকি!

6

 

এই যে এত মেটাফর, এই যে এত সিম্বল, এই যে এত বিবলিকাল রেফারেন্স, সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যেত যদি এ্যারোনোফস্কি মুভির এ্যাটমস্ফিয়ার ঠিকমত নির্মাণ করতে না পারতেন। তিনি তা পেরেছেন খুব ভালোভাবেই। মাদার রূপী জেনিফার লরেন্সকে আমরা বারবার দেখি পুরো স্ক্রিন জুড়ে, বড় অবয়বে। আমরা দেখি তার সৌন্দর্য, কাঠিন্য, তার রূপান্তর। এ্যারোনোফস্কির প্রতিটি ছবিতেই মূল ক্যারেকটারকে এই ব্রেকডাউনের মাধ্যমে যেতে হয়। এখানেও তার ব্যত্যয় হয় নি। হাভিয়ের বারদেম তথা গৃহকর্তা, তথা লেখক তথা সৃষ্টিকর্তা চরিত্রটির প্রতি এ্যারোনোফস্কি স্পষ্ট তাচ্ছিল্য দেখিয়েছেন। তার বক্তব্য খুব স্পষ্ট। কখনও কখনও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এত হাস্যকর সহজভাবে তার স্তুতিস্পৃহা দেখিয়েছেন যা আপনাকে ইরিটেড করবেই! এই যেমন, জেনিফার লরেন্স যখন তার গর্ভের সন্তান নিয়ে, বাসার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন সে তখন তার আদৃত অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে, গর্ব ভরে বলছে, “দেখো, কত মানুষ এসেছে আমার কাছে!”। এত স্পষ্ট ইঙ্গিত, এত প্রকটভাবে বলে দেয়া, সাহসের ব্যাপার বটে! তবে দুর্ভাগ্য না সৌভাগ্যের ব্যাপার, জানি না, মেইনস্ট্রিমের দর্শকেরা বেশিরভাগই এই বক্তব্যের ধারেকাছে না গিয়ে তাদের পপকর্নের খরচ গচ্চা গেছে, দু’ঘন্টা নষ্ট হয়েছে বলে চিৎকার চেঁচামেচিতে ব্যস্ত। অবশ্য দর্শক যখন এই প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে বসেন যে, আরে হাঙ্গার গেমসের জেনিফার লরেন্সের ছবি, এবং দেখেন যে আসলে এটা জেনিফার লরেন্স নয়, এ্যারোনোফস্কির ছবি, তখন তো হতাশ হবেনই!
অভিনয় অবশ্য তিনি চমৎকার করেছেন। হাভিয়ের বারদেমের এ্যাপিয়ারেন্স ছিলো সম্ভ্রম জাগানিয়া। তবে প্রথম দুই অতিথির চরিত্রে এড হ্যারিস এবং মিশেল ফাইফারকে সবচেয়ে ভালো লেগেছে। তাদের উপস্থিতি সবসময়ই ছিলো এক হিসহিসে অস্বস্তির কারণ। মূল সঞ্চালনার ভূমিকাটা তাদেরই ছিলো।
সিনেমাটিকে নিয়ে শুধু প্রশংসাই করছি। দুটো মন্দ কথা না বললে কি আর জাতে ওঠা যাবে? তবে তাই হোক! সিনেমার একদম প্রথমদিকে হঠাৎ করে ‘মাদার’ যখন ঘরের বাইরের দৃশ্য (মহাবিশ্ব?) দেখছিলেন তন্ময় হয়ে, পেছনে বারদেম সাহেব এসে টিপিক্যাল হলিউডি হরর ভঙ্গিমায় যেভাবে চমকে দিলেন, তা বড়ই পীড়াদায়ক! এছাড়াও চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় লরেন্স ম্যাম যখন ৯১১ তে কল করেন, তা ঠিক কেন যেন যায়নি এতসব বিবলিকাল এ্যালিগরির মধ্যে। আর কল যখন করলেনই, তখন লাইন কেটে যাবার পর ৯১১ থেকে কলব্যাক করলো না কেন? বড় অন্যায়!
শেষ করবো এ্যারোনোফস্কির আরেকটি ছবির প্রসঙ্গ টেনে। তার সবচেয়ে আন্ডাররেটেড মুভিগুলোর মধ্যে একটি- দ্যা ফাউন্টেনে (শুধু তার না, চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড বলে বিবেচিত হতে পারে) আমরা দেখেছি ভালোবাসার মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে সেই সৃষ্টির আদিযুগ থেকে অতি দূর ভবিষ্যতের মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম। কোনো প্রাচীন কালে কেউ একজন খুঁজেছিলো প্রাণ সঞ্জীবনী লতা, বর্তমানে কেউ খুঁজছে আধুনিক প্রতিষেধক, ভবিষ্যতে কেউ খুঁজবে মৃতপ্রায় নক্ষত্রকে বাঁচিয়ে রাখার পদ্ধতি। উদ্দেশ্য সবার একই, শুধু পদ্ধতি ভিন্ন। এই বেঁচে থাকা, বাঁচিয়ে রাখা প্রিয়জনকে। মাদার ছবিতেও আমরা ঠিক এমনই একটা বৃহৎ এবং মহত্তর প্রতিবেশ পাই। এই ক্যাওটিক ডিস্টার্বনেসের ভেতরে একসময় স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টি মূর্ত হয়ে ওঠে, আর হারিয়ে যায় স্তাবকেরা। স্রষ্টা এবং সৃষ্টির এই সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে, তবে তা নিজেদের নতুন একটি জগৎ তৈরিতে বাধা নয়।
দ্যা ফাউন্টেন, মাদার এর সঙ্গে এরকম আরো একটা ছবি যোগ করে একটা ট্রিলজি বানিয়ে ফেলবেন নাকি মিস্টার এ্যারোনোফস্কি?

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *