Smiley face

নিউটনঃ গণতন্ত্র মুক্তি পাক

newton
সাইদুজ্জামান আহাদ
‘নিউটন’ নামটা শুনলে কার কথা প্রথমে মাথায় আসে? আইজ্যাক নিউটন, গ্র্যাভিটি, আপেল- এসবই তো? আমার মাথায় কিন্ত এখন বিজ্ঞানী টিজ্ঞানীর অস্তিত্ব নেই। আমি যে নিউটনকে চিনি, তিনি একজন ছাপোষা সরকারী কর্মচারী। বেচারার একটা সমস্যা আছে, লোকটা একটু বেশীই সৎ। আর এই সততার পরকাষ্ঠা দেখাতে গিয়েই নিজের ঘাড়ে বিপদ ডেকে আনাটা তার স্বভাব।
কি করেছে আমাদের এই নিউটন? নিউটন আসলে কিছু করেনি, করেছেন অমিত ভি মসুরকর, রাজকুমার রাও আর ‘নিউটন টিম’। ২০১৭ সালটা বলিউডে একটু অন্যরকম। অল্প বাজেটে দারুণ কিছু সিনেমা নির্মিত হয়েছে, অসাধারণ কিছু গল্পের ওপর পরিচালক-অভিনেতাদের যত্নের ছোঁয়ায় এ বছর হিন্দি সিনেমা জগত পেয়েছে মনে রাখার মতো কয়েকটা সিনেমা। তালিকা করতে বসলে বেশ ক’টা নামই আসবে, কিন্ত সবার ওপরে যে নামটা থাকবে, সেটা নিউটনের।
ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকালে ছত্তিশগড় জায়গাটা মোটামুটি মাঝামাঝি অবস্থানেই মিলবে। মাওবাদী অধ্যুষ্যিত এই এলাকাটা সম্পূর্ণভাবে ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। বলে হয়, সেখানে নকশালদের আইন চলে, জঙ্গলজুড়ে নকশাল বিদ্রোহীদের গোপন ঘাঁটি, হাতের তালুর মতো চেনে ওরা গোটা এলাকাটাকে। সেনা মোতায়েন করা আছে, কিন্ত তারাও যে সবসময় ওদের সঙ্গে পেরে ওঠে, এমনটা নয়। এখানকারই একটা কেন্দ্রে নির্বাচনের প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হলো একজনকে, কিন্ত সে এই ভয়ের রাজত্বে যেতে রাজী না হওয়ায় ডাক পড়লো রিজার্ভে থাকা নূতন কুমার সিং, ওরফে নিউটনের। প্রাণের ঝুঁকি সেখানে প্রচণ্ড, নকশাল বিদ্রোহীরা নির্বাচন প্রতিহতের ডাক দিয়েছে, গোলাগুলি তো ওখানকার রোজকার ডালভাত।
সিল-ছাপ্পড়, অফিসিয়াল কাগজপত্র আর ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে হেলিকপ্টারে চড়লো নিউটন, লক্ষ্য একটাই, ছিয়াত্তর জন ভোটারের যে লিস্ট তাকে দেয়া হয়েছে, তাদের সবার ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা। আর্মি ক্যাম্পে পরিচয় হলো সেনা কর্মকর্তা আতমা সিং-এর সঙ্গে। তিনিই নিউটনকে প্রস্তাব দিলেন, ঝুঁকি নিয়ে কেন্দ্র পর্যন্ত যাওয়ার কাজ নেই, একটা কিছু বসিয়ে দিলেই হবে। কিন্ত নিউটন তো এসব পথে যাবে না কখনোই, সে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পুরোটাই যথাযথভাবে পালন করতে চায়। এরপর? নিউটন কি শেষমেষ আদিবাসী ভোটারদের ভোট নিতে পেরেছিল? আতমা সিং কতটা সাহায্য করবে নিউটনকে? এই গল্পে সে আবার ভিলেন হয়ে দাঁড়াবে না তো?
জবাবগুলো সিনেমাটা দেখেই নাহয় জেনে নেবেন। নিউটন বা নূতন, যাই বলি না কেন, রাজকুমার রাও এবছরের সেরা অভিনয়টা করেছেন এই সিনেমায়। আতমা আতমা সিংয়ের চরিত্রে পঙ্কজ ত্রিপাঠি ছিলেন দুর্দান্ত। তবে সবচেয়ে বড় হাততালিটা পাবেন পরিচালক অমিত মসুরকর। প্রতিটা দৃশ্য, প্রতিটা সংলাপে তার যত্নের ছাপটা চোখে পড়বে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুব বেশী জায়গায় নেই, যেটুকু ছিল, এক কথায় দারুণ। শুটিং হয়েছে ছত্তিশগড়েই, পরিস্থিতিটাকে বাস্তবে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টার কমতি রাখেনি টিমের কেউই। এই সিনেমাটার নির্মাণ খরচ মাত্র নয় কোটি রূপি শুনলে ভিরমি খেতে হয়; সামান্য বাজেটের একটা কাজ যে কতটা গোছানো হতে পারে, সেটার দারুণ এক দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো নিউটন।

MV5BNDIzOGQwODYtNDU2MC00YTcwLThhZWYtNDIwY2VkNTc5MGIzXkEyXkFqcGdeQXVyNjY1MTg4Mzc@._V1_SX1777_CR0,0,1777,666_AL_

পরিচালক চাইলেই মাওবাদী বিদ্রোহীদের খলনায়ক বানিয়ে দিতে পারতেন, চাইলে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর সব দোষ ঝাড়তে পারতেন। সেই সহজ আর অনুমেয় পথে অমিত হাঁটেননি। তিনি সিস্টেমের ফাঁক-ফোঁকরগুলো নজরে আনার চেষ্টা করেছেন, পুরোপুরি সফলও হয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত, যে গণতন্ত্র গণতন্ত্র করে বিশ্লেষকেরা মাথার চুল ছেড়েন, যে গণতন্ত্রকে মুক্তির সোপান আখ্যা দেয়া হয়, সেই গণতন্তের বাস্তবিক সংজ্ঞাটা আসলে কি? ‘ডেমোক্রেসি ইজ এ গভর্নমেন্ট অফ দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপলে’র সেই মুখস্ত সংজ্ঞার কথা বলছি না। যে গণতন্ত্রকে মানুষ নিজের চোখে দেখতে চায়, হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চায়, সেই গণতন্ত্র কি আছে কোথাও? সোয়াশো কোটি মানুষের মুখের ওপর এই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছে নিউটন।
পাঁচ বছর পরপর ভোটের মৌসুম আসে, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সেটাকে একটা উৎসব বানিয়ে ফেলেন। তাদের স্বার্থ আছে, ক্ষমতায় যাবার গরজ আছে। সাধারণ মানুষের কি লেনাদেনা? ওরা তো শুধু খারাপ আর কম খারাপের মধ্যে একটা দলকে বেছে নেয়, যারা ক্ষমতায় বসার পরে ওদের দিকে আর ফিরেও তাকান না। ছত্তিশগড়ের সেই ছিয়াত্তরজন অশিক্ষিত আদিবাসী যেন শতকোটি মানুষের প্রতিচ্ছবি। ‘ভোট দিলে আমাদের কি লাভ?’- ওদের এই নিরীহ প্রশ্নের জবাব কারো জানা নেই।
এই যে অশিক্ষিত প্রান্তিক মানুষগুলো, সভ্য জগতের চাকচিক্য থেকে শত শত মাইল দূরে যারা বাস করেন, আসলেই কি ওদের গণতান্ত্রিক মত প্রকাশের কোন দাম আছে কারো কাছে? ওরা প্রার্থী চেনেনা, রাজনৈতিক দল চেনেনা, ইভিএমে ভোট দিতে জানেনা, ওরা আর্মি বোঝে না, সরকার বোঝে না, মাওবাদী নকশাল কিছুই ওরা চায় না, ওদের চাওয়া শুধু দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের সংস্থান। মজার ব্যপার হচ্ছে, ওদের সেই চাওয়াটাও কেউ বোঝে না, বা বুঝলেও মানতে চায় না। আর তাই ওরা অবহেলিত, মার খায় দু’পক্ষেরই। সরকারের সেনাবাহিনী এসে ওদের ঘরদোর জ্বালিয়ে দেয়, নকশালরা এসে লুটপাট করে নিয়ে যায়। যা কিছুই হোক, ভুক্তভোগী ওরাই।
নিউটন একটা জমজমাট থ্রিলার হতে পারতো, মাওবাদীদের আক্রমণের ভয়ে ভীত কিছু মানুষ, এই বুঝি হামলা হলো- ধরণের একটা চাপা আতঙ্ক মনে ভর করে থাকবে পুরোটা সময়। কিংবা এটা একটা পলিটিক্যাল স্যাটায়ারও হতে পারতো, একপক্ষ বা দুই পক্ষকেই দায়ী করে কারো ঘাড়ে দোষ চাপানো যেতো। অমিত সেসব কিছুই করতে চাননি, যেটা করেছেন তাতে নিউটন শেষমেশ একটা বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছে। নিউটন যেটা একদিনে দেখেছে, ওই এলাকার মানুষ প্রতিদিন এসব দেখে, এগুলো নিয়েই ওদের জীবন। আর সেই জীবনটাকেই খুব সোজাসাপ্টাভাবে পরিচালক তুলে এনেছেন সেলুলয়েডে।
বিপথগামীদের পথে আনার দায়িত্ব প্রশাসনের। কিন্ত প্রশাসন যখন নিজেই বিপথগামী, নিজেই যখন প্রহসনে পরিণত হয় তখন? তখন নিউটন বন্দুক তাক করেছে সেই প্রশাসনের দিকে, পক্ষান্তরে সিস্টেমের দিকেই। সিভিল সার্ভিস আর ডিফেন্স ইউনিটের মধ্যেকার মানসিক দ্বন্দ্বটা খুনসুটির আড়ালে দেখিয়েছেন অমিত, সেইসঙ্গে এটাও জানিয়েছেন, চাইলেই নিজেদের ইগো ভুলে দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করতে পারে দেশের জন্যে।
এ বছর যে ক’টা ভালো সিনেমা উপহার দিয়েছে বলিউড, সেগুলোর বেশ ক’টারই ফিনিশিংয়ে ঝামেলা ছিল। তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে, জোর করে ক্লাইম্যাক্স বানানো- এমনটা মনে হয়েছে বেশ ক’বার। নিউটনকে ভালো লাগার কারণটা এখানেও। তড়িঘড়ি বা দর্শককে বিস্মিত করার কোন উপাদান জোর করে আরোপ করার চেষ্টাই করেননি পরিচালক। সাদামাটা গল্পের শেষটাও হয়েছে একদম সোজাসাপ্টা, গল্প বলার ব্যাপারে সিনেমার নিউটনের মতোই সৎ ছিলেন অমিত মসুরকর।
শ্রদ্ধেয় মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের একটা কথা আমার খুব প্রিয়- “একজন ভালো মানুষ দিয়ে কি হয়? কিছুই না। কিন্ত একশো জন ভালো মানুষ একটা সমাজ, একটা দেশ বদলে দিতে পারেন।” তেমনই একটা দুটো ‘নিউটন’ দিয়ে হয়তো কিছুই হবে না, কিন্ত পাঁচটা, দশটা, পনেরোটা নিউটনের মতো সিনেমা বলিউডের চেহারাটাই বদলে দিতে পারে পুরোপুরি!

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com